জগদীশ গুপ্ত
(উপেক্ষিত সাহিত্যিক)
শংকর ব্রহ্ম
তাঁর পৈতৃকনিবাস ছিল ফরিদপুর জেলার খোর্দ মেঘচারমি গ্রামে। তাঁর পিতা কৈলাশচন্দ্র গুপ্ত কুষ্টিয়া আদালতের বিশিষ্ট আইনজীবী ছিলেন। তাঁর পিতা কর্মসূত্রে সেখানে ছিলেন। সেখানেই জগদীশ গুপ্ত ১২৯২ বঙ্গাব্দের ২২শে আষাঢ় ( ৫ ই জুলাই, ১৮৮৬ সালে ) আমলাপাড়া, কুষ্টিয়া, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারতে (বর্তমান বাংলাদেশ) জন্মগ্রহণ করেন।
জগদীশ গুপ্তের ছোটবেলা কেটেছে , তৎকালীন নদিয়া জেলার কুষ্টিয়ায়। কাছেই ছিল গড়াই নদী, তার জলে এক সময় রোজ স্নান করতেন তিনি। খুব ছোটবেলা থেকেই লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তেন বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস। ১৯০৬ সালে নদিয়া জেলার ওসমানপুরের চারুবালা সেনগুপ্তের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় কুড়ি বছর বয়সে। চারুবালার স্মৃতি থেকে জানা যায়, ‘তিন-চার বছর পর্যন্ত তিনি পতিতাদের বাড়িতে খেলাধূলা করতেন। বাড়ির জানালা দিয়ে এই পতিতাপল্লী দেখা যেত।’
১৯০৫ সালে কলকাতা সিটি কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। তারপর কলকাতা রিপন কলেজে ভর্তি হন। ১৯০৭ সালে এফ. এ পরীক্ষা দিয়ে কলেজের পড়াশুনা ত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে তিনি কলকাতা কমার্শিয়াল ইন্সটিটিউট থেকে শর্টহ্যান্ড ও টাইপরাইটিং শেখেন।
তিনি পেশা হিসাবে বেছে নেন টাইপিংকেই। বীরভূম জেলার সিউড়ি জাজকোর্টে ১৯০৮ সালে টাইপিস্টের চাকরি গ্রহণ করেন। সেখানে পাঁচ বছর চাকরি করার পর, ১৯১৩ সালে উড়িষ্যার সম্বলপুরে একজিকিউটিভ এঞ্জিনিয়ারের অফিসে পুনরায় টাইপিস্টের চাকরি গ্রহণ করেন । কিন্তু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মনোমালিন্য হওয়ায় চাকরি থেকে ইস্তফা দেন।
তিনি ছিলেন সিউড়িতে। পরে কর্মসূত্রে তিনি ওড়িশার সম্বলপুরে এবং পটনা হাইকোর্টে টাইপিংয়ের কাজ করেন। পরের অধীনে চাকরি করতে গেলে বহু অন্যায় কাজও অনেক সময় মেনে নিতে হয়। জগদীশ গুপ্তের মতো প্রখর মর্যাদাজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের পক্ষে তা কখনও সম্ভব ছিল না। উপরওয়ালা ইংরেজের সঙ্গে তাঁর মতান্তর হয় একটি ইংরেজি শব্দ নিয়েই। সাধারণ এক টাইপিস্টের ‘ঔদ্ধত্য’ শ্বেতাঙ্গ কর্তার সহ্য হয়নি।
জগদীশ যে শুধু পটনা হাইকোর্টের চাকরি ছাড়লেন তা-ই নয়, জীবনে আর কখনও চাকরি করবেন না, এই সিদ্ধান্ত নিলেন। পটনায় বাড়ির কাছেই ছিল গঙ্গা, সেখানে নিয়মিত স্নান করতে যেতেন সেই সময়।
চাকরির বিকল্প হিসাবে তিনি বেছে নিলেন ব্যবসাকে। কুষ্টিয়াতে ফিরে এসে তিনি প্রথমে একটি পত্রিকা প্রকাশ করবেন বলে ঠিক করলেন। সেই পত্রিকা প্রকাশিত হলেও তা থেকে আয় খুব বেশি হলো না। এর পর যেটুকু পুঁজি অবশিষ্ট ছিল, তার সবটাই বিনিয়োগ করে শুরু করলেন ফাউন্টেন পেনের কালি তৈরির ব্যবসায়। কিন্তু ব্যবসা চালানোর জন্য যে বৈষয়িক বুদ্ধির দরকার হয়, তা তাঁর একেবারেই ছিল না। ফলে ব্যবসায় তাঁর আর্থিক ক্ষতি হলো প্রভূত।
এরপর কপর্দকশূন্য অবস্থায়, ১৯২৭ সালে তিনি এলেন বোলপুরে, অর্থের বিনিময়ে মক্কেলদের কোর্টের দরকারি কাগজপত্র টাইপ করে দিতেন। সেই সময় অনেকেই বলেছিলেন তাকে রবীন্দ্রনাথের সাথে যোগাযোগ করতে। কিন্তু তিনি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার ব্যাপারে মোটেও আগ্রহ দেখাননি। তবে ১৯৩১ সালে ‘লঘু গুরু’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হলে এক কপি বই রবীন্দ্রনাথকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ‘পরিচয়’ পত্রিকায় বইটির দীর্ঘ সমালোচনা করেন রবীন্দ্রনাথ।
সেখানে একটানা সতেরো বছর কাজ করার পর ১৯৪৪ সালে অবসর গ্রহণ করেন। এরপর কুষ্টিয়ায় বসবাস করতে থাকেন। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর কুষ্টিয়া ত্যাগ করে কলকাতায় চলে আসেন এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন।
তাঁর দাম্পত্যসঙ্গী ছিলেন - চারুবালা সেনগুপ্ত।
ভারত উপমহাদেশের অন্যতম বাঙালি ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্পকার ছিলেন তিনি। মূলতঃ কথাসাহিত্যিক হলেও তিনি সাহিত্যিক জীবনের শুরুতে কবিতা লিখেছেন ও একটি কবিতা সংকলন (অক্ষরা) প্রকাশ করেছেন।
কবি হিসেবে তিনি প্রথমে আত্মপ্রকাশ করলেও ছোট গল্পকার-রূপে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন লাভ করেন। 'বিজলী', 'কালিকলম', 'কল্লোল' প্রভৃতি সেকালের নতুন ধরনের সকল পত্রিকাতেই গল্প প্রকাশ করতে থাকেন। গল্প ও উপন্যাসের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র প্রকাশভঙ্গির জন্য সাহিত্যিক মহলে তিনি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছিলেন।
জগদীশ গুপ্ত ছিলেন ছোটগল্পের বিশিষ্ট শিল্পী। গভীর জীবনবোধ, সুঠাম কাহিনিবিন্যাস ও চরিত্রচিত্রণের নৈপুণ্যে তাঁর ছোটগল্পগুলি সমৃদ্ধ হয়েছে। মনোবৈকল্য ও মনোবিশ্লেষণ এবং দুঃখময়তার নিপুণ বর্ণনায় তার শিল্পকর্ম এক অসাধারণ সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে সেই সময়। সামাজিক অন্যায়-অবিচারের চেয়ে অদৃষ্টলিপিই দুঃখময়তার কারণ বলে তার গল্পে বিশ্লেষেণ করেছেন।
জগদীশ গুপ্তের অনেক রচনাই ‘কল্লোল’, ‘কালি কলম’, ‘প্রগতি’ ইত্যাদি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন, গল্প তৈরি তাঁর উদ্দেশ্য নয়। লেখাগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি শুধুমাত্র নিজের বক্তব্য পরিবেশন করেছেন। তাঁর ছোটগল্পের সংখ্যা প্রায় একশো পঁচিশ। মানুষের যেমন হওয়া উচিত, অথবা যেমন হলে তাকে আমাদের ভালো লাগে তা নয়, মানুষ প্রকৃতই যা, তার বিশ্বস্ত ছবি একেবারে নির্মোহ দৃষ্টিতে আঁকতে চেয়েছেন তিনি।
রবীন্দ্রনাথ, প্রভাতকুমার, শরৎচন্দ্রের মিলিত প্রয়াসে, মানুষের প্রতি অপরিসীম বিশ্বাসের ভিত্তিতে যে সাহিত্যরুচি গড়ে উঠেছিল, জগদীশ গুপ্ত তা থেকে সরে এলেন। ভাববাদী ধারার সত্য, মঙ্গল ও নৈতিকতার মতো বিষয়গুলো আসলে যে কতটা মিথ্যা আর বানানো, তা দেখালেন। প্রবেশ করলেন মানুষের অবচেতনায়, মনের গহনতম প্রদেশে; দেখালেন পাপবোধ ও কদর্যতা মেশানো তার প্রকৃত স্বরূপকে। আর এই সবই দেখালেন বাস্তবতার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে। শার্ল বোদল্যেয়ার ফরাসি কাব্যে প্রথম যা করে দেখিয়েছিলেন, বাংলা গল্প-উপন্যাসে সেটাই করে দেখালেন জগদীশ গুপ্ত। জীবনের অশুভ দিকগুলোকে স্বীকৃতি দিলেন, দেখালেন বেআব্রু করে।
জীবনের সমস্ত মেকি আবরণ টেনে ছিঁড়ে আপসহীন ভাবে দেখিয়েছেন তার ভেতরের সত্যকে। সত্যের সাধনাতেই তিনি কাটিয়ে গেছেন গোটা জীবন। তাঁর লেখা তাই আমাদের স্বস্তি দেয় না। তিনি আমাদের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেন, আর নিজেদের দিকে তাকিয়ে, অবচেতনের স্বরলিপি পাঠ করে, জীবনের বিকৃতি ও অসঙ্গতিগুলোর দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠি আমরা। আমাদের মুখোশ খসে পড়তে থাকে, মুছে যেতে থাকে সমস্ত প্রসাধন। লেখার জন্য জীবনে কখনও আপস করেননি তিনি। এক প্রকাশক তাঁর একটি উপন্যাসকে আরও খানিকটা বাড়াতে বলে একটা চিঠি লিখেছিলেন তাকে । অগ্রিম কিছু টাকাও পাঠিয়েছিলেন। তিনি সেই টাকা তাকে ফেরত পাঠিয়ে জানান, ‘যে উপন্যাস যেখানে যখন সমাপ্ত হওয়া প্রয়োজন এবং যে ঘটনা বিস্তারের যতটুকু ক্ষেত্র আছে, তার বেশি কোনো ফরমাসী লেখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
তাঁর লেখা স্বস্তি দেয় না। মানুষের মনের কদর্য অবচেতনকে তাঁর লেখায় তুলে ধরতেন জগদীশ গুপ্ত। লেখায় আপস করেননি কখনও, ফলে শেষ জীবন কেটেছে চরম দারিদ্রে।
' মানুষের প্রেমের ট্র্যাজেডি মৃত্যুতে নয়, বিরহে নয়, অবসাদে আর ক্ষুদ্রতার পরিচয়ে, আর উদাসীনতায়।’ - লিখেছিলেন জগদীশ গুপ্ত।
‘কল্লোল যুগ’ বইতে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখেছেন, ‘জগদীশ গুপ্ত কোনোদিন কল্লোল–অফিসে আসেননি। মফঃস্বল শহরে থাকতেন, সেখানেই থেকেছেন স্বনিষ্ঠায়। লোক-কোলাহলের মধ্যে এসে সাফল্যের সার্টিফিকেট খোঁজেননি। সাহিত্যকে ভালোবেসেছেন প্রাণ দিয়ে। প্রাণ দিয়ে সাহিত্যরচনা করেছেন। অনেকের কাছেই তিনি অদেখা, হয়তো বা অনুপস্থিত।’
আড্ডা বা সভাসমিতির প্রতি কোনও দিনই তাঁর আকর্ষণ ছিল না। কথায়, আচরণে পরিমিতিবোধ ও রুচিগত আভিজাত্যের ছাপ। পড়াশোনার ব্যাপ্তি ছিল বিস্ময়কর। শেক্সপিয়র, মলিয়ের থেকে মোপাসাঁ, ওয়াশিংটন আরভিং— বহু লেখকের লেখা পড়েছেন তিনি। এক সম্পাদককে এক চিঠিতে তাকে রেমিজভের কিছু অনুবাদ পাঠানোর কথা বলেছিলেন। প্রতীকবাদী আলেক্সেই রেমিজভ ছিলেন রুশ গদ্যের নতুন ধারার পুরোধা, যার অন্যতম অনুরাগী ছিলেন জেমস জয়েস।
১৯৪৪ সালে তিনি এলেন কলকাতায়, এখানেই স্থায়ী ভাবে বসবাস করবেন। দীর্ঘ ছ’বছরের চেষ্টায় মাথা গোঁজার মতো একটি বাড়ি তৈরি করলেন যাদবপুর অঞ্চলের রামগড় কলোনিতে। মাটির তৈরি, বাঁশের বেড়া দেওয়া ছোট বাড়ি। ঘরে শুধু তক্তপোশ, আর কোনও আসবাব ছিল না। নির্জনতাপ্রিয় এক মানুষ। বেশি পাওয়ারের পুরু চশমার কাচের আড়ালে উজ্জ্বল চোখ, যদিও দৃষ্টিশক্তি তখন বেশ ক্ষীণ হয়ে এসেছে। লম্বা, রোগা, ছিপছিপে চেহারা, মাথার চুলে পাক ধরেছে, ঠোঁটের উপর কালো গোঁফজোড়া বেশ জমকালো। বাড়িতে লোকজন বেশি হলেই বেরিয়ে যেতেন, বা ঘরের এক কোণে বেহালা বা এস্রাজ বাজাতে বসতেন। বাঁশিও বাজাতেন প্রায়ই। ছবি অাঁকতেন। আর যখনই সময় পেতেন, লেখায় বুঁদ হয়ে যেতেন।
নিঃসন্তান জগদীশ গুপ্ত একটি মেয়েকে সন্তানস্নেহে পালন করেছিলেন। তার নাম দিয়েছিলেন সুকুমারী। নিয়মিত ও নিশ্চিত আয় না থাকায় শেষের দিনগুলিতে রীতিমতো অর্থাভাবে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। আর ছিল নানা রোগ–ব্যাধির নিয়ত উপদ্রব। যদিও এই মানুষটিই এক সময় নিয়মিত ফুটবল খেলেছেন। সাঁতার ছিল তাঁর প্রিয় নেশা। স্ত্রী চারুবালা, পালিতা কন্যা সুকুমারীকে রেখে ১৯৫৭ সালের ১৫ এপ্রিল তিনি প্রয়াত হন।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পথিকৃতের সম্মান যাঁর প্রাপ্য বলে অনেকে মনে করেন, তিনি কিনা মারা গেলেন অবহেলায়, কোনও স্বীকৃতি না পেয়ে, কঠোর দারিদ্রের মধ্যে। কিন্তু এ নিয়ে তাঁর মনে কোনও অনুযোগ ছিল না।
এক চিঠিতে লিখেছেন এই কথাগুলো, ‘নরনারীর মনের গতির পরিচয় কিছু কিছু যদি এতদিন না দিয়া থাকি, তবে আমার লেখা বৃথা হইয়াছে।’
তাঁর প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ -
১). বিনোদিনী (১৩৩৪ বঙ্গাব্দে)
২). রূপের বাহিরে (১৩৩৬ বঙ্গাব্দে)
৩). শ্রীমতি (১৩৩৭ বঙ্গাব্দে)
৪). উদয়লেখা (১৩৩৯ বঙ্গাব্দে)
৫). শশাঙ্ক কবিরাজের স্ত্রী (১৩৪১ বঙ্গাব্দে)
৬). মেঘাবৃত অশনি (১৩৫৪ বঙ্গাব্দে)
৭). স্বনির্বাচিত গল্প (১৩৫৭ বঙ্গাব্দে)
তাঁর প্রকাশিত উপন্যাস -
১). অসাধু সিদ্ধার্থ (১৩৩৬ বঙ্গাব্দে)
২). লঘুগুরু (১৩৩৮ বঙ্গাব্দে)
৩). দুলালের দোলা (১৩৩৮ বঙ্গাব্দে)
৪). নিষেধের পটভূমিকায় (১৩৫৯ বঙ্গাব্দে)
৫). কলঙ্কিত তীর্থ (১৩৬৭ বঙ্গাব্দে)
৬). রোমন্থন (১৩৬৭ বঙ্গাব্দে)
তাঁর প্রকাশিত কবিতা-সঙ্কলন
১). অক্ষরা।