প্রথম খণ্ড : ইতিহাস, মোহের ছায়া এবং এক জাদুকরের ডায়েরি

শ্রাবণ মাসের এক মেঘলা দুপুর। রূপপুরের জমিদার বাড়ির চিলেকোঠায় বসে যখন আমি এই পুরানো ডায়েরির পাতাগুলো উলটাচ্ছি, বাইরে তখন ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি নামার উপক্রম। বাতাসটা ভারী, ঠিক যেন ইতিহাসের নিঃশ্বাসের মতো। ইতিহাস বড়ো অদ্ভুত জিনিস। তা কখনো সত্যের রূপ ধরে আসে, কখনো মায়া হয়ে চোখের সামনে ভেসে থাকে। মায়া কাটিয়ে উঠলেই কেবল দেখা যায় আসল চেহারা।
আজ আমি আপনাদের এক মায়াজালের কথা বলব— যে মায়ার নাম ‘ঐতিহাসিক মহিমা’।
জগতে কত সাম্রাজ্য এলো আর গেল। রোমানরা এলো, পারসিকরা এলো, ব্রিটিশরা এলো। কিন্তু এক অদ্ভুত জাদুর কাঠি যেন ছড়িয়ে দেওয়া হলো এক বিশেষ সাম্রাজ্যবাদের ওপর! ভারত বলুন, আফ্রিকা বলুন, কিংবা আন্দালুসিয়ার সেই জাদুকরী স্পেন— সবখানেই এক অদ্ভুত উত্তরাধিকার জন্ম নিল। তারা শুধু তরবারি নিয়ে আসেনি, সাথে করে নিয়ে এসেছিল এমন এক মায়াবী সুরমা, যা চোখে লাগালেই ইতিহাস বদলে যায়। তারা হয়ে উঠল ইতিহাসের অধ্যাপক, স্থপতি, প্রাজ্ঞ লেখক। তারপর পরম মমতায় তারা নিজেদের বিজয়ের কথা লিখে গেল, নিজেদের রক্তারক্তিকে বানিয়ে দিল ‘সভ্যতার আলো’। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো সাম্রাজ্যবাদকে নিয়ে কি এমন উদাত্ত স্তুতিগাথা গাওয়া হয়েছে? না, হয়নি।
ইংরেজি শাসনের কথাই ধরুন। এই বাংলায় যখন রেলের পাত বসলো, আধুনিক শিক্ষার হাওয়া লাগলো— তবু কেউ যদি দাঁড়িয়ে বলে, “আহা, ইংরেজরা তো ভারতবর্ষের কিছু ভালো কাজও করে দিয়ে গেছে!”— মুহূর্তের মধ্যে পুরো সমাজ তেড়ে আসবে। তাকে দাগিয়ে দেওয়া হবে ‘সাহেবদের দালাল’ কিংবা ‘নয়া সাম্রাজ্যবাদী’ বলে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ভারতবর্ষেই যখন শতাব্দী ধরে আক্রমণ চলল, যখন তলোয়ারের ধারে কিংবা ধর্মান্তরের মাধ্যমে সাম্রাজ্য বিস্তার ঘটল, তখন তাকে বলা হলো ‘ইসলামের ইতিহাস চর্চা’! স্পেনের কর্ডোবা থেকে উত্তর আফ্রিকার তপ্ত বালুচর হয়ে সিন্ধুর তীর পর্যন্ত এই সাম্রাজ্য বিস্তারকে আমাদের নাকি দেখতে হবে ‘আন্তরিকতার চশমা’ দিয়ে। তা না হলে নাকি আমরা বড্ড ভুল বুঝে ফেলব!
ভাবতে অবাক লাগে না? সাম্রাজ্যবাদ জিনিসটাই তো এক ঘৃণ্য দখলদারিত্ব। তবে এই বিশেষ সাম্রাজ্যবাদের বেলাতেই কেন পৃথিবীর নীতি বদলে যায়? কেন ইতিহাসবিদরা এর সামনে এসে নতজানু হন?
কারণটা আসলে জাদুর মতোই সরল, অথচ ভীষণ অন্ধকার। এই সাম্রাজ্যবাদ শুধু মাটি দখল করেনি, তারা রক্তের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। ধর্মান্তর আর বংশবিস্তারের এমন এক নিখুঁত উত্তরাধিকার তারা রেখে গেছে, যা যুগের পর যুগ ধরে তাদের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আজ আফগানিস্তানের বামিয়ানে দাঁড়িয়ে যে-সব সুরমা-পরা তরুণ বুদ্ধের বিশাল মূর্তিগুলো ডাইনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেয়, কিংবা মসুলের জাদুঘরে হাজার বছরের প্রাচীন ভাস্কর্য হাতুড়ি দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়— তাদের রক্তের অনুসূত্রে তাকালে এক রূপকথা দেখতে পাবেন। সেই রূপকথা কোনো রাজপুত্রের নয়, বরং সেইসব হতভাগ্য দাসদের, যারা হাজার বছর আগে ভারতবর্ষ বা পারস্যের মাটিকে রক্তে ভিজিয়ে গনিমতের মাল হিসেবে বিক্রি হয়ে গিয়েছিল দাসের বাজারে।
কালের কী অদ্ভুত লীলা! সেই দাসদেরই বংশধররা আজ নতুন নামে শাসন প্রতিষ্ঠা করে, আর চরম মূর্তিবিদ্বেষী হয়ে নিজেদের পূর্বপুরুষদেরই স্মৃতি মুছে ফেলে। ভারতে তিনশো বছরের শাসনের পক্ষে সাফাই গাওয়ার মতো মানুষ আজ তৈরি হয়ে আছে। স্পেন বা ফ্রান্সে তলোয়ারের জোরে প্রতিষ্ঠিত শাসনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হওয়ার লোক অভাব নেই। বিশ্বজুড়ে জন্ম নিয়েছে ‘ইসলামের ইতিহাস’ নামের এক আস্ত বিদ্যাচর্চার শাখা— যা মূলত এক সাম্রাজ্যবাদের গুণকীর্তন ছাড়া আর কিছুই নয়।
তারা বলে, “আমরা তো একে পরবাস ভাবিনি, একেই নিজের দেশ বানিয়ে নিয়েছি!”
কিন্তু একটা দেশকে জোর করে দখল করে সেখানে ঘর বাঁধলেই কি তাকে দখলদার বলা যাবে না? আপনি যদি সুদূর আমেরিকা মহাদেশের দিকে তাকান— ইংল্যান্ড থেকে আসা শ্বেতাঙ্গরা সেখানকার আদিবাসীদের রক্তে নদী ভাসিয়ে দেশ দখল করেছিল। কৌতূহলজনক ব্যাপার হলো, আমেরিকার রাজ্যগুলোর নাম কিন্তু এখনও সেইসব ধ্বংস হয়ে যাওয়া আদিবাসীদের ভাষার নামেই রয়ে গেছে! শ্বেতাঙ্গরা ব্রিটিশদের সাথে যুদ্ধ করে আমেরিকাকে স্বাধীনও করেছিল, একেই নিজেদের একমাত্র দেশ মানল। তা সত্ত্বেও আজকের ইতিহাস কি তাদের ‘উপনিবেশকারী’ বলতে দ্বিধা করে? কখনই না। তাহলে ভারতবর্ষের বুকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে হামলা চলল, তাকে আক্রমণ কিংবা দখলদারিত্ব বলতে এত দ্বিধা কেন? প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিবদের মতো বিজ্ঞজনেরাও যখন এই সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে তাত্ত্বিক ঢাল হয়ে দাঁড়ান, তখন বিস্ময় জাগে। বামপন্থিদের চোখে নাকি সাম্রাজ্যবাদ সবচেয়ে বড়ো শত্রু— অথচ ভারত, স্পেন কিংবা আফ্রিকায় এই বিশেষ সাম্রাজ্যবাদের মুখোমুখি হলেই তারা অচেনা এক নীরবতা পরেন!
মুঘল আমল বা তার আগের কথা চিন্তা করুন। তখন কলকাতা বা দিল্লির সাধারণ মানুষ কি পুরো ভারতবর্ষকে একটি ‘দেশ’ বলে কল্পনা করতে পারত? সত্যি বলতে, সেই ধারণাই তখন কারো মাথায় ছিল না। এই বিশাল ভূখণ্ডকে একটি একক ‘দেশ’ হিসেবে চিনতে শেখাল তো সেই ইংরেজরাই। ইংরেজদের খোলা স্কুলে পড়ে, শেকসপিয়র আর মিল্টনের ইংরেজি সাহিত্য গিলে প্রথম এই দেশের মানুষ বুঝতে পারল—‘দেশপ্রেম’ কাকে বলে, পরাধীনতার জ্বালা কী আর স্বাধীনতার রক্তিম আকাঙ্ক্ষাই বা কী!
ইংরেজি শাসনের অবদানগুলোকে স্বীকার করা আজ প্রায় নিষিদ্ধ। তা বললেই হেগেল, মার্ক্স বা এডওয়ার্ড সাঈদকে নিয়ে আসা হবে আপনাকে চূর্ণবিচূর্ণ করতে, অরুন্ধতী রায়ের উক্তি দিয়ে প্রমাণ করা হবে আপনি কলোনিয়াল যুগের ক্রীতদাস। অথচ আপনি যদি স্পেনে মুসলমানদের দখলদারিত্ব, ফ্রান্সে তাদের অভিযান কিংবা ভারতে তাদের রক্তক্ষয়ী শাসনকে ‘গৌরব’ বলে চিৎকার করেন— তাহলে অমুসলিম হলে আপনাকে বলা হবে ‘প্রগতিশীল সেক্যুলার’, আর মুসলিম হলে পদবি মিলবে ‘বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ’! কেবল এর বিরোধিতা করলেই আপনি রাতারাতি হয়ে যাবেন ‘বিদ্বেষী’ বা ‘মৌলবাদী’।
বখতিয়ার খিলজি, তৈমুর লং, সুলতান মাহমুদ কিংবা মুহাম্মদ বিন কাশিম— এরা তো স্পষ্টতই ছিল লুটেরা, রক্তপিপাসু সাম্রাজ্যবাদী। কিন্তু এই সাম্রাজ্যবাদ এমন এক উত্তরাধিকার রেখে গেছে, যা তাদের অপকর্মকেও বীরত্ব বলে গায়। ধর্মান্তর, দাসপ্রথা আর রক্তের মিশ্রণই এই অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করেছে। ইংরেজরা সে কাজ করতে পারেনি, কারণ তাদের ছিল অহংকারী ‘জ্যাতাভিমান’। তারা নেটিভদের সাথে রক্ত মেশাতে দেয়নি। যদি দিত, তবে আজ ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের পক্ষেও হুবহু একই রকম স্তুতিগাথা লেখা হতো। সাহেবদের লেখা ইতিহাসকে তাই বামপন্থি আর মুসলিম লীগ সহজেই উড়িয়ে দিতে পেরেছিল।
আমার বিচারটা বড্ড সহজ, স্পষ্ট।
ইতিহাস কোনো রূপকথার গল্প নয় যে বিজয়ী রাজার জন্য এক আইন আর বিজিতের জন্য অন্য আইন হবে। ইসলামের ইতিহাস বা মুসলিম ইতিহাস বলে যা প্রচলিত, তা মূলত এক প্রতাপশালী সাম্রাজ্যবাদেরই জয়গান। যদি হানাদারবৃত্তি আর সাম্রাজ্য স্থাপন অপরাধ হয়, তবে পৃথিবীর প্রতিটি সাম্রাজ্যবাদকে একই তুলাদণ্ডে মাপতে হবে। ইতিহাসকে হতে হবে নিরপেক্ষ, মায়াহীন। একই যাত্রায় পৃথক ফল— এ তো কোনো ন্যায়ের কথা হতে পারে না।

দ্বিতীয় খণ্ড : স্মৃতির সিন্দুক, রক্তের দাগ এবং তলোয়ারের ছায়া

বৃষ্টির শব্দটা এখন বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চিলেকোঠার কাচের জানালায় একফোঁটা একফোঁটা পানি জমছে, ঠিক যেন ইতিহাসের ঝাপসা চোখ। প্রথম পর্বে আমরা যেখানে থেমেছিলাম, সেখান থেকেই গল্পের সুতোটা আবার টানি।
ইতিহাসের এক অদ্ভুত রোগ আছে—সে রোগ হলো ‘স্মৃতিভ্রংশ’। কোনো এক অদৃশ্য জাদুকর যেন এসে আমাদের অবচেতন মন থেকে কিছু ভয়ংকর রক্তের দাগ মুছে দেয়, আর সেখানে বসিয়ে দেয় সুন্দর আলপনা।
ভাবুন তো একবার সেই সময়টার কথা, যখন সিন্ধুর তীরে এসে নামলেন মুহাম্মদ বিন কাশিম। কিংবা সেই সোমনাথের মন্দিরের দিকে যখন ধেয়ে এলেন সুলতান মাহমুদ। তারা কি কোনো সভ্যতার আলো ছড়াতে এসেছিলেন? নাকি এসেছিলেন জয় করতে, রক্ত ঝরাতে এবং সম্পদ লুট করতে? উত্তরটা অতি সাধারণ। কিন্তু এই ভারতবর্ষের ইতিহাস-চর্চায় যখন তাদের প্রসঙ্গ আসে, তখন কোনো এক আশ্চর্য ছোঁয়ায় তারা হয়ে যান ‘মহান বীর’ কিংবা ‘ন্যায়পরায়ণ শাসক’।
অথচ কী ঘটেছিল সেদিনগুলোতে?
যখন কোনো বিজিত ভূমিতে বিজয়ী সেনাবাহিনী প্রবেশ করে, তখন সেখানকার ঘরবাড়ি জ্বলে, পুরুষেরা প্রাণ হারায়, আর নারী ও শিশুরা পরিণত হয় গনিমতের মালে—অর্থাৎ যুদ্ধলব্ধ সম্পদে। এই গনিমতের মাল হিসেবে হাজার হাজার মানুষকে পারস্য বা মধ্য এশিয়ার দাসবাজারে নিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হলো। যাদের শিকড় ছিল এই মাটিতে, যাদের বংশধরেরা হাজার বছর ধরে নদীর ধারে ফসল ফলাত—এক ঝটকায় তারা হয়ে গেল পরিচয়হীন ক্রীতদাস।
আজ আমরা যাদের বলি ‘উত্তরাধিকার’, তারা আসলে কীভাবে তৈরি হলো?
যখন কোনো এক সাম্রাজ্যবাদ বিজিত জাতির সাথে নিজেদের রক্ত মিশিয়ে দেয়, তখন সেই রক্তের ভেতর এক অদ্ভুত দ্বিধা জন্ম নেয়। সে আর নিজের আসল অতীতকে চিনতে পারে না। সে ভুলে যায় তার পূর্বপুরুষের ক্রন্দন, ভুলে যায় তার ভিটেমাটি ছাই হয়ে যাওয়ার গল্প। তার বদলে সে আঁকড়ে ধরে সেই তলোয়ারকে, যে তলোয়ার একদিন তার পূর্বপুরুষের গর্দান কেটেছিল!
ইংরেজি শাসনের ইতিহাস লিখলে আমরা বুক চাপড়ে বলি, “জালিওয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড ভুলব না!” কিন্তু তৈমুর লং যখন দিল্লিতে এসে হাজার হাজার মানুষের মাথা কেটে পিরামিড তৈরি করেছিলেন, তখন কেন আমাদের ইতিহাসবিদরা শান্ত স্বরে বলেন, “ওটা তো তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রয়োজন ছিল!”?
এ কী আশ্চর্য বৈষম্য!
একজন ইংরেজ সাহেব যখন তার উন্নত চশমাজোড়া চোখে এঁটে নেটিভদের ‘অসভ্য’ বলত, তখন আমরা তার মধ্যে দেখতে পেতাম এক ঘৃণ্য বর্ণবাদ। কিন্তু একজন মধ্য এশীয় হানাদার যখন ভারতে এসে এ দেশের মানুষকে ‘কাফের’ বা ‘অসভ্য’ বলে চিহ্নিত করে তাদের সংস্কৃতি ও দেবালয় গুঁড়িয়ে দিল, তখন তাকে আমরা বানিয়ে ফেললাম এক ‘ঐতিহাসিক রূপান্তর’!
আসলে, এই মায়াজালে আমাদের বন্দি করে রাখা হয়েছে শতাব্দী ধরে। বামপন্থী ইতিহাসবিদ থেকে শুরু করে একশ্রেণির প্রগতিশীল সুশীল সমাজ— সবাই মিলে ইতিহাসকে এমনভাবে ছেঁটেছে যাতে সত্যের কুৎসিত চেহারাটা সামনে না আসে। তাদের যুক্তি হলো : “তারা তো আর লুট করে নিজেদের দেশে ধন-সম্পদ নিয়ে যায়নি, তারা তো এখানেই স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল!”
এবার একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবুন তো— আমেরিকায় যে-সব ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গরা গিয়েছিল, তারা কি তাদের ধন-সম্পদ আবার ইংল্যান্ড বা ফ্রান্সে ফেরত পাঠিয়েছিল? না। তারা আদিবাসীদের গণহত্যা করে, তাদের জমি ছিনিয়ে নিয়ে সেখানেই নিজেদের স্থায়ী আবাস বানিয়েছিল। আজকে যে ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক বা ক্যালিফোর্নিয়া দেখছেন, সেগুলো শ্বেতাঙ্গদের তৈরি করা রাজ্য। তবুও পৃথিবীর ইতিহাস কোনোদিন সেই শ্বেতাঙ্গদের ‘আমেরিকার ভূমিপুত্র’ বলে না, তাদের সবসময় ‘ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক’ হিসেবেই চিহ্নিত করে।
তাহলে ভারতবর্ষে কিংবা স্পেনে কিংবা উত্তর আফ্রিকায় মুসলিম সাম্রাজ্যবাদ যখন তলোয়ারের জোরে নিজের আস্তানা গাড়ল, তখন তা কেন ‘আপন হয়ে যাওয়া’ বলে গণ্য হবে?
কারণ একটাই। ধর্মান্তর আর বংশবিস্তারের মাধ্যমে তারা এমন এক বিশাল জনসংখ্যার জন্ম দিয়ে গেছে, যারা মানসিকভাবে সেই সাম্রাজ্যবাদের পাহারাদার হয়ে উঠেছে। এই পাহারাদারেরা ইতিহাস লেখে, পাঠ্যবই তৈরি করে, আর নতুন প্রজন্মকে শেখায়— তলোয়ারের আঘাত নাকি আসলে আশীর্বাদ ছিল!
ইতিহাসের সত্য বড়োই নিষ্ঠুর। কিন্তু সেই সত্যকে ঢেকে রেখে যদি আমরা মিছে রূপকথা রচনা করি, তবে তা কেবল অতীতকেই অপমান করে না, ভবিষ্যৎকেও এক অন্ধ গহ্বরে ঠেলে দেয়। সাম্রাজ্যবাদ সাম্রাজ্যবাদই— তা তাজের অধীনে হোক কিংবা পাগড়ির ছায়ায়।

তৃতীয় খণ্ড : বুদ্ধের চোখ, অপহৃত সত্য এবং সেক্যুলারিজমের কুয়াশা

বিকেলের আলোটা এখন নামতে শুরু করেছে। মেঘলা আকাশ আরও ঘোলাটে হয়ে এসেছে, রূপপুরের সেই চিলেকোঠায় যেন আচ্ছন্ন এক স্তব্ধতা। আমি চায়ের কাপে চুমুক দিই আর ভাবি— মানুষের মন কীভাবে এই অদ্ভুত দ্বিচারিতাকে আপন করে নেয়?
প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে আমরা তলোয়ার, দাসপ্রথা আর অন্ধ উত্তরাধিকারের কথা বলেছিলাম। এই খণ্ডে আমাদের চোখ ফেরাতে হবে সেই বুদ্ধমূর্তির দিকে, যার ভাঙা চোখের কোণে জমা আছে সহস্রাব্দের দুঃখ।
বামিয়ান কিংবা মসুল— দূর কোনো দেশের গল্প বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ঘটনাগুলোর শিকড় একই সুতোয় গাঁথা। ২০০১ সালে যখন আফগানিস্তানের বামিয়ানে তালেবানেরা পাহাড় খোদাই করা সেই হাজার বছরের প্রাচীন মহীয়সী বুদ্ধমূর্তিগুলোকে বারুদ দিয়ে উড়িয়ে দিল, তখন সারা বিশ্ব শিউরে উঠেছিল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম হা-হুতাশ করল, “শিল্পের কী নির্মম বিনাশ!” কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই ধ্বংসকামিতার জন্ম কোথায়?
এই মূর্তি ভাঙার দলটির ধমনিতে প্রবাহিত রক্ত কিন্তু কোনো ভিনগ্রহের নয়। বহু শতক আগে এই ভারতবর্ষ আর পারস্যের মাটি থেকেই হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে দাস বানিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেইসব শুষ্ক পার্বত্য অঞ্চলে। তারা ছিল এই ভূখণ্ডেরই সন্তান— যারা ভাস্কর্য গড়ত, শিল্প সৃষ্টি করত, দেবালয় আর বুদ্ধের করুণাময় রূপ বন্দনা করত। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের জাঁতাকলে পড়ে, ধর্মান্তর আর দাসত্বের ক্রমান্বয়ে, তারা ভুলে গেল নিজেদের আত্মপরিচয়।
যে হাত একদিন শিল্প গড়ত, শতাব্দীর ব্যবধানে কালক্রমে সেই হাতই সুরমা চোখে হয়ে উঠল চরম শিল্পবিদ্বেষী, মূর্তিবিদ্বেষী! কী অবিশ্বাস্য এক ট্র্যাজেডি! যে পূর্বপুরুষেরা একদা শৃঙ্খলিত দাস হয়ে বাজারে বিক্রি হয়েছিল, তাদেরই উত্তরসূরিরা আজ সেই দাসত্বের অহংকার নিয়ে ‘ইসলামি আমিরাত’ প্রতিষ্ঠা করে আর প্রাচীন ঐতিহ্যকে ডিনামাইট দিয়ে চূর্ণ করে।
অথচ আমাদের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী আর সেক্যুলার সমাজ এই সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পান।
এখানেই সবচেয়ে বড়ো তামাশা। আধুনিক বিশ্বরাজনীতিতে আর সাহিত্যচর্চায় বামপন্থি চিন্তাবিদদের বড়ো অহংকার হলো— তারা সাম্রাজ্যবাদের ঘোর বিরোধী। ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, ফরাসি বা ওলন্দাজ সাম্রাজ্যবাদ— এসবের নাম শুনলেই তারা কলম উঁচিয়ে চিৎকার করে ওঠেন। তারা সাঈদ পড়েন, মার্ক্স আওড়ান, আর অরুন্ধতী রায়ের দীর্ঘশ্বাস ঊর্ধ্বে তুলে ধরেন। কিন্তু যেইমাত্র আলোচনাটি মোড় নেয় স্পেনে মুসলমানদের তলোয়ারের রাজত্বে, ফ্রান্সে তাদের সশব্দ অভিযান, কিংবা ভারতবর্ষে তিনশো বছরের সাম্রাজ্যবাদে—অমনি সেই প্রগতিশীল বন্ধুদের কণ্ঠরোধ হয়ে যায়!
কেন এই নীরবতা?
কারণ, তারা এক অদ্ভুত ফাঁদে আটকা পড়েছেন। যদি কোনো অমুসলিম ঐতিহাসিক এই মধ্যযুগীয় দখলদারিত্বের সত্য নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরেন, অমনি তাকে ব্র্যাকেটবন্দি করে ফেলা হয়—‘সেক্যুলারিজমবিরোধী’, ‘ইসলাম-বিদ্বেষী’ কিংবা ‘হিন্দুত্ববাদী’! আর যদি কোনো মুসলিম লেখক বা গবেষক এই সাম্রাজ্যবাদের স্তুতি রচনা করেন, স্পেনে মুসলিম শাসনের ‘স্বর্ণযুগ’ আর ভারতবর্ষে মুঘলদের ‘মহান অবদান’ নিয়ে বিশাল আখ্যান লেখেন, তবে তাকে পরম শ্রদ্ধায় মাথায় তুলে নেওয়া হয় ‘প্রখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবিদ’ হিসেবে!
আহা, কী সুন্দর নিয়ম! সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে কথা বললে আপনি প্রগতিশীল, আর সাম্রাজ্যবাদের শিকার হওয়া মানুষদের বেদনার কথা বললে আপনি সাম্প্রদায়িক!
আজ বিশ্বজুড়ে ‘ইসলামের ইতিহাস’ নামে যে আস্ত এক সাবজেক্ট বা বিদ্যাচর্চার শাখা তৈরি করা হয়েছে, একটু তলিয়ে দেখলেই বুঝবেন তা মূলত এক সাম্রাজ্যবাদের গুণকীর্তন ছাড়া আর কিছুই নয়। ইতিহাসের পাতা খুললে আপনি দেখবেন— সেখানে বিজয়ী রাজাদের জয়গাথা আছে, প্রাসাদের চাকচিক্য আছে, আর আছে বিজিতের পরাজয়কে ঢাক ঢোল পিটিয়ে ‘সভ্যতা বিনির্মাণ’ বলার অপচেষ্টা।
বখতিয়ার খিলজি যখন নালন্দার হাজার হাজার বছরের জ্ঞানালয়, দুর্লভ বইয়ের লাইব্রেরি পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিলেন, কিংবা তনুমন কাঁপানো গণহত্যা চালিয়েছিলেন— সেটিকে কি ইতিহাস সাম্রাজ্যবাদী বর্বরতা হিসেবে স্পষ্ট ভাষায় লিখেছে? নাকি বলা হয়েছে, “ওটা তো নিছকই এক সামরিক অভিযান ছিল!”
এই মায়াজাল ভাঙা দরকার। কারণ, ইতিহাস যদি অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করতে ভয় পায়, তবে সেই ইতিহাস কেবল একপক্ষীয় স্তুতিগাথায় পরিণত হয়। ইতিহাসকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা পতাকার জন্য আলাদা নিয়ম বানাতে দেওয়া যায় না।

চতুর্থ খণ্ড : রক্তের অহংকার, জ্যাতাভিমান এবং একপেশে ইতিহাসের দাঁড়িপাল্লা

সন্ধ্যা নেমে এসেছে রূপপুরের আকাশে। বৃষ্টির তোড় কিছুটা কমে এলেও বাতাসে এখন ভিজে মাটির এক প্রগাঢ় গন্ধ। চিলেকোঠার টিমটিমে ল্যাম্পের আলোয় বসে যখন আমি এই ডায়েরির চতুর্থ পাতাটি লিখছি, তখন মনে হচ্ছে— সত্যিই তো, ইতিহাস কত সহজেই না বিজয়ীদের হয়ে কথা বলে!
আগের পর্বগুলোতে আমরা দেখেছি কীভাবে ইতিহাসকে একপেশে করে সাজানো হয়েছে। কিন্তু এখানে একটি খুব সূক্ষ্ম এবং গভীর প্রশ্ন উঠে আসে : কেন ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে এমন এক অন্ধ উত্তরাধিকার তৈরি হতে পারল না, যা ইসলামি সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে তৈরি হয়েছে?
উত্তরটি লুকিয়ে আছে ইউরোপীয়দের এক অদ্ভুত সামাজিক ব্যাধিতে—যার নাম ‘জ্যাতাভিমান’ বা বর্ণশ্রেষ্ঠত্বের অহংকার।
ইংরেজরা যখন এই ভারতবর্ষে এলো, তারা শাসন করল, লুণ্ঠন করল, রেলে-রপ্তানিতে নিজেদের লাভ মেলাল। কিন্তু তারা একটি কাজ কঠোরভাবে এড়িয়ে চলেছে— তা হলো এ দেশের মানুষের সঙ্গে নিজেদের রক্ত মেশানো। ইউরোপীয় মনিবেরা এ দেশের ‘নেটিভ’ বা স্থানীয় মানুষদের অলিখিতভাবে ঘৃণার চোখে দেখত। তারা ভারতীয়দের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে রক্ত সংমিশ্রণ ঘটায়নি, কিংবা ব্যাপক হারে ধর্মান্তরের মাধ্যমে নিজেদের অনুগত কোনো বিশাল সামাজিক গোষ্ঠী তৈরি করে রেখে যায়নি।
যদি ইংরেজরা সেই মধ্যযুগীয় শাসকদের মতো ব্যাপক ধর্মান্তর ঘটাত, জোরপূর্বক রক্তের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে কোটি কোটি মানুষের মধ্যে এক ‘সাহেবি রক্তধারার’ জন্ম দিত— তবে বিশ্বাস করুন, আজকের ভারতবর্ষে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের পক্ষেও কথা বলার মতো অগাধ লোক থাকত! তারা তখন রবার্ট ক্লাইভ বা লর্ড কার্জনকে নিজেদের ‘জাতীয় বীর’ আর ‘সভ্যতার রূপকার’ বলে মহিমান্বিত করত।
কিন্তু ইংরেজরা তা করেনি। ফলে তাদের রেখে যাওয়া ইতিহাসকে ভারতবাসী সহজভাবেই ‘কলোনিয়াল যুগের ইতিহাস’ হিসেবে বর্জন করতে পেরেছে। ব্রিটিশদের লেখা সাম্রাজ্যবাদী ইতিহাসকে আমাদের দেশের বামপন্থী চিন্তাবিদ বা মুসলিম লীগাররা এক তুড়িতে উড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন, কারণ সেই ইতিহাসের পেছনে অন্ধ রক্তানুভূতির কোনো ঢাল ছিল না।
অথচ ইসলামি সাম্রাজ্যবাদের বেলায় কী ঘটেছে?
এখানে বিজয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ধর্মান্তর, দাসপ্রথা আর রক্তমিশ্রণ। এই তিনটি জিনিস মিলে এমন এক অদ্ভুত মানসিকতার জন্ম দিয়েছে, যেখানে শোষিত মানুষের বংশধরেরাই শোষকের পক্ষে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
চিন্তা করে দেখুন, মুঘল কিংবা সুলতানি আমলে কি ভারতবাসী নিজের দেশকে আজকের মতো একটি অখণ্ড স্বাধীন দেশ হিসেবে কল্পনা করতে পারত? না, সেই ভাবনাই ছিল অচেনা। ইংরেজরা আমাদের শোষণ করলেও, তাদেরই স্কুলেই পড়ে, শেকসপিয়র আর মিল্টনের বই হাতে নিয়েই কিন্তু ভারতবাসী প্রথম চিনেছিল—‘দেশপ্রেম’ কাকে বলে, স্বাধীনতার আসল অধিকার কী। এটি এক ঐতিহাসিক বৈপরীত্য।
অথচ আজ যদি কেউ দাঁড়িয়ে ইংরেজদের রেখে যাওয়া শিক্ষা বা প্রশাসনিক কাঠামোর সত্য প্রশংসাটুকুও করে, তাকে মুহূর্তের মধ্যে দাগিয়ে দেওয়া হবে ‘ব্রিটিশদের দালাল’ কিংবা ‘নয়া সাম্রাজ্যবাদী’ বলে! অরুন্ধতী রায়, মার্ক্স বা এডওয়ার্ড সাঈদের বচসা দিয়ে তাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
কিন্তু ঠিক বিপরীত দৃশ্যটি দেখুন—আপনি যদি বখতিয়ার খিলজি, তৈমুর লং, সুলতান মাহমুদ কিংবা মুহাম্মদ বিন কাশিমের মতো রক্তপিপাসু লুটেরাদের ভারতবর্ষ অভিযানের গৌরবগাথা গান, তবে আপনাকে বলা হবে ‘উদারপন্থি সেক্যুলার’!
মুহাম্মদ বিন কাশিম বা তৈমুর লং কোনো সাধু-পুরুষ ছিলেন না। তারা ছিলেন নির্ভেজাল দস্যু ও সাম্রাজ্যবাদী। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের এই গুণকীর্তনকে আজ ‘ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি’ বলে আমাদের গেলাতে চাওয়া হয়।
একই যাত্রায় এই পৃথক ফল কেন? রক্ত আর ধর্মান্তর দিয়ে লেখা ইতিহাস কি তবে সভ্যতার সত্য ইতিহাসকে চিরকাল এভাবে ঢেকে রাখবে?

পঞ্চম খণ্ড : শেষ পাতায় সত্যের আলো এবং একই পাল্লায় ইতিহাসের বিচার

রাতের আঁধার এখন রূপপুরের চারপাশকে পুরোপুরি গিলে খেয়েছে। ঝিঁঝি পোকার ডাক আর চালের ওপর টুপটুপ বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। চিলেকোঠার পুরানো হারিকেনের আলোয় বসে আমি ডায়েরির শেষ পাতাটি খুললাম।
এতক্ষণ ধরে আমরা যে কুয়াশার ভেতর হেঁটেছি, এবার তার শেষ সীমায় এসে পৌঁছানোর সময় হয়েছে।
আমার মূল বক্তব্য বা পয়েন্ট খুব বেশি জটিল নয়। এটি কোনো রাগ, দ্বেষ বা কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীর প্রতি অন্ধ আক্রোশের কথা নয়— এটি কেবল ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে এক সোজা আয়না তুলে ধরার চেষ্টা।
আজ ‘ইসলামের ইতিহাস’ বা ‘মুসলিম ইতিহাস’ নামে পৃথিবীর পাঠ্যপুস্তকে যা কিছু পরিবেশন করা হয়, তার সিংহভাগই আসলে এক প্রতাপশালী সাম্রাজ্যবাদের জয়গান। এটিকে পরম সত্য, ঈশ্বর-প্রেরিত আলো বা মহান সামাজিক বিপ্লব বলে ভুল করার কোনো সুযোগ নেই। এটি যা ছিল, ঠিক তা-ই— একটি সুসংগঠিত, আক্রমণাত্মক এবং ক্ষমতাগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদ।
প্রথমে আমাদের নির্মোহভাবে স্বীকার করে নিতে হবে যে, মধ্যযুগে আরব, পারস্য বা মধ্য এশিয়া থেকে যে অভিযানগুলো পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা কোনো সাধু-সন্ন্যাসীর প্রেম ছড়ানোর যাত্রা ছিল না। তা ছিল ভূমি দখল, সম্পদ লুণ্ঠন, ক্ষমতার লালসা এবং আধিপত্য বিস্তারের এক ধ্রুপদী সাম্রাজ্যবাদী প্রক্রিয়া।
এখন প্রশ্ন থেকে যায়— ইতিহাসের বিচারে ‘হানাদারবৃত্তি’ আর ‘সাম্রাজ্য স্থাপন’ কি আদতে কোনো মহান গুণ?
যদি কোনো ফরাসি, ইংরেজ, ওলন্দাজ বা স্প্যানিশ রাজার বেলায় কোনো ভূখণ্ড দখল করা, সেখানকার মানুষকে দাস বানানো, স্থানীয় সংস্কৃতি চূর্ণ করা এবং নিজের ধর্ম ও ভাষা চাপিয়ে দেওয়াকে ‘বর্বর সাম্রাজ্যবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়— তবে ঠিক একই কাজের জন্য অষ্টম বা দ্বাদশ শতকের কোনো মধ্যপ্রাচীয় বা মধ্য এশীয় শাসককে কেন ‘সভ্যতার রূপকার’ বলা হবে?
ইতিহাসের তুলাদণ্ড কখনো দুটি হতে পারে না। বিচারকের আসন যদি ন্যায়পরায়ণ হয়, তবে পৃথিবীর সমস্ত সাম্রাজ্যবাদকে একই পাল্লায় ওজন করতে হবে। রোমান সাম্রাজ্যবাদ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, মার্কিন ঔপনিবেশিকতা যেভাবে শোষণের ইতিহাস হিসেবে চিহ্নিত, ঠিক একইভাবে সিন্ধু থেকে আন্দালুসিয়া, উত্তর আফ্রিকা থেকে গাঙ্গেয় উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করা ইসলামি সাম্রাজ্যবাদকেও সেই একই ‘সাম্রাজ্যবাদ’ পরিচয়েই মূল্যায়ন করতে হবে।
একই যাত্রায় পৃথক ফল দেওয়ার এই মেকি সেক্যুলার ও একপেশে রেওয়াজ বন্ধ করার সময় এসেছে।
ইতিহাসের পাতা থেকে যদি আমরা এই অন্ধ ভালোবাসার সুরমাটা মুছে ফেলতে পারি, তবেই কেবল দেখতে পাব— তলোয়ারের কোনো ধর্ম হয় না, বিজয়ের অহংকারের কোনো ন্যায়-অন্যায় হয় না। সাম্রাজ্যবাদ তা যার নামেই পরিচালিত হোক না কেন, তা মূলত মানুষের রক্ত, চোখের জল আর স্বাধীনতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক কুৎসিত ভাস্কর্য।
বৃষ্টির শব্দটা এখন ধীরে ধীরে মিলিয়ে আসছে। চিলেকোঠার জানোলা দিয়ে দূরের দুরন্ত বাতাসের ঝাপটা আসছে। ইতিহাস তার হাজার বছরের ছায়া নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে— শুধু অপেক্ষা করছে এমন এক প্রজন্মের, যারা রক্ত আর মোহের মায়াজাল ছিঁড়ে সত্যকে সত্য হিসেবে উচ্চারণ করার সাহস দেখাবে।
(সমাপ্ত)