মহিউদ্দীন ছোটবেলা থেকেই তার জীবনের পথ যেন এক অদৃশ্য হাতে আগেই লিখে রাখা ছিল—একজন ভালো আলেম হওয়া। নিজের ইচ্ছার চেয়েও এই স্বপ্নটা বেশি ছিল তার বাবা-মায়ের, বিশেষ করে তার বাবার হৃদয়ে গেঁথে থাকা এক নীরব আশা।
তার বাবা ছিলেন একজন উচ্চ শিক্ষিত মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত পদার্থে কৃতিত্বের সাথে পড়াশোনা শেষ করে তিনি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। জ্ঞানচর্চা ছিল তার নেশা। বই ছিল তার সবচেয়ে কাছের সঙ্গী। অবসর পেলেই তিনি ডুবে যেতেন বইয়ের পাতায়। অথচ ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন—তার সন্তানরা মাদ্রাসায় পড়বে। তার একটাই চাওয়া ছিল, “আমার সন্তানেরা যেন আল্লাহওয়ালা, নেককার ও আদর্শবান মানুষ হয়।”
ছেলেটি বাবার সেই স্বপ্নকে নিজের জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করল। মাদ্রাসার পড়াশোনার ভেতরেই ধীরে ধীরে তার মনে জন্ম নিল আরেকটি ভালোবাসা—লেখালেখি। কবিতা, গল্প, সাহিত্য—সবকিছুই তাকে টানত। ছাত্রজীবনে সে প্রায়ই পুরস্কার পেত, তার প্রতিভা ধীরে ধীরে আলো ছড়াতে শুরু করেছিল।
একদিন তার লেখা একটি কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত হলো। সে হয়তো ততটা গুরুত্ব দেয়নি, কিন্তু তার মা একদিন হাসিমুখে এসে বললেন,
“যেদিন তোমার কবিতাটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয় সে-ই দিন তোমার আব্বা ও কবিতটি মসজিদে বসে সবার কাছে পড়ে শুনিয়েছে। কত খুশি হয়েছে!”
এই কথা শুনে ছেলেটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার ভেতরে এক অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিল—তার ছোট্ট লেখাগুলোও তার বাবার জন্য এত বড় আনন্দের কারণ হতে পারে!
সময় এগিয়ে চলল। মাদ্রাসার পড়াশোনা শেষ করে সে বাংলা বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে শিক্ষকতার পেশায় যুক্ত হলো। জীবনের পথ কিছুটা স্থির হলো, কাজকর্মও ভালোই চলছিল।
কিন্তু হঠাৎ একদিন তার বাবা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।
ছেলেটির জীবনে নেমে এলো এক গভীর শূন্যতা। চারপাশে সবকিছু ঠিক থাকলেও ভেতরটা যেন নিঃশব্দ হয়ে গেল। যে কলম একসময় তার হাতে অনায়াসে চলত, সেই কলমই যেন কথা বলতে ভুলে গেল। লেখালেখি থেমে গেল, ভাবনাগুলো থমকে গেল।
তবুও একদিন, হঠাৎ করেই সে তার মায়ের কাছে বাবার কিছু স্মৃতির কথা জানতে চাইল। করোনা সময়ের সেই কঠিন দিনগুলোতে বাবার সঙ্গে মোবাইলে কথা হলেও শেষবার তার মুখ দেখা হয়নি। বাবাকে আর একবার চোখে দেখার সুযোগটাও হয়নি।
তার মা তখন শান্ত স্বরে বললেন,
“তোমার বাবা তোমার লেখাগুলো খুব ভালোবাসতেন…”
এই কথাটি যেন তার হৃদয়ের গভীরে গিয়ে আঘাত করল—একই সাথে এক অদ্ভুত শক্তিও জাগিয়ে তুলল। মনে হলো, বাবার সেই নীরব ভালোবাসা আজও তাকে ডাকছে।
সে আবার কলম তুলে নিল। ধীরে ধীরে পুরোনো স্বপ্নগুলো নতুন করে জেগে উঠল। কবিতা, ছড়া, গল্প, ইসলামিক বিষয় ভিত্তিক প্রবন্ধ—সবকিছুতেই সে আবার নিজেকে খুঁজে পেল। একে একে তার লেখা প্রকাশ পেতে লাগল পত্রিকায়। পরে তার বইও প্রকাশিত হলো, স্থান পেল বাংলা একাডেমি বইমেলায়। মানুষ তাকে একজন লেখক হিসেবে চিনতে শুরু করল।
তবুও প্রতিটি নতুন অর্জনের মুহূর্তে, প্রতিটি প্রশংসার শব্দে তার চোখ ভিজে ওঠে। মনে পড়ে যায় সেই মানুষটিকে, যিনি নিঃশব্দে তার প্রতিটি সাফল্যে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেতেন।
রাতের নীরবতায়, সিজদায় মাথা রেখে সে ফিসফিস করে বলে ওঠে—
“আব্বা, তুমি যদি আজ থাকতে… কত খুশি হতে…”
তারপর চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে দোয়ার ভেতর—
“হে আল্লাহ, আমার এই সামান্য কাজগুলো আমার বাবার জন্য নেকি হিসেবে কবুল করুন। আমার বাবাকে আপনি ক্ষমা করে দিন… আমিন।”

মন্তব্য করতে ক্লিক করুন