প্রসূন গোস্বামী

গল্প - খাঁচার ভেতর অচিন ‘মুমিনা’

প্রসূন গোস্বামী
রবিবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রম্য

সেই এক অদ্ভুত মহানগরী, যেখানে আকাশ থেকে বৃষ্টির বদলে ঝরে পড়ে কালো মখমলের পর্দার টুকরো। শহরের রাজপথে আজ সহস্র ছায়ার মিছিল । তারা নারী, কিন্তু তাদের অবয়ব নেই; তারা মানবী, কিন্তু তাদের পরিচয় কেবল ‘আবৃত সত্তা’ । একদা যারা বিদ্যার মন্দিরে বিচরণ করত, আজ তারাও সেই মিছিলের অগ্রভাগে, যেন এক দীর্ঘস্থায়ী তন্দ্রার ঘোরে আচ্ছন্ন ।

শহরের এক কোণে দাঁড়িয়ে এক আগন্তুক বিস্ময়ে শুধাল, “এরা কি মুক্তি চায়?”

পাশ থেকে এক অট্টহাসি ভেসে এল। এক স্থবির বৃদ্ধ, যার হাতে সময়ের শিকল, সে বলল, “মুক্তি? না হে বৎস, এরা ‘স্বেচ্ছাবন্দিত্বের’ মহোৎসবে মেতেছে । এরা বিশ্বাস করে, এদের হাড় দিয়ে তৈরি হয়েছে এক আদিম সিংহাসন, যেখানে বসবে কেবল তাদের অধিপতিরা । এরা শ্রম দিতে চায় না, চায় কেবল ‘ভরণপোষণের’ সোনার খাঁচায় বন্দি হতে ।”

সেই মিছিলে অংশ নেওয়া এক উচ্চশিক্ষিতা ছায়া ম্লান স্বরে বলল, “অফিসের ওই ফাইলপত্রের চেয়ে স্বামীর মনোরঞ্জন আর অন্দরমহলের ঘানি টানা ঢের বেশি সম্মানের । যদি শাসক বদলে যায়, যদি আমাদের কলম কেড়ে নিয়ে খুন্তি ধরিয়ে দেওয়া হয়, তবেই তো আমরা পরম সুখে থাকব । এমনকি চার সতীনের একজন হয়ে প্রহার সইতেও আমাদের বীরত্বের কমতি নেই ।”

আগন্তুক দেখল, ওই ছায়াদের হাতের প্ল্যাকার্ডে লেখা নেই প্রগতির কথা, বরং সেখানে আঁকা আছে এক বিশাল ‘দাঁড়িপাল্লা’ । এক পাল্লায় তাদের সত্তা, অন্য পাল্লায় এক অন্ধকার শাসনের প্রতিশ্রুতি। আশ্চর্যের বিষয়, তারা নিজেরাই নিজেদের পাল্লাটি নিচু করে রাখছে।

সূর্য ডুবছে। মহানগরীর প্রগতিশীলতার লেবাসটুকু খসে পড়ছে একটা জীর্ণ চামড়ার মতো । ছায়াগুলো ঘরে ফিরছে—যে ঘর তাদের কাছে কারাগার নয়, বরং এক পবিত্র অন্ধকূপ। তারা জানে, কাল প্রভাতে যদি সূর্য না ওঠে, তবে তারা খুশিই হবে; কারণ অন্ধকারে তো পর্দার প্রয়োজন পড়ে না।

পরে পড়বো
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন