গল্পের রাজকুমার
শংকর ব্রহ্ম


আন্তন চেখভের শৈশব কেটেছে দারিদ্রের মধ্য দিয়ে। চেখভের বাবা ছিলেন একজন মুদি দোকানদার। বাবা চাইতেন ছেলে স্কুলে না গিয়ে তার দোকানে বসুক। তার সাথে তিনি ছেলেকে নিয়মিত গীর্জায় যেতে বাধ্য করতেন। কিন্তু চেখভের মা চাইতেন, বাপের মতো মুদি দোকানদার না হয়ে, ছেলে লেখাপড়া শিখে মানুষ হোক।

আন্তন চেখভ (Anton Chekhov)-য়ের জন্ম হয় ১৯শে জানুয়ারি ১৮৬০ সালে রাশিয়ার তাগানকা। বাবা ছিলেন - পাভেল জেগোরোভিচ চেখভ আর মা ছিলেন - পাভেল চেখভ।

দশ বছর বয়সে বাবার অমতেই, মায়ের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আন্তন চেখভ শহরের একটি ভালো স্কুলে ভর্তি হন । এর আগে তিনি গ্রামের এক প্রাইমারি স্কুলে পড়তেন। শহরের স্কুলেই আন্তন চেখভ প্রাচীন গ্রীক এবং ল্যাটিন ভাষার সাহিত্য সমূহ পড়েছিলেন।
১৮৭৯ সালে বাবার মুদির দোকান উঠে যাওয়ার বাবা সপরিবার ভাগ্যান্বেষণে রাজধানী শহর মস্কোতে চলে আসেন । মস্কো এসে আন্তন চেখভ ডাক্তারী পড়ার মনস্থ করেন। ভর্তি হন - ফার্স্ট মস্কো স্টেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে।

তিনি ছিলেন চিকিৎসক, রুশ ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্পলেখক এবং নাট্যকার। গল্প লেখায় আন্তন চেখভ-য়ের ছিল অসাধারণ দক্ষতা। তিনি বলেছিলেন, যে লিখতে পারে, লেখায় মুন্সীয়ানা থাকলে সে একটা ছাইদানী নিয়েও সুন্দর গল্প লিখতে পারে। মানুষের মনের রহস্য অনুসন্ধান করার মতো মানসিক ক্ষমতা থাকা চাই। আন্তন চেখভের গল্প কিংবা নাটকের কাহিনিতে কোথাও কোনও জটিলতা নেই। গল্পের শেষে রয়েছে মনোজ্ঞ এক সমাধান। জীবনের অতি তুচ্ছ ঘটনাকে আন্তন চেখভ এমন দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলতে পারতেন যে, সব মিলিয়ে ছবির মতো ফুটে উঠতো একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনের এবং সমাজের চালচিত্র। এইজন্য তাঁকে বলা হয় ছোটগল্পের রাজকুমার।
চেখভ আশ্চর্য নিপুণতায় এঁকেছেন তার সময়কার রাশিয়ার জীবনের বাস্তব ছবি। চেখভের সাহিত্যকর্ম ছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর রাশিয়ার সমাজ জীবনের জীবন্ত-বাস্তব ও পূর্ণাঙ্গতার প্রতিচ্ছবি ।
আন্তন চেখভকে বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সেরা ছোটগল্পকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্ব- সাহিত্যের তিন জন অবিস্মরণীয় গল্পকার হলেন, রাশিয়ার আন্তন চেখভ , ফ্রান্সের গী দ্য মোপাসাঁ ও আমেরিকার ও.হেনরী।
আন্তন চেখভের ছোটগল্পগুলো পরবর্তী কালের - লেখক, সমালোচক ও সমাজের বিভিন্ন মানুষের কাছে প্রভূত সমাদর লাভ করেছে। নাট্যকার হিসেবে পেশাজীবনে চেখভ চারটি ক্ল্যাসিক নাটক লিখেছিছেন। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে এমন নাট্যকারদের মাঝে শেকসপিয়ার ও ইবসেনের পাশাপাশি চেখভের নামও উল্লেখ করা হয়। এ'ছাড়া মঞ্চনাটকে প্রাক-আধুনিকতার উদ্ভবে অন্যতম তিনজন ব্যক্তিত্বের মধ্যে ইবসেন ও অগুস্ত স্ত্রিন্দবারির পাশাপাশি আন্তন চেখভ এর নাম উল্লেখ করা হয়ে থাকে।
১৮৭৯ সালে আন্তন চেখভ মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টিতে ভর্তি হন ও ১৮৮৪ সালে তিনি ডাক্তারী পাস করেন ।
তিনি ডাক্তার হিসাবে একটি সরকারী চাকরিও পান । এবার তিনি নিজেই পরিবারের হাল ধরেন। চাকরি করার পাশাপাশি তিনি শুরু করেন সাংবাদিকতা এবং কমিকসের বই লেখা।
আন্তন চেখভ সাহিত্য রচনায় হাত দেন ১৮৮০ সালের দিকে। ‘স্টেপ্পে’ নামক একটি বড় গল্প দিয়ে তাঁর সাহিত্য সাধনা শুরু ।
তিনি খুব দ্রুত লিখতে পারতেন। ১৮৮৮ সালের মধ্যে তিনি আরও দশটি গল্প লিখে ফেলেন । ইভোনভ নামে একটি নাটকও লেখেন ১৮৮৭-৮৯ সালের মধ্যে ।
আন্তন চেখভ (১৮৯৩-৯৪ সালের মধ্যে ‘ দি আইল্যান্ড অব সাখালিন ’ নামক একটি ভ্রমণকাহিনীও লেখেন।
সুভোরিন নামক এক ব্যক্তি ছিলেন চেখভের গ্রন্থসমূহের প্রকাশক এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু । তিনি প্রথম ইউরোপ ভ্রমণে যান সেই প্রকাশক বন্ধুর সাথে।
১৮৮৮-১৮৮৯ সালে তিনি ‘উড ডেমন‘ নামের চার অঙ্কের একটি উল্লেখযোগ্য নাটক লেখেন।
১৮৯০ সালে আন্তন চেখভ লেখেন তাঁর সব চেয়ে বেশি মঞ্চসফল নাটক Pyadya Vanya ( Uncle Vanya ). এটা তার একটা মাস্টারপিস নাটক ।
১৮৯২ সাল থেকে ১৮৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি সরকারী ডাক্তার হিসাবে মস্কো থেকে ৮০ কি.মি. দক্ষিণে মিলিখোভো গ্রামে কাটান। তাঁর সাথে থাকতেন তাঁর বোন মারিয়া। মারিয়া ভাইয়ের দেখাশুনার জন্য তখনও বিয়েই করেননি। এই দুর্গম অঞ্চলে তিনি যান ভাইয়ের সেবা করার জন্য। নির্জন স্থানে তার তেমন কোনো কাজ ছিল না। আন্তন চেখভ তাঁর অবসর সময়কে কাজে লাগিয়েছিলেন লেখালেখির মধ্য দিয়ে।
জীবনের পুজারী ছিলেন চেখভ। জীবনকে আন্তন চেখভ সহজভাবে নিয়েছিলেন এবং দেখেছিলেন অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে। আন্তন চেখভ-এর সমগ্র রচনার মধ্যে আছে মানবতা-দরদী শিল্পী হৃদয়ের মহত্বের ছাপ।
১৮৯২ সালে প্রকাশিত হয় তার গল্প 'বাটার ফ্লাই ও নেভারস'। ১৮৯৩ সালে রচনা করেন An Annonymous Story. ১৮৯৪ সালে রচনা করেন The Black Monk এবং ১৮৯৭ সালে রচনা করেন Peasants. এছাড়াও তিনি আরও অনেক গল্প লিখেছিলেন ।
টলস্টয়ের লেখার পরম ভক্ত ছিলেন আন্তন চেখভ। তিনি টলস্টয়ের আদর্শের দ্বারা নিজেও প্রভাবিত হয়ে পড়েন ১৮৮০ সালের পর থেকে।
আন্তন চেখভের ১৮৯৬ সালে শ্রেণী সংগ্রামের পটভূমিকায় Chayka ( The Seagall ) নামে একটি উল্লেখযোগ্য নাটক লেখেন। তার জন্য তিনি পুশকিন পুরস্কার পান।
এক সময় আন্তন চেখভ-এর নাটকের এক অভিনেত্রী ওল্‌ল্গা নিপারের প্রেমে পড়েছিলেন তিনি। শেষ বয়সে এসে ১৯০১ সালে তাঁকে বিয়েও করেন, কিন্তু তাঁদের কোনও সন্তান হয়নি।
জীবনের শেষ দিকে আন্তন চেখভ সহসা ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হন। নিজে ডাক্তার হয়েও এই কঠিন ব্যাধি থেকে তিনি মুক্তিলাভ করতে পারেননি।
দুরারোগ্য মারণ এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরই তাকে আধাপঙ্গু আখ্যা দিয়ে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
সংসার ও রোগের চিকিৎসার খরচের জন্য তাঁকে বাধ্য হয়ে নিজের বাড়ি বিক্রি করে দিতে হয়। তিনি মস্কোর বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে মফঃস্বল শহর ইয়াল্টায় গিয়ে একটা বাড়ি কিনে বসবাস করতে থাকেন । শেষ জীবনটা তাঁর মোটেও সুখের হয়নি।
আন্তন চেখভ ১৯০৪ সালের ১৭ই জানুয়ারি মাত্র চুয়াল্লিশ বছর বয়সে দুরারোগ্য ক্ষয় রোগেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস।