অসুরেরা দেবতাদের শত্রু, তাই তাহাদিগকে মারিবার জন্য দেবতারা সর্বদাই চেষ্টা করেন। একবার ইন্দ্রের হুকুমে অগ্নি আর বায়ু দুজনে মিলিয়া অসুরদিগকে পোড়াইয়া ফেলিতে গেলেন। বাতাস যদি আগুনের সাহায্য করে, তবে তাহার তেজ বড়ই ভয়ংকর হয়। হাজার হাজার অসুর সেই আগুনের তেজে পুড়িয়া মরিতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে আর সকল অসুরই মারা গেল, খালি পাঁচজন অসুর যে সমুদ্রের ভিতরে লুকাইয়া ছিল, অগ্নি আর বায়ু তাহাদিগকে মারিতে পারিলেন না।
সেই পাঁচটা অসুর যে কেবল জলের ভিতরে ঢুকিয়া প্রাণ বাঁচাইল তাহা নহে, মাঝে মাঝে জলের ভিতর হইতে বাহির হইয়া আসিয়া সংসারের সকল লোককে বিষম জ্বালাতনও করিতে লাগিল। তখন ইন্দ্র বলিলেন যে, “অগ্নি আর বায়ু সাগর শুষিয়া ফেলুক।” কিন্তু অগ্নি আর বায়ু তাহাতে রাজি হইলেন না, তাঁহারা বলিলেন, “এই সাগরের মধ্যে কত কোটি কোটি জীব আছে যাহারা কোনো অপরাধ করে নাই; আমরা সাগর শুষিতে গেলে তাহারা মারা যাইবে। এমন পাপ আমরা করিতে পারিব না।”
এ কথায় ইন্দ্র ভয়ানক চটিয়া বলিলেন, “তোমরা আমার হুকুম অমান্য করিলে, এই অপরাধে তোমাদিগকে মুনি হইয়া পৃথিবীতে জন্মিতে হইবে।”
ইন্দ্র এই কথা বলিবামাত্র অগ্নি আর বায়ু স্বর্গ হইতে পৃথিবীতে পড়িয়া গেলেন এবং দুজনে মিলিয়া একটি মুনি হইয়া একটা কলসীর ভিতর হইতে বাহির হইলেন। এই মুনির নামই অগস্ত্য। ইনি বড়ই আশ্চর্যরকমের লোক ছিলেন;আর ইনি যে মাঝে মাঝে এক একটা কাজ করিতেন তাহাও অতিশয় অদ্ভুত।
অসুরেরা জলের ভিতর হইতে আসিয়া অত্যাচার করিয়া যখন দেবতাদিগকে নিতান্তই ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিল, তখন বিষ্ণু তাঁহাদিগকে শিখাইয়া দিলেন যে, “তোমরা গিয়া অগস্ত্যকে ধর। তিনি ইচ্ছা করিলেই সাগরের জল খাইয়া ফেলিতে পারেন, আর তাহা হইলে তোমাদেরও অসুর মারিবার খুব সুবিধা হইবে।”
এ কথায় দেবতারা অগস্ত্যের নিকটে আসিয়া বলিলেন, “ঠাকুর আমাদের একটি কাজ তো না করিয়া দিলেই নয়। আপনি যদি দয়া করিয়া একটিবার সাগরের জলটুকু খাইয়া ফেলেন, তবেই আমরা অসুরগুলিকে মারিতে পারি, নচেৎ আমাদের বড়ই বিপদ।”
অগস্ত্য বলিলেন, “আচ্ছা, তবে চলুন।” এই বলিয়া তিনি সমুদ্রের জল খাইতে চলিলেন, আর সংসারের লোক ছুটিয়া তাহার তামাশা দেখিতে আসিল। সেই অদ্ভুত ব্যাপার দেখিয়া তাহারা কি আশ্চর্য যে হইয়াছিল, আর অগস্ত্যের কিরূপ প্রশংসা যে করিয়াছিল, তাহা বুঝিতেই পার। দেখিতে দেখিতে অগস্ত্য সাগরের সকল জল খাইয়া শেষ করিলেন, আর দেবতারাও মনের সুখে দুষ্ট অসুরদিগকে ধরিয়া মারিতে লাগিলেন।
ইম্বল আর বাতাপি নামে দুটা দৈত্যকে অগস্ত্য যেমন করিয়া মারিয়াছিলেন, তাহাও অতি আশ্চর্য। ইম্বল বড় ভাই, বাতাপি ছোট ভাই; মণিমতী পুরীতে তাহাদের বাড়ি। একবার ইম্বল একটি ব্রাহ্মণের নিকট এইরূপ বর চাহিয়াছিল, “আমার যেন ইন্দ্রের সমান একটি পুত্র হয়।” ব্রাহ্মণ বলিলেন, “এমন বর তো আমি তোমাকে দিতে পারিব না বাপু।” ইহাতে ইম্বল যারপরনাই চটিয়া গিয়া ব্রাহ্মণ মারিবার এক ফন্দি বাহির করিল।
ইম্বলের একটা বড় আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল যে, সে কোনো মরা জন্তুর নাম ধরিয়া ডাকিলে সেই জন্তু অমনি বাঁচিয়া উঠিয়া তাহার নিকট আসিয়া উপস্থিত হইত। কোনো ব্রাহ্মণ তাহার বাড়িতে আসিলে সে বাতাপিকে ছাগল সাজাইয়া, সেই ছাগলের মাংস রাঁধিয়া তাহাকে খাওয়াইত। ব্রাহ্মণ খাওয়া-দাওয়া সারিয়া বিশ্রাম করিতে বসিলে দুষ্ট দৈত্য ডাকিত, ‘বাতাপি! বাতাপি!’ অমনি বাতাপি সেই ব্রাহ্মণের পেট ছিড়িয়া হাসিতে হাসিতে বাহির হইয়া আসিত। এমনি করিয়া হতভাগা অনেক ব্রাহ্মণ মারিয়াছিল।
এই সময়ে একদিন অগস্ত্য পথে চলিতে চলিতে দেখিলেন যে, এক গর্তের ভিতরে কতকগুলি লোক ঝুলিতেছে, তাহাদের মাথা নীচের দিকে পা উপরদিকে। সেই লোকগুলিকে দেখিয়া অগস্ত্যের বড়ই দয়া হওয়ায় বলিল, “বাপু, আমরা তোমার পূর্বপুরুষ। তুমি বিবাহ কর নাই, তাই আমাদের এই দশা। তুমি যদি বিবাহ কর আর তোমার ছেলে হয়, তবে আমাদের দুঃখ দূর হইতে পারে।”
এ কথায় অগস্ত্য অতিশয় ব্যস্ত হইয়া বিবাহের চেষ্টা দেখিতে লাগিলেন কিন্তু কোথাও একটি মনের মতন কন্যা খুঁজিয়া পাইলেন না। শেষে আর কোনো উপায় না দেখিয়া তিনি নিজেই একটি কন্যার সৃষ্টি করিলেন। সংসারের সকল জন্তুর মধ্যে যাহার শরীরে যে স্থানটি সকলের চেয়ে সুন্দর সেইরূপ করিয়া কন্যাটির শরীরে সকল স্থান গড়া হইল। তেমন সুন্দর আর কেহ কখনো দেখে নাই। সেই কন্যা বিদর্ভ দেশের রাজার ঘরে গিয়া তাঁহার মেয়ে হইয়া জন্মগ্রহণ করিল; রাজা তাহার নাম রাখিলেন, লোপামুদ্রা।
লোপামুদ্রা যখন বড় হইলেন, তখন অগস্ত্য আসিয়া রাজাকে বলিলেন, “মহারাজ, আপনার কন্যাটিকে আমি বিবাহ করিব।”ইহাতে রাজা আর রাণী তো বড়ই বিপদে পড়িলেন। এত আদরের কন্যাটিকে কদাকার দরিদ্র মুনির হাতে দিতে কিছুতেই মন উঠিতেছে না; না দিলে আবার মুনি না জানি কি শাপ দেন, এখন উপায় কি হইবে? এমন সময় লোপামুদ্রা বলিলেন, “বাবা আমার জন্য আপনারা চিন্তিত হইবেন না; মুনির সঙ্গে আমার বিবাহ দিন।” সুতরাং শীঘ্রই অগস্ত্য আর লোপামুদ্রার বিবাহ হইয়া গেল।
বিবাহের পর লোপামুদ্রা তপস্বিনীর বেশে স্বামীর গৃহে আসিয়া বাস করিতে লাগিলেন। অগস্ত্যের ইচ্ছ হইল, তাহাকে রাজকন্যার মতন সুন্দর বসন-ভূষণ পরাইয়া রাখেন। কিন্তু তিনি অতি দরিদ্র;বসন-ভূষণ কোথায় পাইবেন? কাজেই ইহার জন্য তাহাকে ভিক্ষায় বাহির হইতে হইল। এক এক রাজার নিকট যান, আর বলেন, “আমি আপনার নিকট ধন চাহিতে আসিয়াছি। আপনি অন্যের ক্লেশ বা ক্ষতি না জন্মাইয়া যদি আমাকে কিছু দিতে পারেন, তবে দিন।”
এইরূপ করিয়া অগস্ত্য ক্রমে শ্রুতধা, ব্রধস্ব আর ত্রসদস্যুর নিকট গেলেন, কিন্তু ইঁহাদের কাহারও হিসাবপত্র দেখিয়া তাঁহার মনে হইল না যে, তিনি অন্যের ক্লেশ না জন্মাইয়া তাঁহকে ধন দিতে পারিবেন। কাজেই ইঁহাদের কাহারও নিকট হইতে তাঁহার ধন লওয়া হইল না। তখন রাজারা তাঁহাকে বলিলেন, “ঠাকুর! চলুন আপনাকে লইয়া ইম্বল দানবের নিকট যাই! উহার অনেক ধন আছে।” এই বলিয়া তাহারা অগস্ত্যকে নিয়া ইম্বলের নিকট উপস্থিত হইলেন।
তাহাদিগকে দেখিয়া ইম্বলের আর সৌজন্যের সীমাই নাই। সে নমস্কার দণ্ডবৎ কতই করিল, তাহার উপর আবার ভাই বাতাপিকে এই বড় পাঁঠা সাজাইয়া তাহার মাংসে চমৎকার কোরমা রাঁধিল। সেই মাংস রান্নার সন্ধান পাইয়া রাজা মহারাজেরা তো কাঁপিয়াই অস্থির, কেননা, তাহা খাইলে যে কি হয়, সে কথা তাঁহারা বিলক্ষণ জানিতেন। যাহা হউক অগস্ত্য তাঁহাদিগকে ভরসা দিয়া বলিলেন, “আপনাদের কোনো চিন্তাই নাই আমি সব ঠিক করিয়া দিতেছি।”
তারপর পাতপিঁড়ি প্রস্তুত হইলে সকলে খাইতে বসিলেন। ইম্বল হাসিতে হাসিতে সেই মাংস পরিবেশন করিতে আসিল, অগস্ত্যও হাসিতে হাসিতে তাহার সমস্তই খাইয়া শেষ করিলেন, রাজাদিগকে দিবার জন্য কিছুই অবশিষ্ট রাখিলেন না। তারপর যখন ইম্বল ডাকিল, ‘বাতাপি! বাতাপি!’ তখন তিনি হাসিতে হাসিতে বলিলেন, “বাতাপি আর কি করিয়া আসিবে? তাহাকে হজম করিয়া ফেলিয়াছি!”
কেহ কেহ বলেন যে, এ কথায় ইম্বল অগস্ত্যকে মারিতে গিয়াছিল আর অগস্ত্য তাহাকে ভস্ম করিয়া ফেলিয়াছিলেন। কিন্তু অন্যরা বলেন যে, ইম্বল অত্যন্ত ভয় পাইয়া অগস্ত্যকে অনেক ধন দিয়াছিল।
আর একবার অগস্ত্য বিন্ধ্য পর্বতকে বড়ই নাকাল করিয়াছিলেন। বিন্ধ্য পর্বতের মাথা ক্রমে এতই উঁচু হইয়া উঠিয়াছিল যে, তাহাতে সূর্যের চলাফেরার পথ বন্ধ হইয়া যায়। বৎসরের মধ্যে একবার সূর্যকে উত্তর হইতে দক্ষিণে যাইতে হয়, আবার দক্ষিণ হইতে উত্তরে আসিতে হয়। বিন্ধ্য পর্বতের মাথা এত উঁচু হইয়া যাওয়াতে সুর্যের সেই কাজটি করা অসম্ভব হইয়া পড়িল।
সূর্য দেখিলেন, তাঁহার ব্যবসায়ই মাটি হইতে চলিয়াছে;কাজেই তিনি অগস্ত্যের নিকটে আসিয়া বলিলেন “ঠাকুর! আমি তো বড়ই সংকটে পড়িয়াছি, এখন আপনি যদি আমাকে উদ্ধার করেন।” অগস্ত্য বলিলেন, “আপনার কোনো চিন্তা নাই, আমি বিন্ধ্য পর্বতের মাথা নিচু করিয়া দিতেছি।” এই বলিয়া তিনি যারপরনাই বুড়া একটি মুনি সাজিয়া বিন্ধ্য পর্বতের নিকট গিয়া বলিলেন, “বাপু, আমি তীর্থ করিতে দক্ষিণ দেশে যাইব। কিন্তু আমি বুড়া মানুষ, তোমাকে ডিঙ্গাইতে পারি, এমন শক্তি আমার নাই। তুমি একটু নিচু হও, আমি তীর্থ করিয়া আসি।”
মুনির কথায় বিন্ধ্য পর্বত মাথা নিচু করিয়াছিল। তখন মুনি তাহার উপর দিয়া দক্ষিণে গিয়া বলিলেন, “যতক্ষণ আমি তীর্থ করিয়া ফিরিয়া না আসি, ততক্ষণ এমনিভাবে থাক, নহিলে কিন্তু ভারি শাপ দিব।” কাজেই বিন্ধ্য আর কি করে? সে হেঁট মুখেই পড়িয়া রহিল। তদবধি আর বেচারা অগস্ত্যের দেখাও পায় নাই, শাপের ভয়ে মাথাও তুলিতে পারে নাই।
অনুসন্ধান করুন
🎂 আজ যাদের জন্মদিন
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
শুভ জন্মদিন! 🎈
সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ
প্রিয় কবি বন্ধু, আপনার আন্তরিক প্রশংসার জন্য হৃদয...
আরো দেখুন
কাজী অ্যাডাম
লেখক:
কাজী অ্যাডাম
প্রিয় কবি বন্ধু, আপনার আন্তরিক ভালো লাগার জন্য কৃ...
আরো দেখুন
কাজী অ্যাডাম
লেখক:
কাজী অ্যাডাম