কারখানার গেটের ঠিক বাইরে কৃষ্ণচূড়ার নিচে প্রতিদিনই কিছু না কিছু পড়ে থাকে। কেউ তাকায় না। শিউলিও না।
কারখানার সাইরেনটা সন্ধ্যায় বাজে।
শিউলি তখনও তাড়াহুড়ো করে না। অন্য মেয়েরা গেট পেরিয়ে যে যার বাস ধরতে ছুটে যায়; সে একটু পরে বেরোয়। ভিড় পাতলা হলে হাঁটা সহজ হয়।
গেটের পাশের চায়ের দোকানে লোকটা প্রতিদিনের মতো কেটলি নামায়। ধোঁয়া ওঠে। দু-একজন মজুর দাঁড়িয়ে চা খায়। শিউলি কখনো দাঁড়ায় না। তার পকেটে চায়ের দাম থাকে, সময়টা থাকে না। গলির মুখে পৌঁছতেই পরিচিত কণ্ঠ ভেসে আসে। — আজও একা ফিরলি? কথাটা কার উদ্দেশে বলা, বোঝার জন্য ফিরে তাকাতে হয় না।
হাঁটতে হাঁটতেই সে চাবিটা বের করে। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে প্রথমেই জানালার কপাট সরায়। সামনের কৃষ্ণচূড়াটা দেখা যায় সেখান থেকে। এখন ফুল নেই। পাতার ফাঁক দিয়ে তারের ওপর দুটো শালিক বসে থাকে। সন্ধ্যা নামলে তারা কোথায় উড়ে যায়, শিউলি কোনোদিন দেখেনি।
ঘরে জিনিসপত্র কম। একটা খাট। একটা টেবিল। টিনের আলমারির গায়ে ছোট্ট আয়না। আয়নার ডান কোণায় কালচে দাগ। কত বছর হলো, মনে নেই।
খেতে বসে সে কখনো রেডিও চালায় না। নীরবতায় ভাতের গন্ধ আলাদা লাগে।
কয়েক দিন ধরে একটা সংখ্যা তাকে অনুসরণ করছে। চৌত্রিশ।
খেতে বসে সে কখনো রেডিও চালায় না। নীরবতায় ভাতের গন্ধ তার আলাদা লাগে।
কয়েক দিন ধরে একটা সংখ্যা তাকে অনুসরণ করছে। পাশের বাসার বউটি হাসতে হাসতে বলেছিল, “তোমার জন্য আর পাত্র খুঁজবে কে?” লোকজনও হেসেছিল। সেই হাসিটা আজও কোথাও শুকায়নি।
চৌত্রিশ।
রাতে থালা ধুয়ে শিউলি আয়নার সামনে দাঁড়ায়। মুখে নতুন কিছু নেই। চোখের নিচের ছায়াটা একটু গাঢ় হয়েছে কি না, বোঝা যায় না। হঠাৎ তার মনে হয়, এতগুলো বছর ধরে সে কী নিয়ে ফিরেছে? শব্দটা ধীরে ধীরে আসে। উচ্চারণ করার পরও ঘর বদলায় না।
জানালার বাইরে একটা বাতি জ্বলে ওঠে।
পরদিন কারখানায় নতুন মেয়ে আসে। সুইয়ে সুতো পরাতে গিয়ে বারবার হাত কেঁপে যায় তার। শেষে আঙুলে ফুটে রক্ত বেরোয়। সুপারভাইজার বিরক্ত হয়ে কাপড়ের বান্ডিলটা টেবিলে ছুড়ে রাখে। কেউ কিছু বলে না। শিউলি নিজের ওড়নার কোণ ছিঁড়ে মেয়েটার আঙুলে জড়িয়ে দেয়। তারপর বান্ডিলটা নিজের দিকে টেনে নেয়। দুজন পাশাপাশি বসে।
অনেকক্ষণ শুধু মেশিনের শব্দ। ছুটির আগে মেয়েটা আস্তে করে বলে, — আপা… তারপর থেমে যায়। বাকিটুকু আর বলে না। শিউলি শুনতেও চায় না।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় কৃষ্ণচূড়ার নিচে কয়েকটা শুকনো শুঁটি পড়ে থাকতে দেখে। একটা কুড়িয়ে হাতে নেয়। বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে আসে। টেবিলের ওপর রেখে দেয়।
দুদিন পর খেয়াল করে, শুঁটিটা ফেটে গেছে। ভেতর থেকে ছোট ছোট বীজ বেরিয়ে এসেছে। কবে ফেটেছে, তার জানা নেই। জানালার পাশে বসে সে অনেকক্ষণ বীজগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে।
বাইরে বাতাস উঠেছে। ডালে ডালে পাতা নড়ছে। আয়নায় তাকালে এখনও সেই পুরোনো দাগটাই দেখা যায়।
—