প্রথম বুলি ছিল বুঝি তোর, ‘বাবা’ বলে মোরে ডাক,
তাই শুনে মোর জগৎ পিছে, তুই সামনে থাক।
প্রথম যেদিন মুখে দিলি তুই ঐ দু-দানা ভাত,
খুশিতে আমি ভাবলাম তবে,দুনিয়ায় খাওয়ানো যাক।

হাঁটতি যখন গুটি গুটি পায়ে খড়ের ঘরের মাঝে,
দৌড়ানোর ঐ আশা পুষতাম মনের গহিন ভাঁজে।
প্রখর রোদে তামাকের ভার ঘাড়ে ছিল মোর বাবা,
তুই ছিলি মোর অন্য কোলে, মনে হয়নি তো বোঝা।

প্রথম যেদিন পাঠশালাতে তোরে নিয়ে খোকা যাই,
মনে হলো যেন শিক্ষিত তুই, আর কোনো ভয় নাই।
কাঁধে নিয়ে তোরে হাঁটতাম কেন, আজও হয়নি বলা—
"আয়ত্তে যেন আসে রে তোর, ওপরে ওঠার কলা।"

স্কুল পেরিয়ে কলেজে গেলি,সাইকেলের ধরলি বায়না,
তোর মা বলিল কান্নার সুরে,"ছেলে মোর ভাত খায় না।"
দুল জোড়া তার বাবার দেওয়া, ছিল যে অনেক প্রিয়,
হাতে দিয়ে মোরে বলল হেসে, "সাইকেল কিনে দিও।"

দেখিনু চেয়ে শেষ স্মৃতি ক্ষয়ে, চোখের কোণায় পানি,
এই দান কভু মিছা যাবে না, এটাই শুধু জানি।
পাস করেছে আমার খোকা, আত্মহারা কুটিরবাসী,
কাপড় কিনতে হবে যে খোকার, লাল গাই-ই নয় বেশি।

চাকরি পেল আমার খোকা, চওড়া হলো বুক আরও,
হেসে বললাম, "কলিমের মা, হুক্কাটা এদিকে ছাড়ো।"
ছেলে দিল মোর বিলেত পাড়ি, ভালো নয় তার গ্রাম,
বৃদ্ধ আমি বসে রইনু, নেই কোনো কাজকাম।

আশা আছে মনে মাস ফুরালেই টাকা আসিবে বাড়ি,
শোধ করিব সব মিলিয়ে যত ঋণের সারি।
মাসের পরে মাস চলে যায়, তোর নাই তো কোনো খোঁজ,
পাড়ার মোড়ের মুদি দোকানি রাগ ঝাড়ে যেন রোজ।

দেখল সবাই সকল সদাই হাত থেকে নিল কেড়ে,
"ছেলে তোমায় বাদ দিয়েছে, বিয়েশাদি সব সেরে।"
সারা রাত গেল বৃষ্টিতে হায়, চাল দেয়নি তো বাঁধা,
চোখ মেলিয়া দেখিনু যে হায়, তোর মার মুখ সাদা!

গেল প্রিয়া আমায় রেখে, বলো কী আর করি?
চুঙ্গি বেচার টাকায় এখন তাহার দেহ পুড়ি।
অস্থি দিনু বিসর্জন, তাও থামে না মনের কান্দন,
তোকে দেখিবার আশাতে তাই দেশ করিয়া ভ্রমণ।

গেটের সামনে দারোয়ান মোরে বলল, "ভাগো বুড়ো,
বড় বাবু মোর বাইরে যাবে, তাহার মেজাজ খড়ো।"
বাবারে তোরে দেখিনু মুই, তুই আজ অফিসার,
কোট-টাইয়ে আজ মানিয়েছে তোরে, দেখিনু বারবার।

বৌমাও বাবা ভালো পেয়েছিস, যেন আকাশের পরী,
ভগবান তোরে রাখুক ভালো, এই প্রার্থনাই করি।
শুনিবি তুই, ভেবে মুই দিনু জোরে জোরে ডাক,
দারোয়ান এসে ঘাড় ধরে মোরে দিল কয়েক ঘাত।

মুছে গেল সব শব্দ-বোমা, মুছে গেল আজ প্রীতি—
পড়িস যদি হয় গো সময়, এই অভাগার চিঠি।