সত্যিই এ পৃথিবীটা খুব স্বার্থপর। কিন্তু মায়ের মুখের থেকে ঐ কথাটা ওভাবে বেড়িয়ে আসতে আমি আরো ভেঙে পরলাম। মা কি সহজেই বলে দিলো।” তুই ফ্লাইট টিকিট কেটে নিয়েছিস যখন তখন তো কাজে জয়ন করবিই তো আমি এখন বৃন্দাবন না গেলেও চলবে। ”
ওরা যে করেই হোক আমাকে বিদেশে আবার চাকরিতে পাঠাবে। আমার চাকরি যেতে ইচ্ছা করে না। অনেক টাকা আয় করেছি। চাহিদা যেনো মেটেই না আমার। বৃন্দাবন ঘুরতে গিয়ে আমার মনটা আরো পরিবর্তন হয়েছে। ঈশ্বরের ওপর নির্ভর করেই কিছু মানুষ নিশ্চিত দিনযাপন করছে।
না আমি ঈশ্বরকে খুব ভক্তি শ্রদ্ধা করি তেমন নয়। তবে আমার একটা অন্য পরিচিত আছে আমি মোটমুটি জনপ্রিয় লেখক। একজন লেখকের দর্শন তার লেখনীর গভীরতা, যা কেবল গল্প বলে না, বরং জগত ও জীবন সম্পর্কে একটি সুনির্দিষ্ট ও গভীর উপলব্ধির জন্ম দেয়। তাই আমি বৃন্দাবন অন্য চোখে দেখেছি। ভাববাদের বিরোধী না করে আমি বলবো এখানে চ্যালেঞ্জ করে, আধুনিক সমাজের সব সুযোগ সুবিধাকে, বিনোদন চাহিদাকে শুরু মাত্র ঈশ্বরকে পাবার লোভ।
ভক্তদের ভাষায় মায়া কাটানো। কিন্তু বৃন্দাবন এই সব প্রতিষ্ঠান বা মন্দির গুলো একটা ব্যবসার সম্ভবণা আছে। আসলে আধুনিক শহর গুলোতে মানুষ খুব সহজেই ক্লান্ত হয়ে পরে। তখন শান্তির খোঁজে বৃন্দাবন মতো তীর্থস্থান গুলোতে ভিড় করে।
আর বৃন্দাবনে আমার একটি আশ্রম আছে। এটার অনেক ব্যবসার সম্ভবনা আছে তাই কিছু মানুষ এটা দখল নিতে চায়।
এই আশ্রমের উত্তর আধিকারি আমার মা। কারণ বৃন্দাবন অলিখিত নিয়ম শিষ্যরাই আশ্রমের দায়িত্ব পায়। আমার মায়ের গুরু গুটি কয়েক শিষ্য করেছিলেন ।কারণ গুরুদেবের কথায় শিষ্য বাড়ায় তারা যাদের অর্থের প্রয়োজন। প্রকৃত কৃপ পেতে হলে সৎ ভক্ত চাই। তাঁর বেশির ভাগ শিষ্য সংসার ত্যাগী।আমার মা প্রকৃত পদ্মপাতার মতো সংসারে থেকে সব নিয়ম নিষ্ঠা যত্ন করে পালন করেন। তাই দয়া করে গুরুদেব তাঁকে দীক্ষা দিয়েছিলেন।
না দীক্ষা নিলে সংসার ত্যাগ করতে হবে এমন কথা কোথাও লেখা নেই। আসলে দীক্ষা পর ঈশ্বরকে নিয়েই সংসার পাতেন ভক্ত। দুই একটা কথায় এগুলো ভিতরের রস কথা আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরবো এতো দক্ষ লেখক আমি না। এমনকি প্রকৃত গুরুরা বলেন দীক্ষা আগে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষা আসলে আপনার চেতনাকে জাগ্রত করে।
আমি গুরুদেবকে অনেকবার দীক্ষা দেবার অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু দেয়নি। বারবার একি কথা বলছে ‘এটা বাংলার রসগোল্লা নয়, যে পাঁচ টাকা দিলি আর এক হাড়ি দিয়ে দিলাম। এ এক অমৃত রস এটা স্বাদ নিতে গেলে নিজেকে তৈরি করতে হবে। ”
এবার আমি যখন বৃন্দাবন গিয়ে ছিলাম যথেষ্ট ক্লান্ত ছিলাম। অথচ লেখক হিসেবে গত বছর ভীষণ ভাবে সফল। সাত প্রকাশন সংস্থা আমার বই প্রকাশ করতে চায়। তিনটে প্রডাকশন হাউস আমার সাথে কথা বলেছে। আমার গল্প ও কবিতা নিয়ে তারা ছবি করবে গান বানিয়েছে। অথচ পিউ আমার মূল্য বুঝতে পারলো না।
আমি যখন এবার গুরুদেবের কাছে দীক্ষা নিতে চাইলাম। তখন গুরুদেবের কি মন হয়ে গেলো রাজী হয়ে গেলো। অনার কথায় কিছু অসৎ লোকজন তো এই আশ্রম দখল করতে চাইছে। তাই আমি যদি চাই তাহলে এখানে মানে বৃন্দাবন থেকে যেতে পারি। পর উপযুক্ত সময় হলে দীক্ষা দিয়ে দেবেন।
আমি আবুধাবি যাওয়া বাতিল করলাম। আত্মীয় স্বজনদের ফোন করলো। বললো আশ্রম বাজার মূল্য যতোই ছয় সাত কোটি হোক। এক পয়সা আয় তো নেই। তাই আশ্রম বেচে গুরুদেবকে চলে আয়। ঐ পয়সায় বাংলায় কিছু একটা করবি। কিন্তু আমি জানি গুরুদেব তাঁর প্রান থাকতে। এই ভজন স্থলী থেকে কোথাও যাবেন না। আর আমার মতেও এই আশ্রমের মালিকানা কোন মানুষের নেই। এই স্থানের মালিক হলেন স্বয়ং গোপীনাথ। তাই এটি বিক্রি করা ক্ষমতা আমাদের নেই।
যাইহোক বাবার অসুস্থতা এবং sir জুজ দেখিয়ে আমাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হলো। প্রথম কয়েক দিন নিয়ম নিষ্ঠা পালনের অসুবিধা হলো না। কিন্তু দুই দিন পর থেকেই মা বললো তিনি আমার জন্য প্রসাদ তৈরি করতে পারবেন না। আমি আমীষ খেতে না চাইলে নিরামিষ সবজি খেতে দেওয়া হবে। ভয়ঙ্কর রসিকতায় পরিনত হলো আমার জীবন। মাছ খেলাম না ঠিক ই। কিন্তু মাছের ঝোলের সবজি খেতে হলো আমাকে। কোনো কিছু প্রতিবাদ করি নি আমি। কারণ মাসি বলেছিলেন বাড়ি ফিরে তোমার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বৈষ্ণব হলো তৃণ মতো। সবাই তাকে পদপৃষ্ঠ করলেও সে প্রতিবাদ করে না। তোমার ঈশ্বর ঠিক তোমাকে রক্ষা করবে।
তবে জানেন তো ওরা আমাকে জীবনের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্য এসব করছে। সংসারে যথেষ্ট অনটন রয়েছে। তবুও সেই দিন চিংড়ি মালাইকারি করলো, চিতল মাছের পেটির রসা’ করলো, মটন কসা করলো, যাতে আমি লোভ না সামলাতে পেরে খেয়ে নিই। আমি আশ্রম রক্ষা করতে গিয়ে আমার সংসার ভাসিয়ে দেবো বলি নি। আমি চাইছিলাম মা গিয়ে বৃন্দাবন থাকুক। আমি পয়সা দিয়ে একটা দেখাশোনা লোক রেখে দেবো। দুই এক বছরের মধ্যে ভাইকে একটা ব্যবসা করে দিয়ে বৃন্দাবনে স্থায়ী ভাবে বসা করবো।
আমি অর্থনৈতিক ভাবে ভাইএর থেকে সফল। কিন্তু ভাইয়ের যোগ্যতা বেশি ছিলো। কলকাতায় ভালো চাকরি নেই বলে আমি বিদেশে গেলাম। কিন্তু ওতো শহরের বাইরে গেলো না। বাবা মা সব ভার নিয়ে পড়ে রইলো এই বুড়ো শহরে। হু হয়তো তাই মায়ের কাছে ও বড় প্রিয়। আমি বঞ্চিত। আমি শুধু টাকা আয়ের যন্ত্র। কিন্তু প্রিয় মানুষদের কষ্ট জীবন যাপনতো দেখতে পারি না আমি তাই প্রতিবাদ করতে পারি না।
মায়ের নির্লজ্জ উলঙ্গ স্বার্থপর উক্তিটা মন বিষিয়ে দিলো। অনেক দিন মোবাইল ঘাটা ঘাটি করি না। সোস্যাল মিডিয়া থেকে অনেক দূরে। আমি আমার একাকীত্ব স্বাদ নিতে শিখে গেছি। আসলে ভীষণ কষ্ট লাগার মধ্যেও জীবনের একটা অন্যরকম স্বাদ আছে। যাইহোক আজ মোবাইল ঘাটতে গিয়ে দেখলাম। পিউ অনেক কয়েকটি মেসেজ। আমার সাথে দেখা করতে চায়। আমি অবাক হয়ে গেলাম ও জানলো কি করে আমি কলকাতায়।
ওর মুখে জানলাম বিষয়টা। আমার এ বছর বইমেলায় পুতুল নিয়ে একটি গবেষণা ধর্মী বই পাওয়া যাচ্ছিলো। বইটা ভালো বিক্রি হচ্ছে শুনে আমি আর আমার বন্ধু ড. প্রদীপ সর্দার হাজির হয়েছিলাম ডং পুতুল নিয়ে। বহু মানুষ ওই পুতুলের ছবি তুলেছেন, ভিডিও করে সোস্যাল মিডিয়া দিয়েছেন। সেই পোস্ট থেকেই ও দেখেছে আমি কলকাতায়।
ওর সাথে অনেক কথা হলো। আমার ওর সাথে দূরত্বের কারণ যে সেন্টু নামের ঐ ক্যামেরা ম্যান ও সেটা ভালো করেই জানে। ও বললো ওর মতো স্ট্রাগেলিং মডেলার ঐ রকম ক্যামেরা ম্যানে সাথে একটু ঘনিষ্ঠতা রাখতেই হবে। আমি যা শুনেছি সেটা সঠিকই ও গড়িয়া নয় নরেন্দ্র পুরে থাকছে। তবে ও সেন্টু এক সাথে থাকে না। সেন্টু অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না তাই ও ওকে বিয়ে করবে না কখনো। ও আমার সাথে দেখা করতে চায় সব কিছু সামনাসামনি বসে ক্লিয়ার করতে চায়।
নিজের প্রশংসা সবার ভালো লাগে। তাই মনটা একটু কেমন কেমন করে উঠলো। সোস্যাল মিডিয়ায় উঁকিঝুঁকি মারতে মন চাইলো। কে কি লিখেছেন জানতে ইচ্ছা করলো। সোস্যাল মিডিয়ায ঢুকে চোখ পড়লো নিজের প্রোফাইল ছবির ওপর। একটা বিখ্যাত পানশালার ছবি। সোনালী তরলটা অনেক সময় সমাজের স্ট্যাটাসের সিম্বল। আমার ব্যাকগ্রাউন্ডে দামী মদের বোতল সাজানো রয়েছে সুন্দর ভাবে। কিন্তু এখন এইসব দেখনদারি নেশা কেটেছে আমার।
আমি প্রোফাইল পিকচার চেঞ্জ করতে চাইলাম। একটা স্লেফি তুলতে গিয়ে দেখি মুখভর্তি সাদাকালো দাড়ি। ঝটপট দাড়ি কেটে ফেললাম। আয়না মুখটা দেখতে গিয়ে দেখতে পেলাম মায়া চারিদিক থেকে আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরছে। আমি হাসলাম। তবে হাসিটা কৃত্রিম কিনা জানি না।



মন্তব্য করতে ক্লিক করুন