বিশ্ব পরিবেশ দিবস প্রতি বছর আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক আজ এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয়, জল ও বায়ুদূষণ কিংবা ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ— সবকিছু মিলিয়ে পরিবেশের প্রশ্ন আজ আর কেবল বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয় নয়; এটি সাধারণ মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত।
এই বাস্তবতার মধ্যেই এ বছরের আন্তর্জাতিক বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে উত্তর ২৪ পরগণার মেদিয়া ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এক উল্লেখযোগ্য সামাজিক উদ্যোগের সাক্ষী থাকল মানুষ। ৫, ৬ ও ৭ জুন তিন দিনব্যাপী বিভিন্ন পরিবেশমুখী কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গঠিত হয় বৃহত্তর গোবরডাঙ্গা পরিবেশ দিবস উদযাপন কমিটি। মেদিয়া গ্রামের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী এলাকার একাধিক সংগঠন এই যৌথ মঞ্চে সামিল হয়। তিন দিন ধরে বৃক্ষরোপণ, পরিবেশ সচেতনতা প্রচার, আলোচনা সভা, জলাশয় সংরক্ষণ বিষয়ক প্রচারাভিযান, ট্যাবলো প্রদর্শন এবং জনসংযোগমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষার বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
এই বৃহত্তর উদ্যোগের অন্যতম সক্রিয় অংশীদার ছিল মেদিয়া শতদল ক্লাব। পরিবেশ দিবসকে কেন্দ্র করে ক্লাবের পক্ষ থেকে তৃষ্ণার্ত পাখি ও পথপ্রাণীদের জন্য মাটির জলপাত্র বিতরণ, বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষরোপণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রচার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এই ধরনের উদ্যোগ হয়তো পরিসরে ছোট, কিন্তু পরিবেশ আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি লুকিয়ে থাকে এমন স্থানীয় অংশগ্রহণের মধ্যেই।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এই কর্মসূচিগুলির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে মেদিয়া শতদল ক্লাবের একাধিক সদস্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ক্লাবের সদস্য সুরজিৎ মিস্ত্রি, তুহিন দে, মলয় ঘোষ, সম্রাট ঘোষ, আশীষ সন্ন্যাসী, সুমন দাস-সহ অন্যান্য সদস্যদের সক্রিয় সহযোগিতা ও আন্তরিক অংশগ্রহণ এই উদ্যোগকে সফল করে তুলতে বিশেষভাবে সহায়ক হয়। পরিবেশ সচেতনতার বার্তা মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে তাঁদের নিরলস প্রচেষ্টা এবং সাংগঠনিক দক্ষতা প্রশংসার দাবি রাখে। প্রকৃতপক্ষে, এই ধরনের সামাজিক কর্মসূচির সাফল্য কেবল নেতৃত্বের উপর নির্ভর করে না; বরং নেপথ্যে থাকা অসংখ্য কর্মীর সম্মিলিত প্রয়াসই তাকে একটি বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনের রূপ দেয়।
অনুষ্ঠানে ক্লাবের সভাপতি সুরজিত দে উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল— পরিবেশ রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং আগামী প্রজন্মের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার অন্যতম শর্ত। বাস্তবিকই, আজ পৃথিবীর সামনে যে সংকটগুলি উপস্থিত, তা দেখলে এই বক্তব্যের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহলে বহুল আলোচিত একটি ধারণা হলো “ট্রিপল প্ল্যানেটারি ক্রাইসিস”— অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং দূষণের সম্মিলিত সংকট। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে এই তিনটি সমস্যা একে অপরকে প্রভাবিত করছে এবং মানবসভ্যতার অস্তিত্বের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।
এই বৈশ্বিক সংকটের প্রতিফলন আমরা স্থানীয় স্তরেও দেখতে পাচ্ছি। উত্তর ২৪ পরগণার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আর্সেনিক দূষণ এখনও একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান প্লাস্টিক দূষণ, জলাশয় ভরাট, কৃষিজমির উপর চাপ এবং নগরায়নের বিস্তার পরিবেশগত ভারসাম্যকে দুর্বল করে তুলছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় সুন্দরবনের বায়ুমণ্ডলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে, যা প্রমাণ করে যে দূষণ আজ পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রগুলিকেও প্রভাবিত করছে।
বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবও ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার প্রায় সমস্ত হিমবাহ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ঘটনা আজ বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয়। একসময় যে হিমবাহগুলি প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতীক ছিল, সেগুলি এখন জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম বাস্তবতার সাক্ষ্য বহন করছে। পৃথিবীর এক প্রান্তের এই পরিবর্তনের অভিঘাত অন্য প্রান্তের মানুষের জীবনেও প্রতিফলিত হচ্ছে— কখনও বন্যা, কখনও খরা, কখনও বা অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহের মাধ্যমে।
এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে মেদিয়া কঙ্কনা বাওড়ের গুরুত্ব নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। স্থানীয় এই জলাশয় কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য এবং জলসংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। অথচ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কারণে জলাশয়টির অবস্থা অবনতির দিকে যাচ্ছে। পরিবেশ সচেতন নাগরিকদের মতে, দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এর ক্ষতি আরও গভীর হতে পারে।
~নন্দ দুলাল মন্ডল
উত্তর ২৪ পরগণা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত