প্রথম পর্ব : কুয়াশার ভিতর ঘরবাড়ি

ঢাকা শহরের ওপর আজকাল কোনো ভোর নামে না। যা নামে, সেটাকে কুয়াশা বলা ভুল হবে; ওটা মূলত ভয়। বিষাক্ত, ভেজা একটা আতঙ্কের আস্তরণ, যা পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি লম্বা শরীরটার কাঁধে এসে ভারী হয়ে চেপে বসে।

রাস্তার মোড়ে শরিফ মিয়ার চায়ের দোকানটা গত মাসে বন্ধ হয়ে গেছে। কাচের বয়ামগুলোয় এখন আর বিস্কুট থাকে না, থাকে কেবল নোনা ধরা বাতাস। আমি কাঁধের খদ্দরের চাদরটা আরেকটু চেপে জড়িয়ে নিলাম। বয়স হচ্ছে, নাকি চারপাশের হাওয়াটাই অতিরিক্ত ঠান্ডা?

হঠাৎ অন্ধকারের ভেতর থেকে দুটো বুটের কর্কশ শব্দ এগিয়ে এল। লোহার নাল বাঁধানো মিলিটারি বুট।

"কে ওখানে? দাঁড়া!"

গলার স্বরটা অচেনা, কিন্তু ভঙ্গিটা ভীষণ চেনা। ১৯৭১ সালের মার্চের সেই কালরাত্রিতে রাস্তায় যে গলার আওয়াজ শোনা যেত, ঠিক তেমনই। অথচ এখন ২০০২ বা ২০০৩ সাল— ঠিক মনে থাকে না। দেশ এখন স্বাধীন। কিন্তু রাত বারোটার পর স্বাধীন দেশের রাস্তায় হাঁটার অপরাধে একটা জলজ্যান্ত মানুষকে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার অধিকার পেয়ে যায় যে-কোনো টহলদার দল।

"আমি প্রবীণ শিক্ষক," আমার গলা ধরে এল, "একটু হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। দম আটকে আসছিল।"

"হাটে বের হইছে! এই ব্যাটা, পকেটে কী? কোন দলের লোক তুই? অপারেশন ক্লিন হার্ট চলতাছে জানোস না?"

অপারেশন ক্লিন হার্ট। চমৎকার একটা ইংরেজি নাম। কোনো এক অদৃশ্য অস্ত্রোপচারে নাকি দেশের হৃৎপিণ্ড পরিষ্কার করা হচ্ছে। অথচ প্রতিদিন সকালে খবরের কাগজটা খুললে মনে হয় একটা বিষাক্ত বমির পাত্র মেলে ধরা হয়েছে চোখের সামনে। গতকাল হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে বলে চালান করে দেওয়া পঞ্চাশতম তরুণের লাশটার কথা মনে পড়ে গেল। রিমান্ডের ঠান্ডা মেঝেতে বিদ্যুতের ছ্যাঁকা খেতে খেতে মেয়েটার আর্তনাদ কি সত্যিই কেউ শুনতে পায়নি?

"কিছু নেই পকেটে। শুধু একটা কবিতার বই আর এক চিলতে কাগজ," আমি পকেট থেকে একটা দুমড়ানো কাগজ বের করে দেখালাম।

টহলদার লোকটা টর্চের আলো ফেলল আমার মুখে। তারপর ভেজা মাটির দিকে থুতু ফেলে বলল, "কবি বুড়া! ঘরে গিয়া ঘুমা। জমানো খারাপ। বেশি কথা বললে তুলে নিয়া যামু, পুলিশি ডান্ডার গুঁতো খাইলে সব কবিতা এক রাতে বের হয়ে যাইব।"

তারা চলে গেল। তাদের শক্ত বুটের শব্দ মিলিয়ে গেল গলির মোড়ে।

আমি গলির মুখে দাঁড়িয়ে রইলাম একা। এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ভৌগোলিক চত্বরে এখন মুক্ত বাতাস নেই। সব জায়গায় এক অদৃশ্য হাজতখানা, একটা সুবিশাল পেষণশালা গড়ে উঠেছে।

অথবা হয়তো দোষটা আমারই।

ষাট বা সত্তরের দশকে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের বারান্দায় হাঁটতাম, তখন আমরা স্বপ্ন দেখতাম। রোম্যান্টিক তরুণের মতো রক্তে দোলা দিত মার্ক্সবাদ, আধুনিক সাহিত্য, আর একটা সম্পূর্ণ নিজস্ব দেশের মানচিত্র। নীলক্ষেতের নিউমার্কেটের বইয়ের দোকানে বসে বন্ধুদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তর্ক হতো ব্রেতোঁ, কাফকা আর রিলকে নিয়ে। তখন বোরকা বা হিজাব ছিল অবাস্তব, ধর্মান্ধতা ছিল সেরেফ কৌতুকের বিষয়।

একদিন শরিফ মিয়ার চায়ের আড্ডায় মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী স্যার চশমাটা নাকের ওপর তুলে মৃদু হেসে বলেছিলেন, "তোমরা যারা নতুন যুগের কবিতা লিখছ, জানো তো— এই ভূখণ্ডের একটা নাম দরকার? আমি ভেবেছি, একে 'বাঙলাদেশ' বললে কেমন হয়?"

আমরা টেবিলে ঝড় তুলেছিলাম। 'বাঙলাদেশ!' কী অদ্ভুত এক নাম! স্বপ্নের মতো মিষ্ট, নদীর মতো প্রবাহিত!

আলবদরদের নিষ্ঠুর হাত সেদিন মোফাজ্জল স্যারকে বাঁচতে দেয়নি। তাঁরা তাঁকে নিয়ে গেল, আর কোনোদিন ফিরে এলেন না। স্যার হয়তো বেঁচে গেলে ভালোই করতেন। আজ যদি তিনি নিজের চোখে দেখতেন— যে স্বপ্নের সোনার বাংলা তিনি চেয়েছিলেন, তা আজ কীভাবে একটা বিকৃত, বলাৎকৃত চরে পরিণত হয়েছে, তবে তিনি নিশ্বাস নিতে পারতেন না!

আমি পকেট থেকে সেই দুমড়ানো কাগজটা বের করলাম। তাতে কয়েকটা লাইন লেখা আছে— যা আমি বহু বছর ধরে নিজের ভেতরে তাড়িয়ে বেড়াই, অথচ কাউকে বলতে পারি না।

যখন আমরা বসি মুখোমুখি, আমাদের দশটি আঙুল হৃৎপিণ্ডের মতো কাঁপতে থাকে...
তখন ভুলেও কখনো আমাকে তুমি বাঙলাদেশের কথা জিজ্ঞেস কোরো না;
আমি তা মুহূর্তও সহ্য করতে পারি না, তার অনেক কারণ রয়েছে...

গাছের পাতা ঝরে পড়ার শব্দ হলো। অন্ধকার আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

হঠাৎ মনে হলো, আমরা কি সত্যিই ১৯৭১ সালে এক মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম? নাকি ওটা ছিল কোনো রূপকথা? লাখ লাখ মানুষের রক্ত, লাখ লাখ নারীর সম্ভ্রম লুণ্ঠন— সব কি তবে কেবল একটা নতুন 'অপপাকিস্তান' তৈরি করার জন্য ছিল?

পায়ের নিচে ভিজে যাওয়া ঘাস। মাথার ওপর কুয়াশা ঢাকা আকাশ। আমি অন্ধকার রাস্তা ধরে নিজের মেসবাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলাম। কাল সূর্য উঠবে, নাকি কেবল আরও খানিকটা অন্ধকার নেমে আসবে, কেউ জানে না।

দ্বিতীয় পর্ব : জ্যোৎস্না ও একটুখানি বৃষ্টি

রাত দুটো বাজে।

টিনের চালে ওপর যেন আলতো হাতে কেউ টিপ টিপ করে আঙুল ছুঁইয়ে গেল। বৃষ্টি নামছে। অকারণে বৃষ্টি নামা ঢাকা শহরের একটা পুরানো অভ্যাস।

আমার ঘরের জানালার একটা শিক ভাঙা। সেই ভাঙা ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাসের সাথে ফোটা ফোটা জল এসে এসে কাচের চশমার ওপর জমছে। আমি চশমাটা মুছে আবার চোখে দিলাম। ঘড়িটার টিকটিক শব্দ ইদানীং খুব স্পষ্ট শোনা যায়। ব্যাটারিটা দুর্বল হয়ে এসেছে, সময়টা একটু ধীরে চলছে যেন।

দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।

এত রাতে কে আসবে? এই কড়া নাড়ারও একটা নিয়ম আছে। তিনটা খুব হালকা চাপ, তারপর একটুখানি বিরতি।

আমি গিয়ে খিলটা খুললাম। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে আনিস। ছাতা আনিসের হাতে আছে, তবে সেটা খোলা নেই। লোকটার অদ্ভুত স্বভাব, বৃষ্টি নামলে সে ছাতা মাথায় দেয় না, ছাতাটা বগলে চেপে ভিজে।

"আসব?" আনিস বলল।

"আয়। তবে জুতোটা বাইরে খুলে আয়। মেঝেতে তোর কাদামাখা পায়ের ছাপ পড়লে আমার বাড়িওয়ালা শওকত সাহেব কাল সকালে এসে রবীন্দ্রসংগীত শোনাবেন।"

আনিস হাসল। ও হাসলে ওর বাঁ গালে একটা গভীর টোল পড়ে। এই টোলটা ওর জীবনের বহু ট্র্যাজেডি ঢেকে রাখে।

ও ঘরে এসে তক্তপোশের ওপর বসল। ওর জামা দিয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে। আমি একটা তোয়ালে ওর দিকে ছুড়ে দিয়ে বললাম, "ব্যাপার কী? অপারেশন ক্লিন হার্টের টহলদারি এড়িয়ে এত রাতে এলি কীভাবে? মিলিটারি বুটের শব্দ পাসনি?"

আনিস তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বলল, "পেয়েছি। গলির মোড়ে দুটো ছেলে দাঁড়িয়েছিল। অস্ত্রধারী। আমায় দেখে বলল, 'কোথায় যান?' আমি বললাম, 'জোছনা দেখতে।' তারা খুব অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। আকাশে তখন মেঘ, কোনো জোছনা নেই। হয়তো ভাবল পাগল, তাই ছেড়ে দিল।"

"তুই পাগলই," আমি একটা নিভে যাওয়া সিগারেট ধরানোর চেষ্টা করতে করতে বললাম।

"স্যার," আনিস হুট করে গম্ভীর হয়ে গেল। "আপনি কি জানেন ভুবনকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে?"

আমার হাতের দেশলাইয়ের কাঠিটা নিভে গেল। ভুবন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছেলেটা। চশমা পরা, শান্ত চেহারার একটা তরুণ, যে কি না রাজপথে কখনো কোনো স্লোগান দেয়নি। যার অপরাধ ছিল একটাই—সে তার বন্ধুদের সাথে বসে দেশের হালচাল নিয়ে একটু বিষণ্ণ আলোচনা করত।

"কখন?"

"আজ সন্ধ্যায়। ওর ঘর থেকে নাকি রাজদ্রোহী বইপত্র পাওয়া গেছে। আসলে কিছুই না, হুমায়ুন আজাদের একটা বই আর জীবনানন্দের দাশের কবিতার খাতা।" আনিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "আজকাল জীবনানন্দ পড়াও রাজদ্রোহ, স্যার।"

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। ঘরটার ভেতর বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কিচ্ছু নেই।

আমরা একটা সম্পূর্ণ আলাদা পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিলাম। যেখানে শেষ রাতে হুট করে বৃষ্টি নামলে তরুণরা রাস্তায় নেমে ভিজবে। যেখানে কোন মিলিটারি বুটের শব্দে বুকের ভেতরটা ছাঁৎ করে উঠবে না। যেখানে একটা চশমা পরা ছেলে কবিতার বই পড়ার অপরাধে থুরি ঘরের মেঝেতে পুলিশের বুটের লাথি খাবে না।

"ভুবনের বাবা কী করছেন?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।

"উনি তো রিটায়ার্ড সরকারি অফিসার। আজ রাতভর মন্ত্রী-এমপিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। কিন্তু কেউ চেনে না বলে ফিরিয়ে দিচ্ছে। ক্ষমতা জিনিসটা খুব অদ্ভুত, তাই না স্যার? যে চেয়ারে বসে থাকে, সে মানুষকে আর মানুষ বলে মনে করে না। ভাবে, সবাই তার হাতের পুতুল।"

আমি উঠে গিয়ে জানালার ধারে দাঁড়ালাম। বৃষ্টি এখন একটু কমে এসেছে। আকাশটা কুচকুচে কালো, কিন্তু দূরে ওই ধানমন্ডি হ্রদের দিকে তাকালে মনে হয় মেঘের আড়ালে একটা ম্লান চাঁদ লুকানো আছে।

"আনিস," আমি নিচু স্বরে বললাম।

"বলুন স্যার।"

"আমাদের এই দেশটার একটা ভারী মিষ্টি নাম ছিল, জানিস? কত রক্ত দিয়ে, কত নদীর জলে ধুয়ে আমরা এই নামটা পেয়েছিলাম। এখন সেই নামটা মুখে আনতেই ভয় করে। মনে হয়, কেউ এসে পিছন থেকে গলনালিটা চেপে ধরবে।"

আনিস কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, "তবুও বৃষ্টি তো নামছে, স্যার। এই দেশের আকাশ কিন্তু বদলে যায়নি। মেঘগুলো এখনও আগের মতোই কালো হয়। আমাদের মতো কিছু বোকা লোক এখনও রাতে ভিজে ভিজে হেঁটে বেড়ায়।"

আমি আনিসের দিকে তাকালাম। এই ছেলেটার চোখে কোনো ক্ষোভ নেই, আছে এক গভীর করুণা।

"চা খাবি?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।

"হবে এক কাপ? একটু আদা দিয়ে বানাবেন। বৃষ্টিতে ভিজে গলাটা যেন কেমন করছে।"

আমি রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালাম। চায়ের কেতলিটা বসিয়ে দিয়ে জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকালাম। একটা ঝিঁঝি পোকা ডাকছে। পৃথিবীর সমস্ত অন্যায়, সমস্ত রক্তপাত আর ক্ষমতার দম্ভের মাঝেও এই সামান্য ঝিঁঝি পোকাটার ডাক থেমে নেই।

হয়তো এই দেশটাও একদিন থামবে না। জোছনা আবার নামবে। কিন্তু সেই জোছনা দেখার জন্য ভুবন নামের ছেলেটা কি কাল সকালে জীবিত ঘরে ফিরবে?

উত্তরটা আমার জানা নেই। কারোরই জানা নেই।

তৃতীয় পর্ব : একটি লাল ডায়েরি ও এক কাপ ঠান্ডা চা

চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া ওঠা বন্ধ হয়ে গেছে।

আনিস কাপটা হাতে নিয়ে এক চুমুক দিল। তারপর একটু বিষণ্ন হেসে বলল, "স্যার, চা-টা ঠান্ডা হয়ে গেছে।"

"ঠান্ডা চা খাওয়া এক ধরনের শিল্প, আনিস। সবাই তা পারে না," আমি চশমাটা ঠিক করতে করতে বললাম।

আনিস কিছু বলল না। সে তার ভিজে যাওয়া পকেটে হাত দিয়ে ছোট একটা ডায়েরি বের করল। লাল রঙের মলাট। বৃষ্টিতে ভিজে মলাটের কোণটা একটু ফুলে উঠেছে।

"এটা ভুবনের ডায়েরি," আনিস ডায়েরিটা তক্তপোশের ওপর রাখতে রাখতে বলল। "আজ সকালে ওর ঘরের পড়ার টেবিল থেকে পেয়েছি। পুলিশ যখন ওকে তুলে নিয়ে যায়, তখন বোধহয় ডায়েরিটা খেয়াল করেনি।"

আমি হাত বাড়িয়ে ডায়েরিটা নিলাম। ভুবনের হাতের লেখা ভারি সুন্দর। একদম যেন কাটাকাটা অক্ষরের সারি। প্রথম পাতায় তারিখ লেখা— ১৫ই অক্টোবর। তার নিচে মোটে দুটো লাইন :

‘আজ নীলক্ষেত থেকে একটা পুরানো রবীন্দ্রনাথের ছবি কিনলাম। ছবির ফ্রেমটা ভাঙা। বিক্রেতা বলল, "ছবি ভাঙা হইলেও মানুষটা তো সত্য।" কথাটা মনে ধরেছে। মানুষ সত্য হওয়া খুব কঠিন কাজ।’

আমি ডায়েরির পাতাগুলো উলটাতে লাগলাম। শেষ পৃষ্ঠায় গিয়ে আমার হাত আটকে গেল। সেখানে একটা ছোট্ট তালিকা করা আছে। ভুবনের নিজের বানানো তালিকা— ‘যে কাজগুলো এই জীবনে করা হলো না’।
১. বাবাকে নিয়ে একবার সেন্টমার্টিন দ্বীপে যাওয়া।
২. শ্রীলেখাকে চিঠি লেখা (চিঠিটা কখনো ডাকবাক্সে ফেলা হবে না)।
৩. একটা সম্পূর্ণ মেঘলা দিনে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাস্তায় হাঁটা।
৪. দেশটা হঠাৎ করে খুব সুন্দর হয়ে গেছে— এমন একটা খবর খবরের কাগজে পড়া।

তালিকার চার নম্বর লাইনটার নিচে দুটো মোটা নীল কালির দাগ টানা।

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো। বাইরে বৃষ্টির শব্দ এখন প্রায় বন্ধ, কিন্তু চাল থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ার শব্দটা রয়ে গেছে।

"স্যার," আনিস ডায়েরির দিকে তাকিয়ে বলল, "ভুবনেরর মতো ছেলেটার কোনো অপরাধ ছিল না। ও তো কোনো রাজনীতি করত না। কেবল এই দেশটাকে একটু ভালোবাসত। এই দেশে কি ভালোবাসাটাই সবচেয়ে বড়ো অপরাধ?"

আমি উত্তর দিলাম না। কারণ এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই। যখন চারপাশের বাতাস বিষাক্ত হয়ে ওঠে, তখন সবচেয়ে আগে দম আটকে মারা যায় সেই মানুষটি, যে খাঁটি বাতাস খোঁজে।

হঠাৎ মেসের নিচের গেট খোলার শব্দ হলো। খুব সাবধানে কেউ একজন শিকল নাড়ল।

আনিস চমকে উঠে দাঁড়াল। ওর মুখের ভঙ্গি বদলে গেল। "মিলিটারি?" সে ফিসফিস করে বলল।

"দাঁড়া, দেখি," আমি উঠে দরজার দিকে এগোলাম।

সিঁড়ি দিয়ে কেউ একজন ধীরপায়ে উঠে আসছে। বুটের শব্দ নয়— চটির শব্দ। ভিজে যাওয়া স্যান্ডেলের চপচপ আওয়াজ।

দরজায় কড়া নাড়ার মৃদু শব্দ হলো।

আমি দরজা খুললাম। আলো-আঁধারির মাঝে দাঁড়িয়ে আছে ভুবনের বাবা, প্রবীণ রফিক সাহেব। তার শরীরটা কাঁপছে। গায়ে একটা পুরানো চাদর জড়িয়ে রাখা, যা পানিতে পুরোপুরি ভিজে গেছে। তার চোখে যে দৃষ্টি, তাকে শোক বলা যায় না; তা কেবল এক অসীম শূন্যতা।

"রফিক সাহেব? আপনি এত রাতে?" আমি ব্যস্ত হয়ে হাত ধরলাম।

রফিক সাহেব চশমাটা খুলে হাতের তালু দিয়ে মুছলেন। তারপর খুব নিচু, ভাঙা গলায় বললেন, "ভুবনকে ছেড়ে দিয়েছে, স্যার।"

আনিস পেছন থেকে লাফিয়ে উঠল, "সত্যি? কোথায় ও? থানায়?"

রফিক সাহেব এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর রাজপথের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বললেন, "না। হাসপাতাল থেকে ফোন করেছিল। বলল, 'হার্ট অ্যাটাক'। ছেলেটার বয়স মাত্র বাইশ ছিল, স্যার... ওর তো হার্টের কোনো ব্যামো ছিল না।"

ঘরের ভেতর ঝুলতে থাকা নিভু নিভু বাল্বটা হঠাৎ একবার কেঁপে উঠল।

বাইরে আবার ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামল। যেন এই শহরের সমস্ত অপরাধ, সমস্ত রক্তের দাগ ধুয়ে ফেলার জন্য আকাশের এত আয়োজন। অথচ আমরা সবাই জানি, কাল সকালে সূর্য উঠলে কাদা আর রক্তের দাগগুলো ঠিক আগের মতোই জেগে থাকবে।

চতুর্থ পর্ব : শেষ ট্রেন ও একটি হলুদ খাম

রফিক সাহেব তক্তপোশের কোণটায় বসলেন।

উনার গা থেকে ভিজে যাওয়া ভিজা কাপড়ের গন্ধ আসছে। চাদরের খুঁট থেকে এখনও টুপটুপ করে পানি পড়ছে মেঝের ওপর। আনিস এক কাপ গরম পানি রফিক সাহেবের হাতে দিল। চা পাতা শেষ, রান্নাঘরে কেবল একটু আদা আর তেজপাতা ছিল।

রফিক সাহেব কাপটা দু'হাতে জড়িয়ে ধরে বসে রইলেন। উনার হাত কাঁপছে। ধোঁয়া ওঠা পানির দিকে তাকিয়ে তিনি খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, "ভুবনের মা এখনো জানে না।"

আমি কিছু বললাম না। কিছু কিছু সত্য এত ভারী হয় যে তা অন্যকে শোনানোর শক্তি মানুষের থাকে না।

"উনাকে বলেছি ভুবনকে কাল সকালে জামিনে ছেড়ে দেবে। উনি আনন্দ সংবাদের অপেক্ষায় চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমোতে গেছেন। প্রতি আধা ঘণ্টা পর পর উঠে এসে জিজ্ঞেস করছেন, 'কটা বাজল? ভুবনের আসার সময় হলো?'"

রফিক সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ঘরের নিভু নিভু বাল্বটার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আমি উনাকে কী বলব, স্যার? বলব যে আমাদের চশমা পরা শান্ত ছেলেটা আর কোনোদিন ঘরে ফিরবে না?"

আনিস জানালার শিক দুটো চেপে ধরে বাইরে তাকিয়ে রইল। ওর পিঠটা একটু কাঁপছে। এই ছেলেটা কাঁদে না, কিন্তু কষ্ট পেলে ওর চোয়াল শক্ত হয়ে যায়।

"আজ রাতে ঢাকা ছাড়ার শেষ ট্রেন কখন, আনিস?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।

আনিস মুখ না ফিরিয়েই বলল, "রাত তিনটা বেজে চল্লিশ মিনিটে 'একতা এক্সপ্রেস' ছেড়ে যায়। দিনাজপুরগামী।"

"রফিক সাহেব, আপনি আর ওই বাড়িতে ফিরে যাবেন না," আমি রফিক সাহেবের কাঁধে হাত রাখলাম। "ভুবনের মাকে নিয়ে কাল সকালেই কমলাপুর চলে যান। গ্রামে ফিরে যান। এই শহর এখন আর মানুষের থাকার জায়গা নয়। এখানে বাতাস বলে কিছু নেই, কেবল বুটের তলার ধুলো আর বারুদের গন্ধ।"

রফিক সাহেব মাথা নাড়লেন। উনার চোখে কোনো পানি নেই। খুব শুকনো, খাঁখাঁ করা দুটো চোখ।

তিনি পকেট থেকে একটা হলুদ রঙের খাম বের করে তক্তপোশের ওপর রাখলেন। "ভুবনেরর জামাকাপড় যখন হাসপাতাল থেকে ফেরত দিল, তখন পকেটে এই খামটা ছিল। চিঠিটা আমার নামে না, স্যার। উনার নামে লেখা।"

খামের ওপর নীল কালিতে লেখা—'বাঙলাদেশ'।

আমার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে এলো। ২২ বছরের একটা ছেলে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দেশের নামে চিঠি লেখে!

আমি খামটা খুললাম না। ওই খাম খোলার সাহস আমার ছিল না। কিছু চিঠি থাকে যা পড়তে নেই, কেবল বুকের কাছে ধরে রাখতে হয়।

দেওয়াল ঘড়িতে তিনটা বাজার ঢং ঢং শব্দ হলো।

বৃষ্টি এখন পুরোপুরি থেমে গেছে। জানালার ভাঙা শিক দিয়ে এক চিলতে ঘোলাটে আলো এসে পড়েছে ঘরের মেঝেতে। চাঁদ উঠে নাই, কিন্তু মেঘ কেটে গিয়ে আকাশটা কেমন এক অদ্ভুত রুপালি রং ধারণ করেছে।

রফিক সাহেব আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন। "আমি আসি স্যার। ভুবনের মাকে জাগাতে হবে। মিথ্যা কথাটা এখন বলে ফেলা দরকার। সকালে আলো ফুটলে মিথ্যাটা হয়তো আরও বেশি নির্মম শোনাবে।"

তিনি দরজার দিকে পা বাড়ালেন। তার হাঁটার ভঙ্গিটা কেমন যেন শিথিল, যেন এক রাতের ব্যবধানে লোকটার বয়স আরো বিশ বছর বেড়ে গেছে।

আনিস আমার দিকে তাকাল। "স্যার, আমি রফিক সাহেবের সঙ্গে স্টেশন পর্যন্ত যাই?"

"যা। আর শোন..."

"বলুন স্যার।"

"স্টেশনে গিয়ে ভুবনের মায়ের জন্য একটা গরম চা কিনে দিস। উনার খুব প্রিয় জিনিস।"

আনিস কিছু বলল না। মাথা নিচু করে রফিক সাহেবের পিছু পিছু সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল।

আমি ঘরের মেঝের ওপর একা বসে রইলাম। সামনে সেই লাল ডায়েরি আর হলুদ খামটা পড়ে আছে।

হঠাৎ মনে হলো, এই যে কত শত তরুণ রাতে হারিয়ে যাচ্ছে, কত শত বাবা আলো ফুটলে লাশের ঘরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন— এসব কি কেবল ইতিহাস হয়ে থাকবে? কোনো এক দূর ভবিষ্যতে কি কেউ মনে রাখবে এই বিষণ্ণ রাতগুলোর কথা?

জানালার বাইরে দূরে কোথাও একটা ট্রেনের হুইস্‌ল শোনা গেল। শেষ ট্রেনটা হয়তো প্লাটফর্ম ছাড়ছে। একদল মানুষ পালাচ্ছে এই রূপসি, কিন্তু নিষ্ঠুর শহরটা ছেড়ে।

আমি চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলাম। ঘরের আলোটা নিভিয়ে দিয়ে তক্তপোশে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। কাল সকালে একটা নতুন দিন আসবে। খবরের কাগজে হয়তো ছোট করে একটা খবর ছাপা হবে—'হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে এক যুবকের মৃত্যু'।

আর আমরা পরম নিশ্চিন্তে এক কাপ চা হাতে নিয়ে সেই খবরটা পড়ব।

(সমাপ্ত)