প্রথম পর্ব: কুয়াশার ভিতর থেকে নেমে আসা ট্রেন

কলকাতা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি যাওয়ার রাতের ট্রেনটা বেশ ফাঁকা। এসি সেকেন্ড ক্লাসের কামরায় ঠান্ডাটা একটু বেশিই। আমার উলটো দিকের সিটে বসে আছেন মাঝবয়সি এক ভদ্রলোক। চোখে চশমা, গায়ে দামি চাদর জড়িয়ে একটা ইংরেজি পত্রিকা পড়ার চেষ্টা করছেন। নাম তাঁর অলোক মুখার্জি। কথায় কথায় জানলাম, উনি একটি বহুজাতিক পানের মশলা কোম্পানির উঁচুপদের কর্মকর্তা।

আমি একটু মৃদু হেসে বললাম, "আচ্ছা অলোকবাবু, ওপার বাংলা— মানে আমাদের বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতীয়দের ধারণাটা ঠিক কীরকম বলুন তো?"

অলোকবাবু চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। তারপর স্বতঃস্ফূর্ত ভঙ্গিতে বললেন, "ধারণা আর কী থাকবে মশায়? বেশ তো চলছে। তবে মাঝে মাঝে পেপারে যা দেখি— একটু শঙ্কা হয় বইকি! তবে সত্যি বলতে, পশ্চিমবঙ্গের বাইরের ভারতীয়রা বাংলাদেশ নিয়ে অত মাথা ঘামায় না। ওদের কাছে বাংলাদেশ আর নেপাল প্রায় একই রকম দূরের কোন একটা জায়গা!"

আমি মনে মনে হাসলাম। আমার প্রিয় একটা কথা আছে— মানুষ যা দেখে, তার চেয়ে অনেক বেশি মনে মনে কল্পনা করে নেয়। অলোকবাবু যা বললেন, তা ভারতের একটা অংশের কথা হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের মনে ভারত সম্পর্কে কী ধারণা কাজ করে? সে তো আমার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না।

একবার বাংলাদেশে একটা গোপন জনমত জরিপ করা হয়েছিল। জরিপের মূল বিষয় ছিল— বাংলাদেশিরা ভারতকে কতটা পছন্দ বা অপযোগ করে।

ফলাফলটা এলো বেশ চমকপ্রদ এবং একই সাথে বেশ থমথমে। জরিপে দেখা গেল, দেশের সিংহভাগ মানুষ ভারতকে একেবারেই সহ্য করতে পারে না— সোজা কথায় যাকে বলে ‘অন্তরের অন্তস্তল থেকে ঘৃণা’। আর যে সামান্য অংশটি ভারতকে পছন্দ করে বা একটু নমনীয় মনোভাব পোষণ করে, তাদের মধ্যে হয়তো সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ আছে। কিন্তু জরিপে অংশগ্রহণকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর সিংহভাগই স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, তারা ভারতকে ভীষণ অপছন্দ করে।

যে কয়েকজন একটু ভদ্র ভাষায় উত্তর দিয়েছিল, অনুসন্ধানে দেখা গেল, সেটাও আসলে এক ধরনের শিষ্টাচার। ভেতরের অনুভূতিটা সেই একই— গভীর অরুচি।

ট্রেনটা একটা ছোট স্টেশনে সিটি বাজিয়ে থামল। জানালার কাচে ঝাপসা কুয়াশা জমেছে। আমি কাচের কুয়াশা একটু আঙুল দিয়ে মুছে বাইরে তাকালুম। অন্ধকারের মধ্যে দু-একটা আলোর বিন্দু দেখা যাচ্ছে।

আমার দেশের মানুষ কেন এমন ভাবছে? এই ঘৃণাটা কি সেরেফ রাজনীতির? নাকি এর গভীরে আরও অন্য কোনো কঠিন গল্প লুকিয়ে আছে?

অলোকবাবু কাগজটা ভাজ করে রেখে বললেন, "আনিস সাহেব, রাজনীতি তো রাজনীতির জায়গায় থাকে। কিন্তু সাধারণ মানুষ কি সত্যি এত ঘৃণা করতে পারে?"

আমি একটু চাটুকারিতার হাসি হেসে বললাম, "অলোকবাবু, মানুষের মন বড়োই অদ্ভুত জিনিস। ভালোবাসার চেয়ে ঘৃণার শিকড় কখনো কখনো অনেক বেশি গভীরে চলে যায়। বিশেষ করে যখন তার পেছনে কোনো পুরোনো সংস্কার বা ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রচ্ছায়া থাকে..."

অলোকবাবু কৌতূহলী চোখে আমার দিকে তাকালেন। আমি রহস্যময় হাসি বজায় রেখে চুপ করে রইলাম। ট্রেনের চাকার আওয়াজ কুয়াশার রাতের নীরবতা চিরে এগিয়ে চলতে লাগল।

---

দ্বিতীয় পর্ব: কলার খোসা ও গোপন সুর

ট্রেন তার নিজস্ব গতিতে সামনের অন্ধকারের দিকে ছুটে চলেছে। কামরার ভেতর অলোকবাবু বেশ কৌতূহলী হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। মানুষের কৌতূহল জিনিসটা বড়ো মারাত্মক। একবার মাথায় ঢুকলে সহজে বের হতে চায় না।

অলোকবাবু চাদরটা গায়ে আর একটু জড়িয়ে বললেন, "আনিস সাহেব, আপনি বলছিলেন ভালোবাসার চেয়ে ঘৃণার শিকড় নাকি অনেক গভীরে চলে যায়। কিন্তু একটা সাধারণ প্রতিবেশী দেশের ওপর সাধারণ মানুষের এত আক্রোশ থাকবে কেন? বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর লোকজন তো পেশাদার, তাদের তো দেশের নীতি অনুসারেই চলার কথা।"

আমি মৃদু হেসে মাথা নাড়লাম। "অলোকবাবু, ওপরের চালচিত্র দেখে ভেতরের সবটা বোঝা যায় না। সেনাবাহিনীতে যখন কেউ কর্মরত থাকে, তখন নিয়মের নানা শিকল তাকে বেঁধে রাখে। সে ইচ্ছা করলেও নিজের মন খুলে কথা বলতে পারে না। কিন্তু চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরই আসল চেহারাটা বেরিয়ে আসে।"

বাংলাদেশ থেকে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের কথা ধরুন না। তারা যখন অবসরে যান, অনেকেই রাজনীতিতে যোগ দেন। আপনি কি এমন কোনো অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তার কথা শুনেছেন, যিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন—‘ভারত আমাদের প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্র, তাদের সঙ্গে আমাদের মেলামেশা ও সৌহার্দ্য বজায় রেখে চলা উচিত’?

না, এমন একজনকেও আপনি পাবেন না। কারণ তাদের ভেতরে যে তীব্র ভারত-বিদ্বেষ কাজ করে, তা আড়াল করার সুযোগ আর তখন থাকে না।

উদাহরণ চান? আমাদের দেশের একজন সামরিক কর্মকর্তা—ধরুন কর্নেল বা মেজর পদে ছিলেন, পরে হয়তো পদোন্নতি পেয়েছিলেন। চাকরি জীবনে ভারত-বিরোধী অবস্থানের কারণে কত জটিলতা হলো, কিন্তু অবসরে যাওয়ার পর তাঁকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে কর্নেল বানানো হলো। আবার অন্য আরেকজন, ধরুন সাবেক কোনো সেনা কর্মকর্তা, যিনি সামরিক পদে থাকা অবস্থাতেই অবসরে বাধ্য হন। অবসরে গিয়ে তিনি ক্রমাগত ভয়ংকর ভারত-বিরোধী কথাবার্তা ও বক্তব্য প্রচার করতে লাগলেন। ফলাফল কী হলো জানেন? তাকে পুরস্কৃত করার জন্য পরবর্তী সরকার অবসরের বহু বছর পর পদোন্নতি দিয়ে 'ব্রিগেডিয়ার' বানিয়ে দিল!

একটি দেশে যখন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভারত-বিদ্বেষের কারণে পুরস্কারস্বরূপ প্রমোশন দেওয়া হয়, তখন সাধারণ সামরিক বা অসামরিক মানুষের মনোভাব বুঝতে কি খুব বেশি কষ্ট হয়?

অলোকবাবু একটু ইতস্তত করে বললেন, "কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো? নির্বাচিত সরকার তো নিশ্চয়ই জনগণের মনোভাব বুঝে কোনো জাতীয় সিদ্ধান্ত নেবে?"

আমি একটু দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। "পলিটিক্স বা রাজনীতির অঙ্ক বড়োই অদ্ভুত অলোকবাবু। আপনি যদি মনে করেন শুধু একটা নির্দিষ্ট দল বা কিছু লোকই ভারতবিরোধী, তবে ভুল করবেন। বিরোধী দল বিএনপি-র নেতা-কর্মীরা যে প্রকাশ্যেই ভারত-বিদ্বেষী, তা তো নতুন করে বলার কিছু নেই। তাদের নেতারা তো রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ওপরের জামাকাপড় পর্যন্ত পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানায়! আর শাসক দল বা আওয়ামী লীগের লোকজন? অনেকে মনে করে তারা বোধহয় ভারতের অন্ধ পরম বন্ধু। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। তারা দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় থাকার হিসাব-নিকাশ বা রাজনৈতিক সুবিধার জন্য মুখে বন্ধুত্বের বুলি আওড়ায়। কিন্তু মনের গহিনে? ফ্রম দ্য বটম অব দ্য হার্ট, দে ডোন্ট লাভ অর লাইক ইন্ডিয়া অ্যাটলিস্ট! ভেতরে ভেতরে ভয়ংকর ঘৃণা তারাও পোষণ করে।"

অলোকবাবু এবার কিছুটা বিষম খাওয়ার মতো করে তাকিয়ে রইলেন।

কাচের বাইরে অন্ধকার এখন আরও গাঢ় হয়েছে। ট্রেনের ঝাঁকুনিতে ঝুলন্ত লাইটের আলোটা দু দুলছে।

আমি বললাম, "কিন্তু অলোকবাবু, আসল প্রশ্ন তো অন্য জায়গায়। এত যে ঘৃণা, এত যে বৈরিতা— এর মূল কারণটা কী? এটা কি সেরেফ ভৌগোলিক আধিপত্যের রাজনীতি? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো সুগভীর মনস্তাত্ত্বিক আর ধর্মীয় হিসাব-নিকাশ?"

অলোকবাবু এবার আগ্রহ ধরে রাখতে না পেরে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে বসলেন, "কী সেই কারণ, আনিস সাহেব?"

---

তৃতীয় পর্ব: শাস্ত্রের ব্যাখ্যা ও মনের কুঠুরি

ট্রেনটা একটা ছোট্ট স্টেশনের সিগন্যালে দাঁড়িয়েছে। চারপাশ নিঝুম। ট্রেনের এসি কামরার ভেতর যে মৃদু একটা গুনগুন শব্দ হচ্ছিল, সেটাও কেমন যেন থেমে গেছে।

আমি অলোকবাবুর আকুল দৃষ্টি দেখে একটা সিগারেট ধরাব কি না ভাবলাম, পরে মনে পড়ল এসি কামরায় ধূপধুনো আর সিগারেটের ধোঁয়া দুটোই নিষিদ্ধ।

আমি মৃদু গলায় বলতে শুরু করলাম, "অলোকবাবু, এই যে বাংলাদেশিদের ভারতের প্রতি চরম বিরোধিতা— এটা কি কেবলই রাজনীতি? রাজনীতি তো ভেসে আসা ফেনার মতো, আজ আছে কাল নেই। আসল কারণটা কিন্তু রাজনীতির নয়, কারণটা কমপ্লিটলি থিওলজিক্যাল—মানে ধর্মীয় চেতনার গভীর শিকড়ে পোঁতা।"

অলোকবাবু চশমাটা ঠিক করতে করতে বললেন, "ধর্মীয় চেতনা? মানে?"

"হাঁ, ধর্মীয় চেতনা," আমি একটু চিন্তিত মুখে বললাম। "বাংলাদেশে এখন একটা নতুন শব্দ খুব চালু হয়েছে—‘তৌহিদী জনতা’। তারা মনে করে, ধর্মীয় অনুশাসন বা মূলনীতির জায়গায় কোনো আপস নেই। আমাদের দেশের ধর্মীয় শিক্ষায় অমুসলিম বা মুশরিকদের প্রতি যে মনোভাবের কথা বলা হয়, সেটাই সাধারণ মুমিন মুসলমানের মনকে তৈরি করে।"

আমি অলোকবাবুর প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য একটু থামলাম। উনি বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনছেন।

আমি আবার শুরু করলাম, "যেমন ধরুন, একটি বহুল আলোচিত ধর্মীয় রেফারেন্স প্রায়ই টানা হয়—পবিত্র কোরানের ৯৮ নম্বর সূরা ‘আল-বাইয়্যিনা’-র ৬ নম্বর আয়াত। যেখানে স্পষ্ট ভাষায় অমুসলিম, কাফের, কিংবা ইসলামে অবিশ্বাসী পৌত্তলিকদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, দে আর দ্য ‘ওরস্ট অব অল ক্রিয়েচারস’—মানে সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে নিকৃষ্টতম প্রাণী।"

অলোকবাবু বেশ একটু চমকে উঠলেন। চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে বললেন, "বলেন কি!"

"হ্যাঁ," আমি মাথা নাড়লাম। "ব্যাখ্যাটা শুনুন। প্রশ্ন উঠতে পারে— ভারতের হিন্দুরা কি তবে মুশরিক বা পৌত্তলিক? আমাদের দেশের আমজনতা বা ধর্মপ্রাণ মানুষ কিন্তু মনে করে, হিন্দুরা যেহেতু অনেক দেব-দেবীর পূজা করে, প্রতিমা গড়ে উপাসনা করে, সেহেতু তারা পুরোপুরি 'আইডলেটর' বা পৌত্তলিক। মক্কায় যখন ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছিল, তখনো কিন্তু সেখানকার কুরাইশদের মধ্যে হুবাল কিংবা লাত-এর মতো দেব-দেবীর পূজা চালু ছিল। সেই পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই ইসলামের প্রতিষ্ঠা। ফলে হিন্দু ধর্মবিশ্বাসের এই আচারগুলোকে তারা মক্কার সেই পৌত্তলিকতার সাথেই খাপে খাপ মিলিয়ে দেখে।"

অলোকবাবু একটু ইতস্তত করে বললেন, "কিন্তু হিন্দু ধর্মেও তো পরমব্রহ্ম বা এক ঈশ্বরের কথা বলা আছে..."

আমি হেসে বললাম, "আপনি-আমি বিমূর্ত দর্শনের কথা বলতে পারি অলোকবাবু, কিন্তু আমজনতা তো দর্শন দেখে না, তারা দেখে আচার-অনুষ্ঠান। তাই সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিতে অমুসলিম মানেই নিকৃষ্ট ক্যাটাগরি। আর মনস্তত্ত্বটা খেয়াল করুন—সাধারণত মানুষ যেমন ক্ষতিকর বা বিপজ্জনক প্রাণী, ধরুন জলাতঙ্ক হওয়া কুকুর, বিষাক্ত বিছা কিংবা ঘরের তেলাপোকাকে ভালোবাসতে পারে না, অবচেতনভাবেই তাদের প্রতি একটা অপছন্দ বা ঘৃণা কাজ করে; ঠিক তেমনই ধর্মীয় শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার কারণে সাধারণ মনের গহিনে এই অপছন্দটা গেঁথে যায়।"

অলোকবাবু বেশ চিন্তিত মুখে বললেন, "কিন্তু মানুষ তো আর সমাজ বা রাজনীতি ছেড়ে শুধু ধর্ম নিয়ে থাকে না! প্রকাশ্যে তারা কী বলে?"

আমি এক গাল হেসে বললাম, "ঐখানেই তো আসল মজা! ডাইরেক্টলি ধর্মের কথা বলে ঘৃণা প্রকাশ করলে তো আবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, সহনশীলতা— এইসব নিয়ে বড়ো বড়ো প্রশ্ন উঠে যাবে! তাই সেটাকে সুন্দর একটা প্যাকিং দেওয়া হয়। কী সেই প্যাকিং? 'ভারত আমাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করছে', 'ভারত আমাদের তেল-গ্যাস-পানি সব নিয়ে যাচ্ছে', কিংবা 'বাংলাদেশকে ভারতের উপনিবেশ বানিয়ে ফেলা হয়েছে'!"

ট্রেনটা একটা মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে আবার চলতে শুরু করল।

আমি জানালার বাইরের কুশলী অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বললাম, "এই যে মনগড়া উদ্ভট কিস্‌সা-কাহিনি তৈরি করা— এটা আসলে ওই নেকড়ে বাঘ আর ভেড়ার বাচ্চার গল্পের মতো। নেকড়ে বাঘের দরকার ভেড়ার বাচ্চাটাকে খাওয়া, তাই বাহানা বানাতে হবে—‘তুই আমার ঝরনার পানি ঘোলা করছিস কেন?’ তেমনি, অপছন্দ করার জন্য একটা অজুহাত বা বাহানা তাদের দরকারই ছিল।"

অলোকবাবু চশমাটা খুলে হাতের রুমাল দিয়ে মুছতে মুছতে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

---

চতুর্থ পর্ব: আয়না ও ছায়ার খেলা

ট্রেনটি তার চাকার শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা চিরে এগিয়ে চলেছে। এসি কামরার ঠান্ডাটা যেন একটু বেশি ঘন হয়ে উঠেছে। অলোকবাবু বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তাঁর চোখের দৃষ্টি জানালার বাইরে অন্ধকারের গভীরে আবদ্ধ, যেন মনের মধ্যে অজস্র হিসেব মেলানোর চেষ্টা করছেন।

আমি একটু গলা পরিষ্কার করে বললাম, "অলোকবাবু, বিষয়টাকে কেবল ধর্মীয় মানসিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ভাবলে কিন্তু ভুলের আধেকটা বাকি রয়ে যাবে। এর একটা প্র্যাকটিক্যাল বা প্রায়োগিক দিকও আছে। আর সেটাই সবচেয়ে অদ্ভুত।"

অলোকবাবু ঘুরে তাকালেন, "কী রকম প্র্যাকটিক্যাল দিক, আনিস সাহেব?"

"বলছি," আমি হালকা হাসলাম। "আমাদের দেশের একটা বিশাল জনগোষ্ঠীর ধারণা— ভারতের মানুষ, বিশেষ করে হিন্দু সমাজ, ভীষণ রকম স্বার্থপর, অর্থলোভী আর সংকীর্ণমনা। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, জীবনধারণের জন্য প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় কত হাজার পদ— পেঁয়াজ, রসুন, চাল, ডাল থেকে শুরু করে আলু— বাংলাদেশের মানুষকে কিন্তু সেই ভারতের ওপরই নির্ভর করতে হয়, ওখান থেকেই আমদানি করতে হয়।"

অলোকবাবু চশমাটা নাকে বসিয়ে বললেন, "তাহলে তো পরস্পরের ওপর একটা স্বাভাবিক নির্ভরতা আর শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হওয়ার কথা!"

আমি হাত দুটো একটু নাড়িয়ে বললাম, "আহা, সেখানেই তো মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম খেলাটা! আমাদের দেশের লোক ভাবে, ‘আমরা ভারতকে যতই অপছন্দ বা ঘৃণা করি না কেন, ওদের ব্যবসায়ীরা যেহেতু পয়সার লোভে ব্যাকুল, তাই আত্মসম্মানবোধ শিকেয় তুলে হলেও ওরা ঠিকই আমাদের মালামাল জোগান দিয়ে যাবে!’ অর্থাৎ একদিকে ভারতের ওপর জীবনধারণের নির্ভরতা, অন্যদিকে মনের ভেতরে সেই ভারতের প্রতিই তীব্র এক অবজ্ঞা। এতে আত্মতুষ্টি ঘটে, কিন্তু ভেতরের অরুচিটা বিন্দুমাত্র কমে না।"

অলোকবাবু একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "কিন্তু আনিস সাহেব, একটা রাষ্ট্র কি শুধু মনগড়া কল্পনার ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে? অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আসার পর কিংবা পরিবর্তনগুলোর পর কোনো বাস্তব তথ্য কি সামনে আসেনি?"

"আরে, সেই জায়গাটাতেই তো সবচেয়ে বড়ো চমক!" আমি হেসে উঠলাম। "আমি নিজেও তো মনে করতাম, পূর্ববর্তী সরকার হয়তো ভারতের সাথে এমন সব গোপন চুক্তি বা লেনদেন করে রেখেছিল, যার কারণে ভারত তাদের অন্ধের মতো সমর্থন জোগাত। বাংলাদেশের মানুষও তো দিনরাত বলত— বাংলাদেশ নাকি ভারতের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে! কিন্তু যখন পটপরিবর্তন হলো, মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা তৌহিদী জনতার পছন্দের বিএনপি শক্তিগুলো সামনে এলো— তারা ছয় মাসের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও কিন্তু ভারতের সাথে করা এমন কোনো অন্যায় বা ক্ষতিকর গোপন চুক্তি জনসমক্ষে তুলে ধরতে পারল না, বাতিল করা তো বহু দূরের কথা!"

অলোকবাবু ভ্রূ কুঁচকে বললেন, "বলেন কি? একটা চুক্তিও না?"

"না," আমি মাথা নাড়লাম। "কোনো চুক্তিই খুঁজে পাওয়া গেল না! অর্থাৎ, এতদিন ধরে যে-সব অভিযোগ তোলা হচ্ছিল, তার প্রায় সবই ছিল মনগড়া রূপকথা। কিন্তু তাতে কি মানসিকতার কোনো পরিবর্তন ঘটেছে? মোটেই না! আজ ভারত হয়তো বহু চেষ্টা করছে, নানাভাবে সম্পর্কের বরফ গলাতে চাইছে, বন্ধুত্বের হাত বাড়াচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের তরফ থেকে সেই আহ্বান প্রায় ঘৃণাভরেই প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। কারণ আর কিছুই নয়— তৌহিদী জনতা বা আমজনতার মনোরঞ্জন করে চলা ছাড়া ক্ষমতার মসনদে থাকাটা যে বড়ো কঠিন!"

অলোকবাবু চুপ করে আমার কথাগুলো গিলছিলেন। আমি লক্ষ্য করলাম, উনার কপালে সূক্ষ্ম দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।

কাচের বাইরে এবার ভোরের আবছা আলো ফুটতে শুরু করেছে। রাত কেটে সকাল হচ্ছে, কিন্তু মনের ভেতর জমানো এই ছায়াচ্ছন্ন বৈরী ধারণার সকাল কি আদৌ এত সহজে আসবে?

---

পঞ্চম পর্ব: শেষ স্টেশন ও খোলা আকাশ

ভোরের আলোটা জানালার কাচ ভেদ করে কামরার ভেতর ছড়িয়ে পড়েছে। ট্রেনের গতি কিছুটা কমে এলো। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন আর খুব বেশি দূরে নয়। চা-ওয়ালা দরজার কাছে এসে হেঁকে গেল—"গরম চা! চা খাবেন বাবু?"

অলোকবাবু কুঁজো হয়ে বসে ছিলেন। চায়ের দুটো মাটির ভাঁড় কিনে একটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। তারপর একটা বড়ো চুমুক দিয়ে বললেন, "আনিস সাহেব, আপনার সব কথা শুনলাম। কিন্তু ভারতের অনেকেই— বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ বা আসামের বাইরের ভারতীয়রা মনে করে, বাংলাদেশ কি আর এমন করতে পারবে? ওদের রাজনৈতিক বা সামরিক কোনো ক্ষমতা তো ভারতে প্রভাব ফেলার মতো নয়। তারা তো বাংলাদেশকে একেবারেই গোনায় ধরে না।"

আমি ধোঁয়া ওঠা চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে একটু মৃদু হাসলাম।

"অলোকবাবু, কে ভাবল আর কে ভাবল না— তাতে বাস্তব সত্যটা কিন্তু বদলে যায় না। এই যে সাধারণ ভারতীয়রা উদাসীন হয়ে বসে আছে, আর ভাবছে বাংলাদেশকে নিয়ে মাথা ঘামানোর কিছু নেই, তারা আসলে অনেক বড়ো একটা ভুল করছে। বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হতে পারে, কিন্তু ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড়ো রকমের ক্ষতি করার সামর্থ্য কিন্তু তার পুরোপুরি আছে।"

অলোকবাবু একটু অবাক হয়ে বললেন, "কী রকম?"

"খুব সোজা হিসেব," আমি হাতের চায়ের ভাঁড়টা ধরে থেকে শান্ত গলায় বললাম। "ডক্টর ইউনূস ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের সীমান্তে কত হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ হয়ে গেল বলুন তো? আসাম বা হাসিমারার দিকে বিপুল পরিমাণ সেনা মোতায়েন করতে হচ্ছে, কাঁটাতারের বেড়া নতুন করে মজবুত করতে হচ্ছে। আগের সরকারের সময়ে তো ভারতীয় প্রতিরক্ষা খাতকে এত বিপুল অর্থ সীমান্তে ঢালতে হয়নি! আজ যা হচ্ছে, তা কেবল সম্ভাব্য হুমকির শঙ্কা থেকেই তো, তাই না?"

অলোকবাবু চুপ করে রইলেন। আমি থামলাম না।

"ধরুন, বাংলাদেশের ভেতরে যদি এই ভারত-বিদ্বেষকে কাজে লাগিয়ে সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলের নানা বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া শুরু হয়, তাদেরকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া হয়— তাহলে ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কী হাল হবে চিন্তা করেছেন? বাংলাদেশের মানুষ যদি মনে করে, তারা দরকার হলে নিজেদের ক্ষতি করে কিংবা 'ঘাস খেয়ে হলেও' ভারতের বিরোধিতা করবে, তবে সেই প্রতিবেশীকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ কি থাকে?"

ট্রেনটা একটা দীর্ঘ হুইস্‌ল বাজিয়ে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ধীরে ধীরে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। চারপাশের কোলাহল আর মানুষের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে।

অলোকবাবু চাদরটা গুটিয়ে ব্যাগটা হাতে নিলেন। তাঁর চোখে মুখে এক ধরনের গভীর চিন্তা ও ভাবনার স্পষ্ট ছাপ। উনি আমার দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, "আনিস সাহেব, আপনার সাথে এই জার্নিটা আর কথাগুলো সারাজীবন মনে রাখার মতো। অনেক অজানা একটা মনস্তত্ত্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেলাম যেন।"

আমি উনার হাতটা ধরে সহাস্যে বললাম, "অলোকবাবু, পৃথিবীটা বড়ো অদ্ভুত জায়গা। মানুষ ভালোবাসতে যেমন হাজারটা কারণ খোঁজে, ঘৃণা করার জন্যও একটা কারণই যথেষ্ট। আবার সেই কারণটা যদি হয় কাল্পনিক, তবে তো কথাই নেই! শুভ সফর।"

অলোকবাবু কুলি ডেকে কামরা থেকে নেমে গেলেন। আমি জানালার পাশে বসে রইলাম। বাইরের রোদটা ততক্ষণে বেশ কড়া হয়ে ফুটে উঠেছে। ইস্পাতের লাইনের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষগুলোকে দেখতে দেখতে আমার মনে হলো— সীমান্তের ওপর হয়তো কাঁটাতার টানা যায়, কিন্তু মানুষের মনের ভেতর যে অচেনাপুরের প্রাচীর তৈরি হয়ে আছে, তা পার হওয়ার মতো কোনো ট্রেন কি কখনো তৈরি হবে?

আমার প্রিয় একটা প্রবাদ মনে পড়ে গেল— মানুষের জীবনের সব গল্পে সমাপ্তি থাকে না, কিছু গল্প চিরকাল অসমাপ্ত থাকলেই দেখতে সুন্দর লাগে।