আমি একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ৩, ক্ষুদ্রলেখক মোঃ রাকিবুল হাসান
আমি একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ৩, ক্ষুদ্রলেখক মোঃ রাকিবুল হাসান
ক্ষুদ্রলেখক মোঃ রাকিবুল হাসান

গল্প - আমি একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ৩, ক্ষুদ্রলেখক মোঃ রাকিবুল হাসান

ক্ষুদ্রলেখক মোঃ রাকিবুল হাসান
বুধবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৫ জীবনবাদী, বিরহ

৩. আমি একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান।
পৃথিবীর সব যুদ্ধে জেতা যায় না, কিন্তু লড়াইয়ের ময়দানে থাকতে হয়। ঠিক তেমনি আমাদের চাহিদা গুলো পূরণ হবেনা এটা জেনেও আশায় আশায় দিন পার করছি। হয়তো আল্লাহ একদিন নাহয় একদিন স্বপ্ন গুলো মেটাতেও পারে।

আব্বা বলতেন আমার যায়গা জমিন কিছুই নেই। কিন্তু শিক্ষা আছে। এটাও একটা সম্পদ। নিতান্ত গরিব হলেও সমাজের মধ্যে সবাই মান্যগন্য করে। তোরাও পড়ালেখা করবি। যতকষ্ট হোক শিক্ষার বিকল্প নেই। আমি থাকি বা নাই থাকি।

আম্মা বাবাকে বাজারের তালিকা ধরিয়ে দিয়ে বললেন বিকেলের মধ্যেই সদায় লাগবে।

আব্বার মন খারাপ হয়ে গেল, কেন মন মলিন এটা হয়তো আমার ছোট ভাই বুঝে উঠতে পারেননি। ছোট ভাই রবিউল বলে উঠলো: আব্বা আমার একটা গাড়ি আর খেলার বল লাগবে। আম্মা বাজারের তালিকায় সেটা লিখতে ভুলে গেছেন।
?? আমার খেলনা গুলো

অন্যদিকে আব্বাকে মামুন ব্যাপারি বলে দিয়েছে: মাষ্টার মশাই ১২২৯ টাকা পাওনা। এই সপ্তাহের মধ্যে পরিশোধ করবেন। যতদ্দিন পরিশোধ করবেন না ততদিনে বাজার বন্ধ। তাদের দোকান থেকে বাকি সদায় খাইতুম আমরা। আব্বা ২০ টাকায় পড়াতেন।তাও চার মাস ধরে টাকা দেয় না রাজুর বাপ। লাইজু আর কচি মধ্যবিত্ত ১৩ টাকা করে দিত। এভাবে তার টিউশনি করিয়ে মাসে ৩০০-৩৫০ টাকা পেতেন। আর স্কুল মাষ্টার হিসেবে মেম্বার সাহেব বেতন দিতেন ১৬০ টাকা। আর পাঁচ কেজি চাল।

মাষ্টার হিসেবে নয়, রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে মেম্বারের সাথে আব্বার ঘনিষ্ঠতা অতুলনীয়। মেম্বারি নির্বাচনে আব্বা বাড়ি বাড়ি ভোট চাহিয়াছিল। তার জন্য দিন রাত কষ্ট করছেন আব্বা। এজন্য আব্বা যখন অর্থনৈতিক সংকটে পরেন তখনই মেম্বারের কাছ থেকে ধার টাকা নেন। আব্বা ধার করে সংসার চালাচ্ছেন কিন্তু বাহির থেকে কাউকে বুঝতেই দিচ্ছেন না আমাদের ভিতরের অভাব অনটন। সব কিছুতে আলহামদুলিল্লাহ। অনেক ভালো রাখছেন। আল্লাহ সব দিক থেকেই আমাদের ভরপুর দিয়েছেন। এই ধরনের কথা আব্বার মুখে প্রায়ই শুনি। আসলে বিগত ছয় মাসে আমরা কেউই পেট ভরে ভাত খেতে পারেনি। আর নতুন জামা কখনোই কিনা হয় নাই। আব্বার ছাত্র-ছাত্রীদের পুরাতন পোষাক টিউশনের ফি বাবদ আনে আমাদের জন্য।

আব্বা মেম্বারের কাছে গিয়ে বললেন: মেম্বার সাহেব আমাকে ২০০ টাকা দিতে পারবেন। আমি বৈশাখ মাসে সব টাকা একত্রে পরিশোধ করবো।

মেম্বার বললেন: মাষ্টার মশাই ঘরে উঁকি না দিয়ে ওই চেয়ারে বসুন। ২০০ টাকা নিবেন সমস্যা নেই। টাকা কি এখনি লাগবে?

আব্বা বললেন: হ্যাঁ? ঘরে বাজার নেই, বাজার করতে হবে। ছোট ছেলের খেলাধুলার বয়স এখন ওর জন্য বল-টল না কিনলে কেমন দেখায়।

মেম্বার বললেন: তাতো ঠিক। কিন্তু আপনার কাছে কি হিসেবে আছে? এযবৎ কত টাকা ধার নিলেন।

আব্বা বললেন: না মেম্বার সাহেব। আপনার উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস আছে। আপনি লিখেছেন না। আর আমি মাষ্টার তো লেনদেনের হিসেব মনে থাকে। আমি ভুলি না।

মেম্বার সাহেব তার কাপড়ের ব্যাগ থেকে দুইশ টাকা দিলেন আর একটা কাগজে ধার টাকার হিসাব।

মেম্বার সাহেব বললেন: মাষ্টার মশাই এই কাগজে আপনার বিস্তারিত লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখ করা আছে। খুব দ্রুত পরিশোধ করবেন। আমার মাছের ঘেরে নতুন পোনা রেনু ছারবো।

আব্বা এতো দিন ভাবছেন মেম্বার সাহেব তাকে করজে হাসানা হিসেবে ধার টাকা দিতেন। এখন এই কাগজে সুদ সহ আসলের পরিমাণ ২৩৫০ টাকা। আব্বা গতবছর বর্ষার পানি থেকে বাঁচতে নতুন মাচা বাঁধছে মেম্বারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে। এই বছর সেই মাচা আবার ত্রুটি যুক্ত। সেখান থেকে পানি পড়ছেন।

আব্বা কোন কিছু না ভেবেই চলে আসলেন বাড়ীতে। বাজারের লিষ্ট নিয়ে বাজারে গেলেন।আব্বা যে নিজের সাথে নিজেই জীবন নিয়ে যুদ্ধ করছেন এটা তার চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। রবিউল দৌড়ে গেল বাজারের ব্যাগ এগিয়ে আনতে। আসলে উদ্দেশ্য ছিল ওর খেলার বল আর গাড়ি। তালিকায় যা যা ছিল তা থেকে সব কিছুই অল্প অল্প করে কিনলেন, কিন্তু রবিউলের বাজার দেখা যাচ্ছে না। আমি লক্ষ করলাম আব্বা সব সদায় করলেন ঠিকি কিন্তু বল আর গাড়ি কিনলেন না।

পরে পড়বো
২১৮
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন