প্রথম পর্ব
ক্যাম্প ডেভিডের চারপাশ জুড়ে ঝরাপাতার বিষণ্ন নীরবতা। ১৯৭০ সালের নভেম্বরের এক থ্যাংকসগিভিং উইকেন্ডের নিঝুম শনিবার।
গাছপালার আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিভৃত সেই কাঠের বাংলোয় রিচার্ড নিক্সন সম্পূর্ণ একা। তাঁর মনে দারুণ অস্থিরতা। নতুন বছর আসছে, কিন্তু মনের ভেতরের ক্ষোভ আর অস্থিরতা কিছুতেই কমছে না। তিনি খসখস করে একটা কাগজে লিখলেন— ’৭১–’৭২ মেয়াদের লক্ষ্যসমূহ। তালিকার একদম শুরুতেই এক অদ্ভুত ও গম্ভীর বাক্য: ১. রাষ্ট্রপতি হবেন জাতির নৈতিক নেতা—দেশের বিবেক।
অথচ এই সুউচ্চ নীতি আর নৈতিকতার বুলিটি ভারতের সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছাল না। পৌঁছানোর কোনো কারণও ছিল না; ভারতকে নিক্সন কোনোদিনই সহ্য করতে পারতেন না।
একবার ড্রিংকসে চুমুক দিতে দিতে তিনি বিরক্তি উগরে দিয়েছিলেন, "মাই গড! দক্ষিণ এশিয়া জিনিসটাই অবিশ্বাস্য! ওই তল্লাটে গেলেই দেখা যাবে চরম দারিদ্র্য আর দিশেহারা হতাশা। ভাবা যায় না!"
ভারতের ওপর তাঁর এই গা-জ্বালা ভাব আজকের নয়। ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বরের ঘটনা। তিনি তখন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে এশিয়া সফরে বেরিয়েছেন। সেই সফরেই প্রথম ভারতের মাটিতে পা রাখেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি লিখেছিলেন— ওই প্রথম সফরটি নাকি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে ভারতের 'জোটনিরপেক্ষ' নীতি নিক্সনের চোখে ছিল চরম ধোঁকাবাজি। মুখেই শুধু নিরপেক্ষতার বুলি, কাজের বেলায় পুরোটাই সোভিয়েত ইউনিয়নের কোলে ঢলে পড়া! তার ওপর ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু যখনই কথা বলতেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার না করে ছাড়তেন না।
নিক্সন তা সইতে পারতেন না। তিনি নিজের মনে ভাবতেন, *'নেহরু সাহেবের আসল উদ্দেশ্য হলো পুরো দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য আর আফ্রিকার ওপর নিজের কর্তৃত্ব চাপানো।'*
ব্যক্তিগতভাবেও নেহরু আর নিক্সন— এই দুজন দুজনকে প্রথম দেখাতেই অপছন্দ করেছিলেন। নেহরুর সুমিত, মোলায়েম ব্রিটিশ উচ্চারণের ইংরেজি আর খানিকটা নাক-উঁচু ভাব নিক্সনের অহমে দারুণ আঘাত করেছিল। পরে তো খেপেই গিয়ে নিক্সন লিখে বসলেন, "লোকটা অহংকারী, কর্কশ এবং অসহ্য রকমের আত্মধার্মিক!"
ভারত সফর শেষ করে নিক্সন গেলেন পাকিস্তান।
আহা, সেখানে গিয়ে কী শান্তি! মনটাই জুড়িয়ে গেল তাঁর।
ওয়াশিংটনে ফিরেই মহা উৎসাহে বলে উঠলেন, "পাকিস্তান এমন একটা দেশ, যার জন্য আমি সবকিছু করে ফেলতে রাজি!"
পাকিস্তানের মানুষ আর সামরিক কর্তাদের তিনি দেখলেন পরম সাম্যবাদী-বিরোধী ও আমেরিকার অন্ধ ভক্ত হিসেবে। নিক্সনের ভাষায়, "ভারতীয়দের মতো এদের কোনো জটিলতা নেই। এরা খোলামেলা কথা বলে, এমনকি সে কথাটা যদি অপ্রিয়ও হয়।"
পাকিস্তানের ঘিঞ্জি শহর কিংবা কোলাহলপূর্ণ গলিঘুঁজি নিক্সনকে টানেনি; তাঁকে টেনেছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ধবধবে পরিষ্কার, পরিপাটি ক্যান্টনমেন্টগুলো। বিশেষ করে জেনারেল আইয়ুব খানের সোজাসাপটা কথা আর রাশভারী সামরিক কায়দা দেখে তিনি মুগ্ধ। এই আইয়ুব খানই তো কিছু বছর পর সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে পাকিস্তানের প্রথম সামরিক শাসক হবেন! আইয়ুব খানের একটা কথা নিক্সনের মনে সারাজীবনের জন্য বিঁধে গিয়েছিল। জেনারেল সাহেব আফসোস করে বলেছিলেন, "আমেরিকার বন্ধু হওয়া যে কী ভীষণ বিপজ্জনক, তা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি!"
ওয়াশিংটনে ফিরে নিক্সন হয়ে উঠলেন পাকিস্তানের সবচেয়ে বড়ো অনুদান-উকিল। তাঁরই জোর তদবিরে আইজেনহাওয়ার প্রশাসন পাকিস্তানের সাথে সামরিক জোট বাঁধার দিকে ঝুঁকলো। আমেরিকা তখন বিশ্বজুড়ে সোভিয়েত-বিরোধী সঙ্গী খুঁজছে, আর সদ্য জন্ম নেওয়া পাকিস্তান মহা উৎসাহে আমেরিকার জোড়া চুক্তিতে সই করে বসলো— সেন্টো (CENTO) এবং সিয়াটো (SEATO)।
পাকিস্তান কেবল চুক্তি করেই ক্ষান্ত হলো না, পেশোয়ারে একটা গোপনীয় সামরিক ঘাঁটি আমেরিকার হাতে তুলে দিল। সেখান থেকেই মার্কিন ইউ-টু (U-2) স্পাই প্লেন সোভিয়েতের ওপর নজরদারি চালাতে উড়াল দিত। (যদিও ১৯৬০ সালে সেই বিমানের একটাকে সোভিয়েত ইউনিয়ন গুলি করে নামিয়ে এনে মহা কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছিল!)
তবে নিক্সনের সফরের সবচেয়ে বড়ো উপহার ছিল সামরিক সাহায্য। ১৯৫৪ সাল থেকে আমেরিকার সর্বাধুনিক মারণাস্ত্র পৌঁছাতে শুরু করল পাকিস্তানে। ভারত যতই কাঁদাকাটা করুক না কেন, আইজেনহাওয়ার যতই সান্ত্বনা দিন যে "এসব অস্ত্র শুধুই কমিউনিস্ট ঠেকানোর জন্য", ভারত ভালো করেই জানত—এই সব অস্ত্রের মুখ আসলে কোন দিকে ঘোরানো।
মার্কিন দয়ায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী দিন দিন দানব হয়ে উঠল। পরের এগারো বছরে ভারত হিসাব করে দেখল, প্রায় দেড় থেকে দুই বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র পাকিস্তান পেয়েছে। ভারতের ক্ষোভের শেষ ছিল না—পাকিস্তান একাই পেয়ে গেল ৬৪০টি আধুনিক ট্যাংক, পাঁচটি সম্পূর্ণ পদাতিক ডিভিশনের জন্য অত্যাধুনিক সরঞ্জাম, তিনটি আধুনিক বিমানঘাঁটি, করাচিতে নেভাল ডকইয়ার্ড আর চট্টগ্রামে নৌঘাঁটি। সাথে পেল সাবমেরিন, বহর-ট্যাংকার আর একগুচ্ছ লড়াকু যুদ্ধবিমান—বি-৫৭ বোম্বার, এফ-৮৬ সেবার জেট। সবচেয়ে মারাত্মক জিনিসটা ছিল সি-১৩০ বিশালাকার পরিবহন বিমান। পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সৈন্য আনা-নেওয়া করার জন্য এর চেয়ে দারুণ জিনিস আর কী হতে পারে!
দেশভাগের ক্ষত তখনো শুকায়নি, তার ওপর এসব দেখে ভারতের তৎকালীন সরকার রাগে ফেটে পড়ল। নেহরু তো বলেই বসলেন, "পাকিস্তান তো এখন আমেরিকার উপনিবেশ ছাড়া আর কিছুই নয়!"
পাকিস্তানের এই মার্কিন অস্ত্র আর অন্যদিকে চীনের চোখ রাঙানি—দুটোকে একসাথে সামলাতে ভারতও তখন সোভিয়েত অস্ত্রের দিকে হাত বাড়াল। ভারত আর আমেরিকার সম্পর্ক একে অপরের দিকে কাদা ছোড়াছুড়িতে পর্যবসিত হলো। পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দিতে আইজেনহাওয়ার ভারতে বড়ো অঙ্কের অর্থনৈতিক সাহায্য পাঠাতে শুরু করলেন।
প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি এসে এই ফাটলটা কিছুটা জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন। ভারতে গণতন্ত্রের চর্চা দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে অর্থনৈতিক সাহায্য বাড়ালেন। ১৯৬২ সালে চীনের সাথে ভারতের যুদ্ধ বেঁধে গেলে, যখন ভারতীয় বাহিনী পিছু হটছে, নেহরু সরাসরি কেনেডির কাছে বিশাল সামরিক সাহায্যের আবেদন করে বসলেন। কেনেডি সব না দিলেও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, গুলি আর সেনা সরানোর জন্য সি-১৩০ বিমান পাঠালেন।
চীন যুদ্ধের পর হিমালয়ের পাহাড়ি সীমান্তে চীনকে ঠেকানোর জন্য মর্টার, বন্দুক আর গ্রেনেড পাঠানো অব্যাহত রইল। ভারত তা নিল বটে, তবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মনে মনে গজগজ করে বলল, "পাকিস্তানকে যা দিয়েছেন, তার তুলনায় এ তো ছিটেফোঁটা!"
১৯৬৫ সালে যখন কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাঁধল, আমেরিকা তখন চরম বিশ্রী এক অবস্থায় পড়ে গেল। দুটি দেশই লড়ছে মার্কিন অস্ত্রে! প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন দ্রুত দুই দেশের ওপরই মার্কিন অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞায় ভারত যতটা না ক্ষতিগ্রস্ত হলো, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ধাক্কা খেল পাকিস্তান। পাকিস্তান মনে করল, আমেরিকা তাদের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আবার ভারতও খুশি হতে পারলো না; কারণ আমেরিকা পাকিস্তানকে 'আগ্রাসী' হিসেবে স্পষ্টভাবে গালি দেয়নি!
যুদ্ধের পর ভারত ধীরগতিতে টুকটাক মার্কিন অস্ত্র কেনা চালিয়ে গেল বটে, কিন্তু শেষমেশ দেখা গেল পাকিস্তান যা পেয়েছে, ভারত তার চারভাগের একভাগও পায়নি। উলটো মার্কিন খাদ্য সাহায্যের সাথে জুড়ে দেওয়া হলো হরেক রকমের অন্যায্য রাজনৈতিক শর্ত। ভারত যখন ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে মুখ খুলল, ক্ষুব্ধ জনসন খাদ্য সাহায্য ঝুলিয়ে রেখে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেন।
দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব তো দূরের কথা, কেবলই গজ গজ আর গর গর।
ঠিক এই চরম তিক্ততার পরিবেশেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় বসলেন রিচার্ড নিক্সন। দুই বিশাল গণতান্ত্রিক দেশের ভাঙা সাঁকো জোড়া লাগানোর ভার এখন তাঁর ওপর। কিন্তু খেলায় মূল চাল তো কেবল শুরু হতে যাচ্ছে...
খেলার ছক
দ্বিতীয় পর্ব
রাজনীতি জিনিসটা কুয়াশার মতো। বাইরে থেকে মনে হয় ধোঁয়াটে, কিন্তু ভেতরে ঢুকলে চোখ-মুখ জ্বলতে শুরু করে। রিচার্ড নিক্সন যখন হোয়াইট হাউসের মসনদে বসলেন, তাঁর সাথে নিয়ে এলেন এক অদ্ভুত বুদ্ধিমান, চশমা পরা মানুষকে— হেনরি কিসিঞ্জার।
কিসিঞ্জার মানুষটা দেখতে খুব সাধারণ, কিন্তু তাঁর মাথার ভেতরের কলকবজা অত্যন্ত জটিল। যে-কোনো ঘটনাকে তিনি দাবার ছকের মতো দেখতেন। কে রাজা, কে গজ, আর কাকে কোন মুহূর্তে কিস্তি দিয়ে চাল মাত করতে হবে— এসব তাঁর নখদর্পণে।
নিক্সন আর কিসিঞ্জার— দুজনে যখন একসাথে বসতেন, তখন যেন ঘরের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কমে যেত।
নিক্সন একদিন কিসিঞ্জারকে ডেকে বললেন, "হেনরি, চীনের সাথে আমাদের একটা ব্যবস্থা করতে হবে। বিশ্ব রাজনীতির ছকটা এবার বদলাতে হবে।"
কিসিঞ্জার চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিয়ে মৃদু হাসলেন। বললেন, "মি. প্রেসিডেন্ট, চীনে যাওয়ার রাস্তা কিন্তু সোজা নয়। বেজিংয়ের দরজায় কড়া নাড়তে হলে আমাদের একটা বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারী দরকার।"
"কে হতে পারে সেই মধ্যস্থতাকারী?"
কিসিঞ্জার কোনো দ্বিধা না করে বললেন, "পাকিস্তান। জেনারেল ইয়াহিয়া খান।"
নিক্সনের মুখে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল। পুরোনো প্রেম আবার নতুন করে জেগে ওঠার মতো ব্যাপার। ভারতকে তিনি কখনোই সহ্য করতে পারতেন না, আর ইন্দিরা গান্ধীকে তো নয়ই। ইন্দিরা গান্ধীকে দেখলে নিক্সনের পিত্তি জ্বলে যেত। কিসিঞ্জারও ইন্দিরার ব্যক্তিত্বের সামনে কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করতেন। তাঁদের চোখে ইন্দিরা ছিলেন এক জেদি, একগুঁয়ে আর অহংকারী নারী।
এদিকে ১৯৭১ সালের শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে কালবৈশাখির ঝড়ের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছিল।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি তখন নিজেদের অধিকারের জন্য গর্জে উঠেছে। নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও যখন ক্ষমতা হস্তান্তর করা হলো না, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ঠিক করল, বুলেটের মুখে বাঙালিকে স্তব্ধ করে দেবে।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে ঢাকা শহরে নেমে এল নারকীয় ধ্বংসলীলা। অপারেশন সার্চলাইট। লাখ লাখ নিরীহ মানুষের রক্তে লাল হয়ে উঠল বুড়িগঙ্গার পানি। ভারতে স্রোতের মতো আসতে শুরু করল শরণার্থী। দেখতে দেখতে সেই সংখ্যা কোটিতে গিয়ে ঠেকল।
ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড সব দেখছিলেন। তাঁর মন কেঁদে উঠল। তিনি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে একের পর এক জরুরি তারবার্তা পাঠাতে লাগলেন।
একটি ঐতিহাসিক তারবার্তায় আর্চার ব্লাড সরাসরি লিখলেন: "এখানে যা ঘটছে তা সেরেফ গণহত্যা। স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী নিজস্ব জনগণের ওপর বর্বর আক্রমণ চালিয়েছে। আর আমাদের সরকার এই ইস্যুতে পুরোপুরি নীরব।"
পররাষ্ট্র দপ্তরের বহু কর্মকর্তা এই প্রতিবাদপত্রে সই করলেন। ইতিহাসে এটি 'ব্লাড টেলিগ্রাম' নামে পরিচিত।
কিন্তু ওয়াশিংটনে বসে থাকা দুই পরাশক্তি— নিক্সন আর কিসিঞ্জার— এই রক্তপাত দেখেও চোখ বন্ধ করে রাখলেন। তাঁদের কাছে মানবাধিকারের চেয়ে বড়ো ছিল চীনের সাথে ঐতিহাসিক যোগাযোগের গোপন মিশন।
একদিন হোয়াইট হাউসে আর্চার ব্লাডের সেই টেলিগ্রাম নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল।
নিক্সন চরম বিরক্ত হয়ে টেবিল চাপড়ে বললেন, "ব্লাড লোকটা কে? ও কি নিজেকে পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণকারী ভাবছে? ওকে এখনই ঢাকা থেকে সরিয়ে দাও!"
কিসিঞ্জার শান্ত গলায় সমর্থন জানালেন, "হ্যাঁ মি. প্রেসিডেন্ট। ব্লাড আবেগ দিয়ে কাজ করছেন। ও রাজনীতি বোঝে না। পাকিস্তান যা করছে তা তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। আর এই মুহূর্তে ইয়াহিয়া খানকে আমাদের হাতছাড়া করা চলবে না।"
কারণ, ঠিক সেই মুহূর্তেই জেনারেল ইয়াহিয়া খান ছিলেন চীন আর আমেরিকার মধ্যকার গোপন পিয়নে পরিণত হওয়া এক অতি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। ইয়াহিয়া খানের মাধ্যমেই কিসিঞ্জারের চীন সফরের গোপন চিঠি আদান-প্রদান হচ্ছিল।
একদিকে পূর্ব পাকিস্তানে হাজার হাজার মানুষের লাশ পড়ছে, নারীদের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হচ্ছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটনে বসে নিক্সন আর কিসিঞ্জার মেপে মেপে হিসেব করছেন কীভাবে রাওয়ালপিন্ডিকে খুশি রাখা যায়।
একদিন ইন্দিরা গান্ধী চিঠি পাঠালেন ওয়াশিংটনে— পূর্ব পাকিস্তানের করুণ পরিস্থিতি এবং ভারতে আসা কোটির কাছাকাছি শরণার্থীর বোঝা সামলানোর আকুতি জানিয়ে।
নিক্সন চিঠিটা একপাশে সরিয়ে রেখে বিশ্রী একটা মুখভঙ্গি করলেন। কিসিঞ্জারের দিকে তাকিয়ে বললেন, "ভারতীয়রা সবসময় কান্নাকাটি করতে ভালোবাসে। এরা সুযোগ খুঁজছে পাকিস্তানকে ধ্বংস করার।"
কিসিঞ্জার নিচু স্বরে বললেন, "ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত চতুর মহিলা। তিনি হয়তো সামরিক হস্তক্ষেপের দিকে হাঁটবেন। কিন্তু আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন ভারতের এই চালে পাকিস্তানের কোনো বড়ো ক্ষতি না হয়।"
নিক্সন সোজা হয়ে বসলেন। তাঁর চোখে তখন এক ধরনের হিংস্র আলো।
"পাকিস্তান আমাদের বন্ধু। আর বন্ধু বিপদে পড়লে আমেরিকা পেছন ফিরে তাকায় না। ভারত যদি বা বাড়াবাড়ি করে, তবে আমরা আমাদের ঝোঁক— আমাদের 'টিল্ট' (Tilt)—পাকিস্তানের দিকেই রাখব।"
খেলার ছক তখন তৈরি হয়ে গেছে। একদিকে রক্তে ভেজা বাংলাদেশ, অন্যদিকে ওয়াশিংটন-ইসলামাবাদ-বেজিংয়ের এক ত্রিমুখী অশুভ আঁতাত। নাটক কেবল জমে উঠছে, যার আসল অঙ্কটি খেলা হবে কূটনৈতিক কূটকৌশলের চূড়ান্ত মঞ্চে...
তৃতীয় পর্ব
১৯৭১ সালের জুলাই মাস। ইসলামাবাদে তীব্র গরম। কিন্তু সেই গরমেও মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের গায়ে সুট-টাই চড়ানো।
তিনি সরকারি সফরে পাকিস্তানে এসেছেন। সারাদিন কূটনৈতিক বৈঠক, প্রেস কনফারেন্স, হাঁসফাঁস করা ব্যস্ততা। হঠাৎ খবর ছড়িয়ে পড়ল— কিসিঞ্জার সাহেব পেটের ভীষণ সমস্যায় ভুগছেন! পাতলা পায়খানা আর পেট কামড়ানো ব্যথায় তিনি নাকি কাবু হয়ে পড়েছেন। চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিলেন, তাঁকে অবিলম্বে মুরির মনোরম পাহাড়ি রিসোর্টে পূর্ণ বিশ্রামে পাঠাতে হবে।
সাংবাদিকেরা সহানুভূতি জানিয়ে নোটবুক বন্ধ করলেন। আহারে, বেচারা কিসিঞ্জার!
কিন্তু আসল সত্যটা জানতেন মাত্র কয়েকজন। কিসিঞ্জারের পেট খারাপের পুরো নাটকটাই ছিল আমেরিকান সিআইএ আর পাকিস্তানের জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সাজানো এক চমৎকার গল্প।
মুরি পাহাড়ে যাওয়ার নাম করে মধ্যরাতে চকচকে এক গাড়িতে চেপে কিসিঞ্জার ছদ্মবেশে চলে গেলেন রাওয়ালপিন্ডির চকলালা বিমানবন্দরে। সেখানে ইঞ্জিনের গর্জন তুলে অপেক্ষা করছিল পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের (PIA) একটি বিশেষ বিমান। বিমানটির গন্তব্য— বেইজিং!
কিসিঞ্জার যখন মধ্যরাতের আঁধারে বেজিংয়ের উদ্দেশ্যে উড্ডয়ন করছেন, ঠিক তখন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কিসিঞ্জারের মাথায় তখন একুশ শতকের ইতিহাস নতুন করে লেখার নেশা। চিনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাইয়ের সাথে টানা ৪৮ ঘণ্টা গোপন বৈঠক করলেন তিনি। চীন-আমেরিকার বরফ গলল।
মিশন সফল করে ওয়াশিংটনে ফিরতেই নিক্সন কিসিঞ্জারকে জড়িয়ে ধরলেন।
"হেনরি, ইউ ডিড ইট!" নিক্সনের গলা আনন্দে কেঁপে উঠল।
কিসিঞ্জার চশমাটা ঠিক করতে করতে বললেন, "মি. প্রেসিডেন্ট, এই ঐতিহাসিক সফরের পেছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশি, সে হলো ইয়াহিয়া খান। পাকিস্তান না থাকলে চিনের রাস্তা আমাদের জন্য চিরতরে বন্ধ থাকত।"
নিক্সন টেবিল থাপড়ে বললেন, "আই নো! আর সেই কারণেই আমরা কোনো অবস্থাতেই পাকিস্তানকে একা ফেলে রাখতে পারি না। ভারত যাই বলুক, বিশ্ব যা-ই ভাবুক— আমেরিকা কিন্তু পাকিস্তানের পাশেই দাঁড়াচ্ছে।"
ঠিক তখনই ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সিদ্ধান্ত নিলেন, আন্তর্জাতিক কূটনীতির দাবার বোড়েগুলোকে উলটে দিতে হবে।
১৯৭১ সালের আগস্ট মাস। মস্কোতে গিয়ে ভারত ও রাজনৈতিক মিত্র Soviet Union-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত হলো ঐতিহাসিক 'ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি'। চুক্তিটা ছিল পরিষ্কার— ভারতে যদি কোনো তৃতীয় দেশ আক্রমণ করে, তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না।
এই খবরের পর হোয়াইট হাউসে জরুরি বৈঠক ডাকলেন নিক্সন। ঘরের আবহাওয়া তখন জমে বরফ।
নিক্সন পাইপে টান দিতে দিতে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, "ইন্দিরা গান্ধী তো মহা চালবাজ মহিলা! ও তো আমাদের আর চিনের আঁতাত ভেঙে দেওয়ার জন্য সরাসরি মস্কোর কোলে গিয়ে আশ্রয় নিল।"
কিসিঞ্জার গম্ভীর গলায় বললেন, "হ্যাঁ, মি. প্রেসিডেন্ট। ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত বিপজ্জনক খেলা খেলছেন। ভারত এখন শুধু পাকিস্তানের ওপর আক্রমণ করার বাহানা খুঁজছে না, তারা চাইছে পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করে দিয়ে পাকিস্তানকে চিরতরে পঙ্গু করে দিতে।"
"আমরা তা হতে দিতে পারি না!" নিক্সন প্রায় গর্জে উঠলেন। "ইন্দিরা যদি ভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের জোরে ও যা খুশি তা-ই করবে, তবে সে ভুল ভাবছে। আমেরিকা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। আমাদের স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে— এই লড়াইয়ে আমাদের ঝোঁক পাকিস্তানের দিকেই।"
কিসিঞ্জার ঠান্ডা মাথায় এক অদ্ভুত চাল চাললেন। তিনি গোপনে চীনের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠালেন।
কিসিঞ্জার চিনকে ইঙ্গিত দিয়ে বললেন, "ভারত যদি পাকিস্তানের ওপর চড়াও হয়, তবে চিনের উচিত হবে উত্তর সীমান্তে সেনা মোতায়েন করে ভারতের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা। আমেরিকা সবরকমের ব্যাকআপ দেবে।"
কূটনীতির ছকে তখন একেকটা রক্ত হিম করা চাল চালা হচ্ছে।
একদিকে লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল বাঙালি ভারতের শরণার্থী শিবিরে কাদা-জলে ভাসছে, মুক্তিসেনারা নিজের রক্ত দিয়ে মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে লড়ছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন আর বেজিংয়ের এসি ঘরে বসে দুজন শক্তিশালী মানুষ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন— একটি স্বাধীন হতে যাওয়া জাতিকে পিষে ফেলতে তারা কতটা দূর যেতে পারেন।
নভেম্বর মাসের শেষ। শীতের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়। কিন্তু বাতাসে ভাসছে বিষাক্ত বারুদের গন্ধ। যে যুদ্ধ এত দিন পর্দার আড়ালে কুশীলবরা খেলছিল, তা এবার খোলা ময়দানে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষণ গুনছে...
চতুর্থ পর্ব
১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর। শীতের আমেজ ঢাকা ও রাওয়ালপিন্ডিতে। কিন্তু সেই শান্ত আমেজ ভেঙে হঠাৎই গোধূলির আকাশে গর্জে উঠল পাকিস্তানি বোমারু বিমানের ইঞ্জিন।
অনুমতি ছাড়াই পশ্চিম পাকিস্তানের বিমানবাহিনী ভারতের সীমান্ত জুড়ে একাধিক বিমানঘাঁটিতে একযোগে বিমান হামলা চালিয়ে বসল। পাকিস্তান ভেবেছিল, আচমকা এই আক্রমণ করে ভারতকে ভড়কে দেবে। কিন্তু দাবার ছকে ভারত যেন ঠিক এই ভুল চালটার জন্যই ওত পেতে বসেছিল।
ঘটনার পরপরই দিল্লির আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে অল ইন্ডিয়া রেডিয়োতে রাত সাড়ে বারোটায় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন ইন্দিরা গান্ধী। শান্ত, অথচ বরফের মতো ঠান্ডা ও সুদৃঢ় গলা—"আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভারত এই যুদ্ধের উপযুক্ত জবাব দেবে।"
পরদিনই পুরোদমে শুরু হয়ে গেল ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। পূর্ব সীমান্তে মিত্রবাহিনী আর মুক্তিযোদ্ধাদের যৌথ আক্রমণে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে লাগল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতিরোধ। চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হলো ঢাকাকে।
ওয়াশিংটনের ওভাল অফিসে তখন অগ্নিকাণ্ড। খবর পেয়েই রিচার্ড নিক্সন রাগে বেসামাল হয়ে পড়লেন।
"হেনরি!" নিক্সন চিৎকার করে কিসিঞ্জারকে ডাকলেন। "ভারতের এই দুঃসাহস হয় কীভাবে? ওরা পুরো পশ্চিম পাকিস্তানকে ধ্বংস করে ফেলবে! আমাদের এখনই কিছু করতে হবে।"
কিসিঞ্জার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসের কার্পেটের ওপর দ্রুত পায়চারি করতে লাগলেন। চশমাটা বারবার নাকের ওপর ঠেলে দিয়ে বললেন, "মি. প্রেসিডেন্ট, ভারত স্পষ্টতই সোভিয়েত সহায়তায় পুরো পাকিস্তানকে মানচিত্র থেকে মুছে দিতে চাইছে। পূর্ব পাকিস্তান তো যাচ্ছেই, ওদের চোখ এখন পশ্চিম পাকিস্তানের দিকেও। আমাদের এখনই বেইজিংয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যেন তারা ভারতীয় সীমান্তে সেনা পাঠায়।"
নিক্সন দ্রুত টেলিফোনে পিকিং এবং জাতিসংঘে বার্তা পাঠালেন। কিন্তু চিনের পিং-পং কূটনীতি তখন ধীরগতির। তারা সীমান্ত সংঘর্ষে জড়াতে খুব একটা উৎসাহ দেখাল না।
এদিকে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থা তখন শোচনীয়। জেনারেল নিয়াজির চোখ দিয়ে তখন জল গড়াচ্ছে। পরাজয় সেরেফ কয়েকদিনের ব্যাপার।
পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার এই অপমান নিক্সন সহ্য করতে পারছিলেন না। তিনি টেবিল থাপড়ে কিসিঞ্জারকে বললেন, "আমাদের শেষ চালটা চালতে হবে, হেনরি। ওদের এমন একটা শিক্ষা দিতে হবে যেন সোভিয়েত আর ভারত সারাজীবন মনে রাখে।"
১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর। বঙ্গোপসাগরের দিকে গতি বাড়াল মার্কিন সপ্তম নৌবহর (7th Fleet)।
পারমাণবিক অস্ত্রবাহী দানবীয় বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ-এর নেতৃত্বে সাতটি যুদ্ধজাহাজ বঙ্গোপসাগরের জলসীমার দিকে এগোতে শুরু করল। ওপর থেকে আমেরিকার বার্তা পরিষ্কার— পাকিস্তানকে বাঁচাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে নামতে পিছপা হবে না।
কিসিঞ্জার মুচকি হেসে নিক্সন কে বললেন, "এই 'টিল্ট' বা ঝোঁকটা ভারতকে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। দেখা যাক মস্কো এবার কীভাবে চাল চালে।"
কিন্তু মার্কিন রণতরি বঙ্গোপসাগরে পৌঁছানোর আগেই মস্কো থেকে আসল খেলা শুরু হলো। মার্কিন সপ্তম নৌবহরের পিছু পিছু বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করল পারমাণবিক সাবমেরিন ও যুদ্ধজাহাজ দিয়ে সজ্জিত সোভিয়েত ইউনিয়নের শক্তিশালী ২০তম অ্যান্টি-শিপ স্কোয়াড্রন।
সোভিয়েত যুদ্ধজাহাজগুলো মার্কিন রণতরীগুলোকে মাঝদরিয়ায় ঘিরে ফেলল। সমুদ্রের শান্ত জলরাশি যেন এক মুহূর্তে বিশ্বযুদ্ধের বারুদাগারে পরিণত হলো।
ওয়াশিংটনে নিক্সন খবর পেয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। কিসিঞ্জারের মুখ থেকে রঙিন হাসির ঝিলিক গায়েব হয়ে গেল।
তারা ভেবেছিলেন বঙ্গোপসাগরে রণতরি পাঠিয়ে ভারত আর মুক্তিযোদ্ধাদের চোখ রাঙানি দেবেন, কিন্তু সেখানে ইতোমধ্যেই তৈরি হয়ে আছে সোভিয়েতের পারমাণবিক প্রতিরোধ প্রাচীর।
সময় ফুরিয়ে আসছে। ঢাকা তখন বিজয়ের নিশ্বাস গ্রহণ করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সমস্ত হিসাব-নিকাশ সমুদ্রের নোনা জলে ভেসে যাওয়ার সময় এসে গেছে...
পঞ্চম পর্ব
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর।
ঢাকার আকাশ তখন কুয়াশাচ্ছন্ন, কিন্তু মানুষের মনে এক তীব্র, উন্মাদ আলো। যে বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে জেনারেল নিয়াজি কাঁপতে থাকা হাতে আত্মসমর্পণের দলিলে সই করলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে ওয়াশিংটনের ওভাল অফিসে নেমে এসেছিল এক শ্মশান নীরবতা।
রিচার্ড নিক্সন তাঁর গাঢ় বাদামি রঙের চামড়ার চেয়ারটায় স্তব্ধ হয়ে বসেছিলেন। ঘরে আলোর রোশনাই নেই, শুধু কোণের টেবিল ল্যাম্পটা থেকে একটা ম্লান আলো এসে পড়েছে তাঁর টেবিলে।
দরজা খুলে ভেতরে এলেন হেনরি কিসিঞ্জার। তাঁর হাতের ফাইলে ঢাকা থেকে আসা সেই চেনা তারবার্তা— ‘পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। বাংলাদেশ এখন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র।’*
কিসিঞ্জার ফাইলটা নিক্সনের সামনে রাখলেন। কোনো কথা বললেন না।
নিক্সন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাইলটার দিকে একনজর তাকালেন। তারপর পাইপটা বের করে মুখে গুঁজলেন, কিন্তু আগুন ধরালেন না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে গম্ভীর গলায় বললেন, "সো, হেনরি... দ্য গেম ইজ ওভার?"
কিসিঞ্জার চশমাটা খুলে একটা ছোট তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে বললেন, "ইয়েস, মি. প্রেসিডেন্ট। দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের হিসাবের ছকটা পুরোপুরি কাজ করল না। ভারত এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন শেষ চালটা দারুণ খেলেছে।"
নিক্সনের চোখ দুটো হিংস্র হয়ে উঠল। "কিন্তু তুমি কি মনে করো আমরা হেরে গেছি? না, হেনরি! আমরা কিন্তু চীনকে পেয়েছি। পাকিস্তানের মাধ্যমে বেজিংয়ের দরজা খোলার যে দানটা আমরা খেলেছিলাম, সেটা সফল। পূর্ব পাকিস্তান হাতছাড়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমরা পশ্চিম পাকিস্তান আর বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্য ধরে রাখতে পেরেছি।"
কিসিঞ্জার মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল এক পরাজিতের কূটকৌশল আড়াল করার ভান। তিনি ভালো করেই জানতেন— কাগজে-কলমে যাই বলা হোক না কেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অদম্য পরাশক্তির অহংকার সেদিন বঙ্গোপসাগরের নোনা পানিতে ডুবে গেছে।
ক্যাম্প ডেভিডের সেই নির্জন শনিবার থেকে যে 'টিল্ট' বা একপেশে নীতির জন্ম হয়েছিল, তার চরম মূল্য দিতে হলো লাখ লাখ নিরীহ মানুষের রক্তে। বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সপ্তম নৌবহরের মহড়া কিংবা পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে অন্ধ সমর্থন— কোনো কিছুই একটি মুক্তিকামী জাতির স্বাধীন হওয়ার স্বপ্নকে পিষে মারতে পারল না।
পরদিন সকালে ওয়াশিংটন পোস্ট আর নিউ ইয়র্ক টাইমসের পাতায় বড়ো বড়ো অক্ষরে খবর বের হলো— একটি নতুন দেশের জন্ম। বাংলাদেশ।
নিক্সন হোয়াইট হাউসের জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে তুষারপাত শুরু হয়েছে। সাদা বরফে ঢেকে যাচ্ছে ওয়াশিংটনের রাস্তাঘাট।
তিনি মনে মনে হয়তো ভাবছিলেন সেই কথাটি, যা তিনি ১৯৭০ সালের নভেম্বরের এক নিঝুম সকালে লিখেছিলেন—’রাষ্ট্রপতি হবেন জাতির নৈতিক নেতা—দেশের বিবেক।’
ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, সেই বিবেকের খাতায় লাল কালিতে লেখা হয়ে রইল এক বিরাট পরাজয়ের গল্প। রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে একটি উদীয়মান স্বাধীন দেশকে পিষে ফেলার অশুভ চক্রান্ত ধুলোয় মিশে গেল, আর পৃথিবীর মানচিত্রে রক্ত দিয়ে লাল-সবুজের পতাকা এঁকে নিল এক নতুন ভোরের বাংলাদেশ।
ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। দাবার রাজা কিংবা গজ— সবাইকে একদিন ছক ছেড়ে বিদায় নিতে হয়। শুধু থেকে যায় সেই গল্পগুলো, যা রক্তের অক্ষরে লেখা হয়।
অনুসন্ধান করুন
🎂 আজ যাদের জন্মদিন
মোঃ আসিফুর রহমান
শুভ জন্মদিন! 🎈