### পর্ব ১: তেলের গন্ধ এবং দূর দেশের চিঠি
মজিদ মিয়ার মেজাজটা আজ বেশ খারাপ। কারণ দুটো। প্রথমত, তার ঘরের পুরানো ফিলিপস রেডিয়োটা হঠাৎ করে ফিসফিস শব্দ করা বন্ধ করে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, দুপুর বেলা নদী পার হয়ে হাটে যাওয়ার সময় তার স্যান্ডেলের ফিতে ছিঁড়ে গেছে।
মজিদ মিয়া উঠোনে নিম গাছের নিচে বসে রেডিয়োটার গায়ে গুটগুট করে দুটো বাড়ি দিলেন। অমনি অদ্ভুত অলৌকিক কায়দায় রেডিয়োটা কেঁপে উঠে এক গম্ভীর গলার কণ্ঠে কথা বলে উঠল—
"সৌদি আরবের তেল শোধনাগারে হুথি বিদ্রোহীদের ড্রোন হামলা... তেলের বাজার এখন চরম অস্থির..."
মজিদ মিয়া রেডিয়োর দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বললেন, "ধুর! তেলের খবর দিয়া আমি কী করব? তেলের কেজি তো এমনিতেও দুশো টাকা।"
তবে কথাটা শুনে উঠোনের কোণে বসে থাকা তার ছোট বোন রশিদা একটু থমকে দাঁড়াল। রশিদার বয়স বেশি না, কিন্তু চোখের কোণে যেন একটা দীর্ঘস্থায়ী ছায়া জমে আছে। বছর দুয়েক আগে সে রিয়াদ থেকে ফিরে এসেছে। ফিরে আসার পর থেকে সে আর বেশি কথা বলে না। ঘরের এক কোণে বসে চাদর সেলাই করে, আর মাঝে মাঝে বাইরে উঠোনের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে।
গাঁয়ের মানুষ অনেক কথা বলে। কিন্তু মজিদ মিয়া কোনোদিন রশিদাকে কিছু জিজ্ঞেস করেননি। কিছু প্রশ্ন না করাই হয়তো এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো মায়া।
এমন সময় উঠোনে এসে হাজির হলেন গ্রামের একমাত্র 'জ্ঞানী' ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত কুদ্দুস সাহেব। কুদ্দুস সাহেবের হাতে একটি খবরের কাগজ। তিনি চশমাটা নাকের ওপর একটু নামিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, "মজিদ, শুনলে নাকি খবর? মধ্যপ্রাচ্য তো শেষ! তেল ছাড়া ওদের আর আছেটা কী?"
মজিদ মিয়া স্যান্ডেল সেলাই করার চেষ্টা করতে করতে বললেন, "তেল না থাকলে সাইকেল চালাবে, সমস্যা কী?"
কুদ্দুস সাহেব একগাল হেসে বললেন, "আরে ভাই, ব্যাপার তা না। মানুষ যখন বড়ো বেশি অহংকারী হয়ে যায়, তখন ওপরওয়ালা ওপর থেকে একটা ছোট পাথর ছুঁড়ে মারেন। আর সেই পাথরেই অত বড়ো প্রাসাদ ভেঙে পড়ে। কত মানুষ যে এই সামান্য তেলের গরমে নিজেকে বড়ো ভাবত! আর আমাদের দেশের এই সহজ-সরল মানুষগুলোকে মানুষই মনে করত না।"
রশিদা সেলাই হাত থেকে নামিয়ে কুদ্দুস সাহেবের দিকে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে কোনো রাগ নেই, কোনো ঘৃণা নেই, কেবল এক অপরিসীম ক্লান্তি।
মজিদ মিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "কুদ্দুস ভাই, বড়ো বড়ো দেশের যুদ্ধ-বিগ্রহের কথা আমরা সাধারণ মানুষ কী বুঝি বলুন? আমরা বুঝি রোজ সকালে উঠে এক মুঠো ভাতের চিন্তা। যে দেশে মানুষ মায়াদয়া ভুলে শুধু টাকার অঙ্ক আর ক্ষমতার হিসেব করে, সে দেশ তো আসলে খুব গরীব দেশ।"
কুদ্দুস সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। বোধহয় কথাটা তার মাথার ভেতর ঢুকতে কিছুটা সময় নিচ্ছিল।
পশ্চিমের আকাশে তখন সূর্যটা ডুবছে। গ্রামের শেষ সীমানায় যে নদীটা চলে গেছে, তার জলে লালচে আলো খেলা করছে। এই শান্ত গ্রামের মানুষের কাছে হুথি, তেল বা দূর দেশের ক্ষমতা দখলের খেলাগুলো খুব দূরের কোনো রূপকথার মতো। কিন্তু সেই রূপকথার পেছনে লুকিয়ে থাকা আঘাতগুলো যে কতখানি সত্যি, তা শুধু রশিদার মতো নীরব মানুষগুলোই জানে।
---
### পর্ব ২: মায়াবতী রাত ও কিছু অপ্রিয় সত্য
রাতের বেলা গাঁয়ের ওপর অদ্ভুত একটা নিস্তব্ধতা নেমে আসে। বিজলি বাতি নেই, হ্যাজাক বাতির কমতি আলোয় মজিদ মিয়ার বারান্দায় একটা প্রকাণ্ড ছায়া নাচানাচি করছে।
মজিদ মিয়া বারান্দার খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে জাঁতি দিয়ে সুপারি কাটছিলেন। ঠক-ঠক-ঠক। চমৎকার একটা ছান্দসিক শব্দ হচ্ছে। ঠিক এই সময় উঠোনে এসে উপস্থিত হলেন তরিকুল সাহেব। তরিকুল সাহেব এই হাইস্কুলের ইতিহাসের শিক্ষক। মাথাভর্তি ধবধবে সাদা চুল, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। তার হাতে একটা মাঝারি সাইজের টর্চলাইট।
"মজিদ, জেগে আছ?"
মজিদ মিয়া সুপারি কাটা থামিয়ে বললেন, "আছি স্যার। বসুন। পান খাবেন নাকি?"
"না, পান খাব না। মাথাটা বড্ড গরম হয়ে আছে।" তরিকুল সাহেব বারান্দার কাঠের পিঁড়িতে বসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"কী হলো স্যার? ভাবির সাথে ঝগড়া নাকি?"
তরিকুল সাহেব গম্ভীর মুখে বললেন, "ঝগড়া হবে কেন? খবর শুনেছ? এই যে দূর দেশে তেল আর ক্ষমতার এত মারামারি চলছে— আজকের পেপারে দেখলাম, ওদিকে নাকি আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাহেব আবার নতুন চাল চালছেন। আর সৌদি আরবের কোষাগারে নাকি নগদ টাকার এতই টানাটানি যে ব্যাংকের কাছে শত শত কোটি ডলার ঋণ চাচ্ছে!"
মজিদ মিয়া একটু অবাক হওয়ার ভান করে বললেন, "বলেন কী স্যার! অঢেল তেলের মালিকেরা টাকা ধার চাচ্ছে? তেলের কূপে কি তবে জল ঢুকে গেছে?"
"তেলের কূপে জল ঢোকেনি মজিদ, মানুষের মাথায় জল ঢুকেছে," তরিকুল সাহেব চশমাটা খুলে জামার খুঁটে মুছতে মুছতে বললেন। "যাদের মাটির নিচে অগাধ ধন-সম্পদ, তারা ভাবত দুনিয়াটা বুঝি তাদের হাতের মুঠোয়। গরীব দেশের মানুষগুলোকে তারা মানুষই মনে করত না। অথচ জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য, মানবতা— কোথাও তাদের কোনো অবদান নেই। কেবল ওপরওয়ালার দেওয়া মাটির নিচের তেল বেঁচে বিলাসী জীবনযাপন! এখন আমেরিকা আর ইসরায়েল তাদের পেছনে লেগেছে। এ যেন এক অদ্ভুত খেলা! ক্ষমতার এই খেলায় আজ যারা বড়ো সাহেব, কাল তারা আবার পথের ফকির।"
ঘরের ভেতর থেকে রশিদা আস্তে করে দরজা ঠেলে বের হয়ে এল। তার হাতে দুটি কাচের গ্লাসে গরম চা।
চা-এর গ্লাস তরিকুল সাহেবের দিকে বাড়িয়ে দিতেই তরিকুল সাহেব থামলেন। রশিদার বিষণ্ণ মুখটার দিকে তাকিয়ে তিনি স্বর নিচু করে ফেললেন। এই মেয়েটির দিকে তাকালে তরিকুল সাহেবের বুকের ভেতরটা খাঁখাঁ করে ওঠে। কত হাজার হাজার মেয়ে এই দেশ থেকে গিয়ে ওই ভিনদেশে লাঞ্ছিত হলো! কত কান্নার হিসাব কেউ কোনোদিন রাখল না! বিচার তো দূরের কথা, নিজের দেশে ফিরেও এই মেয়েগুলোকে সমাজ বাঁকা চোখে দেখেছে।
তরিকুল সাহেব চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বললেন, "রশিদা মা, চা-টা চমৎকার হয়েছে।"
রশিদা কোনো উত্তর দিল না। মৃদু একটু হেসে আবার ভেতরে চলে গেল।
মজিদ মিয়া তরিকুল সাহেবের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বললেন, "স্যার, আমাদের দেশেও তো মানুষগুলোর বিচারবোধ কমে গেছে, তাই না? যারা আমাদের ঘরের মেয়েদের ওপর অত্যাচার করল, আমরা আবার তাদের পায়েই মাথা নোয়াই। মানুষ যখন নিজের আত্মসম্মান ভুলে যায়, তখন তাকে কেউ আর মানুষ বলে গণ্য করে না।"
তরিকুল সাহেব কিছুক্ষণ নীরব থেকে রেডিয়োটার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, "মজিদ, ইতিহাস বড়ো নির্মম। যে জাতি নিজের সম্মান রক্ষা করতে পারে না, অন্য জাতি তাদের ওপর চেপে বসে। আজকে ওই আরবে যা হচ্ছে, পাকিস্তান আর তুরস্ক যে দূরে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে— এসবের পেছনেই আছে এক জটিল হিসেব। কিন্তু এই হিসেব মেলাতে গিয়ে বলির পাঁঠা হয় সাধারণ মানুষ।"
রাতের বাতাসটা একটু ঠান্ডা হয়ে এল। বাঁশঝাড়ে হাওয়ার শব্দে কেমন একটা উদাস সুর ভেসে আসে। দূরে কোথাও একটা রাতচরা পাখি ডেকে উঠল। মজিদ মিয়া সুপারি কাটার জাঁতিটা পাশে রেখে আকাশের দিকে তাকালেন। আকাশভর্তি অসংখ্য তারা, কোনো তারা জ্বলজ্বল করছে, কোনটি আবার মিটিমিটি।
মানুষের রাজ্যগুলোয় কত যুদ্ধ, কত হিংসা, কত অহংকার! অথচ এই বিশাল নিঝুম মহাবিশ্বের নিচে দাঁড়িয়ে কেন যে মানুষ এত ক্ষুদ্র অহংকারে মেতে ওঠে— মজিদ মিয়ার সহজ সরল মন তা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না।
---
### পর্ব ৩: অন্ধ বিশ্বাস ও কাটানাক যাত্রা
পরদিন সকালের রোদটা বেশ কড়া। মজিদ মিয়ার চায়ের দোকানে আজ অন্যদিনের চেয়ে ভিড় একটু বেশি। চায়ের ধোঁয়ার সাথে সাথে রাজনৈতিক উত্তাপও বেশ জমজমাট।
দোকানের এক কোণে কাঠের বেঞ্চে বসে আছেন মোতাহার হোসেন। তিনি স্থানীয় মাদ্রাসার প্রাক্তন শিক্ষক। মাথায় টুপি, হাতে তাসবিহ। মোতাহার সাহেব চায়ে চুমুক দিয়ে জাঁকিয়ে বসে বললেন, "তোমরা যাই বলো ভাই, সৌদি আরব হলো নবীর দেশ। অমুসলিম বা হুথিদের এই আক্রমণ ওপরওয়ালা বরদাস্ত করবেন না। আর আমাদের দেশের মানুষের উচিত এই বিপদে তাদের পাশে দাঁড়ানো।"
বেঞ্চের অন্যপ্রান্তে বসে ছিলেন মতি মিয়া। মতি মিয়া পেশায় দরজি, কিন্তু হাবভাব একজন মহাবিজ্ঞানীর মতো। তিনি চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন, "হুজুর, নবীর দেশ তো ঠিক আছে, কিন্তু সেখানকার মানুষগুলোর চালচলন কি নবীর শিক্ষার মতো? আমাদের গাঁয়ের আকমল মিয়ার মেয়েটা যখন রিয়াদ থেকে কেঁদে কেটে পেটে বাচ্চা নিয়ে ফেরত আসল, তখন তো তাদের ওই ইমানি জাজবা কোথায় ছিল? তখন তো একবারও মনে হয়নি যে আমরা মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই!"
কথাটা শুনতেই মোতাহার সাহেবের মুখটা থমথমে হয়ে গেল। তিনি তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে বললেন, "আহা মতি, ওসব হলো দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা! আর তাছাড়া ওদের আমরা আশ্রয়দাতা মনে করি, আমাদের লাখ লাখ মানুষ ওখানে কামাই করে খাচ্ছে।"
ঠিক তখনই দোকানে ঢুকলেন তরিকুল সাহেব। তিনি সাইকেলটা দোকানের সামনে দাঁড় করিয়ে ভেতরে এসে বসলেন। মোতাহার সাহেবের কথাটা শুনে তিনি মৃদু হাসলেন।
"মোতাহার সাহেব," তরিকুল সাহেব শান্ত গলায় বললেন, "নিজের চোখ থাকতেও যদি আমরা অন্ধ হয়ে থাকি, তবে তার চেয়ে বড়ো ট্র্যাজেডি আর কিছু হতে পারে না। এই যে আপনি বলছেন 'আশ্রয়দাতা'—ওরা কিন্তু আমাদের দেশের মানুষকে মানুষই মনে করে না। নিজেদের মাটির নিচের তেল বেঁচে বিলাসী জীবন কাটায়, আর ভাব দেখায় যেন দুনিয়ার সব ধর্ম আর নিয়মকানুন কেবল তাদের জন্যই মানানসই। অথচ সভ্যতায়, বিজ্ঞানে বা সাহিত্যে ওদের অবদান শূন্য।"
মতি মিয়া হাত তুলে বলল, "স্যার, একদম ঠিক কথা! তবে আজকাল আবার আরেক কাণ্ড শুরু হইছে। এই যে বাজার আগুন, বিদ্যুতের অভাব, কিন্তু মানুষ বলে ভারতের কাছ থেকে সাহায্য নেবে না! দরকার হয় নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করবে, তবুও নাকি ওদের সাথে সম্পর্ক ভালো করবে না।"
তরিকুল সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "ওটাই তো আমাদের দেশের মানুষের সবচেয়ে বড়ো সংকট মতি। আবেগ আর অন্ধ বিশ্বাস দিয়ে দেশ চলে না। আমরা সৌদি আরবের ধর্মীয় ধোঁকা খেয়ে নিজেদের সংস্কৃতি হারিয়েছি, আর এখন নিজেদের ক্ষতি করে হলেও অন্যকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করছি। যে জাতি নিজের ভালো-মন্দ বোঝে না, অন্যেরা তাদের কেবল ব্যবহারই করে। যেমন আজ আমেরিকা আর ইসরায়েল চাল চালছে মধ্যপ্রাচ্যকে ভাতে মারতে, আর আমরা দূর থেকে বসে কেবল হুথিদের রকেট গোনার খেলা দেখছি।"
দোকানের পরিবেশটা হঠাৎ কেমন যেন নীরব হয়ে গেল। চা বানাতে বানাতে মজিদ মিয়া এসব কথা শুনছিল। সে মোতাহার সাহেবের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল, "হুজুর, আমার বোন রশিদা যখন ওই দেশ থেকে খালি হাতে, ভাঙা মন নিয়ে ফিরে আসছিল, তখন কোনো আইন বা কোনো বিচার তার পাশে দাঁড়ায়নি। ধর্ম যদি মানুষের মর্যাদা রক্ষা করতে না পারে, তবে সেই ধর্মের নাম ভাঙিয়ে বড়াই করার কোনো মানে হয় কি?"
মোতাহার সাহেব মজিদ মিয়ার কথার কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি নীরবে চায়ের দামটা বেঞ্চের ওপর রেখে উঠে দাঁড়ালেন।
দুপুরের কড়া রোদ তখন রাস্তার ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। বাতাসের ধুলোবালি উড়ছে। মানুষের অন্ধত্ব আর বাস্তবতার এই যে কঠিন লড়াই— তা যেন গ্রামের ধূলিমাখা ওই মেঠো পথটার মতোই দীর্ঘ ও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন।
---
### পর্ব ৪: কুয়াশার ভিতর মায়াজালে বোনা মানুষ
বিকেলের দিকে মেঘ ডেকে বৃষ্টি নামল। শ্রাবণ মাসের শেষ দিকের বৃষ্টি, কোনো আগাম বার্তা না দিয়েই ঝুমঝুম করে নামল গ্রামের ওপর।
মজিদ মিয়ার বারান্দায় বৃষ্টির ছাট আসছে। তিনি বাঁশের চাটাইটা টেনে টেনে নিচে নামিয়ে দিচ্ছিলেন। এমন সময় বৃষ্টিতে একবারে ভিজে চপচপে হয়ে এসে উঠোনে দাঁড়ালেন মজনু। মজনু লোকটা একটু খ্যাপাটে কিসিমের, মাথায় ছিট আছে বলে গ্রামের সবাই জানে। সে ঘুরে ঘুরে গান গায়, আর যখন-তখন মানুষের মুখের ওপর এমন সব কথা বলে বসে যা স্বাভাবিক কোনো মানুষ বলতে সাহস পায় না।
"মজিদ ভাই! ও মজিদ ভাই! এক কাপ গরম চা আর দুটো বিস্কুট হবে নাকি?" মজনু দাঁত বের করে হাসল।
মজিদ মিয়া তোয়ালে এগিয়ে দিয়ে বললেন, "আগে মাথাটা মোছ মজনু, জ্বর বাঁধাবি। ঘরে আয়।"
মজনু বারান্দায় উঠে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে তরিকুল সাহেবের দিকে তাকাল, যিনি আগেই এসে বারান্দার এক কোণে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
মজনু হঠাৎ গম্ভীর হয়ে তরিকুল সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলল, "শিক্ষক মশাই, আপনে তো অনেক বইপুস্তক পড়ছেন। আমারে একটা কথার জবাব দেন দিকি? মানষের মাথার ভেতরে যে মগজটা থাকে, ওইটা কি চাল-ডাল মাপার বাটখারা?"
তরিকুল সাহেব চশমাটা ঠিক করে নিয়ে একটু হেসে বললেন, "কেন রে মজনু, হঠাৎ এই প্রশ্ন?"
"না মানে," মজনু বারান্দার চাটাইয়ের ওপর বসে হাঁটু দুটো বুকের কাছে টেনে এনে বলল, "আজকে বাজারে দেখলাম সবাই বলাবলি করতেছে, সৌদি আরবে নাকি বড়ো বড়ো বোমা ফুটতেছে। অহন আমাদের দেশের একদল মানুষ হাহা করে হাসতেছে, আর আরেক দল মানুষ কেঁদে ভাসাইতেছে। আচ্ছা স্যার, যে দেশে গেলে আমাদের দেশের মেয়েদের কান্দায় কান্দায় রক্ত বের হয়, সেই দেশের তেলের ট্যাংকার ফুটলে আমাদের দেশের মানুষ কাঁদবে কেন? এ কেমন ধারার ভালোবাসা স্যার? মায়াদয়া নাকি সস্তা পানের দোকান?"
তরিকুল সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মজনুর দিকে তাকালেন। "মজনু, তুই যাকে মায়াদয়া বলছিস, ওটা আসলে এক ধরনের গভীর অন্ধকার মায়া। মানুষ যখন নিজের পরিচয় ভুলে গিয়ে অন্য কারো ছায়ায় নিজেকে ধন্য মনে করতে চায়, তখন তার নিজস্ব বিচারবুদ্ধি লোপ পায়। একেই বলে মানসিক গোলামি।"
ঠিক এই সময়ে রশিদা ভেতর থেকে একটা পেতলের থালায় গরম মুড়ি আর কিছু নারকেল কোড়া নিয়ে এল। মজনু মুড়ির থালার দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বলল, "রশিদা বুজি, তুমি ওই দেশে গেছিলা না? সত্যি করে বলো তো, ওই দেশের আকাশ কি আমাদের এই গাঁয়ের আকাশের চেয়ে বেশি নীল?"
রশিদা থালাটা বারান্দায় রেখে থমকে দাঁড়াল। কিছুক্ষণের জন্য পুরো বারান্দাটায় যেন এক কঠিন নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল। কেবল বাইরে বৃষ্টির টিনের চালে ঝুমঝুম শব্দ।
রশিদা খুব নিচু গলায়, প্রায় ফিসফিস করে বলল, "মজনু ভাই, সেখানকার আকাশে কোনো নীল নেই। সেখানে শুধু বালি আর টাকার গরম। আর সেই গরমের নিচে মানুষের মন শুকিয়ে একমুঠো ছাই হয়ে যায়।"
কথাটা বলে রশিদা আর দাঁড়াল না, দ্রুত ঘরের ভেতরে চলে গেল।
মজনু মুড়ির বাটি থেকে এক মুঠো মুড়ি মুখে পুরে নিয়ে তরিকুল সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, "শুনলেন তো স্যার? রশিদা বুজির এই ছোট্ট কথাটা কি আপনার ওই বিশ্ব রাজনীতির মোড়লরা বোঝে? আমেরিকা, পাকিস্তান, তুরস্ক কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের ওই রাজাবাদশাহরা— ওরা তো কেবল ক্ষমতার দান মারতে জানে। মানুষের বুকের ভেতরের খবর কজনে রাখে?"
তরিকুল সাহেব জানালার বাইরের অন্ধকার হয়ে আসা রূপসি গ্রামটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। বৃষ্টির ঝাপসায় গাছপালাগুলোকে কেমন যেন অস্পষ্ট লাগছে। মানুষের অহংকার, ভ্রান্ত বিশ্বাস আর ক্ষমতার এই উন্মাদ খেলায় সাধারণ মানুষের রক্ত আর চোখের জলই যে বারবার শোধ করতে হয়— এই চরম সত্যটা যেন এখন আরো বেশি স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে।
---
### পর্ব ৫: শ্রাবণের রাত ও নদীপারের নিস্তব্ধতা
বৃষ্টিটা রাত বাড়ার সাথে সাথে কিছুটা ধরে এসেছে, কিন্তু বাতাসের মেঘলা আর্দ্রতাটুকু রয়ে গেছে পুরোপুরি। মজিদ মিয়ার বারান্দার হারিকেনটার সলতে কমে এসে মিটিমিটি আলো ছড়াচ্ছে।
তরিকুল সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বললেন, "মজিদ, অনেক রাত হলো। এবার উঠি।"
মজিদ মিয়া টর্চলাইটটা তরিকুল সাহেবের হাতে এগিয়ে দিয়ে বললেন, "স্যার, সাবধানে যাবেন। পিচ্ছিল পথ, কোথাও আবার পা হড়কে না পড়েন।"
"হ্যাঁ, সাবধানেই যাব," তরিকুল সাহেব শান্ত মুখে বললেন। "জীবনটাও তো পিচ্ছিল পথের মতোই, মজিদ। যেখানে নিজের আত্মসম্মান আর বিবেক ঠিক রাখতে না পারলে মানুষ ধুপ করে আছাড় খায়।"
তিনি দরজার কাছে গিয়ে একটু থামলেন। তারপর অন্ধকার মেঠো পথের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বললেন, "দূর দেশে আজ তেলের কূপে আগুন জ্বলুক, কিংবা ক্ষমতার তাসের ঘর ভেঙে পড়ুক— আমাদের শিক্ষাটা বড়ো স্পষ্ট। যে জাতি ধর্মের মোড়কে নিজের শেকড় আর ঐতিহ্য ভুলে অন্যের পদলেহন করে, তারা কোনোদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। আমাদের এই পলিমাটির সরল মানুষগুলোকে যেদিন তারা সত্যি সত্যি ভালোবাসতে শিখবে, কোনো ভণ্ড অহংকারের কাছে বিক্রি হবে না— সেদিনই আমাদের আসল মুক্তি।"
তরিকুল সাহেব আঁধার রাস্তায় নেমে গেলেন। তার হাতের টর্চলাইটের হালকা আলোর বৃত্তটা আস্তে আস্তে দূরের বাঁশঝাড়ের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
মজিদ মিয়া বারান্দার সিঁড়িতে এসে বসলেন। ঘরের ভেতরে রশিদা তখনো জেগে আছে। আলো-আঁধারিতে দেখা যাচ্ছে, সে শান্ত হাতে একটা পুরোনো কাঁথার পাড় সেলাই করছে। আজ অনেকদিন পর রশিদার মুখটাতে আর সেই পুরানো আতঙ্কের ছায়া নেই। যেন এক দূর সম্পর্কের অধ্যায় আজ চিরতরে মুছে গেছে।
মজনু তখনো উঠোনের এক কোণে নিমগাছের নিচে বসে একা একাই হাত নেড়ে গুণগুণ করে কোনো এক অদ্ভুত সুর ভাঁজছে।
মজিদ মিয়া মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, "কী রে মজনু, বাড়ি যাবি না?"
মজনু মাথা নেড়ে বলল, "যাব মজিদ ভাই, একটু পর যাব। আকাশে কত তারা দেখছেন? ওই যে সৌদি আরব, আমেরিকা, ইসরায়েল— ওদের মাটির তলে যত তেলই থাকুক, এত সুন্দর তারা কি ওদের আকাশে ওঠে? ওরা টাকার গরমে অন্ধ, তাই আকাশের আলো দেখতে পায় না।"
মজিদ মিয়া কিছু বললেন না। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকালেন।
আজ মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী খেলা, মার্কিন ট্রাম্পের নতুন কূটচাল, কিংবা আরব বিশ্বজুড়ে নেমে আসা অর্থনৈতিক সংকট— এসব দূর-দূরান্তের খবরগুলো হয়তো কাল সকালে আবার চায়ের দোকানে ঝড় তুলবে। কিন্তু এই ছোট্ট গ্রামের মায়াময় নিস্তব্ধতায়, এই মুক্ত বাতাসের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর নিজস্ব যে এক আত্মমর্যাদা আর ভালোবাসার ঘর আছে, তা কোনো তেলের গরমে কেনা যায় না।
মজিদ মিয়া হারিকেনের ফুঁ দিয়ে আলোটা নিভিয়ে দিলেন। নিবিড় এক অন্ধকার আর শান্ত শ্রাবণের রাত পুরো গ্রামটাকে এক পরম মমতায় জড়িয়ে নিল।
গল্প — নক্ষত্রদের কোনো তেল লাগে না
বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অন্যান
১৮
এআই বিশ্লেষণ (মূলভাব)
"নক্ষত্রদের কোনো তেল লাগে না" একটি চমৎকার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের গল্প। গল্পে বিশ্ব রাজনীতির জটিলতা, তেল সংকট এবং প্রবাসীদের আড়ালে থাকা কষ্টের চিত্র ফুটে উঠেছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ মজিদ ও তার বোন রশিদাই গল্পের মূল কেন্দ্র। ক্ষণস্থায়ী ক্ষমতার দম্ভের বিপরীতে সাধারণ গ্রামীণ জীবনের স্থায়িত্ব ও মানবীয় মূল্যবোধের গভীর বার্তা বহন করে এই রচনাটি।
অনুসন্ধান করুন
🎂 আজ যাদের জন্মদিন
মোঃ আসিফুর রহমান
শুভ জন্মদিন! 🎈