# আমীরুল ইসলাম

**শিশুসাহিত্যিক, ছড়াকার ও লেখক**

**জন্ম:** ৭ এপ্রিল ১৯৬৪, লালবাগ, ঢাকা
**মৃত্যু:** ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ঢাকা
**সাহিত্যক্ষেত্র:** শিশুসাহিত্য, ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য
**পুরস্কার:** বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০০৬

---

## পরিচিতি

**আমীরুল ইসলাম** ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিশুসাহিত্যিক, ছড়াকার ও বহুমাত্রিক লেখক। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, বিজ্ঞান, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও নানা সৃজনশীল বিষয় নিয়ে বিপুলসংখ্যক বই রচনা করেছেন।

শিশুদের জন্য লেখা তাঁর সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল **সহজ-সাবলীল ভাষা, কল্পনাশক্তি, রসবোধ এবং শিশুমনের প্রতি গভীর সংবেদনশীলতা**। তাঁর রচনায় শিশুরা শুধু গল্পের পাঠক নয়, বরং কল্পনা, প্রশ্ন, আনন্দ ও আবিষ্কারের সক্রিয় অংশ হয়ে ওঠে।

চার দশকেরও বেশি সময়ের সাহিত্যজীবনে তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

---

## শৈশব ও জন্ম

আমীরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন **১৯৬৪ সালের ৭ এপ্রিল ঢাকার লালবাগে**। তাঁর বাবা ছিলেন সাইফুর রহমান এবং মা আনজিরা খাতুন।

ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে এই আগ্রহই তাঁকে বাংলা শিশুসাহিত্যের অন্যতম পরিচিত লেখকে পরিণত করে।

সাহিত্যিক পরিবার ও পরিবেশের সঙ্গেও তাঁর যোগ ছিল। তাঁর পিতৃব্য ছিলেন শিশুসাহিত্যিক কবি **হাবীবুর রহমান**।

---

## সাহিত্যজীবনের শুরু

আমীরুল ইসলামের সাহিত্যিক যাত্রা শুরু হয় মূলত **ছড়া লেখার মধ্য দিয়ে**। তাঁর প্রথম প্রকাশিত বই **‘খামখেয়ালি’**।

প্রথম বই থেকেই তাঁর লেখার স্বতন্ত্রতা পাঠক ও সাহিত্যাঙ্গনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বইটির জন্য তিনি বাংলাদেশ শিশু একাডেমি আয়োজিত **অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার** লাভ করেন।

পরবর্তীকালে তিনি একই পুরস্কার আরও কয়েকবার অর্জন করেন।

ছড়া দিয়ে সাহিত্যজীবন শুরু করলেও তিনি নিজেকে কোনো একটি সাহিত্যধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। শিশুসাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ।

---

## শিশুসাহিত্যে অবদান

আমীরুল ইসলামের সাহিত্যজগৎ ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়।

তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন—

* ছড়া
* কবিতা
* গল্প
* উপন্যাস
* বিজ্ঞানভিত্তিক লেখা
* ইতিহাসভিত্তিক রচনা
* মুক্তিযুদ্ধের গল্প ও সাহিত্য
* জীবনী
* ভ্রমণকাহিনি
* অনুবাদ
* নাটক
* গান
* স্মৃতিচারণ
* শিশুসাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ

তাঁর লেখার একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল **শিশুর চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখা**।

কখনো গাছ হয়ে ওঠে কল্পনার চরিত্র, কখনো ভূত চলে আসে শহরে, কখনো একটি শিশু নিজেকে পিঁপড়ের জগতে আবিষ্কার করে। বাস্তব ও কল্পনার এই মিশ্রণ তাঁর লেখাকে শিশুদের কাছে আনন্দময় ও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।

---

## উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ

আমীরুল ইসলামের উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে—

**‘খামখেয়ালি’**
**‘আমি সাতটা’**
**‘দশটা দশ রকম’**
**‘আমি মুক্তিযোদ্ধা হতে চাই’**
**‘শাদা ভূত কালো ভূত’**
**‘রাজাকারের ছড়া’**
**‘আমার ছড়া’**
**‘আয়রে আমার ছেলেবেলা’**
**‘বারোয়ারি বারো গল্প’**

এ ছাড়া তাঁর শিশুসাহিত্যবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—

**‘শিশুসাহিত্যের আলোছায়া’**
**‘শিশুসাহিত্যের চেনা অচেনা’**

তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দুই শতাধিকের বেশি বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।

---

## মুক্তিযুদ্ধ ও দেশচেতনা

আমীরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে **মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের ইতিহাস**।

শিশু-কিশোরদের উপযোগী করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন, দেশপ্রেম এবং স্বাধীনতার চেতনা তুলে ধরতে তিনি বহু বই লিখেছেন।

তাঁর **‘আমি মুক্তিযোদ্ধা হতে চাই’**-এর মতো রচনায় নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস স্পষ্ট।

শিশুদের কাছে মুক্তিযুদ্ধকে কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং অনুভব ও উপলব্ধির বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করাই ছিল তাঁর লেখার অন্যতম শক্তি।

---

## ভাষা ও লেখার বৈশিষ্ট্য

আমীরুল ইসলামের লেখার ভাষা ছিল সহজ, প্রাণবন্ত ও কথোপকথনধর্মী।

তাঁর লেখায় পাওয়া যায়—

**কল্পনা + হাস্যরস + শিশুমন + বাস্তবতা + দেশচেতনা**

তিনি শিশুদের ছোট করে দেখেননি। বরং শিশুর নিজস্ব চিন্তা, প্রশ্ন ও কৌতূহলকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

তাঁর রচনায় নীতিকথা চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে গল্প, ছড়া ও কল্পনার মধ্য দিয়ে শিশুদের ভাবতে শেখানোর প্রবণতা দেখা যায়।

এই কারণেই তাঁর লেখা শুধু শিশুদের আনন্দ দেয়নি; তাদের কল্পনাশক্তি ও চিন্তার জগতকেও প্রসারিত করেছে।

---

## পুরস্কার ও সম্মাননা

দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে আমীরুল ইসলাম বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

### বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার

**২০০৬ সালে** শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি **বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার** লাভ করেন।

এটি তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যসাধনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।

এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে শিশুসাহিত্য ও সাহিত্যচর্চায় অবদানের জন্য আরও বেশ কিছু পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

* অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার
* সিকান্দার আবু জাফর সাহিত্য পুরস্কার
* নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার
* পদক্ষেপ সাহিত্য পুরস্কার
* ছোটদের পত্রিকা পুরস্কার
* শামসুর রাহমান সাহিত্য পুরস্কার
* অন্নদাশঙ্কর সাহিত্য পুরস্কার

---

## গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড

আমীরুল ইসলাম শুধু সাহিত্যিক হিসেবেই নয়, বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একজন সক্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।

তিনি দৈনিক বাংলার কিশোরদের পাতার বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কিশোর পত্রিকা **‘আসন্ন’**-এর সঙ্গেও তিনি সম্পাদনার দায়িত্বে যুক্ত ছিলেন।

পরবর্তীতে তিনি **চ্যানেল আই**-এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই যুক্ত হন এবং দীর্ঘ সময় অনুষ্ঠান বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

সাহিত্য, গণমাধ্যম ও সংস্কৃতি—এই তিন ক্ষেত্রেই তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে তাঁকে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান দিয়েছে।

---

## ব্যক্তিজীবন ও আগ্রহ

সাহিত্যের বাইরেও আমীরুল ইসলামের ছিল নানা সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক আগ্রহ।

বই পড়া, পুরোনো বই ও চিত্রকলা সংগ্রহ, দাবা খেলা এবং রবীন্দ্রসংগীত শোনার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল।

তাঁর ব্যক্তিত্বে ছিল প্রাণবন্ততা, রসবোধ ও আড্ডাপ্রিয়তার ছাপ। সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে তিনি কেবল পেশা হিসেবে নয়, জীবনযাপনের অংশ হিসেবেও ধারণ করেছিলেন।

---

## মৃত্যু

জীবনের শেষদিকে আমীরুল ইসলাম কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং শেষ পর্যায়ে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।

**২০২৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর**, ৬২ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের সাহিত্য, শিশুসাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়।

তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে তাঁর মায়ের কবরেই সমাহিত করা হয়।


## শেষকথা

আমীরুল ইসলাম ছিলেন শিশুমনের একজন নিবেদিত শিল্পী।

তিনি শিশুদের জন্য লিখেছেন, কিন্তু তাঁর লেখার ভেতর দিয়ে তিনি আসলে **একটি প্রজন্মের কল্পনা, আনন্দ ও দেশচেতনাকে সমৃদ্ধ করেছেন।**

তাঁর প্রয়াণে বাংলা শিশুসাহিত্য হারিয়েছে একজন বহুমাত্রিক ও সৃষ্টিশীল লেখককে।

কিন্তু একজন প্রকৃত লেখকের মৃত্যু তাঁর সৃষ্টির মৃত্যু নয়।

**আমীরুল ইসলাম তাঁর বইয়ের পাতায়, তাঁর ছড়ার ছন্দে এবং অসংখ্য পাঠকের শৈশবের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবেন।**

**শ্রদ্ধাঞ্জলি।**