স্বনামধন্য কিছু সাহিত‍্যিকের অভ্যাস ও পরামর্শ
শংকর ব্রহ্ম

(প্রথম পর্ব)

কয়েকজন সনামধন‍্য সাহিত‍্যিকের অদ্ভূত কিছু অভ্যাস ও পরামর্শের কথা শুনুন।

প্রথমেই শুরু করি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দিয়েই। তিনি কখনও এক জায়গায় বেশিদিন লিখতে পারতেন না। কখনও শ্যামলী, কখনও উদয়ন, কখনও নৌকায়, কখনও ঝুল-বারান্দায়। শোনা যায়, তিনি নাকি গাছের ওপরও একটি বাড়ি বানাবার কথা ভেবেছিলেন, যেখানে বসে লিখবেন।

গ্রীক সুবক্তা, রাজনীতিবিদ এবং বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ লেখক - ডেমোসথিনিস (৩৮৪ খ্রীষ্টপূর্ব খেকে ৩২২ খ্রীষ্টপূর্ব)। তিনি ছোটবেলায় ভালো করে কথা বলতে পারতেন না। জিভে জড়তা ছিল। সে কারণে মুখে ছোট ছোট পাথর দিয়ে কথা বলতে বলতে বলাটা খানিকটা ভাল হয় এবং পরে তিনি একজন অসাধারণ সুবক্তা হন। তার একটি অভ্যাস এমন ছিল, কোনো একটি সিরিয়াস বিষয়ে লিখতে বসার আগে মাথার আধেক চুল কামিয়ে ফেলতেন। তারপর যতদিন সেই আধেক চুল বড় না হত, তিনি লেখা থেকে উঠতেন না এবং বাইরে বের হতেন না।

ভিক্টর হিউগো (১৮০২ সাল থেকে ১৮৫৫ সাল) -
'হাঞ্চব্যাক অফ নোটরডামের' লেখক, লিখতে বসার আগে শরীরের সব কাপড় খুলে তার পরিচারককে বলতেন, এগুলো লুকিয়ে রাখ যতক্ষণ না আমার লেখা শেষ না হয়, এগুলো আমাকে দেবে না।
যখন খুব শীত লাগত তাঁর, তিনি তখন গায়ের চারপাশে একটা কম্বল জড়িয়ে বসে লিখতেন।
'লা মিজারেবল' লেখার সময় তিনি দীর্ঘদিন কাপড় পরেননি। কারণ ভালো কাপড় চোপড় পরলেই তার বাইরে যেতে ইচ্ছা করত, বই লেখা আর শেষ হতো না। কাজেই সেগুলো লুকিয়ে রাখার নির্দেশ দিতেন, এবং লেখা শেষ না হওয়া পর্যন্ত, তিনি চাইলেও যাতে না দেওয়া হয় এমন কঠোর নির্দেশ, যথাযথ ভাবে পালন করার কথা পরিচারককে বলা থাকত।

বালজাক (১৭৯৯ সাল থেকে ১৮৫০ সাল) এবং ভলটেয়র(১৬৯৪ সাল থেকে ১৭৭৮ সাল) -
ওঁনারা ছিলেন ভয়ানক কফিখোর। দিনে পঞ্চাশ কাপ কফি না খেলে তারা নাকি লিখতে পারতেন না। এভাবেই বালজাক নাটক, অপেরা, উপন্যাসের জন্ম দিয়েছেন। ভলটেয়ারের 'কানদিদাও' এইভাবে কফি পানের মধ্য দিয়েই সৃষ্টি হয়েছিল।

টুর্গেনিভ (রাসিয়ান গল্প লেখকও উপন্যাসিক) -
খোলা জানলার দিকে মুখ করে, আর টেবিলের তলায় গরম জলের বালতিতে পা ডুবিয়ে বসে লিখতে পছন্দ করতেন। তিনি মনে করতেন, এই ভাবে বসাটাই লেখকদের পক্ষে ঠিক উপযুক্ত। তাঁর কাছে গরম জলের বালতিটি হচ্ছে প্রেরণা, সৃষ্টির উৎসের প্রতীক,আর খোলা জানলাটি হচ্ছে বাইরের পৃথিবী, যেখান থেকে স্রষ্টা তার সৃষ্টির মালমসলা সংগ্রহ করবেন।

জার্মান কবি শিলার (১৭৫৯ সাল থেকে ১৮০৫ সাল) -
তাঁর ছিল এক অদ্ভুত অভ্যাস। একবার জার্মান কবি গ্যেটে গেছেন তার বাড়িতে, তখন শিলার বাড়িতে ছিলেন না। বসে আছেন শিলারের লেখার ঘরে। হঠাৎ একটা বাজে তীব্র গন্ধে তিনি ভাবতে লাগলেন, এ গন্ধ আসছে কোথায় থেকে। হঠাৎ শিলারের লেখার টেবিলের ড্রয়ার খুলে দেখেন, সেখানে এক ড্রয়ার পচা আপেল। তিনি শিলারের স্ত্রীকে ডাক দিয়ে বললেন, আপনি দেখছি আপনার স্বামীর দিকে খেয়াল রাখেন না। এক ড্রয়ার পচা আপেল ওর ড্রয়ারে। তাঁর কথা শুনে, স্ত্রী হেসে বললেন, পচা আপেলের গন্ধ না পেলে আপনার বন্ধু যে লিখতে পারেন না কিছু । শুনে, গ্যেটে তো অবাক!

মার্ক টোয়াইন (১৮৩৫ সাল থেকে ১৯১০ সাল) -
তিনি সবসময় বিছানায় শুয়ে লিখতেন। এ ছাড়া তিনি লিখতে পারতেন না।
আমাদের বাংলার লেখক সন্তোষ কুমার ঘোষেরও এই একই অভ্যাস ছিল। বুকে বালিশ চেপে উপুর হয়ে শুয়ে তিনি লিখতেন।
ব্রিটেনের শিশুসাহিত্যিক মাইকেল মোরপারগোর (১৯৪৩ সালে জন্ম। মৃত্যু জানা নেই) - তাঁর একই অভ্যাস ছিল । বিছানায় বসে পেছনে বালিশের পাহাড় বানিয়ে সেখানে হেলান দিয়ে লেখেন তিনি। আজকের দিনের লেখক হয়েও তিনি কম্পিউটার বা ল্যাপটপ ব্যবহার করেন না। কলমে লিখতেন সবসময়।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও মনে করতেন কলম দিয়ে লিখলে লেখায় গতি আসে। তিনিও আজীবন কলম দিয়ে লিখে গেছেন। কম্প্যুটার বা ল্যাবটপে কোনদিন লেখেননি।

ব্রিটেনের বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক রোয়াল্ড ডাল (১৯১৬ সাল থেকে ১৯৯০ সাল) -
তিনি লিখতেন বাগানের শেডে একটি সোফায় বসেন। কোলের ওপর বোর্ড রেখে। সেই বোর্ডের ওপর কাগজ রেখে মোটা কলমে লিখতেন। পাতাটা শেষ হলেই নিচে ফেলে দিতেন। এভাবে পাতার পর পাতা বড় বড় অক্ষরে লিখতেন। সেই শেডে কেউ যাতে না আসতে পারেন, তার সঙ্গে কথা বলতে বা ডাকতে পারেন না। তার জন্য পরিচারককে কঠোর নির্দেশ দিতে রাখতেন। সেখানে চা-কফির ব্যবস্থা থাকত। প্রয়োজন হলে সেই চা-কফি তিনি নিজেই বানিয়ে নিতেন।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে (১৮৯৯ সাল থেকে ১৯৬১ সাল)
তিনি লিখতেন সবসময় দাঁড়িয়ে। দাঁড়াতেন একটা টাইপ রাইটারের সামনে। বুক সমান উঁচু একটি টাইপরাইটার ছিল তার। তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লিখতেন। এভাবেই তার অসংখ্য উপন্যাস লিখেছেন এবং লিখে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন।

আলেক্সজান্ডার ডুমাস (১৮০২ সাল থেকে ১৮৭৯ সাল) -
তিনি লেখেন বিভিন্ন রঙের কলম দিয়ে। নীল রঙ দিয়ে যখন লেখেন সেটা হল উপন্যাস বা গল্প, গোলাপি রঙের কলমে বিভিন্ন প্রবন্ধ এবং হলুদ কলমে নানা রকমের কবিতা। এভাবেই তিনি লিখেছেন 'দি থ্রি মাসকেটিয়ার্স', 'দি কাউন্ট অফ মন্টে ক্রিস্টো' নামের বিখ্যাত বইগুলো।

ডান ব্রাউন (১৯৬৪ সালে জন্ম) -
তিনি লেখেন বাড়ির ছাদঘরে। যাকে ইংরেজিতে বলে লফ্ট। সেখানে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাজে এমন একটা ঘড়ি আছে, যা তাকে বলে দেয় কত ঘণ্টা হয়ে গেছে। তখন তিনি ওঠেন, শরীর টানটান করেন। সিট আপ এবং পুশ আপস করেন। এরপর ছাদে দুই পা দিয়ে উল্টো হয়ে নিচে ঝোলেন। এতে নাকি শরীরের রক্ত চলাচল ভালভাবে হয়। ছাদ থেকে ঝুলবার জন্য তিনি দুই পায়ে স্পেশাল বুট পরেন, যা দিয়ে তার পা ছাদে আটকে থাকে। তারপর আবার লিখতে শুরু করেন। 'দ্য ভিনচি কোড' এবং আরও কতসব বই এভাবেই লিখেছেন। 'দেয়ার আর সো মেনি থিংগস ইন হেভেন অ্যান্ড আর্থ হোরেশিও'।

হারুকি মুরাকামির (১৯৪৯ সালে জন্ম) -
তাঁর লেখার গল্প অনেকটা ডান ব্রাউনের মতো। তিনিও ভোর চারটায় ওঠেন। যখন কোনো বড় উপন্যাস লেখেন তখন এই ভোর চারটাতে ওঠা তার নিয়ম। পাঁচ-ছয় ঘণ্টা একটানা লেখেন। এরপর বিকেলে দশ কিলোমিটার দৌড়ান এবং অনেকক্ষণ সাঁতার কাটেন। এরপর ধ্যানমগ্ন হন। যাকে তিনি বলেন, - আমি নিজে নিজেকে সম্মোহিত করি এবং একেবারে অন্তরের গভীরে প্রবেশ করি। লেখার জন্য আমার এ আত্মমগ্নতা প্রয়োজন।

মায়া অ্যাঞ্জেলো (১৯২৪ সাল থেকে ২০১৪ সাল) -
তিনি সকালে ঘুম থেকে উঠে তার অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে বাইরে চলে যান। যান একটি হোটেলের ছোট ঘরে। যান সকাল সাতটায়। সাতটা থেকে বেলা দু'টো পর্যন্ত একটানা লেখেন। যাওয়ার সময় সঙ্গে নেন একটি বাইবেল, একটা প্যাকেট তাস (মাঝে মধ্যে পেশেন্স বা সলিটেয়ার খেলেন) আর এক বোতল শেরি। এইসব নেন তার লেখার সময়। এভাবেই তিনি প্রচুর লেখা লিখেছেন।
তার একটি বিখ্যাত কোটেশনের সঙ্গে আমি এক মত 'সবচেয়ে যন্ত্রণাময় সময় সেটি, যখন ভেতরে একটা অজাত গল্প ছটফট করতে থাকে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সেই গল্পকে লেখায় আকার দেওয়া না যায়।'

জেন অস্টেন (১৭৭৫ সাল থেকে ১৮১৭ সাল) -
তিনি প্রথমে একটি কাগজে নানা সব শব্দ লেখেন। যা তার মনে আসে তাই। যেমন ডার্সি । বারবার লেখেন ডার্সি ডার্সি ডার্সি। একসময় ওই ডার্সি একটা মানুষের রূপ নেয় এবং সে হয়ে যায় 'প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিসের' নায়ক। কেবল যে মানুষের নাম লেখেন তা নয়। লেখেন আরও নানারকম শব্দ। তারপর সেসব শব্দ থেকে তৈরি হয় বাক্য। তারপর সেটা হয়ে যায় একটি পূর্ণাঙ্গ বই।

আগাথা ক্রিস্টি (১৮৭৬ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল) -
তাঁর লেখার টেবিলের দুই পাশে, বই দিয়ে সাজিয়ে, দু'টি দেয়াল তৈরী করেন। একটি বইয়ের ওপরে আর একটি বই, এইভাবে।। এরপর লেখেন ওই দুই বইয়ের দেয়ালের মাঝখানে। কখনও স্নান করতে করতেও নোট দেন সেক্রেটারিকে। আবার খেতে খেতেও একই কাজ করেন তিনি।

চার্লস ডিকেন্স (১৮১২ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল) -
তিনি প্রতিদিন দশ মাইল হাঁটতেন। হাঁটতে গিয়ে ইচ্ছা করেই হারিয়ে যেতেন। যখন হারিয়ে যেতেন, তখন নাকি তাঁর মনে লেখার 'স্পার্ক' চলে আসত। এরপর যখন তিনি বাড়িতে ফিরে আসতেন। তখন লিখতে বসে যেতেন। অসংখ্য বই তিনি এই 'স্পার্ক' থেকে সৃষ্টি করেছেন। আবার লিখতে লিখতে কখনও সে লেখা জোরে জোরে পড়ে, নিজের কানকে শোনাতেন। নিজের কাছে ভালো না লাগলে ছিঁড়ে ফেলতেন নির্মোহভাবে। তারপর আবার লিখতে বসতেন প্রবল উৎসাহ নিয়ে।

কবি ওয়ার্ডস ওয়ার্থ (১৭৭০ সাল থেকে ১৮৫০ সাল) -
তিনি নাকি একটা কুকুর নিয়ে হাঁটতে বেরোতেন। জোরে জোরে আবৃত্তি করতেন তার নিজের লেখা কবিতাগুলো। যখন কুকুর চুপ করে সে কবিতা শুনত,তখন তিনি মনে করতেন বা বুঝতে পারতেন, তার কবিতা ঠিক হয়েছে। যখন কুকুর খুব ঘেউ ঘেউ করে ডেকে উঠত, তখন তিনি বুঝতে পারতেন, কবিতা কুকুরের পছন্দ হয়নি, মানে লেখাটা কিছুই হয়নি। বাড়িতে ফিরে এসে সেই কবিতাকে তিনি বদলাতেন। আবার নতুন করে লিখতেন।

জন স্টেইনবেক (১৯০২ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল) -
সব লেখাই তিনি লিখতেন পেন্সিলে। 'গ্রেপস অফ রথ' নামের বিখ্যাত উপন্যাসটি লিখতে তার ক্ষয় হয়েছিল প্রায় তিনশোটি বড় মোটাসোটা পেন্সিল। তার 'ইস্ট অফ ইডেন' লিখতেও ক্ষয় হয়েছিল ওই পরিমাণ পেন্সিল।

ব্রন্টি বোনেরা(১৮১৬ সাল থেকে ১৮৫৫ সাল),
শার্লোট (১৮১৮ সাল থেকে ১৮৪৮ সাল),
এমিলি ও অ্যান (১৮২০ সাল থেকে ১৮৪৯ সাল) -
একটা বড় ফায়ার প্লেসের সামনে বসে তিন বোন একটা টেবিলে লিখতেন। শার্লোটের চারখানা, এমিলির একটি বড় উপন্যাস, অ্যানের তিনখানা উপন্যাস সেই একই টেবিলে বসে লেখা।

শিশুসাহিত্যিক এনিড ব্লাইটন (১৮৯৭ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল) -
তিনি সকালে লিখতে বসতেন, সঙ্গে থাকত তার লাল রঙের একখানা মরোক্কান শাল। এই রঙ নাকি তাকে লেখায় উদ্দীপ্ত করত। একটা টাইপরাইটারে লিখে যেতেন একটানা। দুপুরে খেয়ে আবার লিখতে বসতেন। দিনে তিনি ছয় হাজার শব্দ লিখতে পারতেন। একবার কেউ কেউ বলেছিল, তার নাকি কিছু 'ঘোস্ট রাইটার' ( ভূত লেখক) আছে, যারা তাকে লিখে দিয়ে যান। তিনি এই সব নিন্দুকদের নামে কেস করেছিলেন এবং আদালতে জিতেও গিয়েছিলেন।

(দ্বিতীয় পর্ব)

----------------------------------------------
শীর্ষ দশজন লেখকের দশটি পরামর্শ
—-------------------------------------------

[]

লেখক হওয়ার বাসনায় খাতা কলম, নিয়ে চা-কফি গলায় ঢেলে, একটার পর একটা সিগারেট-গাঁজা ফুঁকে, মনমতো একটা লেখা লিখতে পারেন না এমন লোকের সংখ্যাও নেহাৎ কম নয়।
পৃথিবীর অনেক দেশে রয়েছে কবিতা লেখার কোর্স। এমনকি বিশ্বের অনেক বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়েও নানান ধরণের কোর্স চালু আছে সাহিত্যিক হওয়ার জন্য। খোদ কলকাতাতেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও সমরেন্দ্র সেনগুপ্তরা একবার কবিতা লেখার এমন এক কোর্স চালু করেছিলেন 'কৃত্তিবাস' পত্রিকার তরফ থেকে।
এবার দেখে নিন বিখ্যাত সব লেখকদের লেখার পিছনের অদ্ভুত সব কীর্তি-কলাপ!

১).

বিশ্ব বিখ্যাত রুশ লেখক 'লিও টলস্টয়' বলেছেন, ‌'আমি সব সময় সকালে লিখি। পরে আমি জেনে খুশি হয়েছি যে, রুশোও ঠিক একই রকম কাজ করতেন।'
সকালে সাধারণত যে কারও মন মেজাজই ঝরঝরে থাকে। সবচেয়ে ফলপ্রসূ ভাবনাটা বেশিরভাগ সময় সকালেই আসে সহজে।

২).

নিউজিল্যান্ডে বড় হওয়া ইংরেজি ভাষার ছোটগল্প লেখিকা 'ক্যাথরিন ম্যান্সফিল্ড'-এর মতে, 'অতীতে তাকিয়ে আমি ভাবি, আমি সবসময় লিখছি। যদিও অর্থহীন কথাবার্তা, কিন্তু কিছু না লেখার থেকে
অর্থহীন কথাবার্তা লেখাও অনেক ভাল।

৩).

নোবেল ও পুলিৎজার পুরস্কারে ভূষিত আমেরিকান লেখক 'উইলিয়াম ফকনার'-য়ের মতে - 'কি বলেছেন, কি লিখেছেন নিজেই তা পড়ুন,পড়ুন, পড়ুন। এবং সবকিছু পড়ুন-বাজে, ধ্রুপদী, ভালো, মন্দ, এবং কীভাবে লেখা হয়েছে তা দেখুন। ঠিক একজন ছুতোরের মতো, যে শিক্ষানবিশের কাজ করে, এবং গুরুর কাজকে অধ্যয়ন করে। পড়ুন! তবেই আপনি অনুধাবন করতে পারবেন বিষয়টা । তারপর লিখুন। লেখা ভাল হলে আপনি নিজেই বুঝবেন। আর না হলে, নির্দিধায় ডাস্টবিনে ফেলে দিন।'

৪).

ম্যান-বুকার পুরস্কার বিজয়ী ইংরেজ লেখিকা 'হিলারি ম্যানটেল'-এর মতে, 'লেখকের জন্য সবচেয়ে উপকারী স্বভাব হচ্ছে আত্মপ্রত্যয় তথা আত্মতুষ্টি লালন করা, যদি তা সামাল দিতে পারেন। আপনি নিজেকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চান, এবং সেজন্য আপনার কাজ সম্পর্কে আপনারই আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে, এমনকি যখন কেউই আপনার সাথে একমত হবে না তখনও।'

৫).

'হেমিংওয়ে'-র পরামর্শ শুনতে একটু অদ্ভুত ঠেকতে পারে, কিন্তু কি আর করা যাবে, এমন একজন লেখকের কথা তো আর উপেক্ষা করা যায় না।
তিনি বলেছেন,'গল্পটা ভাল মতো তরতর করে এগোতে থাকলে লেখা থামান এবং তা নিয়ে পরের দিন লেখা শুরু করুন। তার আগে আর লেখাটি নিয়ে কোন কিছু ভাববেন না। এতে আপনার অবচেতন মন সব সময় লেখাটি নিয়ে ভাববে। কিন্তু আপনি যদি সচেতনভাবে লেখাটি নিয়ে ভাবেন, অথবা দুঃশ্চিন্তা করেন, তবে ওটা মরে যাবে, এবং লেখার আগেই আপনার মাথা ক্লান্ত হয়ে পড়বে।'

৬).

একজন চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্র পরিচালককে ধরা যাক। আমেরিকার লেখিকা 'মিরান্ডা জুলাইয়'-এর মতে, 'প্রথম উপন্যাস লেখার সময় নিজেকে সবচেয়ে বাজে লেখক মনে হত। তখন মনে হয়নি, আমি প্রথম খসড়া লিখছি। কিন্তু প্রথম খসড়া লেখার পর মনে হতো বাকি সবকিছু তুলনামূলকভাবে সহজ কাজ।'


৭).

ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ও ছোট গল্প লেখিকা 'জাডি স্মিথ'-এর মতে, 'ইন্টারনেট সংযোগ নেই, এমন কম্পিউটারে বসে আপনাকে লিখতে হবে। যে গল্প আপনি কখনও শেষ করতে পারবেন না, তা বাদ দিন। বরং চার'শো পাতা নিন এবং প্রতিদিন একপাতা করে লিখুন।'

৮).

লেখক হওয়ার পরামর্শ দিতে গিয়ে অনুরূপ কথাই (লেখিকা জাডি স্মিথের কথাগুলি) বলেছিলেন নোবেল ও পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী আমেরিকান সাহিত্যিক 'জন স্টেইনব্যাক'।

৯).

বিশ-শতকের একজন সেরা আমেরিকান লেখক 'এফ স্কট ফিটজেরাল্ড', যার লেখনিতে জ্যাজ সংগীতের শুরুর দিককার আমেজ পাওয়া যায়। তার মতে, - 'লিখতে হলে, এটা খুবই পরিস্কার বিষয় যে, বড় কিছু বিষয় নিয়ে লিখতে গেলে কোন রকম উত্তেজক পানীয় কিংবা মদ পানকরা অবস্থায় লেখা চলবে না। তাতে ছোটগল্প হয়তো লেখা গেলেও, উপন্যাসের জন্য আপনাকে নিরন্তর মাথা খাটাতে হবে এবং এ'জন্য অবশ্যই ত্যাগ স্বীকার করতে হবে (সমরেশ বসুও এটা মনে করতেন)।

১০).

হেমিংওয়ের পরামর্শ শুনে অদ্ভুত লাগলে, 'মুরিয়েল স্পার্ক’-য়ের কথায় আপনি হয়তো ভিরমি খাবেন কিংবা কিঞ্চিত বিস্মিতও হতে পারেন। স্কটিশ ঔপন্যাসিক, ছোট গল্প লেখক, কবি ও প্রাবন্ধিক মুরিয়েলের মতে লেখক হতে হলে নাকি বিড়াল পুষতে হবে। আর তাতেই নাকি কলম দিয়ে ঝরঝর করে লেখা বেরোতে থাকবে।
'লিখতে হলে বিড়াল পুষতে হবে। একটি ঘরে বিড়ালের সাথে একা…… বিড়ালটি লেখার টেবিলে উঠে টেবিলে রাখা বাতির নিচে বসবে। বাতির আলো বিড়ালকে বেশ তুষ্ট করে। বিড়াল তখন প্রশান্ত হবে, এ প্রশান্তি দেবে অনুধাবন ক্ষমতা। বিড়ালের এ প্রশান্তি আপনাকে ধীরে ধীরে আবেশিত করবে, আপনি ফিরে পাবেন আত্ননিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা । আপনাকে শুধু সব সময় বিড়ালটির দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। মনোযোগের উপর বিড়ালের প্রভাব চমকপ্রদ, এবং রহস্যময়।'
একবার ভাবতে পারেন 'মুরিয়েল স্পার্কে-এর কথা?