বাপন মান্না

গল্প - ফার্স্ট

বাপন মান্না
বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ছোটদের, জীবনবাদী

কিরে মদন, রেডি হয়েছিস?
— হ্যাঁ, এই তো, আসছি রে, একটু দাঁড়া।
ঘর থেকে বেড়িয়ে মদন তপনের সাথে স্কুলের পথে রওনা দেয়। তারা দুজনেই সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। তারা দুজনেই খুব ভালো বন্ধু। তারা দীনবন্ধু হাই স্কুলের ছাত্র। হাঁটতে হাঁটতে তারা স্কুলে পৌঁছে যায়। স্কুলে ঢোকার মুখে আনন্দ স্যারের সঙ্গে তাদের দেখা হয়। মদন এবং তপনকে দেখে আনন্দ স্যার বলেন — ‘সামনেই তো তোদের পরীক্ষা। ভালো করে প্রস্তুতি নে। আর হ্যাঁ, মদন, তোকে কিন্তু এবছর ফার্স্ট হতেই হবে।’ এই কথা বলে দুজনের মাথায় হাত বুলিয়ে আনন্দ স্যার চলে যায়।
আসলে স্কুলের সকল শিক্ষক-শিক্ষিকাই মদনকে খুব ভালোবাসে। সে বরাবরই ভালো রেজাল্ট করে। এ বছর সে থার্ড হয়েছে। তবুও সবাই চায়, সে যেন ফার্স্ট হয়। কারণ সে যে রতন মন্ডলের ছেলে। রতন মন্ডল হল দীনবন্ধু হাই স্কুলেরই একজন শিক্ষক। তার ওপরে রতনবাবুর বাবা ওই স্কুলটি প্রতিষ্ঠার পিছনে অনেক অবদান রেখেছিলেন। তিনি অর্থ ও শ্রম দুটোই তিনি দিয়েছিলেন। কারণ তিনি চেয়েছিলেন, এই গ্রামে একটা হাই স্কুল গড়ে উঠুক। এই গ্রামের বাচ্চাদের যাতে দূরে অন্য কোনো স্কুলে যেতে না হয়, সেইজন্য তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। সেই মহান মানুষের নাতি বলে কথা। ভালো রেজাল্ট তো তাকে করতেই হবে। তা যেকোনো প্রকারেই হোক না কেন।
স্কুল ছুটি হতে মদন এবং তপন দুজনে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরতে থাকে। এমন সময় পথের ধারে দেখতে পায় — ভূতো একটা কুকুরছানাকে মারছে, আর হাসছে। কুকুরছানাটার পায়ে আঘাত লাগার ফলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। এটা দেখে মদনের মনে খুব কষ্ট হয়। সে ভূতোর সাথে ঝগড়া করে কুকুরছানাটা তাদের বাড়ি নিয়ে যায়। মা বকতে পারে ভেবে, সে কুকুরছানাটাকে সদর দরজার কাছে এক জায়গায় লুকিয়ে রাখে। তারপর বন্ধুকে টা-টা বলে নিজের বাড়ি ঢোকে। মদন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে মদনের মা বলে – ‘খোকা, হাত-মুখ ধুয়ে আয়, আমি তোর জন্য ভাত বাড়ছি।’ ভাত খেতে খেতে তার মনে পড়ে সেই কুকুরছানাটার কথা। তাই সে বেশি করে ভাত মাখিয়ে মাকে বলে – ‘এত ভাত আমি খেতে পারব না। আমার পেট ভরা আছে। মাখানো ভাতটা ফেলে না দিয়ে দরজার কাছে থাকা কুকুরছানাকে দিয়ে দিই।’ তার মা এতে সম্মতি জানায়। সেইমতো মদন তার ভাতের বাকি অংশটা কুকুরছানাটিকে দেয়। কুকুরছানাটাও প্রথমে ভয় পেলেও পরে বশ্যতা স্বীকার করে।
সন্ধ্যায় মদন হাত-পা ধুয়ে পড়তে বসে। বাবা বাইরে থেকে এসে দেখে মদন বই পড়ছে। বাবা খুশি হয়। কাছে গিয়ে বলে, এবছর তোকে ফার্স্ট কিন্তু হতেই হবে। এটা আমার মান-সম্মানের ব্যাপার। না হলে সবাই বলবে, মাস্টারের ছেলে হওয়া সত্ত্বেও ফার্স্ট হতে পারল না। লোকে হাসবে। তাই তোকে কিন্তু ফার্স্ট হতেই হবে। ভালো করে মন দিয়ে পড়্। কথাগুলো মদনের মাথায় চাপ সৃষ্টি করল। পড়া থামিয়ে মদন কিছুক্ষণ ভাবল — ‘তাকে ফার্স্ট হতেই হবে, আমার ওপরে বাবার সম্মান নির্ভর করছে। তাই আমাকে সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করতে হবে।’
কিছুদিন পর পরীক্ষা শুরু হল। পরীক্ষা ভালো হল মদনের। কিন্তু ফলাফলের দিন দেখা গেল — মদন ফার্স্ট হতে পারেনি। তাই সে খুব কষ্ট পেল। তার রেজাল্ট দেখে দু-একজন স্যার তাকে বলল — ‘এবছরও পারলি না! তোকে দিয়ে আর হবে না।’ স্যারেদের এমন কথা শুনে মদন আরও বেশি দুঃখ পেল। বাড়ি ফেরার পথে রোহিতের মায়ের সাথে দেখা। উনি মদনকে দেখে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। এটা দেখে মদনের খুব রাগ হচ্ছিল। বাড়ি ফিরতেই মা রেজাল্ট দেখে বলে, ‘অমন বাবার ছেলে হওয়া সত্ত্বেও তুই তোর বাবার সম্মান রাখতে পারলি না। কি ছেলে রে তুই!’ মদন আর কষ্ট চেপে রাখতে পারছিল না। দুচোখ ভরে জল বেরিয়ে আসতে লাগল। তবুও তার মা বলতে লাগলো — ‘ন্যাকা কান্না কেঁদে কি হবে! ফার্স্ট হওয়ার জন্যে তো আর বই পড়িস নি।’ কাঁদতে কাঁদতে মদন ভাবছিল — ‘সে সারাটা বছর শুধু নিজের পরিবারের সম্মানের কথা চিন্তা করেছে। ফার্স্ট হওয়ার জন্যেও সে অনেক চেষ্টা করেছে। তবুও দুই নম্বরের জন্য রোহিত ফার্স্ট হয়ে গেল। কিন্তু কেউ এটা জানত না যে, রোহিত প্রতিটা পরীক্ষায় টুকলি দেখে লিখত। তাই সে দুটো নম্বর বেশি পেয়ে ফার্স্ট হয়েছে। তবুও সে সবাইয়ের কাছে খুব ভালো। আর আমি সবাইয়ের কাছে খারাপ, খুব খারাপ।’ মদন এই কথাগুলো ভাবতে ভাবতে কান্না তার থামতে চাইছিল না। অনেক পরে তপন এসে তাকে জোর করে খেলতে নিয়ে যায়।
এই ঘটনার বেশ কিছু দিন পরে স্কুলে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা শুরু হয়। সেই ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় মদনও অংশ নেয়। মা বাড়ি থেকে বলে দেয়, ‘দেখ্, পড়াশোনায় তো ফার্স্ট হতে পারলি না! অকম্মার ঢেঁকি! যদি পারিস অন্তত খেলায় ফার্স্ট হওয়ার চেষ্টা করিস।’ মায়ের এই কথা মদনের বুকে তীরের ফলার মতো গাঁথে। তার মনে পড়ে যায় আগের ঘটনা। তাই সে মনে মনে জেদ করে — তাকে যেকোনো ভাবেই হোক খেলাতে অন্তত ফার্স্ট হতেই হবে। সে এটাকে একটা সুযোগ হিসেবে ভাবে। তাই সে মনটাকে দৃঢ় করে স্কুলের খেলার মাঠে পৌঁছায়। কিছুক্ষণ পরেই ১০০ মিটার দৌড়ে তার নাম মাইকে অ্যানাউন্স হয়। সে ট্র্যাকে দাঁড়ায় আর ভাবে — ‘ফার্স্ট তাকে হতেই হবে।’ বাঁশির আওয়াজে দৌড় শুরু হয় কিন্তু মদন ফার্স্ট হতে পারে না। মদন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্যতম ছেলে হিসেবে নিজেকে মনে করছিল। সে এবারেও ফার্স্ট হতে পারল না। আর একটাই সুযোগ আছে — ২০০ মিটার দৌড়। আরও বেশ কিছুক্ষণ পরে সেটাতেও মদনের নাম অ্যানাউন্স হল। মদন আবার ট্র্যাকে দাঁড়াল। সে ট্র্যাকে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল — তার জন্যই তার বাবা-মায়ের মাথা হেঁট হচ্ছে, তার জন্যই তারা কারো কাছে কোনো কথা গর্ব করে বলতে পারে না। এমন ছেলে হয়ে পৃথিবীতে থেকে কি লাভ! তাই জীবন দিয়ে হলেও সে এবারে ফার্স্ট হতে চায়। আবারও বাঁশি বাজল, আবারও সে দৌড় শুরু করল। আগের থেকে অনেক বেশি গতি নিয়ে। সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে আরও জোরে দৌড়াতে লাগল। তার বাবা-মায়ের যোগ্য সন্তান হওয়ার জন্য তাকে ফার্স্ট হতেই হবে — এই কথা ভেবে সে আরও গতি বাড়াতে লাগল। ঝড়ের গতিতে দৌড়াতে গিয়ে, নিজেকে যোগ্য সন্তান প্রমাণ করতে গিয়ে সে পা জড়িয়ে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তার নাক মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরোতে লাগলো। সবাই খেলা থামিয়ে তার কাছে দৌড়ে আসল। তার বাবাও দৌড়ে আসল। মাকে খবর দেওয়া হল। ডাক্তারকে খবর দেওয়া হল। স্কুলের পাশেই ডাক্তারখানা। ডাক্তার আসল। তার মাও আসল। ডাক্তার দেখে বলল, ‘মাথায় প্রচন্ড আঘাত পেয়েছে। তাই তার আর বেশি সময় নেই।’
‌‌ মদনের মা পাগলের মতো দৌড়ে এসে মদনকে বুকে নিয়ে অঝর ধারায় কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, ‘তোর কি হয়ে গেল রে, বাবা! এত জোরে দৌড়ানোর কি দরকার ছিল? মদন আধো আধো চোখে বলতে লাগলো, ‘আমি ফার্স্ট হওয়ার জন্যে দৌড়াচ্ছিলাম, মা। ফার্স্ট আমাকে হতেই হবে। আমি তোমাদের যোগ্য সন্তান হওয়ার জন্যে দৌড়াচ্ছিলাম, মা।’ মদনের বাবা অশ্রুসজল চোখে বলল, ‘তুই চুপ কর, বাবা, তুই চুপ কর্। আমরা কখনো তোকে বুঝিনি, শুধু ফার্স্ট হওয়াটাই চেয়েছি।এটা আমাদের মস্ত বড়ো ভুল।’ মদনের কথা জড়িয়ে আসছিল, তবুও সে বলল, ‘আমি ফার্স্ট হয়েছি, বাবা, আমি ফার্স্ট হয়েছি। আমাদের ক্লাসের সমস্ত বন্ধুদের মধ্যে আমিই আগে এ পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি, বাবা। তুমি কেঁদো না বাবা। অন্তত একটা বিষয়ে তোমাদের ছেলে ফার্স্ট হয়েছে, বাবা। তোমরা আর কেঁদো না, মা। বরং এবার তোমরা হা…। আর তার কোনো কথা শুনতে পাওয়া গেল না। মদনের বাবা-মা পাগলের মতো কাঁদতে লাগলো। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্র-ছাত্রী, গ্রামবাসী সবাই কাঁদতে লাগলো।

পরে পড়বো
৬৮
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন