সবুজ ঘাসের ডগায় ভোরের প্রথম রশ্মি পড়ার আগেই তার প্রহর শুরু হতো। গ্রামের সেই নিভৃত কোণে, বাঁশবনের ছায়ায় যখন কুয়াশার চাদর বিছানো থাকত, তখনই সে সজোরে ডানা ঝাপটে ঘোষণা করত—নতুন দিন আসছে। তার মস্তকের লাল ঝুঁটিটি ছিল ভোরের সূর্যের মতোই প্রদীপ্ত। আপন শাবক আর সঙ্গিনীদের নিয়ে উঠোনের ধুলোবালিতে আল্পনা আঁকা, খড়কুটোর অরণ্যে খাবারের অন্বেষণ আর প্রকৃতির অকৃপণ ওম গায়ে মাখাই ছিল তার জীবনের পরম তৃপ্তি। সে নিস্পাপ মনে ভাবত—এই বিশাল ধরিত্রী যেমন মানুষের, তেমনই বোধহয় তারও।
কিন্তু নিয়তির লিখন বদলে গেল একদিনের আকস্মিকতায়।
বিকেলের পড়ন্ত রোদে যখন সে মুক্তির আনন্দে ডানা মেলতে চাইল, তখনই মানুষের কর্কশ হাত তাকে জাপটে ধরল। কোনো অপরাধ ছাড়াই তার নমনীয় পা দুটি শক্ত দড়িতে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলা হলো। এখন সে ধুলোবালির এক কোণে অবহেলিতভাবে পড়ে আছে। মাথার ওপর নীল আকাশটা আজও অপরিবর্তিত, কিন্তু তার ডানা ঝাপটানোর মৌলিক অধিকারটুকু মুহূর্তেই হরণ করা হয়েছে।
সে বিস্ময়ভরা চোখে মানুষের ব্যস্ততা দেখে। যে হাতগুলো প্রতিদিন তাকে দানা ছিটিয়ে দিত, আজ সেই মানুষগুলোই তার দিকে তাকাচ্ছে এক জিঘাংসা আর আদিম তৃষ্ণা নিয়ে। সে মনে মনে প্রশ্ন করে—মানুষ কি সত্যিই এতটাই ক্ষুধার্ত? প্রকৃতি তো কাউকেই রিক্ত হাতে ফেরায় না। বহমান নদীর জল, গাছের থরে থরে সাজানো ফল আর দিগন্তজোড়া সোনালী শস্যের মাঠ—সবই তো মানুষের তরে। তবে কেন এই নগণ্য প্রাণটিকে একবেলার আহারের জন্য অকালে বিলীন হতে হবে?
সে তো কোনো নগরী দগ্ধ করেনি, কোনো রণক্ষেত্র সাজায়নি। সে কেবল চেয়েছিল বনের সীমান্তে কিংবা ঝোপের অন্তরালে প্রকৃতির এক নিঃশব্দ অংশ হয়ে বাঁচতে। কিন্তু মানুষের কাছে তার জীবনের চেয়েও ‘প্রাতরাশ’ আজ অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে উঠল।
রাতের অন্ধকার ঘনীভূত হয়। ডাইনিং টেবিল ঘিরে মানুষের উল্লাস আর বৈদ্যুতিক আলোর ঝিলিক তার চোখে পড়ে। একটু পরেই হয়তো সুগন্ধি মশলার প্রলেপে তার অস্তিত্ব চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে। অথচ সে শেষবার মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে চায়, “হে শ্রেষ্ঠ জীব, প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে তোমারও তো একদিন মহাপ্রয়াণ ঘটবে; তবে আমার সময় হওয়ার আগেই আমাকে কেন নির্বাসনে পাঠাচ্ছ? আমার জীবনের মূল্য কি কেবল তোমাদের উদরপূর্তিতে?”
মানুষের অকাল মৃত্যুকে সমাজ ‘হত্যা’ বলে মান্য করে, বিচারালয়ে তার বিচার হয়। কিন্তু একই স্রষ্টার সৃষ্টি হয়েও কি একটি ক্ষুদ্র প্রাণীর জীবনের কোনো অধিকার নেই? মানুষ কেবল নিজের জীবনের সুরক্ষায় ব্যগ্র, অন্য প্রাণের প্রতি সে কেন এমন উদাসীন? মানুষ তার স্বাভাবিক মৃত্যুকে স্বীকার করে, তবে কেন সে অন্য প্রাণের স্বাভাবিক সমাপ্তির জন্য অপেক্ষা করতে পারে না?
অসহায় প্রাণীটি আকাশের শেষ নক্ষত্রটির দিকে তাকিয়ে এক নীরব দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে। তার চোখের কোণে জমে থাকা এক বিন্দু জল দেখার সাধ্য কোনো মানুষের নেই। সে কেবল প্রকৃতির কোলে সামান্য একটু আশ্রয় চেয়েছিল, কিন্তু মানুষের ক্ষুধার স্পর্ধা আর শ্রেষ্ঠত্বের দম্ভের কাছে সেই তুচ্ছ ইচ্ছাটি এক টুকরো ধারালো ইস্পাতের তলায় স্তব্ধ হওয়ার প্রতীক্ষায় প্রহর গোনে।
