আলোচনা — সাম্প্রদায়িকতার ঘি–মাখা রাজনীতি: ভারতীয় সংস্করণের রম্য কাহিনি**

বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬

ভারতবর্ষে রাজনীতি এমন এক যাদুর বাক্স, যার ঢাকনা খুললেই দেখা যায় মাঝে মাঝে গণতন্ত্র, মাঝে মাঝে উন্নয়ন, আর বেশিরভাগ সময় দেখা যায়—সাম্প্রদায়িকতার রঙে রঞ্জিত চশমা। এই চশমা পরে নিলেই রাজনীতিবিদদের সবকিছুর রঙ বদলে যায়। রাস্তা ভাঙা?—ওটা তো “অমুক সম্প্রদায়ের ষড়যন্ত্র”! বিদ্যুতের বিল বেড়েছে?—“তোমরা জানো না, এর পেছনে তমুক ধর্মীয় মিশন কাজ করছে!” অর্থাৎ রাজনীতির যুক্তি আজকাল রাস্তায় পাওয়া কাবাবের কাঠির মতো—পাতলা, টেকসই নয়, তবে ঝাল-মশলাদার যথেষ্ট।

ভারতীয় রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতা একপ্রকার শাশুড়ির মতো—চাইলে এড়ানো যায় না, মানালেও শান্তি নেই। নির্বাচনের আগে হঠাৎ করে সব দলের নেতারা সক্রিয় হয়ে ওঠেন যেন ধর্মীয় ফোকাস লাইট তাদের মাথায় ফেলা হয়েছে। কোন নেতা কখন কোন মন্দির, মসজিদ বা গুরুদুয়ারায় গিয়ে কী প্রণাম করছেন—এটাই তখন প্রধান ব্রেকিং নিউজ। যেন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও ভোটের সময় বিশেষ “সিজনাল আকর্ষণ” ঘোষণা করেছে!

রাজনীতিবিদদের আরেক প্রবল শখ হলো ইতিহাস নিয়ে তর্ক। এমনভাবে কথা বলেন যেন তারা সব ঘটনাই নিজ চোখে দেখেছেন—“ওই প্রসাদ আমি নিজের হাতে বানিয়েছিলাম, আর তুমি সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলছো?” ইতিহাসের বই খুললে যেখানেই খালি পাতা পাওয়া যায়, তারা সঙ্গে সঙ্গে সেখানে নতুন ধর্মীয় কাহিনি গেঁথে দেন। দেশের সমস্যার তালিকা যত দীর্ঘই হোক, তারা ব্যস্ত কোন মূর্তি কত উঁচু হবে সেটা নিয়ে বিতর্ক করতে। যেন উন্নয়নের মাপকাঠি এখন থেকে কিলোমিটারে নয়, ‘ফুট’-এ মাপা হবে।

আর ভোটাররা? তারা নিরুপায় দর্শক। কিছু মানুষ ভাবেন, “এই দলটা তো ওদের ধর্মের দিকে বেশি ঝুঁকছে”, অন্যরা বলেন, “ওই দলটা আমাদের দিকে তাকাচ্ছে না”—এভাবে বিভাজন নিশ্চিত হয়। সাম্প্রদায়িকতা এমন এক সস্তা চাটনি, যা সব দলই তাদের রাজনীতির প্লেটে রাখতে পছন্দ করে। কারণ চাটনি যত ঝাল, ভোট তত ভালো ওঠে—এটাই বোধহয় অদৃশ্য সমীকরণ।

অবশ্য সব দোষ রাজনীতিবিদদের নয়। জনগণও কম যায় না! পাড়ার চায়ের দোকানে দুই মিনিটে বিশ্বশান্তি আনতে পারা বিশেষজ্ঞরা বাস করেন। তারা বিশ্বাস করেন, তাদের ধর্ম সবচেয়ে শান্তিপ্রিয়, আর প্রতিবেশীর ধর্ম সবচেয়ে গোলমেলে। নিজের ধর্মীয় উৎসবে চারটে অতিরিক্ত লাউডস্পিকার লাগালে সেটা ‘ভক্তির প্রকাশ’, আর অন্যেরটা হলে ‘সামাজিক অবনতি’। এই দ্বিমুখী আচরণ দেখলে মনে হয়, আমরা যেন জাতীয় নাট্যশালার স্থায়ী অভিনেতা।

সব মিলিয়ে ভারতীয় রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতা এমন এক উপাদান যা ছাড়া যেন তাদের রান্না জমে না। উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—এসব তো অনেক কঠিন বিষয়। তার বদলে ধর্মীয় আবেগকে একটু এদিক-সেদিক নেড়ে দিলেই হয় ভোট-ফসল প্রস্তুত। তবে আশার কথা—এই নাটকের দর্শকও ধীরে ধীরে বুদ্ধি খাটাতে শিখছে। মাঝে মাঝে দেখা যায়, সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ পেলে ভোটাররাই নাক চেপে পলায়ন করেন।

তাই রাজনীতিবিদদের প্রতি আবেদন—ধর্মকে ধর্মের জায়গায় থাকতে দিন, আর রাজনীতিকে রাজনীতির জায়গায়। না হলে ইতিহাস একদিন লিখবে—“ভারতীয় রাজনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল যে তারা সবসময় ঈশ্বরের নাম করত, কিন্তু ঈশ্বরও জানতেন না কেন।”
………..

২ বার পঠিত রিপোর্ট

মন্তব্য করুন

লেখকের অন্যান্য প্রকাশনা