(কথাটা শুনতে যতটা সহজ মনে হয়, সত্যিটা ঠিক ততটা সহজ না।
পৃথিবীতে কিছু জিনিস থাকে যা দেখতে হুবহু গল্পের মতো, আবার কিছু গল্প থাকে যা দেখতে একেবারে সত্যি ঘটনার মতো। কিন্তু এই ঘটনাটা? এটা গল্পও নয়, সত্যিও নয়। এমনকি 'কিছুই নয়' বলে যে একটা শূন্যতা আছে, এটাও ঠিক তা-ও নয়।
তাহলে জিনিসটা আসলে কী?
হয়তো এটা এক ফোঁটা বৃষ্টির জল, যা টিনের চালে পড়তে গিয়ে হঠাৎ বাতাসে মিলিয়ে গেল। কিংবা মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে মনে হওয়া সেই চেনা মানুষের ডাক, যার অস্তিত্ব বাস্তবে কোথাও নেই। আপনি চাইলে একে একটা বিভ্রম বলতে পারেন। আবার চাইলে একটা দীর্ঘশ্বাসও বলতে পারেন।
সব কথার উত্তর খুঁজতে নেই। কিছু বিষয় উত্তরহীন থাকে বলেই রাতগুলো এত নিঝুম হয়, আর মানুষের মন এত ব্যাকুল হয়।
এই যে আপনি এখন এই লেখাটা পড়ছেন— এটাও কি সত্যি? নাকি আপনার মন কল্পনা করে নিচ্ছে? কে জানে!)
প্রথম পর্ব
হেমন্তের বিকেলটা রংপুরে একটু আগেই অন্ধকার হয়ে আসছিল। কারমাইকেল কলেজের পুরোনো মেহগনি গাছের পাতায় হাওয়া লেগে এক ধরনের খসখসে শব্দ হচ্ছে, যা শুনলে মনে হয় কেউ বুঝি ফিসফিস করে কোনো গোপন অপরাধের কথা বলছে।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সদ্য সাবেক কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদের চশমার কাচ ঘেমে উঠেছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে চশমাটা টেবিলক্লথ দিয়ে মুছতে মুছতে তিনি উলটো দিকের দোতলা নির্মাণাধীন বাড়িটার দিকে তাকালেন। সেই বাড়ি— শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি, যেখানে গত পরশু রাতে ঘটে গেছে এক নারকীয় হত্যাকাণ্ড। একই পরিবারের চার চারটে লাশ! গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, বিবাহযোগ্য কন্যা আগামী এবং বারো বছরের ছোট ছেলে প্রিয়ম।
মেজর শাস্তির খাঁড়া মাথায় নিয়ে কমিশনার মাবুদ গত ১২ আগস্ট বদলির আদেশ পেয়েছিলেন। কিন্তু রংপুর ছেড়ে তিনি যাননি। যাওয়ার উপায়ও ছিল না। এই শহরের মাটির নিচে তিনি যে রহস্য পুঁতে রেখেছিলেন, তা আজ লাশের গন্ধে বিষাক্ত হয়ে উঠেছে।
তাঁর পাশে এসে দাঁড়াল ডিবি অফিসার সনাতন চক্রবর্তী। তার পরনে একটি গাঢ় ঘি রঙের আরং-এর বিশেষ নকশার শার্ট।
"সব পরিষ্কার করা হয়েছে, সনাতন?" মাবুদের গলাটা অস্বাভাবিক রকম নিচু এবং খাঁজকাটা।
সনাতন একটু ইতস্তত করে বলল, "জি স্যার। সিদ্ধার্থ আর মুগ্ধ— ওই দুটি বখাটে ছেলেকে অলরেডি তুলে এনে আসামি বানিয়ে ফেলেছি। প্রেস ব্রিফিংয়ে মিডিয়াকে বলা হয়েছে ওরা ছাদে বসে ইয়াবা খাচ্ছিল, গণপতি স্যার দেখে ফেলায় গামছা প্যাঁচিয়ে খুন করেছে। তারপর একে একে সবাইকে..."
"আর আলামত?" কমিশনারের চোখে ধারালো দৃষ্টি।
"মেয়েটার ঘরের সাব-মার্সিবল পাম্পের সুইচ অন করে পুরো বাড়ি পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাল রাতেই ছাদের ও ডাইনিংয়ের সব রক্তের দাগ ধুয়ে সাফ। তবে..." সনাতন থামল।
"তবে কী?"
"স্যার, ডোম জাকির ভাই মেডিক্যাল কলেজে দুই ভিকটিমের শরীর থেকে ভেজাইনাল সোয়াব সংগ্রহ করে ফেলেছিল। ৭১ টিভির এক সাংবাদিক গোপনে তার ইন্টারভিউ রেকর্ড করে ফেলেছে। সেখানে স্পষ্ট বলা আছে— মেয়ের শরীরে তাজা বীর্যের আলামত মিলেছে।"
কমিশনার মাবুদের ডান চোখের পাতাটা লাফিয়ে উঠল। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, প্রীতিলতার সেই বান্ধবী আর আগামী চক্রবর্তী কোনো গোপন সত্য জেনে ফেলেছিল। সেই সত্য ফাঁস হওয়ার ভয়েই এই চারটে রক্তাপ্লুত লাশ। কিন্তু এখন এই ডোমের মুখ বন্ধ না করলে পুরো নাটকটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
হঠাৎ কমিশনারের টেবিলের সরকারি ফোনটি বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে ঢাকার একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের নাম। কমিশনার মাবুদ চশমাটা চোখে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। অন্ধকার এখন পুরোপুরি গিলে খেয়েছে চার চিতার ছাই হয়ে যাওয়া বাড়িটিকে। খেলা মাত্র শুরু হয়েছে।
দ্বিতীয় পর্ব
ফোনটা বাজতেই থাকল। রিসিভার তুললেন না মাবুদ। তাঁর চোখে তখন অন্য এক হিসাব। টেবিল থেকে একটা নীল রঙের ফাইল টেনে নিয়ে তিনি সনাতনের দিকে ছুঁড়ে দিলেন।
"গল্পটা কে বানিয়েছে সনাতন? তুমি? নাকি ডিবির অন্য কেউ?" মাবুদের গলায় বরফের মতো ঠান্ডা স্বর।
সনাতন ঢোক গিলল। "কেন স্যার? খুনিরা ছাদে ইয়াবা খাচ্ছিল, গণপতি স্যার দেখে ফেলায়... "
"থামো!" মাবুদ ধমক দিয়ে উঠলেন। "মানুষ খুন করে কেউ ডাইনিং টেবিলে বসে আয়েশ করে বয়ামের খেজুর খায়? এই গাঁজাখুরি গপ্প মিডিয়া খাবে? তুমি প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছ খুনিরা ভোর রাতে কাজ সেরেছে। অথচ ভিকটিম আগামী চক্রবর্তী শুক্রবার ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে তার বান্ধবীকে ফেসবুকে মেসেজ করেছে, 'সারারাত বিদ্যুতের কী জানি নষ্ট হয়েছে, সারারাত জাগলাম'। তার মানে সকাল ছয়টার সময়ও মেয়েটা বেঁচে ছিল।"
সনাতনের ফরসা মুখটা কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল।
মাবুদ চশমাটা আবার চোখে দিয়ে বললেন, "আর ওই সিদ্ধার্থ ছেলেটা? আট বছর ধরে পিকে পাল জুয়েলার্সে স্বর্ণের কারিগর হিসেবে কাজ করে সে। সে নাকি সোনা চেনার জন্য আগুন দিয়ে টেস্ট করেছে! একজন পাকা কারিগর আগুন দিয়ে সোনা চেনে? আর ফিঙ্গারপ্রিন্ট মোছার জন্য ডিটারজেন্ট মেশানো বালতির পানিতে মোবাইল ফোন ভিজিয়ে রেখে যায়? সোনা নিয়ে গেল, আর মোবাইলটা নিয়ে না গিয়ে ভেজালো কেন?"
ঘরের ভেতর পিনপতন নীরবতা। শুধু পুরোনো সিলিং ফ্যানটা কটকট শব্দ করে ঘুরছে।
"স্যার, তাড়াহুড়োয় স্ক্রিপ্টে একটু ভুল হয়ে গেছে।" সনাতন আমতা আমতা করে বলল। "ওই প্রীতিলতা চক্রবর্তী আর তার বান্ধবী যে আপনার নারীঘটিত বিষয়টা নিয়ে বেশি দূর এগোচ্ছিল। আমি আর কোতোয়ালির ওসি মিলন তো জানতাম। আপনি নিজেই তো ১৫ থেকে ১৭ তারিখের মধ্যে ওই বাড়িতে গিয়ে ওদের হুমকি দিয়ে এসেছিলেন। ২০১২ সালের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ওই নারী কেলেঙ্কারির ঘটনার মতো এবারও যদি কিছু হতো, তবে আপনার এসিআর-এ আবার লাল দাগ পড়তো। মুখ তো বন্ধ করতেই হতো।"
মাবুদ চোখ বন্ধ করলেন। ছাত্রদলের ক্যাডার থেকে পুলিশে ঢোকা এই দুর্ধর্ষ অফিসারের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্মৃতিটা এখনো তাঁকে তাড়া করে ফেরে। সেবার উন্মত্ত জনতার হাতে অবরুদ্ধ হতে হয়েছিল তাঁকে, তৎকালীন এসপি এক্সট্রা ফোর্স পাঠিয়ে উদ্ধার না করলে মেরেই ফেলত। এবার রংপুরেও কি সেই ফাঁদেই তিনি পা দিলেন?
"ডোম জাকিরকে সামলাও।" চোখ না খুলেই বললেন মাবুদ। "মেয়েটার ধর্ষণের রিপোর্ট কোনোভাবেই যেন বাইরে না যায়। আর ওই যে ছেলেটাকে ধরেছ, তার ভাই তো নিজে চোখে দেখেছে লাল জামা পরা কেউ একজন রাতে আলামত নষ্ট করছিল। ওকে তুলে আনো। কোনো সাক্ষী রাখা যাবে না।"
শহরের আকাশ চিরে দূরে কোথাও একটা সাইরেন বেজে উঠল। মাবুদ জানেন, মিথ্যার জাল বুনতে গিয়ে তিনি এমন এক চোরাবালিতে পা দিয়েছেন, যেখান থেকে বের হওয়ার রাস্তাটা ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে।
তৃতীয় পর্ব
রংপুর মেডিক্যাল কলেজের ময়নাতদন্ত কক্ষের বাইরেটা স্যাঁতসেঁতে আর তীব্র ফরমালিনের গন্ধে ভরা। রাত পৌনে বারোটা। লালচে টিউবলাইটের আলোটা মিটমিট করে জ্বলছে আর নিভছে।
ডোম জাকির হোসেন ময়লা এক খণ্ড কাপড়ে হাত মুছতে মুছতে করিডোরে বেরিয়ে এলো। তার মুখে দেশি মদের গন্ধ, চোখে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। সামনে দাঁড়িয়ে আছে সনাতন চক্রবর্তী। তার পরনের সেই ঘি রঙের আরং-এর শার্টে এখনো একটা নিখুঁত পাট ভাঁজ করা।
"জাকির ভাই," সনাতনের গলাটা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি মিষ্টি। "একাত্তর টিভির সাংবাদিককে যে সোয়াবের কথা বললে, ওসব কি খুব দরকার ছিল?"
জাকির চমকে উঠে সনাতনের দিকে তাকালো। বিষণ্ন হেসে বলল, "আমি তো ডোমের কাজ করছি স্যার। মেয়েটার শরীর থেইক্যা বীর্য বার হইছে, ডাক্তার সাইবও দেখল। আমি হাচা কথা কমু না তো কি মিছা কমু? তয় ডাক্তার সাইব তো মানা করতাছিল বাইরে কিছু বলতে... ডাক্তার সাইব জানুক আর রিপোর্ট জানুক, আমার তো স্যার কোনো দোষ নাই।"
সনাতন পকেট থেকে একটা মোটা সাদা খাম বের করল। জাকিরের হাতে সেটা চেপে ধরে নিচু গলায় বলল, "ডাক্তার সাহেব কাল সকালে যে রিপোর্ট লিখবেন, সেটাই চূড়ান্ত। তুমি তো পুরোনো লোক, জানোই তো বেশি কথা বললে এই মেডিক্যাল কলেজের কাটা ঘরের ট্রলিতে নিজের লাশের ওপরই শুয়ে থাকতে হয়।"
জাকির খামটার দিকে তাকালো না। তার কপালে ভাঁজ পড়ল। দীর্ঘদিনের লাশ কাটার অভিজ্ঞতায় সে জানে— কত লাশের কথা চাপা পড়ে যায়, কত তাজা শরীর এক রাতেই নিছক একখানা কাগজের রিপোর্টে বদলে যায়।
ঠিক সেই মুহূর্তে কোতোয়ালি থানার দিকে একটা কালো গ্লাস তোলা মাইক্রোবাস ছুটছে। গাড়ির পেছনের সিটে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বসে আছে অভিযুক্ত সিদ্ধার্থের ছোট ভাই। রাত দেড়টার পর বাড়ি থেকে যে দুজন লাল জামা পরা লোক বের হতে দেখেছিল এবং গায়ের গেঞ্জি বদলে শার্ট পরানোর নাটক দেখেছিল, সে-ই এই ছেলেটা। তার চোখভরা জল আর আতঙ্ক।
থানার অন্ধকার রুমে টেবিলের ওপর পানির গ্লাসটা ঠক করে নামিয়ে রাখলেন সাবেক কমিশনার মাবুদ। তাঁর ফোনে তখন ঢাকার এক পরিচিত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কল।
"মাবুদ," ওপাশ থেকে ভারী গলা শোনা গেল। "শহরে কিন্তু কথা উঠে গেছে। ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—কেউ তোমার এই 'ইয়াবা সেবনের পর খুন' মার্কা স্ক্রিপ্ট বিশ্বাস করছে না। পুলিশ নিজেই সাব-মার্সিবল ছেড়ে আলামত নষ্ট করেছে, এই ভিডিয়ো কিন্তু ঘুরে বেড়াচ্ছে!"
মাবুদ একটা লম্বা শ্বাস ফেললেন। হুমায়ূন আহমেদের গল্পের মতোই কি চারপাশের পরিস্থিতিটা জটিল হয়ে উঠছে? যে জট তিনি পাকাতে চেয়েছিলেন, সেই জটে কি নিজেই জড়িয়ে পড়ছেন?
মাবুদ নিচু কণ্ঠে জবাব দিলেন, "চিন্তা করবেন না স্যার। জল ঘোলা করতেই হবে। দরকার হলে কাল সকালে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের নতুন একটা অ্যাংগেল মিডিয়ার সামনে ফেলে দেব। হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যকার কোন্দল বলে চালালে মানুষ আসল ঘটনা ভুলেই যাবে।"
কিন্তু মাবুদ জানতেন না, শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর রক্তে ভেজা ওই বাড়ির ছাদে ছিটকে পড়ে থাকা একটা ছেঁড়া বোতাম আর একটি মোবাইল নম্বরের লাস্ট কল লিস্ট— তখনো এমন এক সত্য ধরে রেখেছে, যা তাঁর সাজানো সব নাটক এক নিমেষে ছাই করে দিতে পারে।
চতুর্থ পর্ব
ভোর চারটে। রংপুরের বাতাস ভারী হয়ে আছে এক অদ্ভুত থমথমে নিস্তব্ধতায়। কোতোয়ালি থানার পেছনের এক অন্ধকার ঘরে বসে আছেন সাবেক কমিশনার আব্দুল মাবুদ। তাঁর সামনে ঝুলন্ত একটা বাতি দুলছে, আর মেঝেতে বসে কাঁদছে সিদ্ধার্থের ছোট ভাই। ছেলেটার ঠোঁট কেটে রক্ত জমাট বেঁধে গেছে।
সনাতন চক্রবর্তী ঘরে ঢুকে কমিশনারের কাছে গিয়ে নিচু কণ্ঠে বলল, "স্যার, মিডিয়া আর এলাকার মানুষ এবার অন্য মোড় নিচ্ছে। সকালে পুরো পাড়া নাকি এক হয়ে ডিসি অফিসের সামনে যাবে। প্রীতিলতা দেবীর সেই বান্ধবী—যিনি আপনার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ পেয়েছিলেন—তিনি নাকি ঢাকায় এক পরিচিত সাংবাদিককে সব অডিয়ো রেকর্ড পাঠিয়ে দিয়েছেন।"
মাবুদের হাতের সিগারেটটা জ্বলছিল। তিনি ধোঁয়া ছেড়ে হালকা হাসার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল এক ধরনের হিংস্র পরাজয়ের আশঙ্কা।
"সনাতন," মাবুদ ধীর গলায় বললেন, "হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলি সাহেব হলে হয়তো বলতেন, মানুষ যখন মিথ্যা সাজায়, তখন সে অতি-বাস্তব কিছু জিনিস যোগ করে ধরা পড়ে যায়। আমরাও সেই ভুলটাই করেছি।"
"কীসের ভুল, স্যার?" সনাতন চমকে উঠল।
"ওই যে মোটের সুইচ অন করে পানি দিয়ে বাড়ি ধুয়ে ফেলার নাটক! একজন কনস্টেবল লাইটের সুইচ দিতে গিয়ে ভুলে পানির মোটরের বিশাল সুইচ চেপে দেবে— এই কথা কোনো ছাগলেও বিশ্বাস করবে না। আর সকালে সংবাদ সম্মেলনে যখন আমি আবেগপ্রবণ হয়ে কেঁদে ফেললাম, লোকে ধরে ফেলল যে পুরোটাই অভিনয়।" মাবুদ চোখ বুজে একটা চিমটি কাটলেন কপালে।
ঠিক তখনই দরজায় নক হলো। থানার ওসির প্রবেশ। মুখমণ্ডল ফ্যাকাশে।
"কী হয়েছে?" মাবুদ সোজা হয়ে বসলেন।
"স্যার, চরম বিপদ!" ওসির কণ্ঠ কাঁপছে। "ঢাকার হেডকোয়ার্টার থেকে একটা বিশেষ গোয়েন্দা টিম রওনা হয়েছে। আপনার বদলির পর এই তিনদিন রংপুরে থাকার কারণ আর ২০১২ সালের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সেই পুরোনো নারী কেলেঙ্কারির ফাইল আবার ওপেন করা হচ্ছে। রংপুর মেডিক্যালের ওই ডোম জাকিরকে সকালে ডিবি স্পেশাল ব্রাঞ্চ জিম্মায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।"
মাবুদের হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা দু'আঙুলের ফাঁক থেকে খসে নিচে কার্পেটে পড়ল।
সনাতন পিছনের দিকে দু-পা পিছিয়ে গেল। তার ঘি রঙের আরং-এর শার্টে হঠাৎ যেন এক ফোঁটা ঘাম এসে জমল। সে বুঝতে পারছে, জাহাজ যখন ডোবে, তখন নাবিক আগে বাঁচার চেষ্টা করে।
মাবুদ শূন্য চোখে ঝুলন্ত বাতিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। যে প্রীতিলতা আর আগামীকে তিনি নিঃশব্দে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন, তাদের রক্তের দাগ আজ তাঁর গলার ফাঁস হয়ে ফিরে এসেছে। নাটক এখন শেষ অঙ্কে, আর দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে।
পঞ্চম পর্ব
ভোর সাড়ে পাঁচটা। রংপুরের পুব আকাশে সূর্য ওঠার আগেই একঝাঁক মেঘ এসে চারপাশ আঁধার করে ফেলল। শুরু হলো গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি।
মেডিক্যাল কলেজের কাটাঘরের পেছনের পুরোনো বটগাছটার নিচে একটা কালো গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। গাড়ি থেকে নামলেন ঢাকা হেডকোয়ার্টার থেকে আসা স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন উইংয়ের প্রধান—একজন মাঝবয়সি পুলিশ অফিসার। তাঁর নাম শাহেদ আলী। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, মুখমণ্ডল গম্ভীর।
কাটাঘরের বারান্দায় চুপচাপ বসে ছিল ডোম জাকির। সামনে অফিসারকে দেখে সে উঠে দাঁড়াল।
শাহেদ আলী জাকিরের দিকে এগিয়ে গিয়ে খুব শান্ত গলায় বললেন, "জাকির ভাই, ডাক্তার সাব তো রিপোর্টে কী লিখবেন তা উনি জানেন, কিন্তু আপনি তো নিজের চোখে দেখেছেন। আমাকে শুধু সত্যিটা বলুন। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।"
জাকির এক মুহূর্ত শাহেদ আলীর চোখের দিকে তাকাল। তারপর এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে বের করল একটা রক্তমাখা জিপলক ব্যাগ। ব্যাগটার ভেতরে রয়েছে একটা মেটালের ছেঁড়া চেইন আর দুটো মোবাইল ফোন— যা সে লাশ কাটার সময় কৌশলে উদ্ধার করে লুকিয়ে রেখেছিল।
"স্যার," জাকিরের গলা কাঁপছিল। "এই চেনটা গণপতি স্যারের মেয়ের গলায় প্যাঁচানো আছিল, আর এই ফোন দুইটা বালতির পানিতে চুবাইয়া রাখা আছিল আলামত নষ্ট করতে। মেলা দিন ধরে লাশ কাটি স্যার, পাপের আর সীমা নাই। এই নিষ্পাপ মাইয়াটার আত্মা আমারে ঘুমাইতে দিতাছে না।"
ঘণ্টাখানেক পর। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের দাপ্তরিক কক্ষ।
সাবেক কমিশনার আব্দুল মাবুদ তাঁর বিশাল কাঠের চেয়ারটায় একদম সোজা হয়ে বসে আছেন। চশমাটা টেবিলের ওপর রাখা। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ডিবি অফিসার সনাতন চক্রবর্তী। সনাতনের ঘি রঙের শার্টটা বৃষ্টি আর ঘামে ভিজে এখন সপসপে।
"সনাতন," মাবুদের গলাটা কেমন যেন খসখসে শোনালো। "তুমিও কি শেষ পর্যন্ত স্টেটমেন্ট বদলে ফেললে?"
সনাতন মাথা নিচু করে রইল। একটু আগে হেডকোয়ার্টারের কাছে সে স্বীকার করে নিয়েছে— কীভাবে কমিশনারের পুরোনো নারী নির্যাতনের ঘটনা গোপন রাখতে এবং আগামী চক্রবর্তীর মুখ বন্ধ করতে এই সাজানো খুনের প্ল্যান করা হয়েছিল। কীভাবে সাব-মার্সিবল দিয়ে বাড়ি ধুইয়ে দেওয়া আর বখাটে দুই তরুণকে ইয়াবাসেবী বানিয়ে বলির পাঠা করা হয়েছিল।
শাহেদ আলী কক্ষে প্রবেশ করলেন। তাঁর হাতে পুলিশের একটি নীল ফাইল আর একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা।
"মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ," শাহেদ আলী শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, "আপনার ১২ আগস্টের বদলির আদেশ অমান্য করা, ক্ষমতার অপব্যবহার, চার খুনের আসল আলামত নষ্ট করা এবং মূল অপরাধীদের আড়াল করার অভিযোগে আপনাকে হেফাজতে নেওয়া হচ্ছে।"
মাবুদ কিছু বললেন না। তিনি শুধু একবার নিজের চশমাটার দিকে তাকালেন, তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
বাহিরে বৃষ্টি এখন কিছুটা ধরে এসেছে। শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর পোড়া বাড়িটার ছাদ থেকে ফোটা ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ছে উঠোনে। যে মিথ্যা দিয়ে পুরো রংপুরকে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, ভোরের প্রথম আলোতে তা কান্নার মতো ঝরে পড়ছে মাটিতে। সত্য কখনো চিরকাল চাপা থাকে না— আইনের হাত যত দেরিতেই পৌঁছাক, রক্তের বিচার এই মাটিতেই হয়।
অনুসন্ধান করুন
🎂 আজ যাদের জন্মদিন
মোঃ তারেক আনোয়ার
শুভ জন্মদিন! 🎈
সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ
প্রিয় কবি বন্ধু, আপনার আন্তরিক প্রশংসার জন্য হৃদয...
আরো দেখুন
কাজী অ্যাডাম
লেখক:
কাজী অ্যাডাম
প্রিয় কবি বন্ধু, আপনার আন্তরিক ভালো লাগার জন্য কৃ...
আরো দেখুন
কাজী অ্যাডাম
লেখক:
কাজী অ্যাডাম