মামারবাড়ি
সোহন ঘোষ
(এক)
একটা কুৎসিত রটনা কিংবা মিথ্যা অপবাদের ক্ষমতা যে কতটা?— তার ধারণা পেয়েছিলাম ক্লাস নাইনে। চৈত্রমাসের শুকনো বনে লাগা দাবানল যেমন এক নিমেষে সবুজ অরণ্য পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে, তেমনি একটি অপবাদও ধীরে ধীরে একটি জীবন্ত মানুষকে নিঃশেষ করে দিতে পারে। বিশেষত সেই মানুষটি যদি হয় কাঁচের মতো স্বচ্ছ, মাটির মতো নরম, আর গঙ্গাজলের মতো পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী। এরকমই একজন ছিল আমাদের বন্ধু শ্রীকান্ত।
ক্লাস সেভেন পেরিয়ে ক্লাস এইটে ওঠার প্রথম দিন; নতুন ক্লাসরুম, নতুন বেঞ্চ আর নতুন বইয়ের গন্ধের মাঝে হঠাৎই চোখে পড়েছিল এক অপরিচিত মুখ। পরে আলাপ হতে জানলাম, ছেলেটির নাম শ্রীকান্ত বিশ্বাস।
বাবা মারা যাওয়ার পর শ্রীকান্ত ছিল অনেকটা বেড়াহীন চারাগাছের মতো। তাই শ্রীকান্তের মাতামহের আদেশে তার মামা তাকে মা ও ভাইয়ের কাছ থেকে একপ্রকার শিকড় ছিঁড়েই নিয়ে এলেন নিজের বাড়িতে। উদ্দেশ্য একটাই—যেন এই চারা গাছটা রোদ, জল আর বৃষ্টি পেয়ে আকাশের দিকে মাথা তুলে বাঁচতে পারে।
শুরুতে শ্রীকান্ত ছিল আমাদের কাছে নিছক এক ধুলোমাখা পাথর। কে জানত, এই সাধারণ আবরণের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অমসৃণ হীরা! বাইরে থেকে আলোর ঝিলিক দেখা যেত না ঠিকই, কিন্তু অন্তরে যে জহরত লুকানো ছিল, তার পরিচয় পেতে বেশিদিন সময় লাগেনি।
সেবার সরস্বতী পুজোর সকালে হারমোনিয়ামের মৃদু সুর ছাপিয়ে যখন শ্রীকান্তর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, তখন পুরো স্কুল যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল। এই লাজুক ছেলেটির বুকের গহিনে যে এক অবাধ্য পাহাড়ি নদী বইছে, তা আগে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। তার শান্ত স্বভাব আর মিতবাক চলাফেরা দেখে ঘুণাক্ষরেও বোঝার উপায় ছিল না যে, তার ভেতরে সংগীতের এমন এক প্রাণবন্ত ঝর্ণাধারা সুপ্ত ছিল।
পুজোর পর স্কুল খোলার প্রথম দিনেই মিতালী ম্যাম ক্লাসে এলেন। প্রতি বছরের মতো এবারও অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী ছাত্রছাত্রীদের ভালো-মন্দ দিক নিয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা শুরু করলেন।
এতদিন আমাদের ক্লাসে গান মানেই ছিল ঝিলিক রায়—প্রশংসার সবটুকু আলো যেন ওকেই ঘিরে থাকত। কারণ আমাদের ক্লাস থেকে ও ছাড়া আর কেউ গানের অনুষ্ঠানে নাম দিত না। ওর ভাই-বোনেদের মুখে শুনেছিলাম, ওর দাদু নাকি নামকরা গানের মাস্টার; তাঁর কাছেই ঝিলিকের গানে হাতেখড়ি। পড়াশোনার পাশাপাশি গানেও এমন তুখোড় হওয়ায় অনেকেই বলত, মেয়েটার ওপর মা সরস্বতীর অশেষ আশীর্বাদ আছে।
কিন্তু এ বছর ছবিটা একটু বদলেছে। ঝিলিকের পাশাপাশি শ্রীকান্তও গান গেয়েছে। আর ম্যামের কথায় স্পষ্ট বোঝা গেল—শ্রীকান্তের কণ্ঠ সবার মনেই গভীরভাবে দাগ কেটেছে। ম্যাম যখন শ্রীকান্তের কণ্ঠের অত প্রশংসা করছিলেন, আমি আড়চোখে দেখেছিলাম ঝিলিকের চোয়াল দুটো কেমন যেন শক্ত হয়ে গেল। এতদিনের একচ্ছত্র প্রশংসায় ভাগ বসানোটা ও বোধহয় সহজে মেনে নিতে পারছিল না।
ম্যাম কেবল শ্রীকান্ত ও ঝিলিকের গান নিয়েই নয়, আমাদের করা নাটকের অভিনয় সম্পর্কেও বিস্তারিত বললেন। কোথায় আমরা ভালো করেছি আর কোথায় আরও উন্নতির সুযোগ আছে—সবটাই ধৈর্য নিয়ে বুঝিয়ে দিলেন। এমনকি যারা নাচে অংশ নিয়েছিল, তাদেরও আলাদা করে প্রশংসা করতে ভোলেননি।
প্রতি বছরই ম্যামের এই গঠনমূলক আলোচনা আমাদের পরের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিকে আরও দৃঢ় করে তুলত। শুধু আমাদের ক্লাসেই নয়, অন্য সব ক্লাসেও তিনি একইভাবে ছাত্রছাত্রীদের কাজ নিয়ে আলোচনা করতেন।
আগের বছরগুলোতে আমাদের চেয়ে এক বছরের বড় পাপিয়াদির গানের কথা ম্যাম প্রায় প্রতিটা ক্লাসে গিয়ে বলতেন এবং তার ভালোদিক বিচার করে প্রশংসা করতেন কিন্তু এবছর শ্রীকান্তের গানের গলা ম্যামকে এতটাই মুগ্ধ করেছে যে, প্রতিটা ক্লাসে গিয়ে শ্রীকান্তকে নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। এমনকি পাপিয়াদিও আমাদের সামনে শ্রীকান্তের বেশ প্রশংসা করেছিলেন।
তবে এই গান গাওয়া ছাড়াও শ্রীকান্ত লোকেদের খুব সাহায্য করতো। শ্রীকান্তের সামনে কেউ বিপদে পড়লে সাহায্য চাইবার আগেই সে এগিয়ে যেত। কথায় আছে, যে যাচিয়া বিলায় তাহার নাকি কদর থাকে না। শ্রীকান্তের ক্ষেত্রেও এই নিয়মের খুব একটা ব্যতিক্রম হয়নি। তবে আমাদের কয়েকজনের কাছে তার মূল্য কিন্তু আর পাঁচজনের অবহেলায় কমতো না।
মাঝে মাঝে আমরাও যে তাকে অবজ্ঞা করিনি—তা বললে বোধহয় একটু ভুলই বলা হবে।”
তার ব্যাগটা দেখলে প্রথমে হাসি পেত। বইখাতার পাশে একটা বাক্সের মধ্যে যত্ন করে রাখা থাকত ব্যান্ডেজ, তুলো, মলম, কাঁচি, সূচ, সুতো, বেশ কিছু বোতাম, স্ক্রু-ড্রাইভার ইত্যাদি—সব জিনিসপত্র যত্ন সহকারে রেখে দিত। কোথা থেকে সে এ-সব সংগ্রহ করেছিল, তা জানি না। তবে এগুলো দিয়ে পারত না—এমন কোনো কাজ নেই।
একবার আমাদের ক্লাসের পিন্টু বর্মনের ভাইয়ের হাওয়াই চটির ফিতে খুলে গেলে, তার ভাই যখন আমাদের ক্লাসে এসে তার দাদার কাছে দাঁড়িয়ে কান্না করতে থাকে, তখন শ্রীকান্তই কোথা থেকে একটা শক্ত কঞ্চি জোগাড় করে এনে নিজের ব্যাগ থেকে একটা দড়ি বের করে ফিতেটা লাগিয়ে দেয়।
খেলতে গিয়ে কখনো হাত-পা কেটে গেলে আমরা আর অফিসে যেতাম না। কারণ অফিসে ব্যান্ডেজ-তুলোর সঙ্গে স্যারেদের বকুনিও জুটত। তার চেয়ে শ্রীকান্তর কাছে যাওয়াই ভালো ছিল—ওখানে ছিল নীরব যত্ন আর ভরসার একটা নিশ্চিন্ত জায়গা।
এসব সাহায্য ছাড়াও মজার প্রকৃতির এই ছেলেটি গল্প আর অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গিতে আমাদের ভরিয়ে রাখত। গোমড়ামুখো এই শহরে মন খারাপের দিনে, এই ছেলেটির সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেই বুকের ভেতরের ভার হালকা হয়ে যেত।
তবে আস্তে আস্তে আমাদের ক্লাসে কিছু পালোয়ান স্বভাবের ছেলেদের কাছে এই শ্রীকান্তই যেন তাদের বাহাদুরি দেখানোর প্রদর্শনীর স্থায়ী মঞ্চ হয়ে উঠেছিল। কখনো সিনিয়র দাদাদের চোখের সামনে, কখনো ছোটদের ভিড়ে, আবার কখনো মেয়েদের সামনে—তারা শ্রীকান্তকে ঘুষি, চড়, ধাক্কা মেরে নিজেদের শক্তি জাহির করত।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, শ্রীকান্ত কোনোদিন পাল্টা হাত তুলত না, কোনো প্রতিবাদ করত না। চুপ করে সহ্য করত।
ধীরে ধীরে অনেকে তাকে বিদ্রূপ করে ‘শ্রী ক্যাবলাকান্ত বিশ্বাস’ বলে ডাকতে শুরু করল।
একদিন বাথরুম থেকে ক্লাসে আসার সময় রানা শ্রীকান্তের বাহুতে একটা জোর ঘুষি মেরে হাত দুটোকে পালোয়ানের মতো ফাঁক করে হাসতে হাসতে হেঁটে চলে যায়।
এই দৃশ্য দেখে সুদীপ শ্রীকান্তকে দাঁড় করিয়ে বলল,
“আচ্ছা তুই ওকে কিছু বললি না কেন? একটা রোগা-পটকা ছেলে, যাকে ফুঁ দিলেই উড়ে যায়?”
শ্রীকান্ত একই শান্ত গলায় বলল,
“আমার বাবা বলতেন, মারপিট করা মোটেও ভালো জিনিস না। এতে দু-পক্ষেরই ক্ষতি হয়।”
“তোর বাবা বলেছে—যতসব ফালতু কথা। আসলে তুই মারপিট করতে জানিস না। ওর থেকে তুই আমার চেলা হয়ে যা, আমি তোকে মারপিট করা শিখিয়ে দেব। গুরুদক্ষিণা হিসেবে বরং পা-টা একটু টিপে দিবি।”
শ্রীকান্ত কোনো উত্তর না দিয়ে চলে আসে।
এইসব ঘটনার কথা রাজের মুখে শুনে আমি বলেছিলাম,
“দেখ শ্রীকান্ত, তোকে কেউ কামড়াতে বলছে না, কিন্তু অন্তত একটু ফোঁস তো করবি! না হলে লোকে তো তোকে পেয়ে বসবে।”
তখন শ্রীকান্ত আমাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে বলল,
“যদি আমাকে মেরে কেউ আনন্দ পায়, তাহলে পেতে দে না। আমরা তো সবাই বন্ধু। তা ছাড়া গ্রাম থেকে শহরে আসার সময় মা আমাকে কড়া করে বলে দিয়েছেন—শহরে যাচ্ছ পড়াশোনা করার উদ্দেশ্যে, ভালো করে পড়াশোনা করবে। কারো সঙ্গে ঝগড়া, অশান্তি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা করবে না। এখন আমি মায়ের কথা তো আর ভাঙতে পারি না।”
একবার সকালে স্কুলে ঢুকে দেখি, ব্ল্যাকবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে শ্রীকান্তর নাম লিখে ব্যঙ্গাত্মক ছড়া—
শ্রী ক্যাবলাকান্ত বিশ্বাস,
বুদ্ধিতে আস্ত হাঁস।
মার খায় ধুসধাস,
করে নাকো ফুঁস-ফাঁস।
গোবর ভরা মাথা,
শ্রীকান্ত একটা বোকা।
তবে সে কিন্তু এটা হাসিমুখেই এড়িয়ে গিয়েছিল।
শুধু ছাত্ররা নয়, অনেক “কিছু শিক্ষক-শিক্ষিকাও আড়ালে-আবডালে শ্রীকান্তকে ‘ফিউজ ওড়া ব্রেন’ বা ‘তারকাঁটা’ বলে বিদ্রূপ করতেন। কিন্তু শ্রীকান্ত? সে যেন এক পদ্মপাতা—বিদ্রূপের কোনো জলই তার গায়ে দাগ কাটতে পারত না। সে হাসিমুখে সবকিছু এড়িয়ে যেত।
তবে আমরা তাকে কত বুঝিয়েছি, কতবার পাল্টা আঘাত করার কথা বলেছি, কিন্তু প্রতিবারই সে মা-বাবার সেই কথাটাই আউড়ে সব এড়িয়ে যেত। একদিন খুব জোরাজুরি করতেই সে নিচু স্বরে বলল—
— “আমি আগে মারপিট করতাম… কিন্তু…”
— “কিন্তু কী?” — অরিজিৎ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল।
রাজও সুযোগ বুঝে হালকা রসিকতা করে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে আমাদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে গেল। অথচ সেই হাসির একটুকুও যেন শ্রীকান্তের মুখে পৌঁছাল না। সে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল—
— “সেদিন হুমায়ুন কাকা আর রহমত কাকার মধ্যে জমির আল নিয়ে সামান্য ঝামেলা হয়েছিল। প্রথমে শুধু কথাকাটাকাটিই চলছিল। কিন্তু একটু পরেই পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে উঠল। দুজনেই রাগে একে অপরকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে লাগলেন। একে একে আশেপাশে লোকজন সেখানে জড়ো হতে লাগল। আমার বাবা, নিতাই কাকা, সিরাজ কাকা— তাঁরা সবাই মিলে ঝগড়াটা থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন।”
এই পর্যন্ত বলে শ্রীকান্ত একটু থামল। তার মুখের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল, অতীতের সেই দৃশ্যটা আবার তার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে আবার বলতে শুরু করল—
— “হঠাৎ রহমত কাকা রাগের মাথায় একটা মোটা বাঁশ তুলে নিলেন। মারতে গিয়েছিলেন হুমায়ুন কাকাকে… কিন্তু… বাঁশটা গিয়ে সোজা বাবার মাথার পেছনে লাগে। বাবা… সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।”
শ্রীকান্ত হঠাৎ চুপ করে জানলা দিয়ে ওই দূরের গাছটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।
— “তারপর?” — রাজ এবার আগের মতো রসিকতার ভঙ্গিতে নয়, খুব ধীর স্বরে জিজ্ঞেস করল।
শ্রীকান্ত চোখ না ফিরিয়েই বলতে লাগল—
— “হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর ডাক্তারবাবু খানিকক্ষণ চুপচাপ পরীক্ষা করলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন— ‘আর একটু আগে আনতে পারলে হয়তো মানুষটাকে বাঁচানো যেত…।’ তারপর দু-পা এগিয়ে গিয়ে আবার ফিরে তাকিয়ে বললেন— ‘অনেকটা রক্ত বেরিয়ে গিয়েছিল। সময়মতো রক্তপাত বন্ধ করার ব্যবস্থা করা গেলে হয়তো…’”
শেষ কথাটা আর সম্পূর্ণ করতে পারল না সে। সেই সময় তার চোখ দুটো ছলছল করছিল কি না, তা আমি আজ আর নিশ্চিত করে বলতে পারব না। তবে এটুকু মনে আছে, কথাগুলো শোনার পর আমাদের কারোরই মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দ বেরোয়নি।
আমি নিঃশব্দে নিজের নখ খুঁটতে খুঁটতে জানলার বাইরের গাছটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। কেন জানি না, সেই মুহূর্তে শ্রীকান্তের জন্য বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত কষ্ট অনুভব করছিলাম।
খানিক পরে শ্রীকান্ত নিজেই খুব ধীরে বলল—
— “সেদিনই বুঝেছিলাম… মানুষের রাগ শুধু অন্য কাউকে আঘাত করে না… কখনও কখনও একটা পুরো পরিবারকেও শেষ করে দেয়। রাগ মানুষের ভেতরের মানুষটাকেই মেরে ফেলে।”
সেদিন স্কুল থেকে ফিরে মনটা বড্ড ভারী হয়ে ছিল। শ্রীকান্তের ওই শান্ত চোখের পেছনের জমাট বাঁধা কষ্টটা আমাকে খুব নাড়া দিয়েছিল। বিকেলে দাদুর কাছে বসে শ্রীকান্তের বাবার গল্পটা, আর ওর ওই চুপচাপ মার সহ্য করার কথাগুলো বলেছিলাম।
সব শুনে দাদু সেদিন আমাকে বাহবা দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ম্লান হেসে বলেছিলেন,
“কোনো মানুষ কেন নীরবে সব সহ্য করে যায়, কেন সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে না, কিংবা কেনই বা সকলের দেওয়া অপমান হাসিমুখে মেনে নেয়—তা জানার প্রতি এই সমাজের আগ্রহ খুব কম রে নির্মল। কিন্তু তাকে ‘বোকা’, ‘ক্যাবলা’, ‘খ্যাপা’ বা ‘অস্বাভাবিক’ বলার লোকের এই পৃথিবীতে কোনো অভাব নেই। এই নিষ্ঠুর ভিড়ের মধ্যে কেবল সেই প্রকৃত বন্ধু হতে পারে, যে তার এই নীরবতার পেছনের ভাষাটা বোঝার চেষ্টা করে আর তাকে ঠিক পথে আগলে রাখে।”
(দুই)
এপ্রিল মাসে আমাদের প্রথম পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন পরীক্ষা হলো। সেই পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার দিন আমাদের মধ্যে বেশ একটা চাপা উত্তেজনা ছিল। আমি, রাজ আর অরিজিৎ আগের দিনই ঠিক করেছিলাম—তাড়াতাড়ি গিয়ে একেবারে পেছনের বেঞ্চটা দখল করব। কিন্তু আমাদের পরিকল্পনা মাঠে মারা গেল; ক্লাসে ঢুকতেই আমরা দেখি পেছনের সব জায়গা দখল হয়ে গেছে। যদিও সেদিন আমাদের ক্লাসে খুব বেশি ছাত্রছাত্রী আসেনি।
অগত্যা শ্রীকান্তকে প্রথম বেঞ্চে বসিয়ে দিয়ে আমরা তার ঠিক পেছনের বেঞ্চটাতেই বসলাম।
টিফিনের আগের ক্লাসে সুমন স্যার হাতে একটা খাতা নিয়ে আমাদের ক্লাসে প্রবেশ করলেন। স্যারের হাতের ওই খাতার দিকেই সবার নজর যেন আটকে রইল। স্যার খাতাটি টেবিলের ওপর রেখে একবার পুরো ক্লাসের ওপর চোখ বুলিয়ে নিলেন। তারপর খাতাটি হাতে নিয়ে বলতে শুরু করলেন, “এবারের প্রথম পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন পরীক্ষায়…”
স্যার একটু থামলেন। ক্লাসে তখন পিনপতন নিস্তব্ধতা। স্যারের পরের বাক্যগুলি শোনার জন্য ক্লাসে উপস্থিত সবাই স্যারের মুখের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর স্যার আবার একই গম্ভীর সুরে, “পুরো ক্লাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছে…”
আবারও সেই দীর্ঘ বিরতি। এই সময় রাজ আমার কানে ফিসফিস করে বলল, “প্রতিবারের মতো এবারেও ঝিলিকই প্রথম হবে দেখিস।”
কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে, স্যার নিজের হাতের খাতার দিকে একবার তাকিয়ে স্পষ্ট স্বরে ঘোষণা করলেন—
“শ্রীকান্ত বিশ্বাস।”
শ্রীকান্তর নাম কানে যেতেই আমরা সবাই বিস্ময়ে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলাম। যারা তাকে এতদিন ‘খেপা’, ‘শ্রীক্যাবলাকান্ত’ বলে বিদ্রূপ করে এসেছে , তারাই এখন চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। শ্রীকান্ত অবশ্য পেছন ফিরে তাকাল না; সে শান্তভাবে স্যারের দিকেই মুখ করে বসে রইল।
স্যার একে একে সবার নম্বর বলে চলে যাওয়ার সময় ঝিলিকের সামনে গিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী রে, আজকাল পড়াশোনায় ফাঁকি দিচ্ছিস নাকি?”
ঝিলিক কিছু না বলে একেবারে পাথরের মূর্তির মতো মাথা নীচু করে চুপ করে বসে রইল।
স্যার বেরিয়ে যেতেই ঝিলিক আর নিজেকে সামলাতে পারল না। মুখে দু’হাত চাপা দিয়ে সে ক্লাসের মধ্যেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ওর সেই কান্না দেখে সারা ক্লাসে এক অদ্ভুত, অস্বস্তিকর স্তব্ধতা নেমে এল। যদিও কয়েকজন সেদিকে নজর না দিয়ে নিজেদের কোনো একটা বিষয় নিয়ে বেশ জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিল
শ্রীকান্তও বেশ চুপচাপ বসেছিল, যার আজ সবচেয়ে বেশি আনন্দ করার কথা ছিল, সেও ঝিলিকের কান্না দেখে একেবারে নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল।
কিছুক্ষণ কাঁদার পর ঝিলিক হঠাৎ অদ্ভুত এক স্থিরতায় উঠে দাঁড়াল। চোখের জল না মুছেই, কাউকে কিছু না বলে সে ঝড়ের বেগে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেল। আমরা ভাবলাম হয়তো নিজেকে সামলাতে সে বাইরে কোথাও একটু সময় কাটাতে যাচ্ছে।
কিন্তু একটু পরেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে সে আবার যখন ক্লাসে ফিরে এল, তার হাতে তখন একগুচ্ছ খাতার পাতা। প্রথমে আমরা বুঝতে পারিনি সেগুলো কীসের পাতা। পরে লাল কালির দাগ আর স্কুলের স্ট্যাম্প দেখে বুঝতে দেরি হলো না। স্কুলের অফিস রুম থেকে সে নিজের সমস্ত বিষয়ের উত্তরপত্রগুলো খুঁটিয়ে দেখার জন্য চেয়ে এনেছে।
বেশ কিছুক্ষণ নম্বর মেলানোর পর সে আবার ডুকরে কেঁদে উঠল।
এরপর টানা কয়েকদিন ঝিলিক স্কুলই এল না।
এদিকে শ্রীকান্ত যেন সবার কাছে দুর্লভ রত্ন হয়ে উঠল।মাঝে মাঝে কয়েকজন মজা করে তাকে ‘ভাই’ কিংবা ‘দাদা’ বলে ডাকত। খাতা দেখানোর অনুরোধ তো ছিলই, কেউ কেউ আবার আধা-মজা আধা-গম্ভীর ভঙ্গিতে বলত,
“ পরীক্ষায় একটু দেখাস কিন্তু, তাহলে বিরিয়ানি খাওয়াব!”
একদিন সুদীপ এসে তার কাঁধে হাত রেখে হেসে বলল,
“কী রে শ্রীকান্ত, এখন তো তোর বিশাল ব্যাপার! সামনের পরীক্ষায় দয়া করে একটু দেখাস। যতই হোক আমি তো তোর দাদা হয় বল!”
শ্রীকান্ত শুধু হালকা হেসে মাথা নাড়ল; কিছু বলল না।
বেশ কিছুদিন পর ঝিলিক যেদিন স্কুলে এল, সেদিন তাকে যেন আগের সেই ঝিলিক বলে মনে হলো না। ওর চোখে আর আগের মতো আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি ছিল না। ভেতরে ভেতরে যেন ভীষণ ভেঙে পড়েছে সেটা মুখে না বললেও তার চালচলন দেখলেই বোঝা যায়। তবে সব থেকে বড় অদ্ভুত লাগলো—
টিফিনের সময় কিংবা স্যারের অনুপস্থিতিতে আগে সে একটা বই বের করে গাল ফুলিয়ে পড়াশোনা করতো আর এখন বইটা সামনে খোলা থাকলেও সে জানলার বাইরে শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকে। খাতার পাতায় কলম দিয়ে হিজিবিজি কী সব আঁকিবুকি কাটে। তার যে কী হয়েছিল তা জিজ্ঞাসা করার সাহস আমাদের কারোর ছিল না।
আমাদের স্কুলে ঝিলিকের খুব ঘনিষ্ঠ কোনো বন্ধু ছিল না। ও একটু অহংকারী স্বভাবের ছিল বলেই হয়তো কেউ ওর সঙ্গে খুব একটা মিশত না। তাই ক্লাসে সে বেশিরভাগ সময় একাই বসত। আগে সেই একা বসাটার মধ্যে একটা গর্ব ছিল—যেন সে কারও ওপর নির্ভর করে না। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই একাকীত্ব সত্যিকারের নিঃসঙ্গতায় বদলে গেল।
আগে যেকোনো প্রশ্নের উত্তর ঝিলিক নির্ভয়ে দিত। এখন প্রশ্ন করা হলে সে একটু থেমে যেত, গলা কেঁপে উঠত। উত্তর জানলেও ঠিকভাবে বলতে পারত না। আত্মবিশ্বাসের অভাবে যেমন জড়তা আসে, ওর অবস্থাও ঠিক তেমনই হয়ে গিয়েছিল। যেন ভুল হওয়ার ভয়টা তাকে আগে থেকেই হার মানিয়ে দিত। ফলে ক্রমশ স্যারদের দৃষ্টিও যেন ধীরে ধীরে বদলে গেল। স্যারেরা শ্রীকান্তের খাতা বেশি দেখতেন, তার প্রশংসা করতেন।
ঝিলিকের এমন অস্বাভাবিক আচরণ দেখে কৌতূহলবশত আমরা টিনাদির কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। টিনাদি সম্পর্কে ঝিলিকের জ্যাঠতুতো দিদি হয়। টিনাদি বলেছিল,
“প্রথম পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়নে ঝিলিক কিছু নম্বর কম পেয়েছে শুনে তার বাবা তাকে ভীষণ বকাঝকা করেন। তার বাবা পেশায় একজন ডাক্তার, অত্যন্ত কঠোর স্বভাবের মানুষ। তিনি চান মেয়েও ভবিষ্যতে তাঁর মতো ডাক্তার হোক, তাই পড়াশোনায় সামান্য ব্যত্যয়ও তাঁর কাছে অগ্রহণযোগ্য।”
টিনাদি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “জানিস,
ঝিলিকের বাবা রাগের মাথায় ঝিলিককে স্টিলের স্কেল দিয়ে এতটাই বেধড়ক মারধর করেছিলেন যে, ওর সারা শরীরে লালচে কালশিটে দাগ পড়ে গিয়েছিল।”
টিনাদি একটু থেমে বলল,
“শুধু ওর বাবা নন, ওর মা, এমনকি প্রাইভেটের শিক্ষকরাও ওকে এই নম্বর কম পাওয়া নিয়ে প্রচণ্ড বকাবকি করেছিল।”
আমরা টিনাদির কাছ থেকে আরও জানতে পারি যে ঝিলিক নাকি একদিন চুপচাপ তার কাছে গিয়ে বলেছিল,
“আমি কি সবার চোখে খারাপ হয়ে গেলাম, দিদি?
আমাকে আর কেউ আগের মতো ভালোবাসে না?”
টিনাদি ঝিলিককে কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই নাকি ঝিলিক কান্নায় ভেঙে পড়ে। তাই টিনাদি আর প্রশ্ন না করে শুধু সান্ত্বনা দিয়েছিল।
টিনাদি একটু ভেবে অনুমান করে বলল, “নার্সারি থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতি বছরই ঝিলিক সবার চেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে এসেছে। কোনোদিন কারোর চেয়ে এক নম্বর কম পায়নি। স্কুলের পরীক্ষা হোক বা টিউশনের কোনো পরীক্ষা, সব জায়গাতেই প্রথম স্থানটি বরাবর ওরই দখলে ছিল। এই প্রথম ও কারও চেয়ে কম নম্বর পেল। তাই হয়তো হঠাৎ এই সামান্য পরিবর্তনটুকু প্রাথমিকভাবে মেনে নিতে পারছে না। তাই হয়তো ও এতটা ভেঙে পড়েছে।”
(তিন)
চোখের পলকে কেটে গেল আরও কয়েকটা মাস। মাঝখানে প্রাইভেটের ছোটখাটো পরীক্ষা, স্কুলের দ্বিতীয় পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন, টিফিনের সময়ের হাসি-ঠাট্টা আর নানান ছোটখাটো ঘটনা—সব মিলিয়ে সময়টা যেন নিঃশব্দেই বয়ে গেল। দেখতে দেখতে এসে গেল বার্ষিক পরীক্ষার দিন।
পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর প্রতিবারের মতো এবারও স্কুলে ছুটি পড়ল। ছুটির এই কদিন আমি আর মা মামার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে কিছুদিন কাটানোর পর আমি, মা, মাসি আর বড়মাসির ছেলে মিলে দার্জিলিং ভ্রমণে বেরিয়েছিলাম। পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা কুয়াশা, শীতল হাওয়া আর মেঘের আনাগোনার মধ্যে কয়েকটা দিন যেন স্বপ্নের মতো কেটে গেল। তারপর আবার মামার বাড়িতে ফিরে এসে দু-একদিন থাকার পর আমরা বাড়ি ফিরে এলাম।
তখনও ছুটির কয়েকটা দিন বাকি ছিল। ছুটি শেষ হলেই প্রকাশিত হবে বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল। সারাবছর পড়াশোনা করে পরীক্ষা দেওয়ার পর ফল প্রকাশের আগের দিনগুলো সবসময়ই এক অদ্ভুত অনুভূতির মধ্যে কাটে। একদিকে ছুটির আনন্দ, অন্যদিকে ফলাফল নিয়ে চাপা উৎকণ্ঠা। আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। তবে দার্জিলিং ভ্রমণ আর মামার বাড়ির আনন্দে সেই উৎকণ্ঠা অনেকটাই চাপা পড়ে গিয়েছিল।
বাড়িতে ফিরে প্রথম দিনটা প্রায় অলসভাবেই কেটে গেল। পরদিন বিকেলে হঠাৎ মনে হলো, এতদিন পর বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা দরকার। তারা ছুটিতে কী করল, কেমন কাটাল—এসব গল্পও তো শোনা হয়নি। তাই আগে থেকেই রাজকে ফোন করে পার্কে আসতে বলেছিলাম।
বিকেলে পার্কে গিয়ে দেখলাম রাজ আর অরিজিৎ এসেছে। শুধু শ্রীকান্তকেই দেখতে পেলাম না।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, শ্রীকান্ত কোথায় রে?
অরিজিৎ বলল,
“ওর দাদুর শরীরটা একটু খারাপ হয়েছে। তাই আজ আসেনি।”
কথায় কথায় শ্রীকান্তের প্রসঙ্গ উঠতেই রাজ হঠাৎ বলে উঠল,
“তুই তো সেদিন ছিলিস না। একদিন শ্রীকান্ত এমন কিছু কথা বলেছিল, যেগুলো শুনে আমি নিজেও—।”
আমি কৌতূহলী হয়ে বললাম,
“কী এমন বলেছিল?”
রাজ একটু থেমে স্মৃতি হাতড়ে বলতে শুরু করল—
“সেদিন কি একটা কথা হতে হতে শ্রীকান্ত বলেছিল, ‘এখানে আসার আগে মা আমাকে খুব কড়া করে বলে দিয়েছিল—দাদু তোকে আমাদের সংসারের কষ্টের কথা ভেবেই মামার বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে গিয়ে কোনো ঝামেলায় জড়াবি না, কারও সঙ্গে কোনোরকম খারাপ ব্যবহার কিংবা দুষ্টুমি করবি না। যদি কোনো অভিযোগ আসে, তাহলে কিন্তু তোকে আবার গ্রামে ফিরিয়ে আনবো। জানিস, আমাদের গ্রামের বাড়িটাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। সেখানে আমার শৈশব পড়ে আছে, বন্ধুদের স্মৃতি আছে, আছে মাঠ, পুকুর আর গাছপালা। সবচেয়ে বড় কথা, সেখানে আমার মা আর ছোট ভাই আছে। কিন্তু এখন যদি সেখানে ফিরে যাই, তাহলে মায়ের কষ্ট আরও বেড়ে যাবে।
বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে মা একাই সংসারের সমস্ত দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। আমার ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা, সংসারের খরচ, খাওয়া-দাওয়া, অসুখ-বিসুখ—সব মিলিয়ে এমনিতেই অনেক কষ্টে দিন চলে। আমাদের কিছু জমিজমা আর কয়েকটা পুকুর থাকলেও সেখান থেকে যা আয় হয়, তা দিয়ে সব প্রয়োজন সবসময় মেটানো যায় না।’
তারপর সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ও বলেছিল,
‘বাবা মারা যাওয়ার পর দাদু মাকে শহরে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। মা রাজি না হওয়ায় তিনি অর্থসাহায্য করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মা সেটাও নিতে চাননি। কারণ বাবা সবসময় একটা কথা বলতেন—মানুষ একবার যদি কারও কাছে হাত পাততে শেখে, তাহলে সে হাত আর সহজে মুঠো করতে পারে না। অথচ জীবনের সঙ্গে লড়াই করতে গেলে নিজের হাতটাকে মুঠো করে রাখার শক্তি দরকার। যত বাধাই আসুক, নিজের শক্তির উপর ভরসা হারালে চলবে না।
বাবার সেই কথাগুলো মা আজও ভুলতে পারেনি। তাই দাদু আর বড়মামা অনেক বুঝিয়েও তাকে অর্থসাহায্য নিতে রাজি করাতে পারেননি। শেষে বড়মামা প্রস্তাব দিয়েছিলেন, অন্তত আমাকে যেন তাঁর সঙ্গে পাঠানো হয়। প্রথমে মা তাতেও রাজি হয়নি। কিন্তু পরে আমার পড়াশোনার কথা ভেবে, আর বাবা আমাকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখতেন সেই স্বপ্নের কথা মনে করে শেষ পর্যন্ত রাজি হতে বাধ্য হয়েছিল।’”
রাজ কিছুক্ষণ থেমে রইল।
তারপর মৃদু হেসে বলল,
— “সেদিন ও আরও অনেক কথা বলেছিল। গ্রামের বন্ধুদের কথা, পুকুরে সাঁতার কাটার কথা, মাঠে বিকেলবেলা ফুটবল খেলার কথা, বর্ষার দিনে কাদামাখা পথ ধরে হাঁটার কথা—কত কী! সব আজ আর মনে নেই। তবে একটা কথা আজও মনে আছে—ছেলেটা তার গ্রামকে যতটা ভালোবাসে, তার চেয়েও বেশি ভালোবাসে তার মায়ের সংগ্রাম আর বাবার রেখে যাওয়া স্বপ্নকে।”
রাজের কথা শেষ হওয়ার পর কিছুক্ষণ আমরা কেউই কোনো কথা বললাম না। বিকেলের ম্লান আলোয় পার্কের গাছগুলো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল। কেমন যেন অদ্ভুত এক ভার এসে জমেছিল আমাদের মধ্যে।
এর কিছুদিন পর শেষ হয়ে গেল শীতের ছুটি। এসে গেল সেই বহু প্রতীক্ষিত ফল প্রকাশের দিন। দিনটা যেন অন্য সব দিনের চেয়ে আলাদা ছিল। সকালের হাওয়াতেও যেন এক অদ্ভুত ভারী ভাব মিশে ছিল। সবাই জানত, এই ফলাফলের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সারা বছরের পরিশ্রম, আশা আর হিসাব-নিকাশের ফল।
অবশেষে ঘোষণা হলো—এবারও সর্বোচ্চ নম্বর শ্রীকান্তের। তবে সে প্রথম স্থান অধিকার করবে, এটা প্রায় সবাই আগেই আন্দাজ করেছিল।
প্রথম হওয়ার পুরস্কার হিসেবে তাকে একটি পেন দেওয়া হলো—ছোট্ট, সাধারণ একটি কলম, অথচ তার মূল্য ছিল অসীম। এতদিন যে পুরস্কার ঝিলিক রায়ের হাতেই উঠত, সেটি অন্যের হাতে যেতে দেখে ঝিলিক আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সবার সামনে তার চোখ ভিজে উঠল, মুহূর্তের মধ্যেই সে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
তার এই আচরণে অনেক স্যার–ম্যাম বিরক্তি প্রকাশ করলেন; কেউ কেউ কড়া কথাও শোনালেন। সেদিন ঝিলিক অবশ্য অনেকের সমালোচনা কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল।
শ্রীকান্ত ঝিলিকের এই কান্নার কথা শুনে তার কাছে গিয়ে নিজের পুরস্কার হিসেবে পাওয়া পেনটা তাকে দেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই, ছোটবেলায় শোনা সেই “ছিপ নিয়ে গেল চিলের” মতো ঝিলিক আচমকা শ্রীকান্তের হাত থেকে পেনটা কেড়ে নিয়ে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে দিল।
তারপর বেঞ্চি থেকে উঠে শ্রীকান্তকে ধাক্কা দিয়ে ঠেলে ফেলে দিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে স্কুলের গেটের দিকে চলে গেল।
শ্রীকান্ত অবশ্য তাকে কিছু বলল না। আমরা ছুটে গিয়ে শ্রীকান্তকে ধরে তুললাম। রাজ অবশ্য শ্রীকান্তকে বেশ কড়া করে কথা শোনালো, কিন্তু শ্রীকান্ত তার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে গায়ে লেগে থাকা ঘাস,ধুলো ঝাড়তে লাগল।
তারপর ডাস্টবিনের কাছে গিয়ে পেনটা তুলে নিল। কলের জলে ভালো করে ধুয়ে নিয়ে নিজের জামা দিয়ে মুছে, খুব যত্ন করে পেনটা বুকপকেটে রেখে বাড়ির পথে হাঁটতে লাগল।
সে ফার্স্ট হয়েছে শুনে তার মাতামহ খুব খুশি হয়েছিলেন। পুরস্কারস্বরূপ তাকে একটা অ্যান্ড্রয়েড ফোন কিনে দিয়েছিলেন—যাতে সে আরও ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারে, নোটস রাখতে পারে, অনলাইনে সাহায্য নিতে পারে।
কিন্তু এই ছোট্ট উপহারটাই যেন বাড়ির ভিতরে একটা অদৃশ্য ফাটল তৈরি করে দিয়েছিল। মামার ছেলে-মেয়েদের কিংবা মামিদের যে এই ব্যাপারটা ভালো লাগেনি, তা তারা মুখে কিছু না বললেও, তাদের চালচলন আর অঙ্গভঙ্গিতেই শ্রীকান্ত সবটা বুঝে নিয়েছিল।
অন্যদিকে, ঝিলিকের কাকার ছেলে পল্টুর মুখে শুনেছিলাম—ঝিলিকের মা যখন শুনলেন যে সে ক্লাসে দ্বিতীয় হয়েছে, তখন তার এই ‘অবনতি’র জন্য তিনি নাকি ঝিলিককে স্টিলের স্কেল দিয়ে বেধড়ক মারধর করেছিলেন এবং সেদিন রাতে তাকে কিছু খেতেও দেননি।
ঝিলিকের বাবা একটা কাজে কয়েকদিনের জন্য বাইরে গিয়েছিলেন। তিনি বাড়ি ফিরে এসে যখন এসব কথা জানতে পারলেন, তখন তিনিও ঝিলিককে বেশ মারধর করলেন এবং তাকে ক্লাস সেভেনে প্রথম হওয়ার জন্য যে সোনার ব্রেসলেট দিয়েছিলেন, সেটাও কেড়ে নিলেন। ঝিলিকের মা নাকি কঠোর গলায় বলে দিয়েছিলেন—এবার যদি সে আগের মতো প্রথম স্থান অধিকার করতে না পারে, তাহলে তার পরিণতি আরও ভয়ংকর হবে।
সেদিনের পর থেকেই ঝিলিককে আরও মনমরা লাগতে শুরু করল। তাকে প্রায়ই স্টেশন কিংবা পার্কে একা বসে থাকতে দেখা যেত। স্কুল ছুটি হওয়ার পরও সে বাড়ি না ফিরে আমাদের শহরের উত্তর ক্লাবের বাগানে পায়চারি করত। গাছপালায় ঘেরা সেই নির্জন পরিবেশে, পাখিদের সঙ্গেই যেন নিজের মনে কীসব বিড়বিড় করত।
একদিন টিউশন থেকে বাড়ি ফেরার পথে, অন্যমনস্ক হয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে প্রায় গাড়ির নিচে পড়ে যাচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে এক ভদ্রলোক তার হাত ধরে টেনে সরিয়ে নেন। তারপর তিনি যখন তাকে বকাঝকা করছিলেন, ঝিলিক কিছুই বলল না—চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। যেন কোনো কথাই তার কানে পৌঁছাচ্ছে না।
এরপর সে নীরবে, মাথা নিচু করেই সেখান থেকে চলে গেল।
(চার)
নবম শ্রেণিতে ওঠার কয়েক মাস পর একদিন টিফিনের সময় আমরা কয়েকজন বন্ধুরা মিলে যখন ক্লাসের ভেতর হাসাহাসি আর গল্পের ঝড়ে মেতে আছি, ঠিক তখনই ঝিলিকের কাকার ছেলে ঘরে ঢুকে এক অঘোষিত বোমা ফাটাল। সে জানাল, ঝিলিক নাকি শ্রীকান্তের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে আমাদের স্কুলের সাইকেল স্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছে। আমরা পল্টুকে চকলেটের লোভ দেখিয়ে জানতে পারি ঝিলিক নাকি শ্রীকান্তকে কিছু বলবে বলে ডেকেছে। কথাটা কানে যেতেই আমরা সবাই যেন একসঙ্গে থমকে গেলাম। যে মেয়েটা স্কুলে প্রায় কারোর সঙ্গেই কথা বলত না, সে কিনা শ্রীকান্তকে ডাকছে—তাও শুধু তার সঙ্গেই কথা বলবে বলে।
দেশের ডাকে যখন কোনো সৈনিক যুদ্ধক্ষেত্রে পা বাড়ায়, তখন তার আত্মীয়-স্বজন যেমন উৎকণ্ঠা নিয়ে পথ চেয়ে থাকে—শ্রীকান্ত দেখা করতে যাওয়ার পর আমাদের কয়েকজনের অবস্থাও সেরকম হয়ে উঠেছিল।
সময়ের সঙ্গে সমানুপাতিক হারে আমাদের আগ্রহ বাড়তে লাগল। এমনকি ঘুড়ির কাঁটার সেই ধীর, শ্লথ চালচলনও আমাদের কাছে অসহ্য বোধ হতে লাগল।
আমাদে কল্পনা-জল্পনা যেন দড়ি বেয়ে ওপরে উঠছিল, কিন্তু কিছুটা এগিয়ে যখন বোঝা যায় যে এই দড়ির সাইজ ছোটো সেখান থেকে নেমে আরেকটা দড়ি ধরতে হয়। কিন্তু সেখানেও একই পরিণতি; সেই দড়িও সীমিত। এভাবেই বারবার ওঠানামার এই ক্লান্তিকর খেলায় ডুবে থাকতে থাকতে, হঠাৎই যেন মঞ্চে শ্রীকান্তের আবির্ভাব ঘটল।
তাকে দেখামাত্রই অরিজিৎ জিজ্ঞেস করল,
“হ্যাঁরে শ্রীকান্ত! তোকে ঝিলিক কী বলল রে?”
“তেমন কিছু না, পেনটা ছুঁড়ে ফেলার জন্য আমার কাছ থেকে ক্ষমা চাইল। আর…”
সে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু
তাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে রাজ রসিকতা করে বলল,
“এ যে দেখছি ভূতের মুখে রাম রাম! কালে কালে কত কিছু হল, কুকুরেরও ডানা গজাল।”
তবে এই সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে ক্লাসের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে গেল। ঝিলিক আর শ্রীকান্তের এই অভাবনীয় মোলাকাত নিয়ে জল্পনা চলল ছুটি হওয়ার আগে পর্যন্ত। অরিজিৎ অবাক হয়ে বলল, “যে মেয়েটা ক্লাসের কাউকে কোনোদিন মানুষ বলে গণ্য করেনি, সে কিনা শেষমেশ শ্রীকান্তকে কথা বলার জন্য ডাকল!”
রাজের রসিকতায় কিশোরসুলভ চপলতা ছিল, সে বাঁকা হেসে বলল, “ব্যাপারটা নির্ঘাত অনুরাগের রে ভাই!” আমরা হাসলাম বটে, কিন্তু ঝিলিকের এই আকস্মিক পরিবর্তন আমাদের বিস্ময় জাগাল। জয় অবশ্য গম্ভীর মুখে মন্তব্য করল, “অহংকার আর কতদিন টেকে? হয়তো নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে।”
সেদিনের পর থেকেই প্রায়ই চোখে পড়ত—ঝিলিক আর শ্রীকান্ত কখনো একান্তে কথা বলছে, কখনো পাশাপাশি বসে টিফিন খাচ্ছে কখনো আবার মাঠের এক কোণে গল্পে মেতে উঠছে। সবকিছুই যেন চলছিল জোড়ায় জোড়ায়। মাঝে মাঝে তাদের দুজনকে পার্কে ঘুরে বেড়াতো দেখা যেত।
সেদিন অঙ্কের ক্লাসে সুরজিৎ স্যার আসতেই শ্রীকান্ত একটা বই নিয়ে সোজা চলে গেল স্যারের টেবিলের সামনে। একটা অঙ্ক দেখিয়ে তার সমাধান জানতে চাইল। প্রশ্নটা দেখেই স্যারের চোখদুটো যেন চকচক করে উঠল।
স্যার কখনো, টেবিলে রাখা শ্রীকান্তের খাতা দিকের ঝুঁকে খসখস করে কলম চালাতে লাগালেন, কখনো আবার থেমে গিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে মগ্ন হলেন গভীর ভাবনায়। বেশ কিছুক্ষণ পর স্যার ঘাড় তুলে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “স্টুডেন্টস, আজকে একটা দারুণ অঙ্ক পেয়েছি! তোমরা সবাই খাতা বের করো, আমি বোর্ডে যেটা করাচ্ছি সেটা টুকে নাও।”
তারপর তিনি শ্রীকান্তের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি গিয়ে বস। আমি প্রশ্নটা সহ অঙ্কের সমাধান বোর্ডে লিখে বুঝিয়ে দিচ্ছি।”
ওই অঙ্কটা সহ আরও বেশ কিছু অঙ্কের সমাধান করাতে করাতেই চতুর্থ পিরিয়ড শেষের ঘণ্টা বেজে উঠল। সুরজিৎ স্যার বেরিয়ে যেতেই আমি শ্রীকান্তের কাছ থেকে অঙ্কের সেই বইটা নিয়ে উলটেপালটে দেখতে লাগলাম। আমার পাশে বসে থাকা রাজ বইটা দেখে শ্রীকান্তকে জিজ্ঞেস করল, “অঙ্কের এই প্রশ্নবিচিত্রাটা কবে কিনলি রে শ্রীকান্ত?”
শ্রীকান্ত নির্লিপ্ত মুখে বলল, “এটা আমি কিনিনি, এটা ঝিলিকের বই।”
এ কথা শুনে আমরা রীতিমতো অবাক! অরিজিৎ আবার জিজ্ঞেস করল, “কার বই?”
শ্রীকান্ত আগের মতোই একই উত্তর দিল।
আমাদের বিস্ময়ের কারণও ছিল যথেষ্ট। ঝিলিক নিজের বই দেওয়া তো দূরের কথা, কাউকে কোনোদিন কয়েক মুহূর্তের জন্য একটা কলম পর্যন্ত ছুঁতে দেয়নি! সেই মেয়ে কিনা শ্রীকান্তকে আস্ত অঙ্কের বই দিয়ে দিল!
অরিজিৎ শ্রীকান্তকে জেরা চালিয়ে গেল, অরিজিৎ আবার জিজ্ঞাসা করলো, “ঝিলিকের মতো মেয়ের কাছ থেকে তুই বইটা পেলি কী করে?”
শ্রীকান্ত বলল, “আসলে আমি ঝিলিকের কাছ থেকে এই বইটা পরশুদিন চেয়েছিলাম…”
রাজ মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে বলল, “এক মিনিট! পরশু মানে তো রবিবার। রবিবার তো আমাদের কোনো প্রাইভেট থাকে না, তাহলে তোর সঙ্গে ওর দেখা হলো কী করে?”
প্রত্যুত্তরে শ্রীকান্ত বলল, “পরশুদিন সকালে আমি ঝিলিককে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করে চেয়েছিলাম। আর…”
ওকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই অরিজিৎ বলে উঠল, “তুই ওর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর পেলি কোথায়?”
শ্রীকান্ত শান্ত গলায় জবাব দিল, “কেন! ঝিলিকই আমাকে ওর ফোন আর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর দিয়েছে।”
এ কথা শুনে আমরা যেন আকাশ থেকে পড়লাম। কারণ পুরো ক্লাসে আমাদের কারও কাছেই ঝিলিকের নম্বর ছিল না।
এরপর আমরা ব্যাগ থেকে টিফিন বের করে খেতে শুরু করলাম। খাওয়ার ফাঁকে প্রতিদিনের মতো আড্ডাও চলতে লাগল। কিছুক্ষণ পর গল্পগুজবের মাঝে রাজ মুখভরা হাসি নিয়ে শ্রীকান্তকে খোঁচা দিয়ে বলল, “তা আজকে তোর ওই ঝিলিক বান্ধবী আসেনি কেন রে?”
অরিজিৎ ফোড়ন কাটল, “দেখ, অঙ্কের বইটা শ্রীকান্তকে দিয়েছে বলে চিন্তায়, চিন্তায় হয়তো রাতে ওর ঘুমই হয়নি! তাই আসতে পারিনি স্কুলে!”
আমরা সবাই হো হো করে হেসে উঠলাম। শ্রীকান্তও আমাদের সাথে হাসিতে যোগ দিল, তারপর হাসি থামিয়ে বলল, “আরে না না। আসলে কাল রাতে ঝিলিকের দিদা মারা গেছেন। তাই ও এখন মামারবাড়িতে আছে।”
অরিজিৎ চোখ পাকিয়ে বলল, “বাব্বা! তুই তো এখন ঝিলিকের বেশ ভালোই খবর রাখিস দেখছি!”
রাজ আরও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় রমেশ কাকু এসে জানালেন যে, আজ আমাদের স্কুলের প্রাক্তন হেডমাস্টারমশাই স্বর্গলাভ করেছেন। তাই কিছুক্ষণ পর স্কুল মাঠে তাঁর শোকসভা পালন করে—আজকে স্কুল ছুটি দিয়ে দেওয়া হবে। কালকের দিনটাও স্কুল ছুটি থাকবে।
এ কথা শোনার পর আমাদের আড্ডার মোড় ঘুরে গেল প্রাক্তন হেডস্যারকে নিয়ে। হেডস্যার যখন রিটায়ার করেন, তখন আমরা এই স্কুলে ভর্তি হইনি। তাই তাঁকে সামনাসামনি কোনোদিন দেখিনি। তবে সিনিয়র দাদাদের মুখে কিংবা সহপাঠীদের কাছ থেকে জেনেছিলাম, তিনি বড্ড রাগী মানুষ ছিলেন। এমনকি আমাদের এখনকার হেডস্যারের চেয়েও নাকি বেশি কড়া ছিলেন। সিনিয়রদের কাছ থেকে অথবা সহপাঠীদের কাছ থেকে কে কী শুনেছে, তা নিয়ে তুমুল আলোচনা শুরু হলো। আমাদের সাথে আরও কিছু ছেলেও যোগ দিল। হেডস্যারকে নিয়ে বেশ কিছু কথা উঠে এল, কেউ কেউ আবার নিজেদের মতো রং চড়িয়ে গল্পও বানাতে লাগল। তার কতটা সত্যি আর কতটা মিথ্যা, সেটা ভগবানই জানেন! যাই হোক, এসব আলোচনার মাঝেই হঠাৎ সশব্দে ঘণ্টা বেজে উঠল। আমরা সবাই পিঠে ব্যাগ নিয়ে একে একে মাঠে জড়ো হতে লাগলাম। দু-মিনিট নীরবতা পালন করার পর আমরা স্কুল থেকে বেরিয়ে পড়লাম।
(পাঁচ)
আস্তে আস্তে ঝিলিকের এই নম্বর দেওয়া, বই দেওয়া, গোপন কথোপকথন আর জোড়ায় জোড়ায় ঘুরে বেড়ানো দেখে ক্লাসের অনেক ছেলের মনেই নিঃশব্দে একটা ধারণা জন্মে গিয়েছিল—ওরা বুঝি প্রেমিক-প্রেমিকা।
তবে শ্রীকান্ত যখনই সেই গোপন কথোপকথন সেরে আমাদের কাছে ফিরে আসত, তখন আমাদের মধ্যে যেন এক অঘোষিত উৎসব শুরু হয়ে যেত। একঝাঁক কৌতূহলী প্রশ্ন নিয়ে আমরা তাকে এমনভাবে ছেঁকে ধরতাম, যেন সে কোনো মহাদেশ জয় করে ফেরা এক ক্লান্ত সেনানায়ক।
সবার মুখেই তখন তিরের মতো ধেয়ে আসা সব প্রশ্ন—“কী রে, আজ কী কথা হলো?”, “এবার কে আগে ডাকল? তুই না ও?”, “নতুন কোনো রহস্যের হদিস দিল নাকি?” শ্রীকান্তের সেই লাজুক নীরবতা আমাদের উত্তেজনার আগুনে আরও ঘৃতাহুতি দিত।
আস্তে আস্তে আমরা ওকে রাগানোর জন্য বিভিন্ন ফন্দি আঁটতে লাগলাম। কখনো খাতার পাতায় একটা বড়ো লাভ চিহ্ন এঁকে, তার ভেতরে ঝিলিক আর শ্রীকান্তের নাম লিখে ওকে দেখাতাম। কখনো আবার কানের গোড়ায় ফিসফিস করে বলতাম, ‘ওই দেখ, তোর বান্ধবী—তোর দিকেই তাকাচ্ছে।’
শ্রীকান্ত কখনো একটু বিরক্ত হতো, আবার কখনো শুধু মুচকি হাসত। আর আমরা সেই হাসিটাকেই ওকে আরও একটু খ্যাপানোর অজুহাত বানিয়ে নিতাম।
এরকমই একদিন টিফিনের সময় আমরা স্কুলের গ্রাউন্ডের এক গাছতলায় বসে শ্রীকান্তকে রাগাচ্ছিলাম। রাগানোর এক পর্যায়ে রাজ বলে উঠল,
“তুই তো ঝিলিককে প্রপোজ করতে পারিস। তাহলে আর কিছু না হোক, আমাদের দলের কারোর তো একজনের গার্লফ্রেন্ড থাকবে!”
আমরা হো-হো করে হেসে উঠলাম।
অরিজিৎও সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠল,
“সেই ভালো! শ্রীকান্ত, তুই রাজি হয়ে যা।”
শ্রীকান্ত একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল,
“আরে ভাই, ও আমার বন্ধু।”
রাজ তৎক্ষণাৎ বলল,
“আরে বাবা, বন্ধু থেকেই তো প্রেম হয়!”
অরিজিৎ এবার একটু নাটকীয় ভঙ্গিতে, গলা নামিয়ে–উঁচিয়ে, একেবারে সিনেমার ডায়লগ বলার মতো করে বলল,
“সিনেমায় দেখিসনি নাকি? প্রথমে নায়ক-নায়িকার মধ্যে বন্ধুত্ব… তারপর আস্তে আস্তে, ধীরে ধীরে প্রেম… তারপর একটু মারামারি, একটু নাটক—আর শেষে গিয়ে ভালোবাসা একদম ফুল ফাইনাল!”
আমরা আবার হো-হো করে হেসে উঠলাম। আমি আর অরিজিৎ হেসেই যাচ্ছি এমন সময় আমাদের বন্ধু রাজ যাহোক করে হাসি থামিয়ে বলে ওঠে,
“সেই তো! সিনেমায় তো এরকম টাই দেখেছি। হ্যাঁ-হ্যাঁ, শ্রীকান্ত তুই রাজি হয়ে যা!”
শ্রীকান্ত বলে ওঠে,
“আরে নারে বাবা অসুবিধা আছে”
আমিও এতক্ষণ তাদের এই কথোপকথন শুনে হেসে যাচ্ছিলাম। তবে কিছু না বললেই নয়! তাই আমিও তাকে রাগানোর উদ্দেশ্যে বললাম,
ক্যাঁ রে? প্যায়ার করনে মে এতনা ডর কিস বাত কা? বড়ে বড়ে কেস মে ভি ছোটি ছোটি বাতেঁ হোতি রহতি হ্যায়।
আমার এই কথা শুনে রাজ ও অরিজিৎ তো হাসতে হাসতে শুয়ে পড়লো। আমিও অবশ্য এদের হাসিতে যোগ দিলাম। কিন্তু এবারের হাসিটা আগের মত বেশিক্ষণ চলল না।
হঠাৎ শ্রীকান্ত বলে ওঠে,
“আমি আমার মায়ের পছন্দ করা মেয়েকেই একমাত্র বিয়ে করবো। তাছাড়া আর কাউকে নয়। প্রেম করে বিয়ে করে আমি আমার মায়ের সম্মান একটুও ক্ষুন্ন করবো না।”
তার এই কথা শুনে আমরা আকাশ থেকে পড়লাম। আমি তাকে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেই যাচ্ছিলাম তখন কেমন করে জানি না, অরিজিৎ প্রাচীন সাধুদের মতো আমার মনের কথা বুঝতে পেরে নিজে বলে উঠলো,
“প্রেম করার সঙ্গে মায়ের সম্মানের কি সম্পর্ক রে ভাই?”
“আসলে আমি যে গ্রামে থাকি, আমাদের গ্রামসহ আশেপাশের আরও কয়েকটা জায়গায় একটা ভ্রান্ত ধারণা খুব গভীরভাবে গেঁথে আছে। সেখানে কেউ যদি প্রেম করে বিয়ে করে, তখন শুধু সেই ছেলে-মেয়েকেই নয়—তার পুরো পরিবারকেই নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। অনেকেই ভাবে, বাবা-মা ঠিকভাবে সন্তানকে মানুষ করতে পারেনি বলেই নাকি এমনটা হয়েছে।
ঝগড়া-বিবাদের সময় তো এই বিষয়টা অস্ত্র হয়ে ওঠেই, এমনকি অন্য সময়ও সুযোগ পেলেই আড়ালে-আবডালে সেই বিয়ে নিয়ে বাবা-মাকে কটাক্ষ আর খোঁটা শুনতে হয়।
ওখানে বাঁশের তৈরি বসার মাচা, কিংবা পাড়ার ক্লাব—এই জায়গাগুলো শুধু আড্ডার জন্য নয়, অনেক সময় সেগুলোই হয়ে ওঠে বিচার-বিশ্লেষণ আর পরনিন্দার আসর। কেউ সামনে না থাকলেই তার ব্যক্তিগত বিষয়গুলো নিয়েই আলোচনা শুরু হয়ে যায়, আর সেখানেই ঠিক হয়ে যায় কে ভালো, আর কে অযোগ্য।”
শ্রীকান্ত একটু থেমে, গম্ভীর গলায় বলল,
“এইসব কথা কিন্তু শুধু মাচা বা ক্লাবেই আটকে থাকে না। সেখান থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে বাড়ির ভেতরেও ঢুকে পড়ে—মহিলাদের আড্ডায়, পাড়ার উঠোনে, এমনকি নিজেদের ঘরের মধ্যেও সেই একই আলোচনা চলতে থাকে।
আর শুধু প্রেম করে বিয়ে নিয়েই নয়—আরও কত কিছু নিয়েই কথা হয়! ধর, কোনো মেয়ের স্বামী যদি অল্প বয়সে মারা যায়, তাহলে তাকে ইত্যাদি ইত্যাদি খারাপ কথা বলা হয়। আবার বিয়ের দুই-এক বছরের মধ্যে যদি সন্তান না হয়, তাহলে তাকে কত রকম কথা যে শুনতে হয়—তা বলে বোঝানো যায় না।
কেউ যদি নিজের সুবিধামতো শাড়ির বদলে চুড়িদার বা নাইটি পরে বাড়ির ছাদে বা উঠোনে কাজ করে, তাহলেও রেহাই নেই—সেটাকেও নিয়ে শুরু হয়ে যায় কানাঘুষো আর সমালোচনা।”
তার কথা শুনে আমরা একটু থমকে গেলাম। এমনটা এখনও কোথাও হয়—এটা যেন ঠিক বিশ্বাসই হচ্ছিল না।
শ্রীকান্ত সেখান থেকে সরে যেতেই রাজ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “এইসব বলে আসলে নিজেকে বাঁচাচ্ছে রে! একেবারে খাঁটি অজুহাত।”
কয়েকদিন পর, একদিন পার্কে বসে আমরা এই বিষয়েই আলোচনা করছিলাম। ঠিক তখনই অর্ণব এসে আমাদের সঙ্গে বসল। আমাদের কথা শুনে সে বলল,
“শ্রীকান্ত তোদের অজুহাত দিচ্ছে না রে। আমার মামার বাড়িও গ্রামে—আমি ব্যাপারটা জানি।”
আমরা সবাই তার দিকে তাকালাম। অর্ণব বলতে শুরু করল,
“আমার ছোট মাসি পাশের গ্রামের এক ছেলেকে ভালোবাসত। ছেলেটা কিন্তু বেকার ছিল না—ব্যাংকে চাকরি করত। কিন্তু এই কথা জানাজানি হতেই বাড়িতে ঝামেলা শুরু হয়ে গেল।
আমার দিদার সঙ্গে মাসির ভীষণ ঝগড়া হয়। শুধু দিদা নয়—বড় মামা, মেজ মামা, এমনকি দাদুও এতে জড়িয়ে পড়েন। আমার মামার বাড়ি ‘মাস্টারবাড়ি’ নামে পরিচিত—দাদু ছিলেন স্কুলশিক্ষক, মামারা কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার। সেই সম্মান নষ্ট হয়ে যাবে—এই ভয়েই এত বড় ঝগড়া। তাছাড়া আমার দিদা পরে যখন জানতে পারে যে তার মেয়ের ভালোবাসার মানুষটি একটু নিচু জাতির তখন আরো তুমুল ঝগড়া হয়। ”
অর্ণব একটু থেমে বলল,
“শেষে পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে দিদা মাসিকে ‘মাথার দিব্যি’ দিয়ে বসেন।”
রাজ জিজ্ঞেস করল,
“তুই এত কিছু জানলি কী করে?”
অর্ণব বলল,
“ঝগড়ার সময় আমি আর আমার বড় মাসির ছেলে পাশের ঘরে দাঁড়িয়ে সব শুনেছিলাম।”
অরিজিৎ একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল,
“তারপর কী হলো তোর মাসির?”
এই প্রশ্ন শুনতেই অর্ণবের চোখ ভিজে উঠল। সে আর কিছু না বলে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল এবং পার্কের দরজার দিকে হাঁটতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আমাদের চোখের আড়াল হয়ে গেল।
আমরা কেউ তাকে আর ডাকলাম না। শুধু বুঝতে পারলাম—তারপর যা-ই হয়ে থাকুক, সেটা ভালো কিছু হয়নি।
সেই দিনের পর বহুবার অর্ণবের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছে, কিন্তু আমরা আর কোনোদিন সেই প্রশ্নটা করিনি।
যাই হোক, আমরা কয়েকজন জানতাম—শ্রীকান্ত কোনোদিনই তার মায়ের মাথা হেঁট করবে না; তবুও সুযোগ পেলেই তাকে রাগাতাম। তার কাছে যেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে ছিল—‘লোকে কী বলবে’—এই ভাবনাটা।
তবে আমরা যে শুধু তাকে খ্যাপাতাম, তা নয়। বিষয়টার অসারতা বোঝানোর জন্য আমরা বারবার চেষ্টা করেছি। নানা মনীষীর উক্তি শুনিয়েছি, নিজেদের মতো করে যুক্তি দিয়েছি। এমনকি ইউটিউব বা ফেসবুকে এই বিষয় নিয়ে কোনো কার্টুন বা ভিডিও পেলেই সেটা তার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেখার জন্য অনুরোধও করেছি। কিন্তু কে শুনে কার কথা! আমাদের সব যুক্তি, সব বোঝানোর চেষ্টা যেন পাথরের দেয়ালে ছুড়ে দেওয়া কাঁচের বলের মতো—ধাক্কা খেয়েই চুরমার হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ত, অথচ পাথরের চেহারায় একচুলও পরিবর্তন আনতে পারত না।
কয়েকদিন ধরে একই বিষয় নিয়ে রাগাতে রাগাতে একসময় আমাদেরও যেন আগ্রহটা কমে গিয়েছিল। শ্রীকান্তকে আর সেভাবে খ্যাপানো হতো না—সবকিছু যেন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছিল।
এরই মধ্যে একদিন আমরা সৌরভ স্যারের কাছে ভৌতবিজ্ঞান পড়তে গিয়েছিলাম। প্রতিদিনের মতো এক ঘণ্টা পড়িয়ে স্যার ছুটি দিয়ে দিলেন। তবে বেরিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের কয়েকজনকে তিনি একটু দাঁড়াতে বললেন—কিসের একটা দরকারি কথা বলা জন্য।
সবাই চলে গেলে সৌরভ স্যার আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আচ্ছা, তোরা কাল একবার এখানে আসতে পারবি? একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করার আছে। আমি ভাবছি, এ বছর থেকে এখানে সরস্বতী ঠাকুর আনব। সে জন্য তোদেরই একটু দায়িত্ব নিতে হবে। তোরা তো জানিস, আমি ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়াই। ক্লাস টেনের ছেলেমেয়েদের সামনে মাধ্যমিক পরীক্ষা, তাই ওদের আর বাড়তি কাজে জড়াতে চাই না। এখন ভরসা বলতে তোরাই আছিস।”
আমরা সবাই মিলে রাজি হয়ে গেলাম। স্যারের অনুমতি নিয়ে স্যারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। গল্প করতে করতে এগোচ্ছি—এমন সময় হঠাৎ শ্রীকান্তের ফোনটা বেজে উঠল।
শ্রীকান্ত প্যান্টের পকেট থেকে ফোনটা বের করে এক মুহূর্ত বিস্মিত হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। তারপর একটু অবাক গলায় বলল,
“এই সময় ঝিলিক আবার আমায় ফোন করছে কেন?”
রাজ সঙ্গে সঙ্গে হেসে বলল,
“প্রেমিকা প্রেমিককে ফোন করবে—এটাই তো স্বাভাবিক!”
শ্রীকান্ত একটু বিরক্ত গলায় বলল,
“আরে ধুর! আমরা শুধুই বন্ধু।”
এরপর রাজ আর সুযোগ ছাড়ল না। শ্রীকান্তকে আরও খ্যাপানোর জন্য গলা খাঁকারি দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল—
“ওই হহে…
আয় হাহে…
বন্ধুগণ শোনো হে,
বন্ধু পড়েছে প্রেমে,
ঝিলিক রায়ের ফ্রেমে!”
শ্রীকান্ত বলল,
“দেখ রাজ, এইসব উল্টোপাল্টা ভাবিস কেন বল তো? ও হয়তো আমাকে কোনো দরকারে ফোন করছে।”
রাজ বলল,
“তাহলে ফোনটা জোরে দে দেখি, আমরাও শুনি। আর হ্যাঁ, ওকে কিন্তু কিছু বুঝতে দিলে হবে না যে তুমি ফোনটা জোরে দিয়েছ।”
শ্রীকান্ত বলল,
“ঠিক আছে, শোন তাহলে।”
তারপর শ্রীকান্ত ফোনটার লাউডস্পিকার অন করে বলল—
“হ্যালো।”
ওপাশ থেকে ভেসে এল,
“তুই কোথায়?”
“এই তো, স্যারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি।”
“তা তুই এতক্ষণ কী করছিলি স্যারের কাছে?”
“স্যার আমাদের সঙ্গে একটু আলোচনা করছিলেন।”
“কীসের আলোচনা?”
“আসলে তেমন কিছু না। এবছর সৌরভ স্যার তার বাড়িতে সরস্বতী পুজো করবেন, সেটা নিয়েই একটু আলোচনা করছিলেন।”
“তা তোর সঙ্গে আর কেউ আছে নাকি?”
এই কথা শুনে রাজ শ্রীকান্তের সামনে গিয়ে ইশারা করে ‘না’ বলতে বলল।
শ্রীকান্ত বলল,
“না।”
“তাহলে তাড়াতাড়ি আয়, আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি।”
“কেন?”
“এই একটু গল্প করতে করতে যেতাম। একা একা যেতে ভালো লাগে না। তুই এলে একটু মজা করতে করতে যেতাম।”
একটু থেমে নরম সুরে বলল,
“তুই থাকলে কাউকে একজনকে রাগাতে পারতাম।”
এই বলে সে হাসতে শুরু করল।
শ্রীকান্ত বলল,
“ঠিক আছে, যাচ্ছি। দাঁড়া।”
ফোনটা রেখে দিতেই রাজ শ্রীকান্তের গলা জড়িয়ে ধরে হাসতে হাসতে বলল,
“বন্ধু, বিশাল ব্যাপার তো!”
তারপর শ্রীকান্ত কী যেন একটা বলতে যাবে, তাকে বলতে না দিয়ে রাজ সামনে গিয়ে বাচ্চা ছেলেদের মতো তিরিং-বিরিং করে লাফাতে লাফাতে গান ধরল—
“তারাপীঠে গিয়ে,
টোপর মাথায় দিয়ে,
শ্রীকান্ত করবে বিয়ে,
ঝিলিককে সঙ্গে নিয়ে।
ঝিলিককে করবে বিয়ে,
সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে।
উপহার দেব গিয়ে,
খাব কবজি ডুবিয়ে।”
তারপর বেসুরের এই গান থামিয়ে তার কাছে এসে তার সামনে গিয়ে তার গাল দুটো দুআঙুলে টিপে ধরে নিজের মুখ নাড়িয়ে নাড়িয়ে–
“আমরা সবাই গিয়ে,
শ্রীকান্তের দেখব বিয়ে।”
শ্রীকান্ত বলল,
“আরে, ওই সব কিছু নয়। এইসব উল্টোপাল্টা ভাবিস না।”
অরিজিৎ-ও সুযোগ ছাড়লো না। সেও শ্রীকান্তকে পাশ থেকে কোমরে করে এক ধাক্কা মেরে তার সামনে গিয়ে–
“বন্ধুর মনে লেগেছে রং,
ভালো লাগে কি তোর ঢং!
পড়েছে প্রেমে আমাদের শ্রীকান্ত,
তোরা দু-একটা গোলাপ আন তো।
ঝিলিক রায়ের ছবি—
ফ্রেমে বাঁধিয়ে আনবি!”
শেষমেশ পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে শ্রীকান্ত সেখান থেকে চুপচাপ চলে গেল।
(ছয়)
সরস্বতী পুজোর আর মাত্র চার দিন বাকি। চারপাশ এখন উৎসবের রঙ, আলো আর ব্যস্ততায় ভরে গেছে। স্কুলের মাঠে একটা ভ্যান এসে থেমেছে। ভ্যানে অনেকগুলো প্যান্ডেল খাটানোর বাঁশ বোঝাই করা আছে। কয়েকজন লোক সেই বাঁশগুলো নামিয়ে মাঠের একপাশে সাজিয়ে রাখছে।
আমাদের বিদ্যালয়ে প্রতি বছর সরস্বতী পুজো উপলক্ষে এক বিশাল প্যান্ডেল নির্মাণ করা হতো। পুরো খেলার মাঠটাই যেন এক মায়াবী চাদরে ঢাকা পড়ে যেত। ফলে বৃষ্টি হোক কিংবা কড়া রোদ—কোনো কিছুই আমাদের পুজোর আনন্দে বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটাতে পারত না।
মা সরস্বতীর বেদীটি নানা রঙের কাগজ, কাগজের ফুল ও অন্যান্য সাজসজ্জার উপকরণ দিয়ে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সাজানো হতো। শুধু প্রতিমার বেদীই নয়, পুজো উপলক্ষে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চটিও আকর্ষণীয়ভাবে সাজানো হতো।
প্রতি বছর সরস্বতী পুজোর দিন আমাদের স্কুল থেকে ছাত্রছাত্রীদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হতো। গত বছর তো রাইস, নান পরোটা, পনির, চাটনি, পাঁপড় আর দুটি করে রসগোল্লা খাওয়ানো হয়েছিল। এবছরও নিশ্চয়ই সেরকমই কিছু জম্পেশ আয়োজন হবে।
অবশ্য দুপুরের সেই রাজকীয় মেনুর পাশাপাশি পুজোর আসল ম্যাজিক লুকিয়ে থাকত অঞ্জলির শেষের ওই এক বাটি খিচুড়ির প্রসাদে। সেই খিচুড়ির স্বাদ এতই অসাধারণ হতো যে একবার খেলে কোনোমতেই মন ভরত না। গরম গরম, মশলার ঘ্রাণে ভরপুর, এক চামচ মুখে দিলেই যেন মনটা একেবারে জুড়ে যেত। তাই বার বার লাইনে দাঁড়িয়ে লুকিয়ে-ছিপে আরেক বাটি নিয়ে খেতাম।
স্যারেরা কিংবা অফিসের স্টাফরা মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে বলতেন,
“এই! কেউ একবারের বেশি নিবি না! যারা নিচ্ছিস তাদের কিন্তু আমি মুখ দেখে রাখছি।”
তবে স্যারেরা জানতেন—যতই মানা করুক না কেন, আমাদের মতো কিছু দুষ্টু ছেলে বারবার খিচুড়ি নেবে। তাই আগে থেকেই অনেক বেশি খিচুড়ি রান্না করে রাখা হতো। আর বাটিও একেবারে ভর্তি করে দিত না।
আজ ক্লাস শেষ হলেই সরস্বতী পুজোর ছুটি পড়বে—এই ভাবনাতেই সকাল থেকেই মনটা কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠেছিল। প্রতিবারের মতো এবারেও রমেশ কাকু ছুটির নোটিশের খাতা হাতে নিয়ে এক ক্লাস থেকে আরেক ক্লাসে ছুটে বেড়াচ্ছেন—কখনো এই ঘর, তো কখনো ওই ঘর।
প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে ঢুকে তিনি খাতাটা শিক্ষকদের হাতে তুলে দিচ্ছেন, আর শিক্ষকরা খাতায় লেখা কথা গুলো ছাত্রদের জানানোর উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে একবার পাঠ করে সই করে দিচ্ছেন। আমাদের ক্লাসে অবশ্য প্রথম পিরিয়ডেই সেই নোটিশ এসে গিয়েছিল
আমাদের ক্লাসে প্রথম পিরিয়ডে স্যারের পড়ানো চলছিল ঠিকই, কিন্তু আমাদের কজনের চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল জানালার ফাঁক গলে বাইরের মাঠের দিকে—যেখানে পুজোর প্রস্তুতির ব্যস্ততা ধীরে ধীরে রঙ নিতে শুরু করেছে।
মনে হচ্ছিল, যেন ক্লাসরুমের চার দেওয়াল আমাদের আটকে রেখেছে, আর মনটা ছুটে বেড়াচ্ছে বাইরে, সেই উৎসবের ভিড়ে।
হঠাৎ ঘন্টা বেজে উঠতেই যেন চমকে উঠলাম—মনে হল, এইমাত্র আবার নতুন করে জেগে উঠলাম। এতক্ষণ আমি যে ক্লাসে বসে ছিলাম, সেটাই যেন ভুলে গিয়েছিলাম। স্যার কী পড়ালেন, কী বোঝালেন—তার কিছুই ঠিকমতো মনে রইল না।
বয়সে বড় হয়েছি ঠিকই, শহরের নিয়মে চলতে শিখেছি, তবু সরস্বতী পুজো এলেই কোথা থেকে যেন সেই ছোটবেলার সরল উচ্ছ্বাসটা ফিরে আসে। মনে হয়, আবার যেন ক্লাস ফাইভের সেই ছেলেটাই হয়ে গেছি। দেখতে দেখতে প্রায় চার বছর কেটে গেল শহরের এই একই স্কুলে। নিজের অবচেতন মনে যখন এমন কথা ভাবছি তখন হঠাৎ অরিজিৎ আমাকে কনুই দিয়ে একটা ধাক্কা মেরে ফিসফিস করে বলল,
“কিরে নির্মল, টয়লেট যাবি?”
আমি কিছু বলার আগেই রাজ অরিজিৎকে উদ্দেশ্য করে একটু চাপা গলায় বলে উঠল,
“আমাদের হেড স্যারের নিয়মটা ভুলে গেলি নাকি? জানিস না—সেকেন্ড পিরিয়ডের আগে টয়লেটে যাওয়া বারণ!”
ভেবেছিলাম—প্রথম পিরিয়ডটা জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অন্যমনস্কতায় কেটে গেলেও, অন্তত দ্বিতীয় পিরিয়ডে মন দিয়ে পড়া শুনব। কিন্তু সেদিন যেন ব্যাপারটা অন্যরকমই হল। দ্বিতীয় পিরিয়ডে স্যারই এলেন না।
রমেশ কাকু আমাদের ক্লাসে এসে জানালেন, এই পিরিয়ডে প্রসেনজিৎ স্যারের আসার কথা ছিল। কিন্তু একটি জরুরি কাজে স্যারকে বাইরে যেতে হয়েছে। স্কুলে সেদিন পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায়, তাঁর বদলে অন্য কাউকেও পাঠানো সম্ভব হয়নি।
ক্লাসে বসে থাকা যেন এক অদ্ভুত বন্দিত্ব—বাইরে যাওয়া নিষেধ, আবার নিজেদের মধ্যে গল্প করাও বারণ। সামান্য শব্দ হলেই ক্লাস মনিটররা আগে একবার করে ওয়ার্নিং দেয়; তাতেও কাজ না হলে খাতায় নাম তুলে ফেলে। শুধু নামই নয়, পাশে লিখে রাখে—কেন সেই নাম তোলা হল।
পরের পিরিয়ডে স্যার এলে সেই খাতাটি তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়। তারপর স্যার নিজের মতো করে অভিযোগের মাত্রা বিচার করে শাস্তি দেন—কাউকে কান ধরে উঠবস করতে হয়, কেউ শুধু বকাঝকা খেয়েই রেহাই পায়, আবার কারো কারো কপালে জোটে কানমলা কিংবা স্কেল বা লাঠির হালকা আঘাত।
ক্লাস ফাইভে থাকতে কত মারই না খেয়েছি—সেসব এখনো স্পষ্ট মনে আছে। এখন অবশ্য শুনি, ছাত্রদের মারধর সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। এই কথাটা আমাদের প্রসেনজিৎ স্যারই একদিন বলেছিলেন। তবে তিনি নিজে কখনোই ছাত্রদের মারতেন না; একটু বকাঝকা করে, কখনো-বা কান ধরে উঠবস করাতেন।
একদিন স্যার মুচকি হেসে বলেছিলেন,
“কান ধরে উঠবস করলে একদিকে যেমন শাস্তি হয়, অন্যদিকে শরীরেরও ব্যায়াম হয়ে যায়। মারধরের চেয়ে এই শাস্তিটাই সবচেয়ে বেশি কার্যকর। তোরা তো কেউ নিজের থেকে ব্যায়াম করবি না, তাই আমাকেই এই ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে!”
যদিও ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস এইট পর্যন্ত এমন ফাঁকা পিরিয়ড খুব কমই পেয়েছি। কোনো স্যার না থাকলে, অন্য কোনো স্যার এসে সেই ক্লাসটা নিয়ে নিতেন। লক্ষ্য করে দেখেছিলাম—নবম কিংবা দশম শ্রেণীতে দু-একটা পিরিয়ড ফাঁকা থাকলেও, এই ক্লাসগুলোকে প্রায় কখনোই ফাঁকা রাখা হতো না।
অন্যান্য দিন স্যারেরা না থাকলে আমি গল্পের বই খুলে পড়তাম। কিন্তু সেদিন গল্প পড়ায় তেমন কোনো আগ্রহই পাচ্ছিলাম না। তাই বেঞ্চে চুপচাপ বসে থাকলাম। অবশ্য শরীরটা বেঞ্চে নিশ্চুপ হয়ে থাকলেও, মনটা কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও স্থির ছিল না। সে যেন জানলার ফাঁক গলে উড়ে বেড়াচ্ছিল—এক অচেনা, অজানা রঙিন দেশ থেকে আরেক রঙিন দেশে, তারপর সেখান থেকে আরও দূরের কোনো কল্পনার রাজ্যে।
ঠিক তখনই কাঁধে এক স্পর্শে চমকে উঠলাম। অরিজিৎ। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
“নির্মল, বাইরে যাবি? দ্বিতীয় পিরিয়ড তো শেষ!”
আশ্চর্যের বিষয়, ঘণ্টা পড়ার শব্দটাও কানে আসেনি আমার। যাই হোক, আমরা দু’জনে টয়লেটে যাওয়ার অজুহাতে ক্লাস থেকে বেরোলাম। কিন্তু বাথরুমের দিকে না গিয়ে, গিয়ে দাঁড়ালাম ক্লাসের উঠোনে।
দূরে তাকিয়ে দেখি—একটা ভ্যানের উপর ডিজেল জেনারেটর চাপানো আছে। অনেকে এই জেনারেটরকে ডিজি- জেনেরেটর বলে। আমাদের ক্লাসের জানলা থেকে এই জায়গাটা দেখা যায় না, তাই এই ডিজি জেনেটার কখন এলো তা ঠিক টের পায়নি। ভ্যানটার পাশে কয়েকটা স্ট্যান্ড ফ্যান, লাইট আর ছোট ছোট বাক্স সাজানো। একটা ছেলে সেখানে বসে মাথা হেঁট করে নিজের মনে ফোনে কীসব ঘাঁটাঘাঁটি করছে—তাকে দেখে মনে হল, যেন সে-ই সবকিছুর পাহারায় আছে।
আমি আর অরিজিৎ নিজেদের মধ্যে এসব নিয়ে ফিসফিস করে কথা বলছিলাম। ঠিক তখনই শুভ্রকান্তি স্যার আমাদের ডেকে বললেন,
“তোরা এই ব্যাগটা একবার অফিস রুমে রেখে আসতে পারবি? খুব ভারী না—কয়েকটা প্লাস্টিকের গ্লাস আর কয়েকটা মশলার প্যাকেট আছে।”
আমরা দু’জনেই রাজি হয়ে গেলাম। ব্যাগটা হাতে নিয়ে দেখলাম, সত্যিই তেমন ভারী নয়।
হেড স্যারের ঘরে যাওয়ার আগে আমরা আমাদের ক্লাসে ঢুকে রাজ আর শ্রীকান্তকে ডাকলাম। কিন্তু ক্লাসের কয়েকজন মনিটর ওদের যেতে দিল না—ইচ্ছে করেই যেন আটকে রাখল।
অগত্যা আমরা দু’জনেই ব্যাগটা নিয়ে অফিস রুমের দিকে রওনা দিলাম।
আমরা হেড স্যারের ঘরে ঢুকতে যাব—ঠিক তখনই যেন ঝড়ের মতো এসে হাজির হল ঝিলিক। আমাদের ধাক্কা দিয়ে সোজা স্যারের টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। চোখ-মুখ লাল, কোণে জমে থাকা জল—মনে হচ্ছিল বহুক্ষণ ধরে কান্না আটকে রেখেছিল, আর এখন আর তা ধরে রাখা তার পক্ষে সম্ভব নয়। মুহূর্তের মধ্যেই অঝোরে ভেঙে পড়ল সে।
হেডস্যার চশমা খুলে টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। এমন দৃশ্য দেখে তিনিও স্পষ্ট বিচলিত। উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
—“কী হয়েছে ঝিলিক? কাঁদছ কেন?”
ঝিলিক কাঁপা গলায়, ওড়নার আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বলল,
—“স্যার… আমি আর সহ্য করতে পারছি না… শ্রীকান্ত আমাকে খুব বিরক্ত করছে। সব সময় গায়ে পড়ার চেষ্টা করে, অযথা স্পর্শ করে। আমি অনেকবার বারণ করেছি, কিন্তু ও শোনে না…”
কথা বলতে বলতে তার গলায় আতঙ্ক জমাট বাঁধল। একটু থেমে আবার বলল,
—“কাল তো সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে স্যার—। চৌমাথার মোড়ে আমার হাত ধরে টেনেছিল। পাড়ার একজন দেখে ফেলেছে—। এখন সবাই নানা কথা—। আমি বাড়িতে এই সম্বন্ধে কিছু বলতে পারিনি। বাবা জানলে আমার পড়াশোনা বন্ধ করে দেবে…”
শেষের কথাগুলো আর শেষ করতে পারল না সে। কান্নায় ভেঙে পড়ে অনুনয় করল,
—“স্যার, প্লিজ… ব্যাপারটা যেন বাবার কানে না যায়। আপনি কিছু ব্যবস্থা নিন। ও সবসময় আমার পেছন পেছন—।”
স্যার নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অফিসের এক মহিলা কর্মীকে ডেকে তাকে সামলানোর ব্যবস্থা করলেন। তারপর গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
—“শ্রীকান্ত কোন ক্লাসে পড়ে?”
—“আমার সঙ্গেই, ক্লাস নাইনে…”—ফুপিয়ে উঠল ঝিলিক।
এরপর স্যারের কণ্ঠে কঠোরতা নেমে এল। দিগন্ত জেঠুকে ডেকে আদেশ দিলেন শ্রীকান্তকে নিয়ে আসতে।
ঝিলিক দু-হাতে চোখ মুছতে মুছতে ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলতে লাগলো,
“এমনকি আমাদের টিউশনের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে আমার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার নিয়ে আমাকে মেসেজ করে বিরক্ত করে।”
স্যারের সেই রণমূর্তি দেখে আমরা ব্যাগ রাখার অনুমতি চাইতে গিয়েও থমকে গেলাম—গলা দিয়ে যেন আর কোনো শব্দই বেরোল না। অগত্যা ব্যাগগুলো হাতে নিয়েই চুপচাপ দেওয়ালের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
আসলে স্যারের এমন রূপ নেওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু মনে হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে সমাজজুড়ে একের পর এক নারীর ওপর নৃশংস অত্যাচারের ঘটনা—আরজি কর হাসপাতালের ঘটনা হোক বা কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের খবর—মানুষের মনে তখনও তাজা ক্ষতের মতো রয়ে গেছে। সেই আতঙ্ক, ক্ষোভ আর অসহায়তার আবহে দাঁড়িয়ে নিজের স্কুলের ভেতরেই এমন এক চরিত্রহীন ঘটনার অভিযোগ—পরিস্থিতিটাকে যেন আরও ভারী, আরও অস্বস্তিকর করে তুলেছিল।
কিছুক্ষণ পর দিগন্ত জেঠুর সঙ্গে শ্রীকান্ত হেঁটে এসে আমাদের দেখে একটু থমকে গেল। তার চোখের দৃষ্টিটা সেদিন অদ্ভুত, অচেনা লেগেছিল—যেন ভেতরে জমে থাকা কোনো প্রশ্ন নীরবে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে।
মনে হলো, সে হয়তো আমাদের কিছু বলতে চাইছে। কিন্তু দিগন্ত জেঠু তাকে সেই সুযোগ দিলেন না; তাড়াতাড়ি ভেতরে নিয়ে গেলেন।
শ্রীকান্ত তখনও বুঝতে পারেনি, তার জন্য ভেতরে কী ভয়াবহ ঝড় অপেক্ষা করে আছে।
সে ঘরে ঢুকে পড়তেই আমরা জানালার ফাঁক দিয়ে ভেতরের দৃশ্য দেখার চেষ্টা করলাম।
হেডস্যারের মুখে ঝিলিকের অভিযোগ শুনে শ্রীকান্ত একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল ঝিলিকের দিকে—লাল চোখ, ভেজা মুখ, কান্নায় কাঁপতে থাকা সেই চেহারার দিকে। তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দই বেরোল না। হঠাৎ স্যারের গম্ভীর ধমকে ঘরের সমস্ত নীরবতা ভেঙে গেল।
ধমক খেয়ে শ্রীকান্ত কাঁপা গলায় বলল,
—“স্যার, আমি এরকম কিছু করিনি…”
তার কথা শেষ না হতেই ঝিলিক কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠল,
—“না স্যার, ও মিথ্যে বলছে… ও প্রতিদিন আমাকে বিরক্ত করে… আপনার বিশ্বাস না হলে আমি পাড়ার সেই দাদাকে ডেকে আনব…”
স্যার এবার কঠোর চোখে শ্রীকান্তের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“তাহলে কি ঝিলিক মিথ্যে বলছে? কয় ও তো কোনোদিন কারও নামে এই অভিযোগ করেনি—তোর নামেই কেন করবে? নিশ্চয়ই তুই কিছু করেছিস! তাছাড়া একজন মেয়ে কি এসব বিষয়ে মিথ্যে কথা বলতে পারে?”
একটু থেমে আরও দৃঢ় গলায় যোগ করলেন,
—“তুমি কি জানো এই অপরাধের শাস্তি কী হয়? আমি চাইলে এই মুহূর্তেই তোমাকে স্কুল থেকে টিসি দিয়ে বের করে দিতে পারি! কোনো স্কুল থেকে টিসি দিয়ে কোনো ছাত্রকে বের করে দিলে এই দেশের কোনো স্কুল সেই ছাত্রকে ভর্তি নেয় না। তোমাকে যদি টিসি দেওয়া হয় তাহলে ভাবতে পারছো তোমার কি হবে?”
শ্রীকান্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
আমাদের ভেতরেও অদ্ভুত এক উত্তেজনা কাজ করছিল। পরের কথাটা শোনার জন্য আমরা জানালার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। ঠিক সেই সময় হঠাৎ পিছন থেকে একটা গলার আওয়াজে আমরা চমকে উঠলাম।
পিছন ফিরে দেখি, আমাদের স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট টিচার মানবেন্দ্র স্যার দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন,
—“এখানে দাঁড়িয়ে কী করছিস তোরা?”
আমি আর অরিজিৎ প্রথমে কিছুই বলতে পারলাম না। তিনি আবার বললেন,
—“কী ব্যাপার? এখানে কেন?”
অরিজিৎ ইতস্তত করে বলল,
—“ইয়ে মানে… শুভ্রক্রান্তি স্যার আমাদের ব্যাগটা অফিসে রাখতে বলেছিলেন…”
স্যার ভ্রু কুঁচকে বললেন,
—“তাহলে ব্যাগটা না রেখে, এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
—“না মানে। স্যার—। আসলে হেডস্যার একটু রেগে আছেন…”
তিনি একটু হেসে বললেন,
—“ও, এই ব্যাপার! ঠিক আছে, ব্যাগটা আমাকে দে— যা তোরা ক্লাসে গিয়ে বস।”
আমরা আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালাম না। ব্যাগ দিয়ে দ্রুত সেখান থেকে সরে এলাম।
কিছুটা এগিয়ে এসে আমি অরিজিৎকে জিজ্ঞেস করলাম,
—“আচ্ছা, শ্রীকান্ত কি সত্যিই ঝিলিককে বিরক্ত করত?”
অরিজিৎ একটু ভেবে শুধু বলল,
—“কি জানি! আমি কি করে বলবো!”
আমরা সেদিন চুপচাপ ক্লাসে এসে বসেছিলাম। চারপাশে সবকিছু আগের মতোই ছিল—একই বেঞ্চ, একই ব্ল্যাকবোর্ড, একই কোলাহল—তবু কোথাও যেন একটা অদৃশ্য শূন্যতা ছড়িয়ে ছিল। আমার মনটা আর কোথাও স্থির হচ্ছিল না। ঝিলিকের আচরণটা মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল বারবার।
অজান্তেই চোখ চলে যাচ্ছিল শ্রীকান্তের ব্যাগের দিকে।
চতুর্থ পিরিয়ডে স্যার ব্ল্যাকবোর্ডে অঙ্ক করাচ্ছিলেন। চক ঘষার খসখস শব্দে ক্লাস ভরে উঠছিল। স্যারের ভয়ে ব্যাগ থেকে খাতা-কলম বের করে বোর্ডের লেখা নকল করতে লাগলাম। আমার মন কিন্তু স্থির ছিল না।
হঠাৎ এক ঠক ঠক শব্দ ক্লাসরুমের সমস্ত নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল। আমি তাকিয়ে দেখি দরজার কাছে রমেশ কাকু দাঁড়িয়ে আছে।
তিনি স্যারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকলেন। তাঁর চোখদুটো যেন কাউকে খুঁজছিল। পুরো ক্লাসের দিকে একবার তাকিয়ে তিনি বললেন,
“শ্রীকান্তের ব্যাগ কোনটা?”
ক্লাসে একটা চাপা গুঞ্জন উঠল। কয়েকজন ছেলে আঙুল তুলে আমাদের বেঞ্চের দিকে দেখাল।
রমেশ কাকু এগিয়ে এসে ব্যাগটা তুলে নিলেন।
আমি নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলাম।
তিনি কিছু না বলেই চলে গেলেন। কিন্তু তাঁর চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার ভেতরের অস্থিরতা যেন আরও বেড়ে গেল।
পরবর্তীকালে জানা যায় যে, তার বাড়ি থেকে গার্জেন কল করা হয়েছিল। শ্রীকান্তের দাদু এসে তাকে স্কুল থেকে নিয়ে যায়। শ্রীকান্তের দাদুও তাকে বেশ বকাঝকা করে। সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরতেই শ্রীকান্তের বড় মামি শ্রীকান্তের বড় মামার কানে এই কথা তোলে। এই ঘটনার কথা শুনে সদ্য অফিস থেকে বাড়ি ফেরা শ্রীকান্তের বড় মামা শ্রীকান্তের ঘরে গিয়ে শ্রীকান্তের কোনো কথা না শুনেই তিনি শ্রীকান্তকে বেধড়ক মারতে শুরু করেন।
শ্রীকান্তের দাদু ছুটে এসে শ্রীকান্তকে টেনে সরিয়ে নিলেন।
“থামো! ছেলেটাকে মেরে ফেলবে নাকি?” —দাদুর কণ্ঠে ছিল রাগ আর উদ্বেগের মিশ্রণ।
তিনি শ্রীকান্তকে নিয়ে পাশের ঘরের দিকে যেতে লাগলেন।
কিন্তু যাওয়ার সময়ই পেছন থেকে বজ্রের মতো গর্জে উঠল বড় মামার গলা—
“আজ থেকে তুই আমাকে আর মামা বলে ডাকবি না!”
একটা মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে গেল।
দাদুর নির্দেশে এই ঘটনার কথা শ্রীকান্তের মায়ের কানে পৌঁছাতে দেওয়া হল না।
সেই রাতেই ছোটো মামা অফিস থেকে ফিরতেই বাড়িতে তীব্র ঝগড়া শুরু হয়। একপর্যায়ে ছোটো মামি চিৎকার করে বলে ওঠেন,
“ওই চরিত্রহীন ছেলেকে তুমি বাড়ি দিয়ে এসো!”
দাদু রাগ সামলে শ্রীকান্তের পক্ষ নিয়ে বলেন,
“ও খুব ভদ্র আর সরল ছেলে। হয়তো খারাপ বন্ধুর প্রভাবে এমনটা হয়েছে। অথবা ব্যাপারটা আমরা যেভাবে ভাবছি, হয়তো সেভাবে নয়। ও তো গ্রামের ছেলে—সবকিছু বোঝে না। সবার সঙ্গেই আপন মনে মিশে যায়, হয়তো কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছাড়াই—।”
“সব বোঝে! আর একটা ফোন কিনে দিন, দেখবেন আরো ভদ্র হয়ে যাবে!” —তীব্র ব্যঙ্গ ভেসে এল বড় মামির গলায়।
“ও আমাদের সম্মান নষ্ট করে—।”
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল।
দাদু আর কিছু বললেন না। ধীরে ধীরে নিজের ঘরে গিয়ে বসে পড়লেন—পরাজিত মানুষের মতো।
সেদিন থেকেই শ্রীকান্ত যেন নিজের বাড়িতেই পর হয়ে গেল।
আমরা অনেকবার ফোন করেছিলাম, কিন্তু প্রতিবারই—
“সুইচড অফ।”
ধীরে ধীরে বাড়ির সবাই তার থেকে দূরে সরে যেতে লাগল।
সে যখনই কারও কাছে যেতে চাইত, পুরোনো ঘটনাটা তুলে এনে তাকে অপমান করা হত।
মামার এক ছেলে তো একদিন সরাসরি বলেই ফেলেছিল—
“তুই বড্ড খারাপ ছেলে। যে মেয়েদের সঙ্গে অসভ্যতামি করে সে আর যায় হোক মানুষ হতে পারে না। আর আমি পশুদের সাথে মিশি না।”
এই সমস্ত ঘটনার কথা আমরা জানতে পারি তাদের বাড়ির রাধুনী ললিতা কাকিমার ছেলে রিপনের কাছ থেকে।
(সাত)
সরস্বতী পুজোর দিন সকাল। সৌরভ স্যারের আদেশে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম শহরের এক দশকর্মার দোকান থেকে পুজোর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আনতে। চারপাশে এক ধরনের নীরব পবিত্রতা ছড়িয়ে আছে। দোকান থেকে সরঞ্জাম নিয়ে ফেরার পথে কালীমন্দিরের দিক থেকে ভেসে এল এক অচেনা অথচ পরিচিত কণ্ঠস্বর।
কৌতূহলবশত মন্দিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখি—নির্জন প্রাঙ্গণে একা বসে শ্রীকান্ত, গুনগুন করে গান গাইছে। তার গলায় ছিল অদ্ভুত এক ব্যথার সুর—
দোষ বলে দাও তুমি,
কী ভুল করেছি আমি।
যার শাস্তি দাও আমায়,
কেন সবাই বৃথা কাঁদায়।
দাও বলে, দাও
দাও বলে দাও…
আমি কি তবে দোষী নই,
নাকি দোষটাই আমার নাম?
সত্য যদি কাঁটার মতো,
ছোঁয়ালে কেন ঝড়ে রক্ত?
দাও বলে, দাও
দাও বলে, দাও….
তুমি কি শুধু দেখো দূরে,
নীরব সাক্ষী সব অপরাধে?
বিচার যদি তোমার হাতে,
তবে দেরি কেন বিচার সাজাতে?
দাও বলে, দাও তুমি,
কি ভুল করেছি আমি।
দাও বলে, দাও….
দাও বলে, দাও….
আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। সাইকেল থেকে নেমে তার কাছে এগোতে যাব, ঠিক তখনই প্যান্টের পকেটে রাখা ফোনটা সশব্দে বেজে উঠল। সৌরভ স্যারের ফোন। রিসিভ করতেই ওপার থেকে স্যার বিরক্তিভরা কন্ঠে বলে উঠলো,
“কোথায় তুই? তাড়াতাড়ি আয়, বামুন চলে এসেছে। এতক্ষণ সময়—।”
কালীতলায় ওকে একলা বসে গান গাইতে দেখে তার কাছে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু একদিকে স্যারের তাড়া, আর অন্যদিকে শ্রীকান্তের সেই শান্ত গুনগুন— দুয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি মুহূর্তের জন্য থমকে গেলাম।
শেষ পর্যন্ত আর পা বাড়াতে পারলাম না। মনে হলো, তার এই পবিত্র একাকীত্বে ভাগ বসানোটা অন্যায় হবে। সব সময় কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিলেই তো আর কষ্ট কমে না; কখনো কখনো দুঃখী মানুষকে তার নির্জনতার সঙ্গে একা থাকতে দেওয়াটাই বোধহয় সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা—এই বিশ্বাসেই সেদিন আমি তার সঙ্গে দেখা না করেই স্যারের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
বিকেলের দিকে আবহাওয়ার ভোল বদলে গেল। মাঘের হাড়কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যে হঠাৎ শুরু হলো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। সরস্বতী পুজোর আনন্দটা এক নিমেষে বিষাদে পরিণত হলো। বৃষ্টির তোড়ে বাইরে বেরোনোর উপায় নেই, ঘরের ভেতর গুমোট মনে জানলার ধারে বসে বাইরের ঝাপসা প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে রইলাম। সন্ধ্যা নামার মুখে যখন শঙ্খধ্বনি আর মসজিদের আজান মিলেমিশে এক অদ্ভুত গোধূলি তৈরি করেছে, ঠিক তখন আবার ফোনটা বেজে উঠল। মোবাইলের স্ক্রিনে শ্রীকান্তের নাম দেখে বুকের ভেতরটা অজানা এক উত্তেজনায় কেঁপে উঠল। ফোনটা তুলতেই উত্তেজনা ভেঙে ওপাশ থেকে ভেসে এল এক বৃদ্ধের আর্তনাদ। শ্রীকান্তের দাদু রুদ্ধশ্বাসে বললেন, “বাবা, শ্রীকান্তকে কি তুমি দেখেছ? সকাল সাতটায় বেরিয়েছে, এখনও বাড়ি ফেরেনি!”
আমি এই কথা শুনে চমকে গেলাম। আমি শ্রীকান্তের দাদুকে সকাল বেলায় শ্রীকান্তের মন্দিরে বসে থাকার কথা বললাম। ফোনটা রাখতেই আমি রাজকে এবং অরিজিৎকে ফোন করলাম। দুজনাই বলল যে শ্রীকান্তের দাদু নাকি তাদেরকেও ফোন করেছিল। সন্ধ্যেবেলাতেও বেশ ঝমঝম বৃষ্টি পড়ছিল। তাই একপ্রকার এই বৃষ্টির মধ্যে ভিজেয় কয়েকজন লোক শ্রীকান্তের সন্ধানে বেরোলো। প্রতিবেশীদের বাড়িতে কিংবা রাস্তাঘাটে শ্রীকান্তের কোন সন্ধান না পেয়ে শেষমেষ শ্রীকান্তের দাদু থানায় জানালে পুলিশরা শ্রীকান্তকে খুঁজতে শুরু করে। পরের দিন সকালবেলা বৃষ্টি একটু ধরলেও বিকেল থেকে পূর্বের মতো বেশ ঝমঝমে বৃষ্টি পড়ছিল।
পরের দিনও একই অবস্থা। বৃষ্টির বিরাম নেই, মাঘের কনকনে ঠান্ডায় বুকের ভেতর এক অজানা আতঙ্ক জমাট বাঁধতে শুরু করল। মাথায় নানা কুচিন্তা ভিড় করছে। এই হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় শ্রীকান্ত কোথায় গেলো? কোনো বিপদ হলো না তো?
দু’দিন পর, রাত তখন এগারোটা। বৃষ্টির তাণ্ডব তখনও থামেনি। হঠাৎ পুলিশের একটি গাড়ি এসে থামল শ্রীকান্তের মামাবাড়ির সামনে। ভেতর থেকে কয়েকজন পুলিশ কর্মী কাদামাখা, আধমরা শ্রীকান্তকে ধরাধরি করে নামিয়ে আনলেন। তারা জানালেন, শহরের দক্ষিণ প্রান্তের এক বাসস্ট্যান্ডে শ্রীকান্ত জ্ঞান হারিয়ে পড়ে ছিল।
চৈতন্য ফিরতেই শ্রীকান্ত ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, “আমি তো চলে যাচ্ছিলাম। তোমরা আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে এলে কেন?”
শ্রীকান্তকে ঘরে এনে শোয়ানো হল। তার সারা শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছিল। দাদু শিয়রে বসে জলপট্টি দিচ্ছেন, কিন্তু জ্বর কমছে না। ছোট মামা বারবার থার্মোমিটার দেখছেন। বড় মামা রেইনকোট জড়িয়ে বেরিয়ে পড়েছেন ডাক্তারের খোঁজে। কিন্তু সেই প্রলয়ঙ্করী রাতে পুরো শহর যেন এক অভিশপ্ত নির্জন দ্বীপ। কোথাও কোনো ওষুধের দোকান বা ক্লিনিক খোলা নেই। এই দুর্যোগে দূরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াও অসম্ভব।
পরের দিন সকালে শ্রীকান্তের বড় মামা ডাক্তার ডেকে নিয়ে আসে।
ডাক্তার তার চোখ দেখতে চাইলে শ্রীকান্ত তার রক্তাভ চোখ দুটো খুলে একবার ডাক্তারের দিকে আর একবার বড় মামার দিকে তাকিয়ে, বিড়বিড় করে বলতে লাগলো, “মামা আমায় মেরো না, আমার কোনো দোষ নেই। আমি কিছু ক–রি–নি…”
শ্রীকান্তের বড় মামা হরিহর বাবু চোখের জল মুছে ডাক্তারের বিপরীত দিকে গিয়ে সস্নেহে শ্রীকান্তের শীর্ণ তপ্ত হাতটা নিজের হাতের ওপর তুলে তার পাশে বসলেন। আমার বাড়ি থেকে শ্রীকান্তের মামার বাড়ি বেশি দূরে নয়, তাই মাঝে মধ্যেই আমি শ্রীকান্তকে দেখতে তার মামারবাড়ি যেতাম।
পরের দিন, শ্রীকান্ত জ্বরের ঘোরে বেহুশ। তাই ডাক্তারকে আবার খবর দেওয়া হলে ডাক্তারবাবু এসে, চিন্তিত বিমর্ষ মুখে জানান, “অবস্থা বড়ই খারাপ!”
দিন দিন শ্রীকান্তের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে তার মাকে খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়েই তিনি অনুরোধ করেছিলেন— তিনি নিজে না পৌঁছানো পর্যন্ত যেন কোনো অবস্থাতেই শ্রীকান্তকে হাসপাতাল বা নার্সিংহোমে ভর্তি না করা হয়।
শ্রীকান্তের মায়ের এই শর্ত আমার কাছে বড়ই অদ্ভুত লেগেছিল। তবে তিনি এই শর্ত কেন দিয়েছিলেন—তা আমি ঠিক জানি না।
কদিন, শ্রীকান্ত প্রলাপ বকতে থাকে। মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে “আমি কিছু করিনি, তোমরা আমাকে বিশ্বাস করো আমি কিছু করিনি।”
জ্বরের ঘোরে শ্রীকান্তের ওষ্ঠপ্রান্ত কেঁপে উঠছে। কিছুক্ষণ পর সে বিড়বিড় করে করুন সুরে মাঝিদের গান ধরল
“হেই–হো–রে, হেই–হো–রো…
নৌ–কা চ–লে হে–ই–হো…
আর– এক–টু–খা–নি,
তার–পর যা–ব…!”
শ্রীকান্তের নদীর পাড়ে বাড়ি হওয়ায় সে প্রতিদিন যাত্রা পারাপারের সময় মাঝিদের এই গান গাইতে দেখতো প্রলাপে শ্রীকান্ত তাদেরই অনুকরণ করে করুনসুরে এই গান গাইতে লাগল।
শ্রীকান্তের প্রাণপাখি তখন খাঁচার দরজা হাতড়াচ্ছে। কোথাও দরজা খুঁজে পাচ্ছে না।
এমন সময় শ্রীকান্তের মা ঝড়ের মতো ঘরে প্রবেশ করে, উচ্চকণ্ঠে শোক করতে লাগলেন। শ্রীকান্তের বড়ো মামা অতিকষ্টে তার শোকোচ্ছ্বাস নিবৃত্ত করেন। শ্রীকান্তের মা ছুটে গিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে উচ্চস্বরে বললেন,
“কী হয়েছে বাবা? মানিক আমার!”
শ্রীকান্ত অতি কষ্টে চোখ মেলল। চোখের কোণে জমে থাকা এক ফোঁটা জল গড়িয়ে কান পর্যন্ত চলে গেল। মায়ের হাতটা শক্ত করে ধরতে চেয়েও তার আঙুলগুলো অবশ হয়েও এল। শেষবারের মতো সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে সে শুধু বলল—
“আমি কিছু করিনি। আমি চরিত্রহীন নই…”
শ্রীকান্ত কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর, জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে
“মা, আসছি… মামাবাড়ি অনেক দূরের পথ…”