এই আর্টিকেলটি লেখার জন্য আমি যে দুঃসাহসিকতা দেখাচ্ছি তার দেখানো জন্য আমি আসলেই কতটুকু যোগ্য আমি জানিনা। আমার এই বিশ্লেষণ যুক্তিসঙ্গত মনে হলে তা যতটা সত্য তার থেকেও বেশি সত্য কারো ভীষণ রকম অপ্রাসঙ্গিক মনে হল। সুতরাং আলোচনা সমালোচনা হোক।
-----------------------------
মানুষকে জানতে গেলে কোথায় যেতে হয়—মনের গভীরে, না কি মানুষের সামাজিক পরিচয়ের আড়ালে? উনিশ শতকের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে সিগমুন্ড ফ্রয়েড ও লালন শাহ যেন এই একই প্রশ্নের দিকে দুই ভিন্ন পথ ধরে এগিয়ে গিয়েছিলেন। একজন ভিয়েনার চিকিৎসাবিজ্ঞান থেকে আবিষ্কার করে বসলেন অবচেতন; অন্যজন বাংলার মাটি, দেহ ও সাধনার মধ্য দিয়ে খুঁজলেন “মনের মানুষ”। তাঁদের এক করে ফেলা ঐতিহাসিকভাবে ভুল; কিন্তু তাঁদের পাশাপাশি বসালে মানুষের আত্মপরিচয় সম্পর্কে দুই ভিন্ন সভ্যতার গভীর চিন্তার এক বিরল সংলাপ তৈরি হয়। যে সংলাপ ধরা দিয়েছে আমার অবচেতনে।
এ বাংলার লালন (প্রায় ১৭৭৪–১৮৯০) ছিলেন বাউল সাধক, কবি ও গীতিকার। তাঁর জন্মস্থান ও প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে মতভেদ আছে এবং তাঁর জীবনের অনেক তথ্য পরবর্তী লোকস্মৃতির সঙ্গে মিশে গেছে। তবে ছেঁউড়িয়ায় তাঁর আখড়া, বাউল সাধনা এবং তাঁর গানের মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চরিত্র সুপ্রতিষ্ঠিত। লালনের দর্শনের কেন্দ্রে ছিল দেহতত্ত্ব—দেহই সত্যের আসন এবং মানুষের মধ্যে জাতি ও ধর্মের কৃত্রিম বিভাজনের প্রত্যাখ্যান।
তাঁর প্রশ্ন, “সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে”, আসলে একটি গানের পরিসীমাকে অতিক্রম করে অস্তিত্বের এ এক প্রশ্ন হয়ে ওঠে। জাত কোথায়? শরীরে? রক্তে? চেতনায়? যদি না থাকে, তবে মানুষকে আলাদা করে যে পরিচয়, তা কি প্রকৃতির, নাকি সমাজের নির্মাণ? লালনের দৃষ্টিতে মানুষ জন্মের সঙ্গে হিন্দু বা মুসলমান হয়ে আসে না; সমাজ তাকে সেই পরিচয় পরিয়ে দেয়। ফলে তাঁর মানবতাবাদ বোধহয় নিছক “সবাইকে ভালোবাসো” ধরনের নৈতিক বাণী নয়—এবং আমার মনে হয়েছে এটি মানুষের পরিচয়ের ভিত্তি নিয়েই একটি মৌলিক প্রশ্ন। বাউল দর্শন এই কারণে দেহ, মানুষ, প্রেম ও অন্তর্সত্তাকে একই সাধনার পরিসরে নিয়ে আসে।
এখানেই ফ্রয়েডের সঙ্গে লালনের দূরবর্তী সাদৃশ্যটি ধরা পড়ে। Sigmund Freud (১৮৫৬–১৯৩৯) আধুনিক ইউরোপীয় চিন্তায় দেখালেন যে মানুষ নিজের মন সম্পর্কে যতটা জানে বলে মনে করে, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক কম জানে। সচেতন “আমি”-এর নীচে কাজ করে অবচেতন আকাঙ্ক্ষা, repression, স্মৃতি ও মানসিক সংঘাত। The Interpretation of Dreams (১৯০০)-এর মতো গ্রন্থে তিনি স্বপ্ন ও অবচেতনকে মানবমনের ব্যাখ্যার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। Freud-এর বিপ্লব তাই কেবল মনোরোগের চিকিৎসায় নয়; মানুষের আত্মপরিচয় সম্পর্কেও—মানুষ নিজের মনেরও সম্পূর্ণ মালিক নয়, হতে পারেওনি।
কিন্তু লালনের “মনের মানুষ” Freud-এর unconscious নয়। Freud নিচে নেমেছেন মানসিক সংঘাতের অন্ধকারে; লালন ভিতরে খুঁজেছেন অস্তিত্বের সত্য। Freud-এর অনুসন্ধান clinical ও psychological; Lalon-এর অনুসন্ধান mystical, embodied এবং social। একদিকে অবদমিত আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে সামাজিক পরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া মানুষ। যেন Freud মানুষের মনের বন্ধ ঘরে প্রদীপ নিয়ে ঢুকেছেন, আর Lalon মানুষের গায়ে সেঁটে থাকা জাত-ধর্মের পরিচয়পত্র খুলে জিজ্ঞেস করেছেন—“এর নীচে মানুষটি কোথায়?”
এই পার্থক্যটি তাঁদের ধর্মভাবনাতেও স্পষ্ট বলেই আমার মনে হয়েছে। Freud ধর্মকে মানুষের মন ও সভ্যতার একটি psychological phenomenon হিসেবে বিশ্লেষণ করেছিলেন; Lalon ধর্মীয় অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার না করেও সংগঠিত ধর্মের সীমানা অতিক্রম করেছিলেন। বাউল ঐতিহ্যে বৈষ্ণব সহজিয়া, সুফি এবং অন্যান্য সাধনাধারার মেলবন্ধন ঘটেছে; লালনের গানে হিন্দু ও মুসলিম প্রতীকের এমন আন্তঃসম্পর্ক দেখা যায় যা একটিকে অন্যটির থেকে আলাদা করা কঠিন।
আর ঠিক এইখানে লালনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও বড় হয়ে ওঠে। তিনি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন না, কোনো দার্শনিক treatise লেখেননি। তাঁর দর্শনের বাহন ছিল কেবল একতারা ও গান। কিন্তু সেই গানই এমন এক মানবধর্মের কথা বলেছিল যেখানে জাত, ধর্ম ও সম্প্রদায় মানুষের চেয়ে কোনো ভাবেই বড় নয়। তাঁর প্রভাব এমনই ছিল যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের আখড়া থেকে ২৯৮টি গান নকল করিয়ে সংগ্রহ করেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর বক্তৃতা ও লেখায় লালনের দর্শনকে শিক্ষিত সমাজের সামনে তুলে ধরেন।
তাই লালনকে “বাংলার Freud” বলা তাঁর মহত্ত্ব বাড়ায় না, বরং কমিয়ে দেয়। কারণ তিনি কোনো ইউরোপীয় তত্ত্বের অসম্পূর্ণ পূর্বসূরি নন। তিনি একটি স্বতন্ত্র দক্ষিণ এশীয় চিন্তার ধারার প্রতিনিধি—যেখানে মানুষের শরীর জ্ঞানের ক্ষেত্র, প্রেম সাধনার ভাষা এবং মানুষ নিজেই ধর্মীয় সত্যের সম্ভাব্য আবাস। Harvard-এর গবেষণাতেও বাউল দেহতত্ত্বকে এমন এক tradition হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে যেখানে মানবদেহকে divine realization-এর বাহন হিসেবে দেখা হয়।
এই কারণেই লালনকে পড়ার মধ্যে আমাদের এক ধরনের বৌদ্ধিক আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। Freud-কে পড়তে হবে—কারণ তিনি মানুষের অবচেতনকে বোঝার এক শক্তিশালী আধুনিক ভাষা দিয়েছেন। কিন্তু মানুষের ভিতরের জগতের প্রশ্নটি Vienna-তে জন্মায়নি। বাংলার নদী, মাটি,বাতাস কিংবা আখড়ার মধ্যেও মানুষ বহু আগে প্রশ্ন করেছিল—আমি কে, আমার দেহের অর্থ কী, আমার পরিচয়ের আড়ালে মানুষটি কে?
ফ্রয়েড মানুষের মনের অন্ধকার ঘরে নেমে অবচেতন খুঁজেছেন; লালন মানুষের সামাজিক মুখোশের আড়ালে মানুষ খুঁজেছেন। একজন আমাদের শেখান—“তুমি তোমার মনকে পুরোপুরি জানো না”; অন্যজন যেন বলেন—“তুমি তোমার পরিচয়ও নও।” আর এই দুই উপলব্ধির মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে এক চিরন্তন প্রশ্ন—মানুষ আসলে কে?
আর একজন লেখক হিসেবে ঠিক এখানেই আমি হেরে গেছি এই আর্টিকেলটি লিখতে গিয়ে। বহুদিন যাবত নানা ভাবে ফ্রয়েড ও লালনের মধ্যে একটা তুলনার দেওয়াল তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এই একটা সিদ্ধান্তে আসতে এর আগেও বহুবার লিখবার চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি।
সম্ভবত এটাই লালনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা: বিশ্বকে বুঝতে আমাদের ইউরোপের দিকে তাকাতে হবে, কিন্তু নিজেকে বুঝতে গিয়ে নিজের মাটির দিকে পিঠ ফিরিয়ে রাখা চলবে না। দর্শনের কোনো একক রাজধানী নেই। মানুষের ভিতরের পথ যেমন Vienna-র psychoanalysis-এ আছে, তেমনি তার আরেকটি পথও আছে বাংলার একতারা-ধরা ফকিরের গানে, যে গান বাংলার আকাশে বাতাসে, হিমালয়ের ঢাল বেয়ে খরস্রোতা নদীর বুকচিরে নেমে আসে তার মোহনায় দিকে তার গন্তব্যের দিকে।
--------------------------
নির্বাচিত তথ্যসূত্র
Banglapedia, “Lalon Shah” — জীবন, দর্শন, জাতিভেদবিরোধিতা, দেহতত্ত্ব এবং রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সম্পর্ক।
Banglapedia, “Baul Song” — বাউল দর্শনের দেহতত্ত্ব, মানুষ, প্রেম, গুরু ও ঈশ্বরের ধারণা।
Harvard Divinity School, Center for the Study of World Religions, “Baul songs by Lalon on Dehatattva” — লালনের দেহতত্ত্ব ও আন্তঃধর্মীয় প্রতীকচর্চা।
Banglapedia, “Baul” ও “Philosophy” — বাউল দর্শনের বৈষ্ণব-সহজিয়া ও সুফি প্রভাব এবং মানবতাবাদী চরিত্র।
Sigmund Freud, The Interpretation of Dreams (1900); The Future of an Illusion (1927); Civilization and Its Discontents (1930)—অবচেতন, ধর্ম, আকাঙ্ক্ষা ও সভ্যতা সম্পর্কে Freud-এর মূল রচনাসমূহ।
অনুসন্ধান করুন
🎂 আজ যাদের জন্মদিন
তসলিমা নাসরিন
শুভ জন্মদিন! 🎈
সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ
প্রবর রিপন নিয়ে আমার কিছু বলার নাই তার মতো আর কেউ...
আরো দেখুন
pabel
লেখক:
প্রবর রিপন
কবি, আপনার সৃষ্টির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রইল। 🙏🌿
আরো দেখুন
নূর মোহাম্মদ কল্পকবি
লেখক:
স্বপ্নীল চক্রবর্ত্তী