যে নারীর কোন দেশ নেই
শংকর ব্রহ্ম
তেরো বছর বয়স থেকে তসলিমা কবিতা লেখা শুরু করেন। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি 'সেঁজুতি' নামক একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। ১৯৮৬ সালে 'শিকড়ে বিপুল ক্ষুধা' নামক তার প্রথম কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়। ১৯৮৯ সালে 'নির্বাসিত বাহিরে অন্তরে' ও ১৯৯০ সালে 'আমার কিছু যায় আসে না' কাব্যগ্রন্থগুলি প্রকাশিত হয়। এই সময় নঈমুল ইসলাম খান দ্বারা সম্পাদিত খবরের কাগজ নামক রাজনৈতিক সাপ্তাহিকীতে নারী অধিকার বিষয়ে লেখা শুরু করেন। তার কাব্যগ্রন্থ ও সংবাদপত্রের কলামে নারীদের প্রতি ইসলামপন্থীদের শোষণের অভিযোগ করায় ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের একদল ইসলামপন্থী এই পত্রিকার অফিস ভাঙচুর করে।
তসলিমা বলেছেন, "যদি কুরআন নারীদের পর্দা করার পরামর্শ দেয়, তাহলে কি তাদের তা করা উচিত? আমার উত্তর হল না। কোন বইতে লেখা আছে, যে ব্যক্তিই পরামর্শ দিক না কেন, যেই আদেশ করুক না কেন, নারীদের পর্দা করা উচিত নয়। পর্দা নেই, চাদর নেই, হিজাব নেই, বোরকা নেই, মাথার স্কার্ফ নেই। নারীদের এই জিনিসগুলির কোনওটিই ব্যবহার করা উচিত নয় কারণ এগুলি সবই অসম্মানের হাতিয়ার"।
এই একই রকম ভাবনা বহুদিন আগে বেগম রোকেয়াও ভেবেছেন। তিনি "অলঙ্কারকে দাসত্বের প্রতীক বিবেচনা করেছেন এবং নারীদের অলঙ্কার ত্যাগ করে আত্মসম্মানবোধে উজ্জীবিত হয়ে আর্থ-রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনে সচেষ্ট হতে আহ্বান জানিয়ে বলেছেন - রোকেয়া অলঙ্কারকে দাসত্বের প্রতীক বিবেচনা করেছেন এবং নারীদের অলঙ্কার ত্যাগ করে আত্মসম্মানবোধে উজ্জীবিত হয়ে আর্থ-রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনে সচেষ্ট হতে আহ্বান জানিয়েছেন।
"আমরা বহুকাল হইতে দাসীপনা করিতে করিতে দাসীত্বে অভ্যস্ত হইয়া পড়িয়াছি। ক্রমে পুরুষরা আমাদের মনকে পর্য্যন্ত দাস করিয়া ফেলিয়াছে।... তাহারা ভূস্বামী গৃহস্বামী প্রভৃতি হইতে হইতে আমাদের "স্বামী" হইয়া উঠিয়াছেন।... আর এই যে আমাদের অলঙ্কারগুলি– এগুলি দাসত্বের নিদর্শন। ... কারাগারে বন্দিগণ লৌহনির্ম্মিত বেড়ী পরে, আমরা স্বর্ণ রৌপ্যের বেড়ী পরিয়া বলি "মল পরিয়াছি। উহাদের হাতকড়ী লৌহনির্ম্মিত, আমাদের হাতকড়ী স্বর্ণ বা রৌপ্যনির্ম্মিত "চুড়ি!"... অশ্ব হস্তী প্রভৃতি পশু লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে, সেইরূপ আমরা স্বর্ণশৃঙ্খলে কণ্ঠ শোভিত করিয়া বলি "হার পরিয়াছি!" গো-স্বামী বলদের নাসিকা বিদ্ধ করিয়া "নাকা দড়ী" পরায়, আমাদের স্বামী আমাদের নাকে "নোলক" পরাইয়াছেন। অতএব দেখিলে ভগিনি, আমাদের ঐ বহুমূল্য অলঙ্কারগুলি দাসত্বের নিদর্শন ব্যতীত আর কিছুই নহে! ... অভ্যাসের কি অপার মহিমা! দাসত্বে অভ্যাস হইয়াছে বলিয়া দাসত্বসূচক গহনাও ভালো লাগে। অহিফেন তিক্ত হইলেও আফিংচির অতি প্রিয় সামগ্রী। মাদক দ্রব্যে যতই সর্বনাশ হউক না কেন, মাতাল তাহা ছাড়িতে চাহে না। সেইরূপ আমরা অঙ্গে দাসত্বের নিদর্শন ধারণ করিয়াও আপনাকে গৌরবান্বিতা মনে করি। ... হিন্দুমতে সধবা স্ত্রীলোকের কেশকর্ত্তন নিষিদ্ধ কেন? সধবানারীর স্বামী ক্রুদ্ধ হইলে স্ত্রীর সুদীর্ঘ কুম্ভলদাম হস্তে জড়াইয়া ধরিয়া উত্তম মধ্যম দিতে পারিবে। ... ধিক আমাদিগকে!আমরা আশৈশব এই চুলের কত যত্ন করি ! কি চমৎকার সৌন্দর্য্যজ্ঞান ! "
এই সময় নির্বাচিত কলাম নামক তার বিখ্যাত প্রবন্ধ-সংকলন প্রকাশিত হয়, যার জন্য ১৯৯২ সালে তসলিমা আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৩ সালের মধ্যে 'অতলে অন্তরীণ', 'বালিকার গোল্লাছুট' ও 'বেহুলা একা ভাসিয়েছিল ভেলা' নামক আরও তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। 'যাবো না কেন? যাব' ও 'নষ্ট মেয়ের নষ্ট গল্প' নামক আরও দুইটি প্রবন্ধ-সংকলন এবং 'অপরপক্ষ', 'শোধ', 'নিমন্ত্রণ' ও 'ফেরা' নামক চারটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ময়মনসিংহ শহরে ১৯৬২ সালের ২৫শে আগস্ট তসলিমা নাসরিন জন্মগ্রহণ করেন। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তার মা ঈদুল ওয়ারা ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান গৃহিণী এবং পিতা রজব আলী পেশায় চিকিৎসক ছিলেন। ১৯৭৬ সালে তিনি ময়মনসিংহ রেসিডেন্সিয়াল স্কুল থেকে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এস.এস.সি) পাস করেন। ১৯৭৮ সালে আনন্দ মোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচ.এস.সি) পাস করেন। এরপর তিনি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৮৪ সালে এম.বি.বি.এস পাস করেন। ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল তিনি সরকারী গ্রামীণ হাসপাতালে এবং ১৯৯০ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত মিটফোর্ড হাসপাতালে স্ত্রীরোগ বিভাগে ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢা.মে.ক.হা)- এ অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
তিনি মনে করেন, "রাষ্ট্রের কর্তব্য নারীদের শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করা, যা তাদের ক্ষমতায়নের মূল কারণ।"
১৯৯৩ সালে ‘লজ্জা’ নামক তার পঞ্চম উপন্যাস প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসে বাংলাদেশের মুসলিমদের দ্বারা একটি সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের ওপর অত্যাচারের বর্ণনা করা হয়। এই উপন্যাসটি প্রকাশের পর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় একদল ইসলামপন্থী তসলিমার ওপর শারীরিকভাবে নিগ্রহ করে ও তার এই উপন্যাস নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দাবি জানায়। গ্রন্থমেলা কর্তৃপক্ষ তাকে মেলায় প্রবেশ করতে নিষেধ করেন। এই বছর অক্টোবর মাসে কাউন্সিল অব ইসলামিক সোলজার্স নামক এক ইসলামপন্থী সংগঠন তার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করে।
লেখক কে. সচ্চিদানন্দনের এক প্রশ্নের জবাবে, নাসরিন বিস্মিত হয়েছিলেন যে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষরা কেন কেবল হিন্দু মৌলবাদীদের প্রশ্ন তুলছেন, যেখানে তারা মুসলিম মৌলবাদীদের কথাই বলছেন না। তিনি অভিযোগ করেন যে ছদ্ম-ধর্মনিরপেক্ষতার উপর ভিত্তি করে তৈরি গণতন্ত্র মোটেও প্রকৃত গণতন্ত্র নয়। তিনি বলেন যে ভারতে প্রকৃত দ্বন্দ্ব হল ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মৌলবাদের মধ্যে, উদ্ভাবন এবং ঐতিহ্যের মধ্যে, মানবতা এবং বর্বরতার মধ্যে এবং যারা স্বাধীনতাকে মূল্য দেয় এবং যারা দেয় না তাদের মধ্যে। তিনি ২০১৫ সালের দাদরিতে গণপিটুনির হত্যার ঘটনার নিন্দা করেছেন এবং দেশের বুদ্ধিজীবীদের তাদের অনন্য প্রতিবাদের ভূমিকার জন্য প্রশংসা করেছেন।
তসলিমা নাসরিনের সাতটি আত্মজীবনী গ্রন্থের অধিকাংশ বাংলাদেশ ও ভারত সরকার দ্বারা নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষিত হয়। 'আমার মেয়েবেলা' নামক তার প্রথম আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে ইসলাম ও মুহাম্মাদের প্রতি বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষিত হলেও ২০০০ সালে এই বইয়ের জন্য তসলিমা দ্বিতীয়বার আনন্দ পুরস্কার জয় করেন। ২০০২ সালে তার দ্বিতীয় আত্মজীবনী 'উতাল হাওয়া' বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষিত হয়। ২০০৩ সালে 'ক' নামক তার তৃতীয় আত্মজীবনী বাংলাদেশ উচ্চ আদালত কর্তৃক নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে এই বইটি দ্বিখণ্ডিত নামে প্রকাশিত হলেও ভারতীয় মুসলিমদের একাংশের চাপে নত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে বইটি নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষিত হলে সরকারের এই সিদ্ধান্ত লেখক মহলে তীব্রভাবে সমালোচিত হয়। এই নিষেধাজ্ঞা ২০০৫ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল। ২০০৪ সালে 'সেই সব অন্ধকার' নামক তার চতুর্থ আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
১৯৯৪ সালের মে মাসে দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইসলামি ধর্মীয় আইন শরিয়া অবলুপ্তির মাধ্যমে কুরআন সংশোধনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এর ফলে ইসলামপন্থীরা তার ফাঁসির দাবি জানাতে শুরু করে। তিন লাখ ইসলামপন্থীদের একটি জমায়েতে তাকে ইসলামের অবমাননাকারী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দালালরূপে অভিহিত করে। দেশ জুড়ে তার শাস্তির দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়। হাবিবুর রহমান সিলেটে একটি সমাবেশে তার মাথার দাম ৫০ লাখ টাকা ঘোষণা করে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে জনগণের ধর্মীয় ভাবনাকে আঘাত করার অভিযোগে মামলা রুজু করা হয় এবং জামিন-অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। সেসময় আলোকচিত্রী শহিদুল আলম সহ বিভিন্ন জনের আশ্রয়ে তিনি দুই মাস লুকিয়ে থাকার পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে তার জামিন মঞ্জুর করা হয় এবং তসলিমা বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
তসলিমা বলেছেন, আমি তিন তলাকের বিরোধী, মাদ্রাসা শিক্ষার ঘোর বিরোধী। আমি বোরখার ঘোর বিরোধী। আমি নির্যাতনেরও ঘোর বিরোধী। ভায়োলেন্সের সমাপ্তি ঘটুক। মানুষ মানবিক হোক, উদার হোক, মানুষ মানুষ হোক। মানবতার চেয়ে যেখানে ধর্ম বড় হয়ে ওঠে, সেখানেই তার আপত্তি। শিক্ষা প্রসঙ্গে তসলিমা নাসরিন বলেছিলেন, মাদ্রাসায় পড়া ছাত্রদের জ্ঞান ও শিক্ষা নিয়ে তিনি আতঙ্কিত। কারণ সেখানে ধর্মশিক্ষা দেওয়া হয়, কিন্ত বিজ্ঞান শিক্ষা দেওয়া হয় না। তিনি মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নন, বরং সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছু রীতিনীতি এবং নিয়মের বিরুদ্ধে যা নারীদের শিক্ষাগত এবং অর্থনৈতিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তিনি কট্টর মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে। তাই মৌলবাদীরাও তার কট্টর বিরোধী।
তিনি তিন তালাকের বিরুদ্ধে কারণ এটি দরিদ্র মহিলাদের জীবনকে প্রতিকূলভাবে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশে একজন অনুশীলনকারী ডাক্তার হিসেবে, তিনি তিন তালাকের পরে নারীদের দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে জীবনযাপন করতে হয় তা দেখেছেন, কোনও অর্থনৈতিক বা সামাজিক সহায়তা ছাড়াই। "যদি একজন মহিলাকে কেবল তিন তালাকের মাধ্যমে তালাক দেওয়া যায়, তাহলে কেন একজন পুরুষকে একইভাবে তালাক দেওয়া উচিত নয়?"
বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর তিনি ১৯৯৪ সালে সুইডেনে ও ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত জার্মানিতে বসবাস করেন। ১৯৯৭ সালে তিনি সুইডেন ফিরে গেলে রাজনৈতিক নির্বাসিত হিসেবে জাতিসংঘের ভ্রমণ নথি লাভ করেন। এই সময় তিনি সুইডেনের নাগরিকত্ব লাভ করেন ও সুইডিশ কর্তৃপক্ষের নিকট তার বাংলাদেশের পাসপোর্ট জমা দেন। ১৯৯৮ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। এই সময় তার মা অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি বাংলাদেশ সরকারের নিকট দেশে ফেরার অনুমতি চেয়ে ব্যর্থ হলে তিনি জাতিসংঘের ভ্রমণ নথি ত্যাগ করে সুইডিশ কর্তৃপক্ষের নিকট হতে তার বাংলাদেশের পাসপোর্ট ফেরত পান ও বিনা অনুমতিতে বাংলাদেশ প্রবেশ করেন। বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে পুনরায় জামিন-অযোগ্য গ্রেপ্তারী পরোয়ানা রুজু হলে তিনি পুনরায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। ১৯৯৯ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি ফ্রান্সে বসবাস করেন।
দীর্ঘ ছয় বছর অপেক্ষার পর ২০০০ সালে তিনি ভারতে প্রবেশ করার ভিসা সংগ্রহ করতে সমর্থ হলে তিনি কলকাতা যাত্রা করেন। এই বছর মার্চ মাসে তিনি 'শোধ' নামক তার একটি উপন্যাসের মারাঠি ভাষায় অনুবাদকর্মের প্রচারে মুম্বই শহরে পৌঁছানোর সময় ইসলামপন্থীরা তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার হুমকি দেন। ২০০২ সালে তসলিমার পিতা মৃত্যুশয্যায় শায়িত হলে তসলিমার বাংলাদেশ প্রবেশে অনুরোধ করে ব্যর্থ হন। ২০০৪ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তাকে অস্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হলে তসলিমা কলকাতা শহরে বসবাস শুরু করেন। ২০০৬ সালে টিপু সুলতান মসজিদের ইমাম সৈয়দ নূরুর রহমান বরকতি নাসরিনের মুখে কালিলেপন করলে পুরস্কৃত করার কথা ঘোষণা করেন। ২০০৭ সালের মার্চ মাসে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল বোর্ড নামক একটি সংগঠন তার মুন্ডচ্ছেদের জন্য পাঁচ লাখ টাকা ঘোষণা করেন। এই বছর ৯ই আগস্ট তিনি 'শোধ' উপন্যাসের তেলুগু ভাষায় অনুবাদকর্মের প্রচারে হায়দ্রাবাদ শহরে গেলে অল ইন্ডিয়া মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন নামক একটি রাজনৈতিক দলের প্ররোচনায় উত্তেজিত জনতা তাকে আক্রমণ করে। ১৭ই আগস্ট কলকাতা শহরের মুসলিম নেতারা তসলিমাকে হত্যা করার জন্য বিপুল অর্থ পুরস্কার দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। ২১শে নভেম্বর অল ইন্ডিয়া মাইনোরিটি ফোরাম নামক একটি ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠী কলকাতা শহরে তাণ্ডব শুরু করলে সেনাবাহিনীকে আইন ও শান্তিরক্ষার জন্য মোতায়েন করা হয়। এই দাঙ্গার পর নাসরিনকে কলকাতা থেকে জয়পুর হয়ে নতুন দিল্লি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ভারত সরকার তাকে পরবর্তী সাত মাস একটি অজ্ঞাত স্থানে গৃহবন্দি করে রাখে। ২০০৮ সালে তাকে 'সিমোন দ্য বোভোয়ার' পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হলেও তিনি ভারতে প্রবেশে অনুমতি না পাওয়ার আশঙ্কায় ফ্রান্স যাত্রা করে পুরস্কার নিতে অসম্মত হন।এই সময় তিনি 'নেই কিছু নেই' নামক তার আত্মজীবনীর ষষ্ঠ ভাগ প্রকাশ বাতিল করেন ও কলকাতার দাঙ্গার জন্য দায়ী 'দ্বিখণ্ডিত' নামক তার বিতর্কিত বইটির কিছু অংশ অপসারণ করতে বাধ্য হন। ভারতের প্রাক্তন বিদেশসচিব মুচকন্দ দুবে মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে একটি পত্রে ভারত সরকারকে চাপ দিয়ে তসলিমার গৃহবন্দী অবস্থার মুক্তির জন্য অনুরোধ করেন। ২০০৮ সালের ১৯শে মার্চ তসলিমা ভারত ছাড়তে বাধ্য হন।
২০১৫ সালে আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত ইসলামপন্থীরা তার প্রাণনাশের হুমকি দিলে সেন্টার ফর ইনক্যুয়ারি তাকে ঐ বছর ২৭শে মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেতে সহায়তা করে এবং তার খাদ্য, বাসস্থান নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।” নির্বাসিত হওয়ার পর তসলিমা নাসরিন ভারতে থাকাকালীন সময়ে প্রথম বাংলাদেশী হিসাবে জনপ্রিয় টেলিভিশন শো 'বিগ বস ৮'- এ আমন্ত্রণ পান। কিন্তু তিনি এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখান করেন।
বেগম রোকেয়া ১৯০৪ সালে বলেছেন, "কোনও ভগ্নী মস্তক উত্তোলন করিয়াছেন, অমনি ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচন-রূপ অস্ত্রাঘাতে তাঁহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে। ... আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্যে পুরুষগণ এই ধর্মগ্রন্থগুলি ইশ্বরের আদেশ বলিয়া প্রচার করিয়াছেন।"
তসলিমা নাসরিন একথা বুঝেই বলেছিলেন, "নারীদের অধিকার রক্ষার জন্য বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যাদের সাথে পুরুষদের সমান আচরণ করা উচিত।"
সুফিয়া কামাল নারীর সামাজিক শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তির দিগন্ত উন্মোচন করার জন্য নিবেদিত ছিলেন। নারীর সামগ্রিক মুক্তির জন্য তার ভূমিকা ছিল সমসময়ের জন্য উদ্দীপনামূলক ও আগ্রহ উদ্দীপক। সে কারণে তসলিমা নাসরিনের কথা ভেবেই বোধহয় তিনি বলেছেন, "আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লাগে এই দেখে যে, মেয়েরা আগের তুলনায় এখন অনেক সাহসী হয়েছে। মেয়েরা এখন রাস্তায় বেরিয়ে অন্তত নিজেদের কথা বলতে শিখেছে। আমরা চেয়েছিলাম, মেয়েরা কথা বলতে শিখুক, সাহসী হয়ে উঠুক, নিজেদের অধিকার তারা বুঝতে পারুক। এটা এখন হয়েছে।"
বেগম রোকেয়া, বেগম সুফিয়া কামালের যোগ্য উত্তরসূরী তসলিমা নাসরিন।
[তার গ্রন্থ তালিকা]
(কবিতা)
১). শিকড়ে বিপুল ক্ষুধা, ১৯৮১ সাল
২). নির্বাসিত বাহিরে অন্তরে, ১৯৮৯ সাল
৩). আমার কিছু যায় আসে না , ১৯৯০ সাল
৪). অতলে অন্তরীণ, ১৯৯১ সাল
৫). বালিকার গোল্লাছুট, ১৯৯২ সাল
৬). বেহুলা একা ভাসিয়েছিল ভেলা, ১৯৯৩ সাল
৭). আয় কষ্ট ঝেঁপে, জীবন দেবো মেপে, ১৯৯৪ সাল
৮). নির্বাসিত নারীর কবিতা, ১৯৯৬ সাল
৯). জলপদ্য, ২০০০ সাল
১০). খালি খালি লাগে, ২০০৪ সাল
১১). কিছুক্ষণ থাকো, ২০০৫ সাল
১২). ভালোবাসো? ছাই বাসো!, ২০০৭ সাল
১৩). বন্দিনী, ২০০৮ সাল।
(প্রবন্ধ সংকলন)
১). নির্বাচিত কলাম, ১৯৯০ সাল
২). যাবো না কেন? যাব, ১৯৯১ সাল
৩). নষ্ট মেয়ের নষ্ট গল্প, ১৯৯২ সাল
৪). ছোট ছোট দুঃখ কথা, ১৯৯৪ সাল
৫). নারীর কোন দেশ নেই, ২০০৭ সাল
৬). নিষিদ্ধ, ২০১৪ সাল
৭). তসলিমা নাসরিনের গদ্য পদ্য, ২০১৫ সাল।
(উপন্যাস)
১). অপরপক্ষ ১৯৯২ সাল
২). শোধ, ১৯৯২ সাল
৩). নিমন্ত্রণ, ১৯৯৩ সাল
৪). ফেরা , ১৯৯৩ সাল
৫). লজ্জা, ১৯৯৩ সাল
৬). ভ্রমর কইও গিয়া, ১৯৯৪ সাল
৭). ফরাসি প্রেমিক ,২০০২ সাল
৮). শরম,২০০৯ সাল।
(ছোট গল্প)
১). দু:খবতী মেয়ে, ১৯৯৪ সাল
২). মিনু, ২০০৭ সাল।
(আত্মজীবনী)
১). আমার মেয়েবেলা, ১৯৯৯ সাল
২). উতাল হাওয়া, ২০০২ সাল
৩). ক, ২০০৩ সাল; (পশ্চিমবঙ্গে দ্বিখণ্ডিত নামে প্রকাশিত, ২০০৩ সাল)
৪). সেই সব অন্ধকার, ২০০৪ সাল
আমি ভালো নেই, তুমি ভালো থেকো প্রিয় দেশ, ২০০৬ সাল
৫). নেই, কিছু নেই, ২০১০ সাল
৬). নির্বাসন, ২০১২ সাল।
(তাকে নিয়ে চলচ্চিত্র)
তসলিমা নাসরিনের জীবনভিত্তিক প্রথম চলচ্চিত্র নির্বাসিত ২০১৪ সালে মুম্বাই চলচ্চিত্র উৎসবে মুক্তি পায়।
২০১৫ সালে এই চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ বাংলা চলচ্চিত্র বিভাগে ৬২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছে।
[পুরস্কার ও সম্মাননা]
তসলিমা তার উদার ও মুক্তচিন্তার মতবাদ প্রকাশ করায় দেশ-বিদেশ থেকে একগুচ্ছ পুরস্কার ও সম্মাননা গ্রহণ করেছেন। সেগুলো হলো -
১). ● আনন্দ সাহিত্য পুরস্কার, ভারত, ১৯৯২ সাল
২). ● নাট্যসভা পুরস্কার, বাংলাদেশ, ১৯৯২ সাল
৩). ● ইউরোপীয় সংসদ থেকে চিন্তার স্বাধীনতার জন্য সাখারভ পুরস্কার, ১৯৯৪ সাল
৪). ● ফ্রান্স সরকার থেকে মানবাধিকার পুরস্কার, ১৯৯৪ সাল
৫). ● ফ্রান্স থেকে নান্টেস পুরস্কারের আদেশ, ১৯৯৪ সাল
৬). ● কার্ট টুচোলস্কি পুরস্কার, সুইডিশ পেন, সুইডেন, ১৯৯৪ সাল
৭). ● হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, থেকে হেলম্যান-হ্যামেট গ্রান্ট, ১৯৯৪ সাল
৮). ● হিউম্যান-এটিস্ক ফরবান্ড, নরওয়ে, থেকে মানবতাবাদী পুরস্কার, ১৯৯৪ সাল
৯). ● ঘেন্ট ইউনিভার্সিটি, বেলজিয়াম, থেকে অনারারি ডক্টরেট, ১৯৯৫ সাল
১০). ● জার্মান একাডেমিক এক্সচেঞ্জ সার্ভিস, জার্মানি, থেকে বৃত্তি, ১৯৯৫ সাল
১১). ● উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়, সুইডেন, থেকে মনিসমানিয়ান পুরস্কার,১৯৯৫ সাল
১২). ● আন্তর্জাতিক মানবতাবাদী এবং নৈতিক ইউনিয়ন, গ্রেট ব্রিটেন, থেকে বিশিষ্ট মানবতাবাদী পুরস্কার, ১৯৯৬ সাল
১৩). ● ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি ফর হিউম্যানিজম, ইউএসএ, থেকে মানবতাবাদী বিজয়ী, ১৯৯৬ সাল
১৪). ● আনন্দ সাহিত্য পুরস্কার, ভারত, ২০০০ সাল
১৫). ● আগামীকালের জন্য গ্লোবাল লিডার, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, ১৯৯৬ সাল
১৬). ● এরউইন ফিশার পুরস্কার, অ-ধর্মীয় ও নাস্তিকদের আন্তর্জাতিক লীগ (IBKA), জার্মানি, ২০০২ সাল
১৭). ● ফ্রি থট হিরোইন অ্যাওয়ার্ড, ফ্রিডম ফ্রম রিলিজিয়ন ফাউন্ডেশন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ২০০২ সাল
১৮). ● কার সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস পলিসিতে ফেলোশিপ, জন এফ কেনেডি স্কুল অফ গভর্নমেন্ট, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ২০০৩ সাল
১৯). ● সহনশীলতা ও অহিংসার প্রচারের জন্য ইউনেস্কো-মদনজিৎ সিং পুরস্কার, ২০০৪ সাল
২০). ● আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অফ প্যারিস থেকে অনারারি ডক্টরেট, ২০০৫ সাল
২১). ● গ্র্যান্ড প্রিক্স ইন্টারন্যাশনাল কনডরসেট-আরন, ২০০৫ সাল
২২). ● শরৎচন্দ্র সাহিত্য পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত, ২০০৬ সাল
২৩). ● প্যারিস, ফ্রান্স, এর সম্মানসূচক নাগরিকত্ব, ২০০৮ সাল
২৪). ● সিমোন ডি বেউভোয়ার পুরস্কার, ২০০৮ সাল
২৫). ● নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফেলোশিপ, ২০০৯ সাল
২৬). ● উড্রো উইলসন ফেলোশিপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ২০০৯ সাল
২৭). ● নারীবাদী প্রেস পুরস্কার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,
২০০৯ সাল।
অনুসন্ধান করুন
সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ
সুন্দর লেখা, অভিনন্দন কবি
আরো দেখুন
কাজী অ্যাডাম
লেখক:
আনিস খান শিহাব
আসসালামু আলাইকুম । বাংলা কবিতা নেট কবিতা অঙ্গনে সক...
আরো দেখুন
নূর মোহাম্মদ কল্পকবি
লেখক:
নূর মোহাম্মদ কল্পকবি
কিছু অনুভূতি
হালকা করে ছুঁয়ে যায়,
কিন্তু হৃদয়...
আরো দেখুন
রিয়াজ খান-হৃদয়
লেখক:
শংকর ব্রহ্ম