বৃদ্ধ মানুষটি প্রতিদিন বিকেলে জানালার পাশে বসতেন, ঠিক যেখানে রোদ এসে দেয়ালে তাঁর ছায়া ফেলত। ছায়াটা লম্বা হতো, খাটো হতো, কখনো একেবারে মিলিয়ে যেত মেঘের আড়ালে। কখনো কখনো তাকিয়ে থাকতেন সেই ছায়ার দিকে, যেন তার সাথে তাঁর কোনো পুরনো বোঝাপড়া বাকি আছে।
নাম ছিল তাঁর নবীন—
একটা নিষ্ঠুর রসিকতার মতো, কারণ এখন তিনি আর নবীন নন; এখন আটাত্তর। তেপান্ন বছর আগে এই একই ঘরে তিনি প্রথম কবিতা লিখেছিলেন; প্রথম প্রেমে পড়েছিলেন, প্রথম হারিয়েছিলেন কাউকে। এখন সেই সবকিছুই তাঁর কাছে মনে হয় অন্য কারো জীবনের গল্প—যেন তিনি শুধু পড়েছেন, বাঁচেননি।
একদিন বিকেলে, ছায়াটা যখন দেয়ালে দুলছিল বাতাসে পর্দার সাথে, তিনি হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলেন, “তুমি কি এখনো আমাকে চেনো?”
ছায়া উত্তর দিল না, কারণ ছায়ারা কথা বলে না। কিন্তু নবীনের মনে হলো, ছায়াটা যেন একটু কেঁপে উঠল, যেমন কোনো পুরনো বন্ধু কেঁপে ওঠে যখন তাকে এমন প্রশ্ন করা হয় যার উত্তর সে নিজেও জানে না।
তিনি ভাবলেন তাঁর জীবনের কথা— কতবার তিনি নিজেকে বদলে ফেলেছেন প্রয়োজনে, কতবার নিজের কণ্ঠস্বর চাপা দিয়েছেন অন্যের প্রত্যাশার নিচে। যে মানুষটা প্রথম কবিতা লিখেছিল, আর যে মানুষটা এখন জানালার পাশে বসে আছে—তারা কি সত্যিই একই মানুষ? নাকি একজন আরেকজনকে শুধু বহন করে নিয়ে বেড়াচ্ছে, যেমন গাছ তার পুরনো বাকল বহন করে?
তিনি উঠে দাঁড়ালেন, দেয়ালের কাছে গিয়ে হাত রাখলেন নিজের ছায়ার উপর। ঠান্ডা দেয়াল, উষ্ণ হাত। কোনো মিলন হলো না। শুধু আলোর অনুপস্থিতি; নিজের শরীরের একটা প্রমাণ যে- সে এখনো আলোর পথে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হলো, হয়তো এটাই উত্তর। ছায়া তাঁকে চেনে না; কিছু নেই সেখানে ধরে রাখার মতো। শুধু সাক্ষী। প্রতিদিন বদলায়, প্রতিদিন নতুন করে জন্ম নেয় আলোর কোণ বদলানোর সাথে সাথে। মানুষও হয়তো তেমনই— প্রতিদিন নতুন, প্রতিদিন কিছুটা অচেনা, তবু একই আলোর নিচে দাঁড়িয়ে।
নবীন জানালার পাশে ফিরে বসলেন। বাইরে সূর্য নামছিল ধীরে, আর তাঁর ছায়া লম্বা হতে হতে মিশে যাচ্ছিল ঘরের অন্ধকারে। তিনি আর প্রশ্ন করলেন না। শুধু দেখলেন, যেভাবে একজন মানুষ দেখে তার নিজের জীবনকে শেষবারের মতো নয়, বরং প্রতিবারের মতো— নতুন করে, অথচ চেনা চোখে।
তিনি মনে মনে ভাবছেন। স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা করাটাই ভুল ছিল। জীবন তো নদীর মতো বহমান— একই জলে দুবার পা রাখা যায় না, কিন্তু নদীটা তবু একই নাম বহন করে চলে। তিনিও হয়তো তেমনই এক নাম; এক ছায়া; যে প্রতিদিন নতুন আলোয় নতুন করে আঁকা হয়।
জানালার বাইরে সন্ধ্যা নামল। ঘর অন্ধকার হলো। আর তাঁর ছায়া, যে এতক্ষণ দেয়ালে ছিল তাঁর সঙ্গী, ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল সেই অন্ধকারেই— যেভাবে সব প্রশ্ন একদিন মিলিয়ে যায় উত্তরের মধ্যে; নীরবে; কোনো ঘোষণা ছাড়াই।