সভ্যতা: দেখ বিবেক, একদিন মানুষ নগ্ন হয়ে বা পশুর চর্ম পরে পাহাড়-জঙ্গলের গুহায় বাস করত। ফলমূল, গাছের কন্দ, কাঁচা মাছ-মাংস বা ঝলসে খেত। রোগব্যাধির চিকিৎসা ছিল না; যখন-তখন মানুষের মৃত্যু হতো। কোনো সুশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থা ছিল না।

বিবেক: হ্যাঁ, এখন মানুষ সুবিশাল অট্টালিকা গড়েছে; চোখধাঁধানো রাস্তাঘাট, শহর-বন্দর গড়েছে। রকমারি খাবার, পানীয় এবং চিকিৎসার অনেক উন্নতি হয়েছে। মানুষের কষ্টের লাঘব হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তবুও মানুষ অমর হয়নি। মানুষের আয়ু বরং কমেছে আর রোগব্যাধি অনেক বেড়েছে। শুধু দূষণ আর মরণব্যাধিতেই লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে। সুশৃঙ্খল সমাজের কথা বলছ, কিন্তু সেই শৃঙ্খলার আড়ালে মানুষ আজ আরও বেশি অন্যায়-অত্যাচার করছে—ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রজীবনে সমানভাবে। গ্রামে বা গোটা দেশে যারা শক্তিশালী, তারা নিজেদের লিপ্সা পূর্ণ করতে দুর্বলদের ওপর সব রকমের অন্যায় করছে। রাষ্ট্রজীবনেও শক্তিশালী দেশগুলি দুর্বল দেশকে বাধ্য করছে তাদের অন্যায় ইচ্ছা মানতে।

সভ্যতা: আমরা চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করব এবং সব রোগের সফল চিকিৎসা নিয়ে আসব। কোনো মানুষ যেন বিনা চিকিৎসায় না মরে, সেই ব্যবস্থা করব। গণতান্ত্রিক উপায়ে যতটা সম্ভব সমাজ সুশৃঙ্খলভাবে আইনের শাসনে চলবে; বাকিটা তো মানুষের ইচ্ছা।

বিবেক: কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, কোনো রোগের প্রতিষেধক এলেও রোগের জীবাণু নতুন করে অভিযোজিত হচ্ছে; আবার নতুন প্রতিষেধক খুঁজতে হচ্ছে। এটা যেন এক পা এগিয়ে দুই পা পেছানো। আমাদের কি মূলে গিয়ে দেখা উচিত নয়? আর আইন থাকলেও সদিচ্ছা না থাকলে মানুষ অত্যাচারিত হবে আইনের দ্বারাই। মূলে গিয়ে দেখলে দেখা যাবে—আইন আছে, মনে হচ্ছে আইন দ্বারা ন্যায়বিচার দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু আসলে লোকদেখানো উপায়ে দুর্বলদের ঠকানো হচ্ছে। সদিচ্ছা আর সমর্থ না থাকলে কেউ বিচার পায় না, নিজের অধিকার পায় না।

সভ্যতা: রোগ হবে, প্রতিষেধক আসবে—এভাবেই চলবে। কোনোদিন এমন সময় আসবে বলে মনে হয় না যখন কোনো রোগ থাকবে না, কিন্তু সব রোগের চিকিৎসা আমরা আনবই। যদিও মূল কারণটি জেনে এগোলে সমাধান তাড়াতাড়ি হবে।

বিবেক: মূল কারণটি আমার মনে হয় মানুষের জীবনযাত্রা। সেটা যদি সঠিক হয়, তবে অনেক রোগব্যাধি ও সামাজিক সমস্যা কমে যাবে অথবা একেবারে সমাধান হয়ে যাবে। আর সেটা করতে গেলে প্রথমে মানুষকে ভাবতে হবে—উন্নতি কী? বাঁচার লক্ষ্য কী?

সভ্যতা: উন্নতি মানে তো নতুন নতুন উদ্ভাবন, যা দিয়ে মানুষের কষ্ট লাঘব করা যায়। সম্পদ বৃদ্ধি পায়, জীবন সহজ হয় এবং মানুষ সুখী হয়। জীবনকে ধন-সম্পদ ও প্রাচুর্যে উপভোগ করে সুখী হওয়াই লক্ষ্য। আজকের দিনে মানুষ পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে কত তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাচ্ছে! মহাকাশে যাচ্ছে, অন্তরীক্ষের খবর এনে দিচ্ছে। সমস্যার সমাধান কত দ্রুত হয়ে যাচ্ছে!

বিবেক: মানুষের সুখ সম্পদের প্রাচুর্যে নয়; কতটুকু ভোগ করলাম তার ওপর জীবনের সুখ নির্ধারণ হয় না। অনেক প্রাচুর্যে বেশি ভোগ করতে গিয়েও মানুষ নিজের জীবন বিপর্যস্ত করে তুলছে। অর্থ আছে কিন্তু ভাবার সময় নেই—কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ। একটা উৎকট ভোগের নেশায় পড়ে মানুষ মাদক বা অন্য কিছুর কবলে জীবন নষ্ট করছে। অনেকে মানসিকভাবেও রোগগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে। আর যাদের প্রাচুর্য আছে, তারা সাধারণ মানুষকে মিথ্যে মোহের পথ দেখিয়ে তাদের সরল জীবনকে অসুখী করে তুলছে। সরল গরিব লোকেরা মিথ্যে প্রাচুর্যের লোভে এক মরিচীকার পেছনে দৌড়ে জীবনকে আরও কষ্টকর করে তুলছে। অনেকটা এক মোটা অন্ধ যেমন আরেক লিকলিকে অন্ধকে হাতি চেনানোর চেষ্টা করছে!

সভ্যতা: দেখো, বাঁচতে গেলে অর্থ চাই; আর যত সুখ চাও, ততই অর্থের প্রয়োজন। তাই আজকের দিনে মানুষকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। দেখছ না, জাপানিরা খাওয়া-দাওয়া বা আরামে যতটা সময় দেয়, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় দেয় কাজে, অর্থ উপার্জনে।

বিবেক: আচ্ছা বলো তো, বাঁচতে গেলে আসলে কী চাই? আমার তো মনে হয়—পেটের অন্ন, পরনের কাপড় আর বাসস্থান। এর সাথে সঠিক শিক্ষা থাকলেই মানুষ নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সব তৈরি করে নিতে পারে। কিন্তু সকলেই যদি বাড়ি-গাড়ি ও বিলাস বহুল জীবনের লক্ষ্যে দৌড়ায়, সেটা কি সবাই পায়? সারা জীবন খাটার পরেও কেউ হয়তো ভালো খাবার পায় না; সুন্দর বাড়ি আর বিলাসিতা তো অনেক দূরের কথা। তাহলে কি আমরা লোকেদের একটা মিথ্যা জগতে, মিথ্যা প্রতিযোগিতায় ঠেলে দিচ্ছি না?

সভ্যতা: মানুষকে যদি বলা যায় কোনো রকমে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকো, বেশি চেষ্টা করো না—তবে তো কেউ কাজ করবে না। সরকার যদি সবকিছু বিনামূল্যে দেয়, তবে মানুষের উদ্যম হারিয়ে যাবে এবং সমাজ অলস ও স্থবির হয়ে পড়বে।

বিবেক: না, অলস কেন হবে? মানুষ কঠোর পরিশ্রম করেই বাঁচবে, কিন্তু মিথ্যা লক্ষ্য নিয়ে নয়। কঠোর পরিশ্রম করলাম কিন্তু একটি ভুল লক্ষ্য নিয়ে—তাহলে দিনের শেষে মনে কেবল দুঃখই আসবে। তার থেকে মানুষ বিভ্রান্ত হবে, ক্ষোভ উগরে দিতে গিয়ে বিভিন্ন অন্যায় কাজে জড়িয়ে পড়বে। অসুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানুষের মনকে উত্তেজিত করে সংঘাত সৃষ্টি করছে।

সভ্যতা: প্রতিদ্বন্দ্বিতা তো সমাজ ও রাষ্ট্রকে উন্নতির চরম শিখরে নিয়ে যায়। তার উদাহরণ অনেক আছে।

বিবেক: প্রতিদ্বন্দ্বিতা উন্নতির উপাদান হতে পারে, যদি তা লোকহিতৈষী হয়। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি শুধু নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন করে দুর্বলকে পদদলিত করার জন্য হয়, তবে সংঘাত অনিবার্য। আর এই সংঘাত জীবনকে বিপন্ন করে তুলবে। আজকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দেশগুলি অন্যকে দমিয়ে রাখার প্রতিযোগিতায় নেমে গোটা পৃথিবীর অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলেছে।

সভ্যতা: না, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যে এগিয়ে থাকে, সে-ই পৃথিবী ভোগ করবে। সবাই তাকেই সর্বশ্রেষ্ঠ মেনে নেবে। যুদ্ধে কেউ তাকে হারাতে পারবে না।

বিবেক: যুদ্ধে কেউ জয়ী হয় না। যুদ্ধ করা উচিত কেবল অন্যায়কারীকে বিরত করে শাস্তি দানের জন্য। যদি আজ সর্বব্যাপী যুদ্ধ হয়, কেউ কি বাঁচবে? যার হাজার হাজার অ্যাটম বোমা আছে সে-ও যেমন ধ্বংস হবে, যার হাতে একটি ছুরিও নেই সে-ও ধ্বংস হবে। তোমার কী মনে হয়?
সভ্যতা: দেখো বিবেক, তুমি শুধু নেতিবাচক দিকগুলোই দেখছো। আজ মানুষ মহাশূন্যে বসতি গড়ার স্বপ্ন দেখছে। রোবট আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাজকে আরও নিখুঁত করে দিচ্ছে। একসময় যে কাজ করতে হাজার শ্রমিকের রক্তজল করা পরিশ্রম লাগত, আজ একটি যন্ত্র তা নিমিষেই করে দিচ্ছে। মানুষ এখন আরও বেশি অবসর পাচ্ছে চিন্তা করার জন্য।

বিবেক: তুমি যাকে 'অবসর' বলছ, আধুনিক মানুষ তাকে 'একাকীত্ব' আর 'অবসাদ' হিসেবে অনুভব করছে। শ্রম লাঘব হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের হাতের দক্ষতা আর সৃজনশীলতা কি মরচে ধরছে না? আজ মানুষ যন্ত্রের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে, যন্ত্র বিকল হলে মানুষের নিজের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ে। তুমি যাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বলছ, তা কি মানুষের নিজস্ব বিচারবুদ্ধিকে অলস করে দিচ্ছে না? আজ মানুষ যন্ত্রকে বুদ্ধিমান করতে গিয়ে নিজেই যন্ত্রের দাসে পরিণত হচ্ছে।

সভ্যতা: কিন্তু প্রযুক্তির এই গতি তো থামানো সম্ভব নয়। আজ ইন্টারনেটের মাধ্যমে সারা বিশ্বের জ্ঞান মানুষের হাতের মুঠোয়। তথ্যের এই অবাধ প্রবাহ কি মানুষকে আরও সচেতন করছে না? আজ মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের অবিচার বা দুর্ঘটনার খবর পৌঁছে যাচ্ছে সবার কাছে।

বিবেক: তথ্য আর জ্ঞান এক জিনিস নয়, সভ্যতা। মানুষের কাছে আজ তথ্যের পাহাড় আছে, কিন্তু সেই তথ্যকে মঙ্গলের কাজে লাগানোর মতো প্রজ্ঞা বা 'উইজডম' কমে গেছে। তথ্যের এই জোয়ারে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ আজ পাশের বাড়ির প্রতিবেশীর চেয়ে হাজার মাইল দূরের এক ভার্চুয়াল বন্ধুর সাথে বেশি সময় কাটাচ্ছে। পর্দার ওপারের জগতের মোহে আমরা রক্ত-মাংসের মানুষের স্পর্শ আর মমতা হারিয়ে ফেলছি। সম্পর্কের এই যান্ত্রিকতা কি মানুষের হৃদয়ে মরুভূমি তৈরি করছে না?

সভ্যতা: পরিবর্তনই প্রকৃতির নিয়ম। আমরা পুরোনো ধ্যান-ধারণা আঁকড়ে ধরে বসে থাকতে পারি না। আজ পরিবেশ রক্ষায় আমরা সবুজ শক্তি (Green Energy) ব্যবহার করছি, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি আনছি। পৃথিবী যদি দূষিত হয়, তবে আমাদের কাছেই তো তার প্রতিকার আছে।

বিবেক: প্রতিকার করার চেয়ে ধ্বংস না করা কি বেশি বুদ্ধিমানের কাজ নয়? তুমি একদিকে বন উজাড় করে শহর গড়ছ, আবার সেই শহরে কৃত্রিম অক্সিজেন সিলিন্ডার বিক্রি করছ—একে কি উন্নতি বলে? সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে, হিমবাহ গলছে—এসবই তো তোমার এই লাগামহীন উন্নতির ফল। প্রকৃতিকে শাসন করার চেষ্টা না করে যদি প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলতে পারতে, তবে আজ কোটি কোটি মানুষকে আশ্রহীন হওয়ার ভয় পেতে হতো না।

সভ্যতা: মানুষ তো অপরাজেয়। আমরা মঙ্গলে ঘর বাঁধব, প্রয়োজনে অন্য গ্রহে চলে যাব। বিজ্ঞানের জয়যাত্রা কেউ থামাতে পারবে না।

বিবেক: অন্য গ্রহে যাওয়ার আগে নিজের এই সুন্দর গ্রহটাকে নরক বানিয়ে ফেললে লাভ কী? তুমি যেখানেই যাও, তোমার লোভ আর অহংকারকে তো সাথেই নিয়ে যাবে। যদি নিজের মনের অন্ধকার না ঘোচাতে পারো, তবে অন্য গ্রহকেও একদিন এই পৃথিবীর মতোই ধ্বংসস্তূপে পরিণত করবে। মনে রেখো সভ্যতা, বিজ্ঞান হলো একটি তলোয়ার—তা দিয়ে যেমন আপেল কাটা যায়, তেমনি মানুষের গলাও কাটা যায়। সেই তলোয়ারটি কার হাতে আছে এবং তার বিবেক কতটা জাগ্রত, সেটাই আসল প্রশ্ন।

সভ্যতা: (কিছুক্ষণ নীরব থেকে) তাহলে কি তুমি বলতে চাও আমাদের এই এত বছরের সাধনা বৃথা? আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই?

বিবেক: বৃথা হবে না, যদি তুমি একটু থামতে শেখো। উন্নতির দৌড় যদি বিনাশের দিকে হয়, তবে সেই দৌড়ে প্রথম হওয়ার চেয়ে পিছিয়ে থাকাই ভালো। বিজ্ঞান হোক মানুষের সেবক, মালিক নয়। প্রাচুর্যের চেয়ে প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দাও। যখন তোমার প্রতিটি উদ্ভাবনের পেছনে ব্যক্তিগত মুনাফা নয়, বরং পৃথিবীর প্রতি প্রতিটি প্রাণের প্রতি মমতা থাকবে—সেদিন তুমি আর আমি আলাদা হবো না। সেদিনই হবে সত্যিকারের 'সু-সভ্যতা'।