নেতারা বললেন,” মহানগরীর ফুটপাতে
ছেলেমেয়ে নিয়ে বাস করে
দিনে রাধঁবে
রাতে ঘুমোবে
এমনটা চললে
এমনটা চলতে দেওয়া হলে
মাঝে মধ্যে এরকম দুর্ঘটনা দু একটা ঘটতেই পারে।”
কাজেই মহানগরীর ফুটপাতে
রাতের বেলা যে মেয়েটা ঘুমোচ্ছিল মায়ের পাশে
তার ঘুমন্ত শরীরটাকে বেমালুন পিষে দিয়ে গেল
সামনের বহুতলের বাবুদের বেপরোয়া বিলিতি গাড়ি তারপর যা হয়ে থাকে তাই
রক্তাক্ত মেয়েটাকে কোলে তুলে
ওরা যখন পৌঁছালে হাসপাতালে
তখন ডাক্তারবাবুদের ঘোষণা অনুসারে তার শরীরে
বহু আগেই থেমে গেছে প্রাণের স্পন্দন ।
মেয়েটার বাবা নেই
মা তিন বাড়ি বাসন মেজে এক বাড়ি রান্না করে
সংসার চালায়
তবু তার মাঝেই কর্পোরেশনের স্কুলে পড়ত মেয়েটা
তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ত
লেখাপড়ায় তার ঝোঁক ছিল খুব
দিন ফুরোলে সন্ধ্যা হলে
যখন আলো জ্বলে উঠত রাস্তায়
তখন সে নিজেই বই নিয়ে বসে যেত পড়তে
হয়তো এই ছবিটা একদিন ছাপা হতো কাগজে
যিনি বর্ণপরিচয় শিখিয়েছিলেন বাঙালিকে
তাঁর ছবির নিচে হয়তো ছাপা হতো ছবিটা
তেমনটা আর হলো কই
তার বদলে যা ছাপা হলো সে অন্য ছবি
সে ছবি বেরিয়েছিল কাগজের ভিতরের পাতায়
মায়ের কোলে ঢলে পড়েছে মেয়েটা
পাশে শোকার্ত ফুটপাতবাসীরা
তাদের পাশে ঘুম ভাঙ্গা চোখে একরাশ আতঙ্ক নিয়ে
অন্য সব শিশুরা
অসহায়ের মত চেয়ে আছে সবাই
ওদের সেই চাউনিতে কোন ক্ষোভ নেই বিক্ষোভ নেই
ক্রোধ নেই ক্রোধের আগুন নেই
যেন এটাই ভবিতব্য
এমনকি মেয়ে হারানো মা নিজেও নিরুত্তেজ স্বরে
শুধু এটুকু বলেছেন,” মেয়েটা তো শুয়েছিল একধারে
তবু যে কিভাবে- – -”
আসলে ক্ষোভে ফেটে পড়ার মতন সাধ্যও নেই ওদের
ক্ষোভে ফেটে পড়ার মতন অধিকারও নেই ওদের
ওরা ফুটপাতবাসী
ওরা ছিন্নমূল ফুটপাতবাসী
ছেঁড়াফাটা একখানা ত্রিপল এর তলায়
ঘর সংসার পেতে
কোনমতনে মাথা গুঁজে থাকা ফুটপাতবাসী
প্রখর গ্রীষ্মে অবিশ্রান্ত বর্ষায়
ঝড় বৃষ্টির দুর্যোগে কাঁপন ধরানো শীতে
কুঁকড়ে পড়ে থাকা ফুটপাতবাসী ।
এই অবস্থায় মহানগরীর পুরকর্তাদের অভিমত হল,
রাস্তায় বা ফুটপাতে কাউকে যাতে ঘুমোতে না হয়
তার জন্য আমরা নৈশাবাসের ব্যবস্থা করেছি
যারা ফুটপাতে শুয়ে রাত কাটান
তারা যাতে নৈশাবাসে যান
তার জন্য আমরা সচেতনতা বৃদ্ধির
কর্মসূচি হাতে নিয়েছি ।
এভাবেই মহানগরীর ভাগ্য বিধাতাদের চোখে
ওদের জীবনের মতন মরণও হয়ে যায় গুরুত্বহীন
আসলে ভোটের বাজারে ফুটপাতবাসীদের
কোন দাম নেই
তাই ওদের নিয়ে শাসক বা বিরোধী
কারোরই তেমন মাথাব্যথা নেই
এই কঠিন বাস্তব কে মেনে নিয়ে
এই অনন্ত বিপন্নতার সঙ্গে নিরন্তর লড়াইয়ের ক্ষয়ক্ষতিকে মাথায় নিয়ে
মেয়েটির সৎকার করে এসে ওরা প্রতিজ্ঞা করে,
এবার থেকে পালা করে জেগে থাকতে হবে রাতে ।
এভাবে মহানগরীর ফুটপাতে জোট বাঁধে ওরা
এভাবে মহানগরীর ফুটপাতে রাত জাগে ওরা
যেভাবে নিবিড় অরণ্যে রাত জেগে পাহারা দিত
আদিম অরণ্যচারী মানুষ
যেভাবে রাতের পর রাত জেগে তারা একদিন
আবিষ্কার করেছিল আগুন
আগুনের মশাল জ্বেলে গড়ে তুলেছিল প্রতিরোধ
ওরা হয়তো এই জনারণ্যের মহানগরীতে
তাই করবে একদিন
আমাদের এই নাগরিক নিস্পৃহতাকে দাহ করতে
আমাদের এই নিরুত্তাপ নির্লিপ্তততাকে দাহ করতে
একদিন হয়তো তাই করবে ওরা
একদিন তাই করবে।

মন্তব্য করতে ক্লিক করুন