নতুন আলো
নতুন আলো
মানব মন্ডল

গল্প - নতুন আলো

মানব মন্ডল
বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারি ২০২৬ জীবনবাদী, ভালোবাসা

বছরশেষে হিসেব নিকেশ করার চল। গত এক বছরে দেখলাম, গরীবদের প্রতি বড়লোকদের হিংসুটি মনোভাব বেড়েছে। চাকরি করা লোকেদের চাকরিহীনদের প্রতি অসূয়া বেড়েছে। বর্ণহিন্দুদের মধ্যে মুসলিমবিদ্বেষ বেড়েছে। মুসলিমরা আরো সাম্প্রতিক হচ্ছে।অর্থ, ক্ষমতা, যশ, প্রতিপত্তি জাহির করা বেড়েছে। কেউ যদি কারোর জন্য কিছু করে, সেটা চাউর করার প্রবণতা বেড়েছে। মজা পাওয়ার চেয়ে মজা পাচ্ছি দেখানো বেড়েছে। ঘোরার জায়গায় কী কী আছে মুখস্ত করে ঘুরতে যাওয়া বেড়েছে। নিজেকে ভিক্টিম দেখানোর প্রবণতা বেড়েছে। ন্যায়-অন্যায়ের যে প্রাকৃতিক বোধ, তার উল্টোদিকে কথা বলা বেড়েছে। এগুলো দেখতে পাচ্ছি। জানি না, এর গভীরতা কত। সত্যিই মনুষ্যসমাজ আগের থেকে আরো খারাপ হয়েছে, নাকি খারাপগুলোই বেশি দেখা যাচ্ছে। দ্বিতীয়টা হলে ভালো। নইলে সামনে বছর খবর আছে।

কলকাতা শহর ছাড়া কথা ছিলো 4 ডিসেম্বর। এয়ারপোর্ট থেকে হঠকারিতার সাথে সিদ্ধান্ত নিলাম চাকরি যাবো না। বাড়িতে আমার কোনদিনই আমার চাকরি যাওয়া নাযাওয়া নিয়ে মাথাব্যথা ছিলো না। চাকরি না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে কিন্তু আমাকে ওরা ভুল বুঝলো।

আমি আলাদা একটা বাড়ি কিনছিলাম। কিন্তু আমাদের উকিল কাগজ পত্র পরীক্ষা করে বললো বাড়িটা নেওয়া যাবে না। আমার বাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে একটা ভুল বোঝাবুঝি হলো বাড়ির সাথে। ওদের না জানিয়ে আমি অনেকটা টাকা দিয়ে রেখেছি। তাই আমি বাড়িটা নিতে চাইলাম কারণ পরে টাকা দিয়ে সব কাগজ করিয়ে নেবো বললাম। কিন্তু সেটাতে ওরা রাজী হলো না। আসলে ওদের একটা ভুল ধারণা আমি বাড়িটা পিউর জন্য কিনছি।
বাড়ির যে কোন সিদ্ধান্ত আমরা যৌথ ভাবে নিয়ে থাকি। হঠাৎ আমার বাড়ি থাকতে আলাদা বাড়ি কেনার সিদ্ধান্তটা বেশ পাঁচ কান হলো আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে রঙ মসলা মিশিয়ে। পিউকে নিয়ে অবাঞ্ছিত কথাবার্তা শুরু হলো। হু হয়তো আমি ওকে ভালোবাসি তাই ওর নিয়ে কথা গুলো বড় গায়ে লাগছিল। তাছাড়া ওর সাথে অন্য কারো সম্পর্ক আছে জেনেও ওর উদ্দেশ্যে বাড়ি কেনার গল্পটা আমার বোকামি কথা প্রতিনিধিত্ব করছে।
বাড়ি অন্তর মহলের গল্প, সারা রাষ্ট্র হওয়ায় আমার মনটা বিষিয়ে উঠলো। চাকরি না যাওয়ার প্রথম সকাল, আমি প্রথম মা বাবা না বলে বেড়িয়ে গেলাম আমার কাছে। একটা প্রোডাকশন হাউজ যাওয়া কথা ছিলো অনেক দিন ধরে। আমার বন্ধু আকাশের জানা শোনা। ও বাড়ি থেকে গেলাম জায়গাটায়। গল্পটা ওরা সিলেক্ট করে রেখেছিলো। কাস্টিং আর্টিস্ট মোটামুটি ভাবে ওরা ঠিক করে রেখেছে। কিন্তু আমি চাইলাম পিউকে ওরা নিক। ওরা তখন নানা অসুবিধা কথা বলতেই আমি স্ক্রিপ্ট রাইটার সাথে বসে গল্পটা একটু চেঞ্জ করলাম। তাই আমাদের রাত হয়ে গেলো অনেকটা।

অন্যদিন হলে রানাকে ফোন করে স্টুডিওতে ডেকে নিতাম। কিন্তু কেন জানি না করলাম না। প্রথম ফোন আপ ব্যবহার করলাম রেপিডো করে বাড়ি গেলাম। পথে ছেলেটার সাথে অনেক কথা হলো। জীবন ধারণের জন্য ছেলেটা দুবেলা কাজ করে। দিনের বেলায় মুদি দোকান চালায়। রাতে রেপিডো করে।
আজ শুনলাম অ্যাপ-ডেলিভারি-এজেন্টদের একাংশ ধর্মঘট করছে বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে। অত্যন্ত ভালো ব্যাপার। কিন্তু তাদের কেউ কেউ দেখছি লিখছে – “অ্যালগরিদমের দাস হয়ে থাকতে চাই না”। এটা সম্পূর্ণ না ভেবে বলা একটা কথা।

অ্যাপ-ডেলিভারি-এজেন্ট রা শোষিত মানুষদের হাতে – অ্যাপ-কর্পোরেটগুলির হাতে। সুইগি, জোম্যাটো – এদের ব্যবসা প্রতি বছর বাড়ছে। কিন্তু এদের ব্যবসাটা কী? কিচ্ছু না। ওই অ্যাপটা। উবের, ওলা কে কলা দেখিয়ে সরকারি অ্যাপ যাত্রী-সাথি দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু মেইনটেনেন্স কস্টটুকু নিয়ে (রাইড প্রতি ১০ টাকা) ড্রাইভার ও যাত্রী কাউকেই চোষণ /তোষণ না করে একটা অ্যাপ-পরিষেবা চালানো যায়। অ্যাপ-ডেলিভারি-এজেন্টদের আন্দোলন খুব ভালো ব্যাপার। কিন্তু “প্রফিটবিহীন সরকারি অ্যাপ চাই” – এই দিশা ছাড়া এই আন্দোলন কৃচ্ছসাধন হয়ে দাঁড়াবে।
যাইহোক সেই দিন বাড়ি ঢোকার পর দেখলাম কোন অশান্তি হলো না। এই উদাসী আবহাওয়াটাই আমার খারাপ লাগলো। আয়বিহীন হয় নি আমি এখনো, শুধু চাকরি আমি যায় নি ঠিকই কিন্তু চাকরি আমার যায় নি। আমি যেনো এখন অপ্রয়োজনীয় বস্তু পরিনত হয়ে গেলাম। ভাবনা সকাল থেকে উদাসীন করছিলো।
মাসিকে ফোন করলাম। কিছু বলার আগেই বললো ” আমার শিষ্যরা বলল ছিলো তুই নাকি এখন ভগবৎ কথাকে তোর গল্প সুক্ষ ভাবে ঢুকিয়ে দিচ্ছিস। গোপালের গোপীদের হাড়ি ভেঙে দেবার গল্প টা লিখেছিস কখনো। ”
সত্যি প্রতি পৌরাণিক গল্প কত অর্থ বহন করে। একটা খুব পরিচিত দৃশ্য গোপীরা মাথায় জল বহন করে ব্রজভুমি পথে চলেছে। ঠিক আমরা যেমন আমরা জীবনের সব চিন্তা দায়িত্ব মাথায় নিয়ে পথ চলি। কৃষ্ণ দুষ্টমি করে গুলতি মরে সেই হাড়ি ভেঙে দেয়। ঠিক হঠাৎ করেই আমাদের সব কষ্ট অর্জিত সম্পদ প্রতিপত্তি হঠাৎ করে নষ্ট হয়ে যায় মৃত্যু সাথে সাথে। তাই গুলতি মেরে ঈশ্বর যেনো বলছে। আমার চিন্তা না করে তুমি অন্য চিন্তায় মগ্ন হয়ো না।
মাসির কথা শুনে আমি মহারাজাজিকে ফোন দিয়ে বললাম “আমি বৃন্দাবন আসতে চাই। ”
বাবা বললো ” কিন্তু তোমার সব টাকা পয়সা কলকাতায় কোথাও দান করে আয়। ”
আমি বললাম ” সে তো আমাদের আশ্রমেও দান করতে পারি। ”
বাবা বললো ” সেটা হবে না। কারণ ঐ টাকাতে আশ্রমের উন্নতি হলে। তুই অহংকার মুক্ত হবি না। কারণ তুই তো দেখবি তোর পয়সায় আশ্রমের উন্নতি হচ্ছে। ”
গুরুদেবের নির্দেশ মতো এক কাপড়ের ট্রেনের টিকেট কেটে চলে এলাম আশ্রমে। বছরের প্রথম দিন। পশ্চিম সংস্কৃতির প্রভাব এখানে পরে কিন্তু শীতকালীন ছুটির ব্যাবহার করতে ভালো মতো শিখে নিয়েছে রাজস্থান, দিল্লি, হরিয়ানা, পঞ্জাব, বাসী সনাতনরা, চারিদিকে চলছে কীর্তন, ভজন, ভগবত কথার উৎসব। ব্যাস্ততম একটা দিনের শুরু হবার আগে, আশ্রমের একটা নির্জন কোন খুঁজে
বটগাছের তলা বসে, ধ্যান মগ্ন হলাম।
কিন্তু একটা ব্যাস্ত কথপোকথন আমি ধ্যান ভেঙে দিলো। আরোহি ফোন কাউকে বলছে” জান্হবি তেরা বাত শুনকে ফাঁস গেয়ি এয়ার। ভাইজি বলেন কে বাদ উনকা মুকা রঙ উতর গেয়ি। ম্যা মন মন বহত খুশ হুয়া। উনসে ম্যা দিলকা বাত বতায়ুগা ক্লায়েন্ট। কাল সে মিলাই নেহি ও। রাত কো উনকা লেপটপ ম্যাগনেকা পেহলেই পদ্মা দি লেপটপ ঘরমে দে গেয়েই। উনকা ঘর মে ঢেরা হু তো উনা বুক মাগনে বাহানা ভি মিলা নেহি। শ্যাম সে উনের দেখা ভি নেহি হ্যা। এয়ার ভাবি, চাচু , পাপা উনকা কিতনা তারিফ করতে থা। ইস বার উনসে পেহলে মিলা । আকে দেখ রাহাথা , উতন্না বড় আদমি খুদ গো শালা সাফ কর রাহা হে। তেরে বাতে শুনকে ম্যা উনকে ম্যা বলা। আপকা ফোট ম্যা দেখা বিনা দাড়ি আপ কো আচ্ছা লাগতা হে। ও উসদিন দাড়ি বানায়া কিতনা কিউট লাগ রাহা থা। চুম নে মন কর রাহা থা। মে তো উসকো প্রোপোজ ভি করনে কো সোচা থা। তুনে বলি উনকো ভাইয়া জি বলানে কো। আব ও মেরা সামনেই আ নেহি রাহা হু আব মে কে করু। ”
আরোহি এতো কথা বলে আমি জানতাম না। তাই গাছে আড়ালে থেকে উঠে সামনে গিয়ে বললাম
” রাধে রাধে ”
আরোহি একটা মিষ্টি হেসে ” রাধে রাধে জি, হেপি নিউ ইয়ার।” বলে পালিয়ে গেলেন। ও বুঝতে পেরেছে আমি ওর সব কথা শুনেছি। গিরিরাজ গোবর্ধন এর কোন থেকে কুয়াশা কাটিয়ে সূর্যটা হাসেছে নতুন দিন শুরু হচ্ছে। আশার আলোয় আলোকিত চারদিকে। কিন্তু আলোকিত প্রতিদিনের শেষ চলে একটা নিষ্ঠুর অন্ধকার। আমি জীবনে অনেক বার সেই অন্ধকারের মুখমুখি হয়েছি।

পরে পড়বো
১১৩
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন