কালান্তরে
– অমরেন্দ্র সেন
এক সময়ে বাধা ছিলেম
একটি লম্বা সুতোয়—তুমি আর আমি।
দাওয়ায় গল্প-হাসি-ঠাট্টার ফাজলামি,
কানে কানে অকারণে ঘরের কোণে—
কত ফিসফিস—দেওয়ালে আজ নেই তার হদিস।
ডালে নুন ভুলে গিয়ে নাওবা দিলে,
হেলেদুলে পোড়া ভাত দিয়ে গেলে—
কিছু মনে হতো না;
বুড়ো হয়ে ছিলেম সুখের মোহিনী কুঁড়েঘরে,
জীবনটা সন্ধ্যার বাতাসের মতো ছিল ফুরফুরে।
মনের বিষ যত হয়েছিল নির্বিষ,
ছুঁচো গেলা হতো বিনা হিসহিস;
গর্তে সাপ ছিল শীতঘুমে নিয়ে,
পাশে ব্যাঙ থাকলেও খায় না চিবিয়ে?
চৈত্রের তেজ ভীষণ তুখোর,
ফণা দেখা গেলেই চিত্র পরিষ্কার।
গোখরোর মাথায় বিষ্ণুর পা—
এক খোঁচাতেই অগ্নিশর্মা।
ঘরে বিষহীন, দন্তহীন—
হেলে দোলা চলা হেলে;
জাদুঘরে ঘুরে জাদু বলে,
হয়ে গেল এক শাঁখামুটি!
মুখে বিষ নিয়ে দাঁড়ায়,
ফণা ধরে আছে শক্ত খুঁটি।
আঁধারে লালিত বিষধর সাপ,
মাথার বিষ সেরিব্রালের শিরীষ—
জ্যৈষ্ঠের বাতাসে ঝাঁঝালো কুরিশ
ভুলিয়ে দেয় কেবা কার বাপ!
পুরুষের ক্ষমতা আর এর বেশি কী?
নারীর ইচ্ছা তো সেই ক্লিওপেট্রার হাসি—
মধ্যম আয় পেটে-ভাতে সুখে থাকা যায়—
সুখের জন্যে বেশি কি আর আছে কোথায়?
সুখ কিছুই নয়, সে এক বিশেষ বিস্ময়—
সুখের চাঁদ ডুবে থাকে অবচেতনার অন্ধকারে,
খোঁজ মেলে না সরিয়ে মেঘ, মনের অচিন পারে।
যোগ্যতা দিয়ে মানুষের জীবনের আয়,
মান-সম্মান-প্রতিপত্তির ভাগ্য সবার নয়;
শুধু বেঁধে রাখে বিনা পয়সার ভালোবাসা—
এই পৃথিবীটাকে ঘরে-বাইরে—
লক্ষ কোটিতে সে তো কেনা যায় না,
পড়ে পেয়ে পথে কেউ কেউ বোঝে না।
সাপের বিষটার ক্রিয়া-বিক্রিয়া
বন্ধ করে মাথায় হৃদয়ের ক্রিয়া—
উচিত-অনুচিত হয়ে যায়।
মানুষের মন তো—
কখন কী পেতে চায়?
ছেলেকালে বাপের দেওয়া লজেন্স কত যে সুখের,
কালান্তরে ব্যাটা বাপ হলে সেই আনন্দ শুধু তুচ্ছের।
প্রেমের প্রথম দিনে পাওয়া বুনো ফুল,
অতি বোকা ঢেমনিও খুঁজে পায় না কূল—
কোন চাঁদে গিয়ে রাখবে লুকিয়ে স্বপ্নের সাধ?
আবার সন্ধ্যার কিনে আনা দামি পারিজাত
শুকিয়ে যায় টবের খাঁচায়—জটিল পরমাদ।
হেলের বিষ আর আমার পুরুষত্ব সেই —
ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব দুই মেরুর পৃথিবীতে,
ধীরে ধীরে একদিন ছিঁড়ে যায় অজান্তেই
লম্বা সুতোটি ছোট হতে হতে।

মন্তব্য করতে ক্লিক করুন