শহীদুল জহির
(বাংলাদেশের গল্পকার ও ঔপন্যাসিক)
শংকর ব্রহ্ম


শহীদুল জহির ১৯৫৩ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের পুরান ঢাকার নারিন্দার ৩৬ ভূতের গলিতে (ভজহরি সাহা স্ট্রিট) জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তার নাম ছিল মোহাম্মদ শহীদুল হক। তার পিতা এ কে নুরুল হক ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা এবং মা জাহানারা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। তার চার ভাই ও চার বোন ছিল এবং তাদের পৈতৃক নিবাস ছিল সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার হাশিল গ্রামে। তার ঠাকুর্দাদা জহিরউদ্দিন ছিলেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও তার দাদির নাম ছিল জিন্নাতুন নেসা। শহীদুল তার নামের জহির অংশটি তার দাদার নাম থেকে নিয়েছিলেন। জহিরের পিতার (এ কে নুরুল হকের) শৈশবে তারা মারা যান। তার নানা ছিলেন সিরাজগঞ্জের আমলাপাড়ার আজিমুদ্দিন আহমেদ ও নানি হামিদা বেগম। এই স্থানগুলি এবং ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া যেখানে তিনি প্রায়ই বেড়াতেন। পুরান ঢাকা, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ প্রভৃতি স্থানে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ কেটেছে। এসব স্থান ও স্থানীয় মানুষের বিচিত্র উপকরণ উঠে এসেছে তার লেখায়।

১৯৫৭ সাল পর্যন্ত জহির পিতার কর্মস্থল কুমিল্লার চাঁদপুরে কাটান। সে বছরই তিনি পুরান ঢাকার নারিন্দার ৩৬ নং ভজহরি সাহা স্ট্রিটে ফিরে আসেন। এসময় তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র ছিলেন। ১৯৯০ সালে তার বাবা মারা যান এবং এরপর থেকে তার মা ঢাকায় ভাইবোনদের সাথে থাকেন। কবি সমুদ্র গুপ্ত তার চাচাতো ভাই।

জহিরের বিদ্যালয় জীবন শুরু হয়েছিল ঢাকার ৩৬ নং র‍্যাঙ্কিন স্ট্রিটের সিলভারডেল কেজি স্কুলে। সেখানে তিনি ১৯৫৮ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত পড়েছিলেন। পরবর্তীতে ঢাকার নারিন্দায় সেন্ট যোসেফ টেকনিক্যাল বিদ্যালয়ে এক বছর পড়েন। ১৯৬৩ সাল তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হন। এরপর ঢাকার বাইরে ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত পড়েছেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া হাই স্কুলে। পরবর্তী বছর, অষ্টম শ্রেণীতে জহির চট্টগ্রামে চলে আসেন। সেখানে তিনি সাতকানিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। একই বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে মানবিক বিভগ থেকে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চ মার্ধমিকের পড়ার জন্য জহির পুনরায় ঢাকায় ফিরে আসেন। ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে তিনি এইচ.এস.সি পাশ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক-পর্বে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। তিনি ১৯৭৬ সালে স্নাতক এবং ১৯৭৭ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ঢাকা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন।

পরবর্তীতে জহির দেশের বাইরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি (স্নাতকোত্তর ডিগ্রি গ্রহণের পূর্বে) ১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ সালে তিনি আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা থেকে ফরাসি ভাষা বিষয়ে ডিপ্লোমা লাভ করেছিলেন। ১৯৯১ সালের আগস্টে তিনি মার্কিন যুক্টরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন, ডি.সি.র আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যান।
সেখানে তিনি ১৯৯২ সালের জুনে নন-ডিগ্রি সার্টিফিকেট ইন প্ল্যানিং অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে ডিগ্রি নেন। ২০০১ সালের জুনে তিনি ইউনিভার্সি অব বারমিংহাম থেকে উন্নয়ন প্রকল্প বিষয়ে ডিগ্রি নিয়েছিলেন।

১৯৭৮ সালের ২৫শে জানুয়ারি জহির বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে যোগদান করেন। সেখানে গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে তিন বছর কর্মরত ছিলেন তিনি। ১৯৮১ সালে তিনি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক ও পরিবহন বিভাগে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস সহকারী সচিব পদে যোগ দেন। ১৯৮৪ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সহকারী সচিব পদে যোগ দেন। ১৯৮৭ সালে তিনি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে সহকারী সচিব পদে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তিনি সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগে যোগ দেন। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত সাভারের বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে উপ-পরিচালক পদেও নিয়োজিত ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব, এবং পুনরায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে উপসচিব হিসেবে ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দ্বায়িত্ব পালন করেন। সে বছরই জহির বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময়কালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উপসচিব হিসেবে কাজ করেন। ২০০৩ সাল থেকে পরবর্তী দুই বছর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে যুগ্ম সচিব হিসেবে ছিলেন তিনি। ২০০৬ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব পদে যোগ দেন। পরবর্তীতে জীবন বীমা কর্পোরেশনে তিনি প্রধান বীমা নিয়ন্ত্রক পদে কিছুকাল কাজ করেন। একই বছরের শেষের দিকে তিনি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে নিযুক্ত হন অতিরিক্ত সচিব পদে।

২০০৮ সালে তার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ভারপ্রাপ্ত সচিব পদে নিযুক্ত ছিলেন।

শহীদুল জহির ছিলেন চিরকুমার। 'কথা' ম্যাগাজিনের সম্পাদক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন যে, তিনি এটি ব্যাখ্যা করতে অক্ষম, "আমি এ ব্যাপারে কিছুই বলতে পারব না, এটা এমনিতেই ঘটে গেছে।" তিনি কম কথা বলতেন এবং অন্তর্মুখী ছিলেন। তার সাথে বন্ধুত্ব করা কঠিন ছিল তবে তিনি অনেক বন্ধুসুলভ ছিলেন। বাংলাদেশী কবি,কলামিস্ট ও লেখক সমুদ্র গুপ্ত তার ভাই।

২০০৮ সালের ২৩শে মার্চ তিনি ল্যাব-এইড কার্ডিয়াক হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এর আগে মার্চের ২১ তারিখ তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত অবস্থায় ইব্রাহিম কার্ডিয়াক সেন্টারে ভর্তি হন। তাকে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সামধিস্থ করা হয়।


শহীদুল জহির তার গল্পে জাদুবাস্তববাদী পদ্ধতির মাধ্যমে নিজেকে আলাদা করে তুলেছেন। তিনি সত্তরের দশকের শেষ দিক থেকে লেখালেখি শুরু করেন। তার প্রথম প্রকাশিত গল্প "ভালবাসা" (১৯৭৪), যেখানে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর প্রভাব স্পষ্ট। ১৯৮৩ সালে পূর্বাণী বোনাস সংখ্যায় 'উড়াল' শিরোনামে তার একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। এটি মরণোত্তর গ্রন্থে সংকলিত হলেও জহির এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেননি। ১৯৮৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ পারাপার প্রকাশিত হয়। বলা হয় যে লাতিন আমেরিকার লেখকদের লেখার জাদুবাস্তবতার ছোঁয়া তার লেখায় রয়েছে। তিনি তার লেখায় জাদুবাস্তবতা ব্যাপারটি সচেতনভাবে প্রয়োগ করেছেন। আহমাদ মোস্তফা কামালের সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, জাদুবাস্তবতার ব্যাপারটা তিনি গ্যাব্রিয়েল গারসিয়া মার্কেসের কাছ থেকে পেয়েছেন। তাকে বাংলাদেশের গ্যাব্রিয়েল গারসিয়া মার্কেস বলা হয়। তিনি স্বীকার করেছেন যে, দুইজন সমসাময়িক ঔপন্যাসিক সৈয়দ শামসুল হক ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ দ্বারা তিনি প্রভাবিত। অনেক সমালোচক জহিরের গল্পকে পরাবাস্তব গল্প হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। পরবর্তীকালে এসব প্রভাব ছাপিয়ে তিনি গল্প বলার স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেছেন, যেটা ‘শহীদুল জহিরীয় ধারা’ হিসেবে চিহ্নিত।

তার প্রথমদিককার রচিত কিছু গল্পের কাহিনীতে মার্ক্সবাদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ১৯৮৮ সালে তার প্রথম উপন্যাস জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রকাশিত হয়। যার উপজীব্য ছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাত। যেখানে তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ব্যবহার করেছেন। এছাড়াও তার "কাঁটা" (১৯৯৫ সালে), "মহল্লায় বান্দর, আব্দুল হালিমের মা এবং আমরা" (২০০০ সালে) এবং "ইন্দুর-বিলাই খেলা" (২০০২ সালে) গল্পগুলিতে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তার ভাবনা, জিজ্ঞাসা ও শিল্পাভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে।

জহিরের ছোটগল্প বাংলা সাহিত্যে ভিন্ন ধারা যুক্ত করেছে। নিত্যনতুন ভাষাবিন্যাস এবং রীতি-ব্যবহারে গল্প বলার কৌশলের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে তিনি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন। তার গল্পের চরিত্রগুলোর অদ্ভুত-উদ্ভট-রহস্যময় কাণ্ড-কীর্তি একধরনের বিমূঢ় অনুভূতি সৃষ্টি করে। যেমন তার "ডলু নদীর হাওয়া" (২০০৩ সালে) গল্পের চরিত্র তৈমুর আলি চৌধুরী একটি শর্ত বা চুক্তি মেনে নিয়ে মগকন্যা সমর্তবানু ওরফে এলাচিংকে বিয়ে করে। চুক্তিটি হলো, সমর্ত তাকে জহর (বিষ) দিয়ে মারবে।
এখানে তিনি প্রেম ও দাম্পত্য জীবনের পরস্পরবিরোধীতা দেখিয়েছেন। অন্যদিকে ২০০৬ সালে প্রকাশিত 'তার মুখের দিকে দেখি' উপন্যাসের এক চরিত্র মামুন মিঞা বালক বয়সে করাতকলে কাঠের ভূষি আনতে গিয়ে চোরাই সারের ট্রাকে করে চট্টগ্রামে পাচার হয়ে যায়। সেখানে শিশু আসমানতারার খরগোশ হিসেবে খাঁচায় বন্দী অবস্থায় তার অন্য জীবন শুরু হয়। একই সময়ে একই চরিত্র মামুন তার পুরান ঢাকার বাড়িতে ফিরে এসে তার স্বাভাবিক জীবন কাটাতে শুরু করে। এখানে জহির ভিন্ন বাস্তবতায় একই ব্যক্তির দুটি সমান্তরাল জীবনের মধ্য দিয়ে সময় ক্ষেত্রের ইঙ্গিত করেছেন।

তিনি কিছু ইংরেজি গল্পও অনুবাদ করেছেন। তার কিছু অপ্রকাশিত কবিতাও রয়েছে। এছাড়াও বাংলা কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন তিনি। তার একটি কবিতার দু'লাইন হল:
... তবুও আমরা আরও একবার সমবেত হলাম,
আর আমাদের সময়ের মাধ্যমে একটি কুঁড়ি ফুলে পরিণত হয়,
একটি রূপালি রূপচাঁদা নোনা পানিতে ভাসে ...

— শহীদুল জহির,

জহিরের কিছু অপ্রকাশিত চিঠি মৃত্যুুর পর বিভিন্ন সংকলন গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। সে সকল চিঠি থেকে ব্যক্তি জহিরের অচাঞ্চল্যকর চারিত্রিক বৈশিষ্ট ধরা পরে। কিছু চিঠিতে, বিশেষ করে আমলাতন্ত্রের অভ্যন্তরে কাজ করা স্বত্ত্বেও সে বিষয়ে তার নির্মোহ মূল্যায়ন নজরে পড়ে।

আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু (২০০৯ সালে) তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের একটি, যেটি ২০১০ সালে প্রথম আলো বর্ষসেরা বই ১৪১৫ পুরস্কার জেতে। এছাড়াও জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা (১৯৮৮ সালে), সে রাতে পূর্ণিমা ছিল (১৯৯৫ সালে) এবং মুখের দিকে দেখি (২০০৬ সালে) উপন্যাসগুলো বাংলা সাহিত্যে অনন্য সংযোজন বলে বিবেচিত হয়। বাংলা ছোটগল্পে তিনি যুক্ত করেছেন নতুন মাত্রা। পারাপার (১৯৮৫ সালে), ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প (২০০০ সালে), এবং ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প (২০০৪ সালে) তার উল্লেখযোগ্য গল্প সংকলন। তার রচিত গল্পসমূহ ব্যাপকভাবে আলোচিত এবং বিশ্লেষিত হয়েছে। "ভালবাসা" (১৯৭৪ সালে), "পারাপার" (১৯৭৫ সালে), "আগারগাঁও কলোনিতে নয়নতারা ফুল কেন নেই" (১৯৯১ সালে), "কাঠুরে ও দাঁড়কাক" (১৯৯২), "কাঁটা" (১৯৯৫ সালে), "চতুর্থ মাত্রা" (১৯৯৮ সালে), "কোথায় পাব তারে" (১৯৯৯ সালে), "ডলু নদীর হাওয়া" (২০০৩ সালে) প্রভৃতি তার উল্লেখযোগ্য গল্প।

পরবর্তীতে নাম বদলালেও জন্মনাম শহীদুল হক নামেই প্রথম গ্রন্থ 'পারাপার' লিখেছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে জহির বলেন, সে সময়ে অন্য শহীদুল হক নামধারী লেখকদের সঙ্গে তার পরিচয়ে ভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছিল বলে তিনি নাম পরিবর্তন করেন। পারাপার শহিদুলের প্রথম গল্পগ্রন্থ, তার মতে যেটির গল্পগুলি অনেকটা প্রথাগত গঠনে লেখা, যার প্রতিটি গল্পে স্বাতন্ত্র্য স্বর-বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। কালি ও কলমের এক পর্যালোচনায় রীতি বা কাঠামোগত দিকের বিচার অনুমানে পারাপার আবদুল মান্নান সৈয়দের গল্পগ্রন্থ 'চলো যাই পরোক্ষ'-য়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এ গ্রন্থে "পারাপার" শিরোনামে একটি গল্প রয়েছে। যেখানে প্রতীকীর মাধ্যমে শ্রেণিশত্রু নিপাতের দিকে দৃষ্টিপাত করেছেন। তার প্রথম প্রকাশিত গল্প "ভালবাসা" এ গ্রন্থে যুক্ত হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে পুরোদস্ত্তর মনস্তাত্ত্বিক গল্প "মাটি ও মানুষের রং"। অন্যান্য গল্পের মধ্যে রয়েছে "তোরাব শেখ", পুরনো ঢাকার প্রেক্ষাপট রচিত "ঘেয়ো রোদের প্রার্থনা নিয়ে"।

১৯৮৫ সালে মাওলা ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত জহিরের অভিষেক গল্প সংকলন পারাপার-এর অধিকাংশ গল্পের কাঠামোগত দিক বিচারে অনেকটা আবদুল মান্নান সৈয়দের ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত চলো যাই পরোক্ষে গল্পগ্রন্থের সঙ্গে মিল থাকলেও জহির এতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন। তার ২০০৪ সালে প্রকাশিত 'ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প' সম্পর্কে আবদুল মান্নান সৈয়দ মন্তব্য করেন: "ওয়ালীউল্লাহর প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে উপস্থিতি সত্বেও শহীদুল জহির নতুন কিছু করেছেন। এখানেই তার স্বকীয় কৃতিত্ব"। জহিরের গদ্যে সৈয়দ শামসুল হকের প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও কমলকুমার মজুমদার, জেমস জয়েস ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের প্রভাবও লক্ষ্যনীয়। এসকল প্রভাবের মধ্য দিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন স্বতন্ত্র ধারা, যা "শহীদুল জহিরীয় ধারা" হিসেবে পরিচিত।

জীবদ্দশায় জহিরের তিনটি উপন্যাস ও তিনটি গল্পগ্রন্থ এবং দুইটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। তার মৃত্যুর পরবর্তী বছর ২০০৯ সালে সর্বশেষ উপন্যাস প্রকাশিত হয়। জীবদ্দশায় প্রকাশিত তিনটি গল্প সংকলনে সর্বমোট ১৯টি গল্প প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলি ১৯৭৪ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে লেখা। এর মধ্যে পুরান ঢাকার প্রেক্ষাপটে ১৯৯৫ সালে রচিত "আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস" গল্পটি জহিরের ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প শিরোনামে দ্বিতীয় এবং ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প (২০০৪ সালে) শিরোনামে তৃতীয় গল্প সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও মৃত্যুর পর একাধিক সংকলন গ্রন্থে সর্বমোট সাতটি অপ্রকাশিত ও অগ্রন্থিত গল্প প্রকাশিত হয়েছে।
জীবদ্দশায় এবং মরণোত্তর মিলিয়ে তার সর্বমোট ১৩টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, এর মধ্যে ৪টি উপন্যাস, ৩টি ছোটগল্প সংগ্রহ, ২টি গল্প সংকলন, ২টি উপন্যাস সংকলন, ১টি সমগ্র এবং ১টি অপ্রকাশিত সংকলন।

জহিরের সর্বমোট ৭টি উপন্যাস রয়েছে। এর মধ্যে ৩টি জীবদ্দশায় প্রকাশিত, ১টি মরণোত্তর, ২টি অগ্রন্থিত এবং ১টি অপ্রকাশিত উপন্যাস। ১৯৮৩ সালে পূর্বাণী পত্রিকার বোনাস সংখ্যায় উড়াল শিরোনামে তার প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয়। তবে গ্রন্থাকারে তার প্রথম উপন্যাস জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে। তার সর্বশেষ উপন্যাস আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু ২০০৯ সালে মরণোত্তর প্রকাশিত হয়ওয়ার পর, প্রথম আলো বর্ষসেরা বই ১৪১৫ পুরস্কার জেতে।
প্রকাশিত, অপ্রকাশিত, অগ্রন্থিত মিলিয়ে জহিরের সর্বমোট ২৬টি গল্প রয়েছে। যার মধ্যে ১৯ রয়েছে গল্প সংকলনে বাকি গুলো তার মৃত্যুপরবর্তী অপ্রকাশিত-অগ্রন্থিত সংকলনসমূহে প্রকাশিত হয়েছে।

[উল্লেখযোগ্য গ্রন্থতালিকা]

পারাপার (১৯৮৫ সালে)
জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা (১৯৮৮ সালে)
সে রাতে পূর্ণিমা ছিল (১৯৯৫ সালে)
ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প (১৯৯৯ সালে)
ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প (২০০৪ সালে)
মুখের দিকে দেখি (২০০৬ সালে)
আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু (২০০৯ সালে, মরণোত্তর)।

জীবদ্দশায় সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০০৪ সালে তিনি আলাওল সাহিত্য পুরস্কার এবং কাগজ সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। তার সাহিত্যচর্চার বিষয় ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। তার রচিত গল্প ও উপন্যাস থেকে নির্মিত হয়েছে একাধিক চলচ্চিত্র, টেলিভিশন এবং মঞ্চনাটক।

[চলচ্চিত্র তালিকা]

ফুলকুমার (২০০২ সালে)
ভালবাসা (২০১৯ সালে, স্বল্পদৈর্ঘ্য)
কাঁটা (২০২১ সালে)

[টেলিভিশন]

চতুর্থ মাত্রা (২০০১ সালে)
কাঁটা (২০১০ সালে)
আগারগাঁও কলোনিতে নয়নতারা ফুল কেন নেই (২০১২ সালে)
কোথায় পাব তারে (দীপংকর দীপন পরিচালিত)
কোথায় পাব তারে (মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত)
শহীদুল জহিরের একাধিক গল্প অবলম্বনে মঞ্চনাটক, টেলিভিশন নাটক এবং স্বল্প ও পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। তার ১৯৯৩ সালে রচিত "এই সময়" (১৯৯৩ সালে) গল্পের উপর ভিত্তি করে ২০০২ সালে আশিক মোস্তফা ফুলকুমার চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। একই গল্প থেকে নাটক নির্মাণ করেছেন ইকবাল খোরশেদ। গল্পটি ১৯৯৯ সালে "ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প" সংকলনে প্রকাশিত হয়। জহিরের ১৯৯৫ সালে রচিত মনোজগতের গল্প "কাঁটা" অবলম্বনে টোকন ঠাকুর একই শিরোনামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন। ১৯৮৫ সালে পারাপার সংকলনে প্রকাশিত ১৯৭৪ সালে রচিত জহিরের প্রথম গল্প "ভালবাসা" অবলম্বনে একই শিরোনামে শুভ্রা গোস্বামী একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন, যেখানে অভিনয়ে ছিলেন দীপক সুমন ও মৌসুমী হামিদ।

একই গল্প নিয়ে রেদওয়ান রনির নির্দেশনা ও ইকবাল হোসাইন চৌধুরীর নাট্যরূপে নির্মিত হয়েছে টেলিভিশন নাটক ফুল। ১৯৯১ সালে রচিত জাদুবাস্তবতাবাদী গল্প হিসেবে পরিচিত, "আগারগাঁও কলোনিতে নয়নতারা ফুল কেন নেই" গল্প থেকে ২০১২ সালে টেলিভিশন নাটক নির্মাণ করেছেন জাহিন জামাল, যেটি চ্যানেল নাইনে প্রচারিত হয়েছিল। গল্পটি ১৯৯৯ সালের ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৯৮ সালে রচিত "চতুর্থ মাত্রা" গল্প থেকে ২০০১ সালে একই শিরোনামে নুরুল আলম আতিক টেলিভিশন নাটক নির্মাণ করেন। জহিরের ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প বইয়ে সংকলিত, ১৯৯৯ সালে রচিত "কোথায় পাব তারে" গল্প অবলম্বনে দুটি নাটক নির্মিত হয়েছে। একটি দীপংকর দীপন পরিচালিত টেলিভিশন নাটক, যেটির চিত্রনাট্য রচনা করেছেন সারা জাকের। অন্যটি রচনা এবং পরিচালনা করেছেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। এছাড়াও কাঁটা গল্প অবলম্বনে ২০১০ সালে একটি টেলিভিশন চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন অনিমেষ আইচ।

তার ১৯৯২ সালে রচিত "কাঠুরে ও দাঁড়কাক" গল্প থেকে দেশ নাট্যদল "জন্মে জন্মান্তর" নামে মঞ্চনাটকও প্রযোজনা করেছে। এছাড়াও তার ১৯৯৫ সালের উপন্যাস 'সে রাতে পূর্ণিমা ছিল' থেকে রেজা আরিফের নির্দেশনায় মঞ্চনাটক প্রযোজনা করেছে নাট্যদল আরশীনগর।

[পুরস্কারের তালিকা]

আলাওল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৪ সালে উপন্যাসে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য বিজয়ী
কাগজ সাহিত্য পুরস্কার ২০০৪ সালে কথাসাহিত্য ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প (২০০৪ সালে) বিজয়ী
প্রথম আলো বর্ষসেরা বই ১৪১৫ ২০১০ বর্ষসেরা বই আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু (২০০৯ সালে) বিজয়ী মরণোত্তর।