প্রথম পর্ব

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড়ো দুঃখ কী, জানেন? মানুষ যখন তার পরম প্রিয় কাউকে শেষবারের মতো দেখতে চায়, অথচ প্রকৃতি বা পরিস্থিতি তার মাঝখানে এক বিশাল লৌহকপাট দাঁড় করিয়ে দেয়। সেই লৌহকপাটের ওপারে আলো থাকে, এপারে থাকে শুধু এক অন্ধকার কুঠুরি।
আমার নাম হিমু নয়, মিসির আলিও নই। আমি একজন সাধারণ গল্পকার। তবে মাঝে মাঝে চারপাশের ঘটনা দেখে মনে হয়, বাস্তব জীবন যে নাটক রচনা করে, তা কোনো লেখকের পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব।
চট্টগ্রামের একটা নির্জন আলো-আঁধারি ঘর। বাতিটা মিটমিট করে জ্বলছে। বাতাসে কেমন যেন এক বিষণ্ণ গন্ধ— ওষুধ, ডেটল আর মৃত্যুচেতনার মিশ্রণ। বিছানায় শুয়ে আছেন এক বৃদ্ধা। বয়সের ভারে শরীর শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে। চোখের কোটর ধসে গেছে ভেতরে, কিন্তু দৃষ্টিটা অপলক স্থির হয়ে আছে ঘরের দরজার দিকে।
তিনি চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মা।
একজন মায়ের জীবনের শেষ ইচ্ছাটা কেমন হতে পারে? খুব বেশি কিছু কি? সোনা-দানা, ধন-সম্পদ? না। একজন মায়ের শেষ ইচ্ছা অত্যন্ত সামান্য— তার সন্তানকে একবার চোখ মেলে দেখা। মুক্ত আকাশে, মুক্ত বাতাসে নিজের সন্তানকে জড়িয়ে ধরা।
বুলবুলি পাখির মতো ক্ষীণ কণ্ঠে তিনি বিড়বিড় করছিলেন, "আমার চিন্ময় কই? ওরে একটু নিয়ে আসো। আমার সময় শেষ হয়ে আসছে..."
পাশে বসা আত্মীয়রা চোখ মুছছেন। কিন্তু তারা তো অসহায়। চিন্ময় তো কোনো সাধারণ দূরে থাকা ছেলে নয়। সে বন্দি। চার দেয়ালের আড়ালে, শিকলের জাঁতাকলে আটক এক মানুষ।
বৃদ্ধা মা শেষ নিশ্বাস ফেলার কিছুদিন আগেও সোশ্যাল মিডিয়ার এক অদৃশ্য আয়নায় চোখ রেখে আকুতি জানিয়েছিলেন। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশ্যে তিনি যেন নিজের শেষ মিনতিটি পাঠাচ্ছিলেন। কণ্ঠ জড়িয়ে আসছিল তার, "তারেক বাবা, তুমি তো বাপের মতো কাজ করছ। আমার ছেলেটা দুই বছর ধরে জেলখানায়। তুমি ওরে একটু বের করে দাও বাবা... আমি তো মৃত্যুশয্যায়। মরার আগে ছেলেটাকে পাশে পেলে একটু শান্তিতে চোখ বুজতে পারতাম..."
এক বৃদ্ধা মায়ের এই আকুতি বাতাসের তরঙ্গে ভেসে বেড়াল, হাজার হাজার মানুষের মোবাইলের পর্দায় গিয়ে ধাক্কা খেল। কিন্তু আদালতের ঠান্ডা কাগজের ফাইলের ভেতর সেই আকুতি কি পৌঁছাতে পেরেছিল?
আদালতের কোনো হৃদয় থাকে না। আইনের বইয়ে থাকে ধারা, উপধারা আর আইনি তর্ক। সেখানে লেখা থাকে— জামিন নামঞ্জুর।
মা আর অপেক্ষা করতে পারলেন না। এই পৃথিবীর সমস্ত মায়া, সমস্ত যন্ত্রণা আর শেষবারের মতো ছেলেকে দেখার অসম্পূর্ণ ইচ্ছা বুকে নিয়েই তিনি বিদায় নিলেন। তার চোখ দুটি খোলা ছিল। হয়তো তিনি ভেবেছিলেন, শেষ মুহূর্তে হলেও দরজার ওপাশ থেকে তার ছেলে 'মা' বলে ডেকে উঠবে।
কিন্তু সেই ডাক আর আসে নি।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাস তখন কারাগারের নির্জন কক্ষে বসে হয়তো প্রদীপের সলতে উসকে দিচ্ছিলেন। সন্ন্যাসী মানুষের চোখ থেকে কি জল পড়ে? সাধু-সন্তরা তো মোহমায়াহীন হওয়ার কথা। কিন্তু সন্ন্যাসীর ভেতরেও তো একজন সন্তান লুকিয়ে থাকে। সেই সন্তান যখন জানতে পারল, তার মা আর নেই— তখন তার ভেতরের পৃথিবীটা কীভাবে ভেঙে দুমড়ে-মুচড়ে গেল, তা কি কোনো আইনি বিধিতে লেখা থাকে?
এক নিরপরাধ মানুষ, যিনি নিরামিষাশী, যিনি জীবের প্রতি অহিংসার বার্তা দেন— তিনি আজ হত্যা মামলার আসামি। পুলিশের কাস্টডিতে গাড়ি থাকা অবস্থায় বাইরের রাস্তায় কার গুলিতে আইনজীবী মারা গেলেন, আর তার দায় এসে পড়ল এই সাধুর ঘাড়ে। কী অদ্ভুত এই সমাজের বিচারালয়! যে মানুষটা একটা মশাসুদ্ধ মারতে হাত তোলে না, সে নাকি খুনের নির্দেশদাতা!
প্রকৃতি এই তামাশা দেখে নিঃশব্দে হাসে। আর আমরা, সাধারণ মানুষ, কেবল সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা 'হাহা' বা 'স্যাড' রিঅ্যাকশন দিয়ে আমাদের নাগরিক দায়িত্ব শেষ করি।
মা চলে গেলেন। ওপারে গিয়ে তিনি হয়তো এখন মুক্ত। কিন্তু এপারে রেখে গেলেন এক বিশাল প্রশ্নের পাহাড়। রাষ্ট্র কি শুধুই একটা শাসনযন্ত্র, নাকি তার কোনো হৃদয় থাকা উচিত?

দ্বিতীয় পর্ব

জেলখানার দেয়ালগুলো খুব অদ্ভুত হয়। এরা সব শব্দ শুষে নেয়, কিন্তু হাহাকারগুলোকে প্রতিধ্বনি করে ফিরিয়ে দেয়।
কারাগারের চার দেয়ালে বন্দি চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের শরীরটা এমনিতেই ভালো নেই। লিভারের পুরোনো অসুখটা মাঝে মাঝেই জানান দেয়। তার ওপর বিগত কয়েক মাসের ধকল। কিন্তু শরীরের যন্ত্রণার চেয়েও বড়ো হয়ে দেখা দেয় মনের ভেতর জমে থাকা এক অদৃশ্য কুয়াশা।
যে মানুষটা জীবনের একটা বড়ো সময় কাটিয়েছে নিরামিষ আহারে, যার বিশ্বাস আর সাধনার মূল ভিত্তিই হলো অহিংসা, সেই মানুষটার নামের পাশে লিখে দেওয়া হয়েছে একটি নির্মম শব্দ—'ঘাতক'।
যেদিন আইনজীবী আলিফ নিহত হলেন, চিন্ময় কৃষ্ণ দাস তখন পুলিশের প্রিজন ভ্যানের ইস্পাতের খাঁচায় বন্দি। চারদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া পাহারা। সেই সুরক্ষিত কাস্টডিতে বসে থাকা একজন সন্ন্যাসী কীভাবে বাইরের এক রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড হয়ে গেলেন, সেই উত্তর আইনের জটিল মারপ্যাঁচে হারিয়ে গেছে।
কারাগারের এক কোণে বসে তিনি যখন মায়ের মৃত্যুর খবরটি পেলেন, তখন কি কেঁদেছিলেন?
সাধারণ মানুষ কাঁদে চোখের জলে। কিন্তু সাধু-সন্ন্যাসীরা যখন কাঁদে, তখন তাদের অশ্রু বাইরে আসে না; তা ভেতরে ভেতরে জমে বরফ হয়ে যায়। যে মা তাকে নয় মাস গর্ভে ধারণ করেছিলেন, যে মা শেষ বয়সে একটুখানি ছোঁয়ার জন্য, একটুখানি দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন— সেই মায়ের মুখটা শেষবারের মতো দেখার অধিকারটুকুও রাষ্ট্র তাকে দিল না।
অথচ কী অদ্ভুত এই বিচারব্যবস্থা! দীপু হত্যা মামলার মতো জঘন্য অপরাধের আসামিরা নাকি ক্ষমতার গলিপথ দিয়ে দিব্যি জামিন পেয়ে মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ায়। আর যার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ কোনো প্রমাণ নেই, শুধু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকারের কথা বলা আর মঞ্চে দাঁড়িয়ে আত্মমর্যাদার ডাক দেওয়াই যার প্রধান অপরাধ হয়ে দাঁড়াল— তার জামিনের আবেদন বারবার নামঞ্জুর হয়ে লাল ফিতার দফতরে আটকে থাকে।
এক বৃদ্ধ মুসলিম হুজুর— মাথায় টুপি, মুখে সাদা দাড়ি— কারাগারের সাক্ষাৎ কক্ষে এসেছিলেন তার সঙ্গে দেখা করতে। সেই বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষটি যখন চিন্ময় বাবুর মুখোমুখি হলেন, তখন ধর্ম বা পরিচয়ের সব দেয়াল নিমিষেই ধসে গেল। বৃদ্ধ হুজুর চিন্ময় বাবুর হাত দুটি ধরে কেঁদে ফেললেন।
রাজনীতিবিদরা যেখানে ধর্মের নামে বিভেদের বিষবাষ্প ছড়ায়, সেখানে এই সাধারণ মানুষটির চোখের জল প্রমাণ করে দিল— মানবতার কোনো আলাদা ধর্ম হয় না। এই দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে সমস্ত রাজনৈতিক চক্রান্ত আর হিংসার ভাষা বড়ো ছোটো হয়ে যায়।
মা হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ফেলার আগে বারবার একটা কথাই বলেছিলেন, "আমার ছেলেটা বাঁচার আর কোনো কারণ খুঁজে পাবে না রে..."
মায়ের সেই আশঙ্কা কি সত্যি হতে চলেছে? একটা মানুষকে শারীরিকভাবে শেষ করার অনেক উপায় আছে। কিন্তু তাকে তিলে তিলে নিঃশেষ করার সবচেয়ে সহজ পথ হলো তার বিচার পাওয়ার আশাটাকেই হত্যা করা। চব্বিশটা মাস— দুই দুটি বছর কেটে গেল এই অনিশ্চয়তার আঁধারে।
কিন্তু ইতিহাসের পাতায় একটা কথা স্পষ্ট লেখা থাকে— ক্ষমতার দাপটে সাময়িক সত্যকে ঢেকে রাখা যায়, কিন্তু চিরতরে মুছে ফেলা যায় না।

তৃতীয় পর্ব

হুমায়ূন আহমেদের লেখালেখিতে একটা কথা প্রায়ই ঘুরেফিরে আসত— মানুষের সবচেয়ে বড়ো শক্তি হলো তার ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা। মানুষ সবকিছু ভুলে যায়। প্রিয়জনের কষ্ট ভুলে যায়, অন্যায় ভুলে যায়, রক্তের দাগ ভুলে যায়। কিন্তু কিছু কিছু দাগ থাকে, যা সময় মুছতে পারে না; বরং যত দিন যায়, সেই দাগগুলো আরও স্পষ্ট হতে থাকে।
চট্টগ্রামের সেই অন্ধকার গলির মোড়ে আইনজীবী আলিফ যখন প্রাণ হারালেন, তখন চারদিকে এক ভীষণ বিশৃঙ্খলা। বাতাস তখন বারুদের গন্ধে ভারী। অথচ রাষ্ট্র খুব সহজে, খুব দ্রুত একজন খলনায়ক খুঁজে বের করে ফেলল। প্রিজন ভ্যানের লোহার শিক ধরে বসে থাকা সেই নিরামিষাশী সাধু মানুষটি, যিনি সারাজীবন অহিংসার বাণী প্রচার করে এসেছেন, তাকেই বানিয়ে দেওয়া হলো মূল চক্রান্তকারী।
কী অদ্ভুত এই বিচারালয়! যে লোকটা জীবনের তাগিদে একটা মাছের প্রাণ সংহার করতেও ভয় পায়, তাকে দেওয়া হলো মানুষ হত্যার দায়।
রাষ্ট্র যখন কাউকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন তার কাছে যুক্তি বা সত্যের কোনো দাম থাকে না। সেখানে বিচার প্রহসনে পরিণত হয়। চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে একে একে ছয়টি মামলা চাপিয়ে দেওয়া হলো। চব্বিশটি মাস কেটে গেল চার দেয়ালের পেছনে। দুটি বছর!
দুই বছরে একটা মানুষের জীবনের কত কী বদলে যায়। ঋতু বদলায়, গাছের পাতা ঝরে নতুন পাতা গজায়, নদীর জল শুকিয়ে আবার নতুন বান আসে। কিন্তু সেই আলো-বাতাসহীন প্রকোষ্ঠে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে ছিল। চারটিতে জামিন মিলল, কিন্তু বাকি দুটোতে আটকে রাখা হলো তাকে। ঠিক যেন একটা খেলা— বিড়াল যেমন ইঁদুরকে ধরে পুরোপুরি মারে না, একটু ছেড়ে দিয়ে আবার থাবা বসায়, তেমনি এক নিষ্ঠুর খেলা।
এই দুই বছরের বন্দীজীবনে চিন্ময় বাবু কী হারিয়েছেন?
তিনি হারিয়েছেন তার স্বাস্থ্য, হারিয়েছেন স্বাধীনভাবে শ্বাস নেওয়ার অধিকার, আর সবশেষে হারিয়েছেন তার মাকে। যে মা মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত পথ চেয়ে বসে ছিলেন— ছেলে কখন মুক্ত হয়ে এসে বুকে জড়াবে। সেই বৃদ্ধা মা হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ফেললেন একবুক হাহাকার নিয়ে। রাষ্ট্র তাকে ছেলের শেষ ছোঁয়াটুকুও পেতে দিল না।
হাসপাতালের সেই নিস্তব্ধ ঘরের দৃশ্যটা ভাবলে বুক কেঁপে ওঠে। বেডে শুয়ে থাকা জ্ঞানহীন বৃদ্ধা মায়ের চোখ দুটি আধখোলা। তিনি হয়তো অবচেতন মনেও খুঁজছিলেন তার সন্তানকে। কিন্তু রাষ্ট্র বড়ো নিষ্ঠুর। আইনের মারপ্যাঁচে আটকে রাখা হলো এক নিরপরাধ ছেলেকে, আর ওদিকে এক মা নিঃশব্দে পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে।
মা চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন কিছু কঠিন প্রশ্ন। রাষ্ট্র কি কেবলই কিছু ক্ষমতাধর মানুষের রক্তচক্ষু আর রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের সমীকরণ? যেখানে দুর্বল ও সংখ্যালঘুর কোনো স্থান নেই?
আজ চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের শরীর ভাঙছে, লিভারের সমস্যা প্রকট হচ্ছে। কিন্তু তার চেয়েও বড়ো কথা—যে দেশটা সবার হওয়ার কথা ছিল, সেই দেশে একা দাঁড়িয়ে থাকা এক সন্ন্যাসীর মনোবল কি আজও অক্ষুণ্ণ আছে? নাকি ক্ষমতার দাপটে সেই মনোবলও আজ ভাঙনের মুখে?


চতুর্থ পর্ব

আমার প্রায়ই মনে হয়, প্রকৃতি কোনো কিছু ফেলে দেয় না। মানুষ অন্যায় করে ভেবে নেয় সে বেঁচে গেল, কিন্তু প্রকৃতির খাতায় প্রতিটা হিসাব খুব সূক্ষ্মভাবে লেখা থাকে। একে আপনি কর্মফল বলতে পারেন, আবার নিয়তিও বলতে পারেন।
আজকের এই বাংলাদেশে সবচেয়ে বড়ো অপরাধ হয়তো নিজের অধিকারের জন্য সোচ্চার হওয়া। চিন্ময় কৃষ্ণ দাস কোনো অস্ত্র হাতে তুলে নেননি, কোনো রাজনীতি বা ক্ষমতার মসনদের প্রতি তার লোভ ছিল না। তার অপরাধ ছিল— তিনি নিপীড়িত, ভীতসন্ত্রস্ত মানুষের পক্ষে কথা বলেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন এই মাটিতে যেন সবাই নিজের পরিচয় নিয়ে, নিজের ধর্ম পালন করে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে।
কিন্তু ক্ষমতাধরদের কাছে এই স্পষ্টভাষিতা সহ্য হলো না। তাই তাকে আটকে রাখা হলো।
একটু ভেবে দেখুন, আজ যদি উচ্চ আদালত থেকে তিনি সব মামলায় খালাস পান, যদি কাল সকালে কারাগারের ভারী লোহার দরজাটা খুলে দেওয়া হয়— তাহলে রাষ্ট্র কি তার জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া চব্বিশটি মাস ফিরিয়ে দিতে পারবে?
রাষ্ট্র কি পারবে সেই বৃদ্ধা মাকে কবর বা চিতাগ্নি থেকে আবার ফিরিয়ে এনে ছেলের কোলে তুলে দিতে? পারবে কি সেই মায়ের শেষ আকুল আকুতি, সেই শেষ চোখের জলটুকু মুছে দিতে?
না, পারবে না। রাষ্ট্র কোনোদিন তার ভুল স্বীকার করে না। রাষ্ট্র শুধু কিছু ফাইলের পাতা উলটায়, কিছু নতুন আইন বানায় আর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার খেলায় ব্যস্ত থাকে।
আজ সমাজের একশ্রেণীর মানুষ ভাবছে, "আমার তো কিছু হয়নি, আমি তো নিরাপদ। চিন্ময় দাসের যা হচ্ছে তা তো অন্য কারো সমস্যা, আমার তো আর হিন্দু পরিচয় নেই বা আমি তো রাজনীতির মধ্যে নেই।"
এই ভাবনাটাই হলো সবচেয়ে বড়ো ভুল। যখন প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লাগে, তখন সেই আগুনের উত্তাপ আপনার ঘরে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগে না। আজ যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ না তোলা হয়, আজ যদি এক নিরপরাধ মানুষের প্রতি হওয়া এই অবিচারে সবাই চুপ করে থাকে, তবে কাল যখন অন্য কারো ওপর এই আঘাত আসবে— তখন কথা বলার মতো আর কেউ বেঁচে থাকবে না।
গণপতি চক্রবর্তীর হত্যাকাণ্ডের কথা কি আমরা ভুলে গেছি? কিংবা সেই তরুণ দীপু দাস— যাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হলো? তাদের ঘাতকেরা নাকি আজ মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ায়, আর একজন সাধু সন্ন্যাসী যিনি শুধু শান্তির কথা বলেছিলেন, তিনি বন্দি থাকেন গুমোট চার দেয়ালে। এই প্রহসন কি আমাদের সমাজের বিবেককে একটুও নাড়া দেয় না?
কারাগারের অন্ধ কুঠুরিতে বসে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস হয়তো আজ নিঃশব্দে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করছেন। সন্ন্যাসীরা তো কারো প্রতি ঘৃণা পোষণ করেন না। কিন্তু যে অশ্রু আজ তার চোখ থেকে ঝরে মাটিকে স্পর্শ করছে, যে হাহাকার তার অন্তরে জমা হচ্ছে— তা কি বাতাসে মিলিয়ে যাবে?
প্রকৃতির একটা অদ্ভুত নিয়ম আছে। যে অন্যায় জলসিঞ্চন করে বড়ো করা হয়, একদিন সেই অন্যায়ের বিষবৃক্ষেই তার কারিগরদের বিনাশ ঘটে।

পঞ্চম (শেষ) পর্ব

অবশেষে সেই মুহূর্তটি এলো, যা হয়তো কোনো সন্তানই তার জীবনে দেখতে চায় না।

প্রশাসনের অনুকম্পায় বা আইনের কাঠামোগত শর্তে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে কয়েক ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তির অনুমতি দেওয়া হলো। কিন্তু এই মুক্তি কি আনন্দ নিয়ে এলো? না। এই মুক্তি বয়ে নিয়ে এলো শ্মশানের ধোঁয়া আর এক অপরিসীম শূন্যতা।
হাতকড়া খোলা হলো কি না, জানা নেই। প্রিজন ভ্যান থেকে যখন একজন মানুষ নেমে এলেন, তখন চারপাশে এক থমথমে নীরবতা। হাটহাজারীর সেই পরিচিত পুণ্ডরীক ধাম আশ্রম— যেখানে জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে তাঁর, যেখানে তাঁর মা শেষ ইচ্ছা নিয়ে এসে বসেছিলেন— সেই প্রাঙ্গণে তখন চিতাগ্নির প্রস্তুতি চলছে।
জীবিত অবস্থায় মা যাঁকে একনজর দেখতে চেয়েছিলেন, এখন তিনি শুয়ে আছেন নিঃশব্দে, কাষ্ঠ শয্যায়।
চিন্ময় বাবু মায়ের চরণের কাছে এসে দাঁড়ালেন। একজন সাধুর মন হয়তো সংসারের ছায়া থেকে মুক্ত হতে শেখে, কিন্তু রক্তের টান আর মাতৃস্নেহের বাঁধন ভাঙা যে কত কঠিন, তা এই দৃশ্য না দেখলে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। শেষকৃত্যের মন্ত্রোচ্চারণের মাঝে এক সন্তানের নীরব কান্না বাতাসের প্রতিটি কণাকে যেন ভারী করে তুলল।
পাঁচ ঘণ্টার সময়সীমা। কাঁটায় কাঁটায় মেপে দেওয়া ঘড়ির ঘণ্টা বাজছে। রাষ্ট্র তাঁকে পাঁচ ঘণ্টা সময় দিয়েছে মায়ের চিতায় শেষ বিদায় জানানোর জন্য। পাঁচ ঘণ্টা শেষ হলেই আবার টেনে নিয়ে যাওয়া হবে সেই লোহার গরাদের ওপারে।
মায়ের মুখের দিকে চেয়ে চিন্ময় বাবু হয়তো মনে মনে বলছিলেন, *"মা, তুমি মুক্ত হয়ে গেলে। এই অন্যায়, এই ষড়যন্ত্র আর বিচারের প্রহসন থেকে তুমি রেহাই পেলে। কিন্তু আমি এখনও বন্দি।"*
আজকের এই বাংলাদেশ কোথায় এসে দাঁড়াল? যেখানে অন্যায়ের প্রতিবাদ করাটাই অপরাধ, যেখানে সত্য কথা বলা মানেই গায়ে রাষ্ট্রদ্রোহিতার তকমা লেপে দেওয়া। যে বাংলাদেশ হওয়ার কথা ছিল অসাম্প্রদায়িক, মুক্তচিন্তার আর প্রতিটি মানুষের বাক্‌স্বাধীনতার প্রতীক— সেই বাংলাদেশ আজ কেমন যেন এক অজানা অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে।
অন্যায় ও অবিচারের এই যে খরস্রোতা নদী, তা হয়তো অনেক দিন ধরে বইছে। কিন্তু নদী যেমন চিরকাল একপথে চলে না, ইতিহাসও তেমনি চিরকাল এক জায়গায় আটকে থাকে না।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাস আবার হয়তো কারাগারের কুঠুরিতে ফিরে গেছেন। তাঁর মা আজ ছাই হয়ে মিশে গেছেন এ দেশেরই মাটিতে। কিন্তু রেখে গেছেন এক বিশাল অনুশোচনার নদী। এই নদী পার হওয়ার সাধ্য কি আজকের বিচারব্যবস্থা বা রাষ্ট্রযন্ত্রের আছে?
প্রকৃতি তার হিসাব ঠিক সময়েই মিলিয়ে নেয়। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। নীরব হয়ে থাকা সাধারণ মানুষের বিবেক যদি আজ না জাগে, তবে এই অনুশোচনার নদী একদিন পুরো সমাজকেই গিলে খাবে।