প্রসূন গোস্বামী

কবিতা - ভস্মাধারে জাগরণী গান

প্রসূন গোস্বামী
শনিবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ অন্যান্য কবিতা

শব্দের খেয়া বয়ে যারা আসে, তারা কি চেনে এই মাটির ঘ্রাণ?
তুমি শঙ্খ ফুঁকছো এক নির্জন শ্মশানে, অসীম,
যেখানে চিতাভস্মের ওড়না পরে ঘুমিয়ে আছে সহস্রাব্দ।
যাদের রক্তে কেবলই পরাধীনতার নীল নকশা,
যাদের অস্থিমজ্জায় মিশে আছে অন্যের চাবুককে মাল্যদানের ঘুণ ধরা সুখ,
তাদের তুমি জাগাতে চাও কোন মন্ত্রে?
এক হাজার টাকার খুচরো মুদ্রায় যারা বিক্রি করে দেয় পূর্বপুরুষের হাহাকার,
লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের কানাকড়িতে যারা খুঁজে পায় পরম নির্বাণ—
তাদের কাছে যুদ্ধের দামামা তো কেবলই গোলমালের সুর।
নেশার ঘোর আর ভজন-কীর্তনের তফাত ফুরিয়ে গেছে বহু আগে,
কেউ মাল খেয়ে টাল, কেউ বা মোহের মদিরায় বিভোর;
তোমার ‘ঐক্যবদ্ধ’ হওয়ার ডাক সেখানে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে উপহাসের মতো।

তুমি দলিল দেখাও? পবিত্র গ্রন্থের শ্লোক পড়ে শোনাও বিনাশের গান?
আরে, এই জাতি তো সেই জাতি—
যারা সূর্যসেনকে ধরিয়ে দিয়ে ইংরেজ সাহেবের কাছে বকশিস গুনেছে,
যারা নিজের শেকল পালিশ করে তাকে অলঙ্কার বলে ভুল করে।
যে মাটিতে বর্ণভেদের বিষবৃক্ষ আকাশ ছুঁয়ে আছে,
সেখানে ‘শূদ্র’ নেতার তর্জনী কি ‘ব্রাহ্মণ’ আভিজাত্যের দর্প ভাঙতে পারে?
এ এক বিচিত্র ধাঁধা, যেখানে বীরত্বের ইতিহাস নেই, আছে কেবল পদসেবার দীর্ঘ ফর্দ।
আকবরকে যারা ‘মহান’ বলে কপালে তিলক আঁকে,
তাজমহলের শ্বেতপাথরে যারা খুঁজে পায় নিজেদের লুণ্ঠিত পরিচয়—
তারা জাগবে না, অসীম, তারা জাগতে জানে না।

জন্মান্তরবাদের শীতল চাদর গায়ে দিয়ে তারা ভাবে,
এই যে দাসত্ব, এ তো গত জন্মের কোনো পাপের ফসিল।
তাই লড়াইয়ের বদলে তারা বেছে নেয় পলায়ন,
ঐক্যের বদলে বেছে নেয় আত্মঘাতী বিভাজন।
তুমি ভুল দেশে জন্মেছ, ভুল সময়ে ধরেছ জাগরণী গান।
বাঙালি যখন নিজেই নিজের ঘর পোড়ায়,
তখন তাকে বাঁচানোর আকুতি এক করুণ কৌতুকে পর্যবসিত হয়।
শোনো হে শিল্পী, শোনো হে বক্তা—
যে সমাজ নিজের পরাজয়কেই উৎসব বলে মানে,
তার জন্য তোমার উষ্মা কেবল অরণ্যে রোদন।

পরে পড়বো
২৩
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন