রাত জেগে বই পড়া
রাত জেগে বই পড়া
বাপন মান্না

গল্প - রাত জেগে বই পড়া

বাপন মান্না
মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ভৌতিক, রহস্য

রাত তখন সাড়ে বারোটা। প্রতিম একা ঘরের মধ্যে বই পড়ছে। সামনেই তার পরীক্ষা। তাই ইদানীং রাত জেগে তাকে বই পড়তে হয়। তাকে সামনের পরীক্ষায় প্রথম হতেই হবে। সে বরাবরই পরীক্ষায় প্রথম হয়। কিন্তু এ বছর শরীর অসুস্থ থাকার জন্য সে দ্বিতীয় হয়েছে। তাই সে এ বছর প্রাণপণে চেষ্টা করছে। রাত জাগছে। খাওয়া-দাওয়ার পরে বাবা মা শুয়ে পড়েছে। কিন্তু প্রতিম জেগে আছে।
পড়তে পড়তে হঠাৎ আচমকা বিড়ালের ডাক শুনে প্রতিম চমকে ওঠে। সে অবাক হয়ে যায় এই ভেবে যে, তাদের বাড়িতে বিড়াল নেই, এমনকি তাদের আশেপাশের বাড়িগুলোতে কেউই বিড়াল পোষে না। তাহলে এত রাতে বিড়াল কোথা থেকে এল! প্রতিম এটা ভেবেই চমকে উঠল। সে পড়াটা থামিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর আবার সে পড়তে শুরু করল। পড়তে পড়তে কেমন একটা শব্দ শুনতে পেল। পড়া থামিয়ে সে বোঝার চেষ্টা করল — এই শব্দটা কিসের? যখনই সে পড়া থামিয়ে দিল, সঙ্গে সঙ্গে সেই শব্দটাও মিলিয়ে গেল। আবার পড়া শুরু করল। বুঝতে পারল যে, আবার সেই শব্দটা হচ্ছে। এবার সে পড়া থামাল না। পড়তে পড়তে সে শব্দটা শোনার চেষ্টা করল। বুঝতে পারল — তাদের বাড়ির পিছনে কেউ হাঁটছে। কেউ শুকনো পাতার ওপরে হাঁটলে যেমন শব্দ হয়, হুবহু সেই শব্দই হচ্ছে। প্রতিম ভয় পেয়ে গেল। এতরাতে তাদের বাড়ির পিছনে কে হাঁটতে পারে! কোনো চোরটোর নয় তো? সে ভাবল, তার বাবা-মাকে ডাকা উচিৎ। তাদেরকে ডাকলে চোরটিকে ধরা যেতে পারে। আবার সে পরক্ষণেই অন্য চিন্তা করল। যদি চোর না হয়ে অন্য কিছু হয়, তাহলে! অন্য কিছু মানে কি? অন্য কিছু মানে তো ভূত। যাই হোক বাবা-মাকে জানাতে হবে। এই ভেবে সবে বই সরিয়ে বিছানা থেকে নামতে যাবে হঠাৎ কারেন্ট চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিমের গা শিউরে উঠল। তখনই আবার সেই বিড়ালের ডাক শুনতে পেল। গা কাঁটা মেরে উঠল প্রতিমের। প্রতিম ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বিছানায় বসে পড়ল। অন্ধকারে টর্চটা খোঁজার চেষ্টা করল। কিন্তু খুঁজে পেল না। প্রতিমের ঠিক মনে আছে যে, সে কোথায় টর্চটা রেখেছিল। সেখানেই সে খুঁজল, কিন্তু পেল না। ঘরটা অন্ধকারে ঘন হয়ে আছে। গভীর অন্ধকার। ঘরের পিছনে অজানা মানুষের হাঁটার শব্দ। বারান্দায় বিড়ালের শব্দ। সবমিলিয়ে প্রতিম ভয়ে একেবারে জড়োসড়ো হয়ে হয়ে গিয়েছে। তার ওপর টর্চ না খুঁজে পাওয়া। কি হচ্ছে — কিছুই বুঝতে পারছিল না। হঠাৎ দেখল আলোর চিহ্ন। খাটের নিচ থেকে আলো বেরিয়ে আসছে। কিন্তু কিভাবে? তারপর ধীরে ধীরে সেই আলোর উৎসকে দেখা গেল। দেখা গেল খুঁজে না পাওয়া টর্চ থেকে অটোমেটিক আলো জ্বলছে। আর টর্চটি শূন্যে ভাসছে। এটা কিভাবে সম্ভব! প্রতিম ভয়ে বিছানা থেকে নেমে ঘরের বাইরে গিয়ে বাবা-মাকে ডাকতে পারছে না। তাই সে জোরে চিৎকার করে ডাকার চেষ্টা করল। কিন্তু তার গলা থেকে শব্দ বের হল না। সে ভাবছে — কি হচ্ছে এটা! টর্চটা শূন্যে ভাসতে ভাসতে প্রতিমের হাতের কাছে আসল। প্রতিম ভয়ে ভয়ে টর্চটা ধরল। যেই প্রতিম টর্চটা হাতে ধরেছে, সঙ্গে সঙ্গে কারেন্ট চলে আসল। কিন্তু প্রতিম দেখে — তার ঘরের মধ্যে একটা প্রকান্ড বাদুড় ঘরের সিলিং থেকে ঝুলছে। এই দেখে প্রতিম কুঁকিয়ে উঠল। সে জোরে চিৎকার করে ওঠে — মা, মা। বন্ধ ঘরে বাদুড় আসল কিভাবে! ভয় তো পাওয়ারই কথা। তাছাড়া এত বড় বাদুড়! মা, মা বলে চিৎকার করার পরে সে গোঙাতে লাগল। হঠাৎ সে একটা চেনা কন্ঠস্বর শুনল — \’ভয় পেয়েছিস প্রতিম? ভয় পাওয়ার কিছু নেই।\’ চমকে উঠে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে — এক বছর আগে মারা যাওয়া বন্ধু রাতুল তার পিছনে বসে আছে। প্রতিম বিদ্যুৎ গতিতে খাট থেকে নিচে নেমে যায়। আর দেখে — যে বাদুড়টি কারেন্টের আলোতে সে দেখেছে, সেই বাদুড়টি আর নেই। তাকে আর ঘরে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি যে বন্ধুকে এক্ষুনি প্রতিম জলজ্যান্ত নিজের চোখে দেখেছে, সেও চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। এ কি করে সম্ভব! বন্ধু রাতুল এত রাতে বন্ধ ঘরে কিভাবে আসল! আবার গেল বা কোথায়! বন্ধু রাতুল প্রতিমের খুব কাছের বন্ধু ছিল। কিন্তু সে তো মারা গিয়েছে এক বছর হয়ে গেল। সে বেঁচে থাকতে প্রতিম এবং তার বন্ধুরা রাতুলকে একবার খুব ভয় দেখিয়েছিল। তাই কি রাতুল মৃত্যুর পরে প্রতিশোধ নিতে এসেছে? এমন সময় হঠাৎ দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেল। আর একটা বিভৎস ভয়ংকর চিৎকার শোনা গেল — \”বাঁচাও! বাঁচাও!\” প্রতিম দেখল — বারান্দায় আলো জ্বলছে। এটা কি করে সম্ভব! প্রতিমের স্পষ্ট মনে আছে — সে ঘরে ঢোকার লাইট অফ করেছিল। তাহলে আলো জ্বলছে কিভাবে! প্রতিমের দরদর করে ঘাম বেরোতে লাগল। প্রতিম থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বারান্দায় এসে দেখে ইলেকট্রিক বোর্ডের সব সুইচ অফ করাই আছে। তবুও আলো জ্বলছে। লম্বা বারান্দা। ইলেকট্রিক বোর্ড থেকে চোখ সরিয়ে যেই বারান্দার শেষ সীমানায় তাকিয়েছে, দেখে — রাতুল দাঁড়িয়ে আছে। তবে অনেক লম্বা। রাতুল এত লম্বা ছিল না। রাতুলের হাত থেকে রক্ত বের হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন কোনো বিড়াল তার হাতে জোরে আঁচড়ে নিয়েছে। তাহলে কি, যে বিড়ালটা এতক্ষণ ডাকছিল, সেই বিড়ালটাই রাতুলের হাতে আঁচড়ে নিয়েছে! তা কি করে সম্ভব! প্রতিম ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে অস্পষ্টভাবে গোঙাতে লাগল — \”মা! মা!\” তারপর সে অজ্ঞান হয়ে যায়।
জ্ঞান ফিরতে সে দেখতে পায় — তার বাবা-মা তার পাশে বসে আছে। তার বাবা-মা তার কাছে সমস্ত ঘটনা জানতে চায়। প্রতিম সব ঘটনা তাদেরকে বলে। সব ঘটনা শুনে বাবা-মাও চমকে ওঠে। আরও চমকে ওঠে, যখন তারা দেখে একজোড়া অচেনা জুতো তাদের পোটের কাছে আছে। সেই থেকে প্রতিম আর কখনও রাতে একা একা বই পড়েনি। বই পড়তে পড়তে বেশি রাত হলে প্রতিমের মা প্রতিমের সাথে জেগে থাকত।

পরে পড়বো
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন