আমি: আজ চাঁদের আলো একেবারে বিছানায় এসে তোমার মুখের ওপর পড়েছে; বড় সুন্দর লাগছে। চাঁদের আলোর সবটাই যেন তোমার রূপের আভা হয়ে উঠেছে। আমি চোখ বন্ধ করেও তোমায় দেখতে পাচ্ছি।
তুমি: (অবাক বিস্ময়ে) আমি কি সুন্দর? অনেক দিন তো এমন কথা শুনিনি।
আমি: যে সুন্দর সে কি স্বীকার করে? যে দেখে সেই তো বোঝে সামনের প্রেমাস্পদটি কত সুন্দর।
তুমি: আমি কি আর সুন্দর হতে পারি? যাকে ভালোবাসো না সে কী করে সুন্দর হতে পারে?
আমি: কে কাকে ভালোবাসে, তা কী করে বোঝা যায়?
তুমি: যদি কেউ কারো খুশিতে সবকিছু করতে রাজি থাকে, তাহলে মনে হয় সে ভালোবাসে।
আমি: কিন্তু অনেক কারণেই তো রাজি থাকতে পারে। আবার কারো ভালোর জন্যেই ভালোবেসে কোনো কিছু করতে রাজি নাও হতে পারে।
তুমি: সেটা আলাদা ব্যাপার; কিন্তু কেউ কাউকে ভালোবাসলে সে অন্তত ছোটখাটো কিছু তো শুনবেই।
আমি: দেখো, ছোটখাটো ব্যাপার অনেক সময় অনেক বড় ব্যাপার হতে পারে। বাবা তার ছোট ছেলের কথা শুনে বিপদ হতে পারে বুঝে অনেক সময় তার কথা শোনেন না; তাতেই কি প্রমাণ হয়ে যায় বাবা সন্তানকে ভালোবাসেন না? আবার ছোট জিনিসের জন্যই যদি কেউ ভাবে ভালোবাসা নেই, তাহলে কি সত্যি সে ভালোবাসা চায়?
তুমি: ভালোবাসলে সবই করা যায়…
আমি: এই পৃথিবীটা কিন্তু শুধু তুমি আর আমি নই। আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে তাকে নিয়েই আমরা বাঁচি। কিন্তু তবুও তার মাঝে তুমি প্রধান। সবার আগে তুমি; তোমার সবকিছু শুনব। কিন্তু তার পরেও সামান্য কিছু উদ্বৃত্ত দিয়ে যদি অনেক জীবনের সাথে বেঁচে থাকা যায়, তাদের ভালোবাসা যায়, তাতে তোমার ক্ষতি কোথায়? তোমার তো কিছু কমে যাচ্ছে না। বরঞ্চ সবার সাথে তোমার জীবনের বৃত্তটা আরও বেড়ে যাবে, আরও বেশি উপভোগ করতে পারবে।
তুমি: আমাকে যারা পছন্দ করে না, আমিও তাদের পছন্দ করি না। আমার বৃত্তের মধ্যে তাদের কোনো স্থান নেই।
আমি: কিন্তু তোমার বৃত্ত আমি অস্বীকার করি না। তাদের যেমন ভালোবাসো তুমি, সেই বৃত্তকে একটু বাড়িয়ে আমার বৃত্তকেও তার ভেতরে নিয়ে নাও। দেখো জীবন আরও সুন্দর হবে, আরও সুখী মনে হবে। যত বৃত্ত ছোট করবে, ততই সুখের গণ্ডি কমে যাবে।
তুমি: আমি সবাইকে নিয়ে সুখী হতে চাই না। আমি শুধু তোমাকে চাই। যারা আমায় চায় না, তাদের আমি চাই না।
আমি: আমি তো তোমারই, তোমার জন্যেই আমার সব। কিন্তু বলছি মানুষ একা বাঁচতে পারে না; আশপাশের সবাইকে নিয়েই বাঁচা। যদি শুধু তুমি আর আমি থাকি, তাহলে কি আমাদের উৎসটাকেও অস্বীকার করা হয় না? বাগানে একটা গাছ কি শুধু নিজেই বাঁচে? মাটি, জল, আলো, বায়ু—পরিবেশের সবকিছুই তো লাগে।
তুমি: আমি অত মহান বড় ব্যাপার বুঝি না। শুধু তোমায় চাই, আর তুমি আমার কথা শুনবে। আর কাউকে আমি চাই না আমাদের মাঝে।
আমি: তোমার আর আমার মাঝে আর কেউ নেই। আমি তোমার জন্যেই—শুধু তোমারই। কিন্তু আমি আমার পাশে যারা আছে তাদের অস্বীকার করি কীভাবে? যাদের নিয়ে জন্মেছি, যাদের নিয়ে বড় হয়েছি, তারা কি আমার কেউ নয়? তুমি আমার, আমিও তোমার; কিন্তু তারাও আমার, তারাও তোমার।
তুমি: দেখো, আমি শুধু একটাই বুঝি—তুমি আমার। আর আমি যা বলব, তুমি তাই করবে। আমাদের মাঝে ওদের কোনো স্থান নেই। আমি কিন্তু এসব আর একেবারেই সহ্য করতে পারছি না। আমি চলে যাব। তুমি আমায় ভুলে যাও। আমায় তুমি একটুকুও ভালোবাসো না। নইলে কেন তুমি সবসময় সবাইকে নিয়ে ভাবো? আরে, আগে ঘরকে নিয়ে ভাবতে হয়। ঘর থাকলে তবেই তো সব ঠিক থাকবে।
আমি: আমি তো সেটাই বলছি, সবার আগে তুমি। তার পরে ছোটখাটো যা কিছু অন্যের জন্যেও ভাবতে হয়—আর আমি তো সেটাই করছি।
তুমি: দেখো, তোমার এসব বড় বড় কথা আমার আর সহ্য হচ্ছে না। শুধু একটাই মনে রাখবে—হয় আমি, নয় ওরা। তোমাকে দুটোর মধ্যে একটা বেছে নিতে হবে।
আমি: বলেছি তো সবার আগে তুমি, আর তোমার স্থান কেউ পাবে না। কিন্তু তবুও বলছি, তোমার পরেও ওরা আছে—এটা অস্বীকার করা যায় না।
তুমি: তাহলে তুমি তোমার মতোই থাকবে বলছো? দেখো, আমি আর সহ্য করতে পারছি না—
আমি: ঠিক আছে। ঠিক আছে, তোমার আর আমার মাঝে এখন থেকে আর কেউ থাকবে না। শুধু তুমি আর আমি।
(আমি গ্লাসের দুধটুকু পান করে শুয়ে পড়লাম।)
অর্ধরাত্রির পর
তুমি: তুমি কি জেগে আছো? (গায়ে জোরে ধাক্কা দিয়ে)
আমি: আমি জেগে আছি, আর ঘুমোলে জাগব না।
তুমি: কেন, কী হয়েছে? তুমি কি গ্লাসের দুধ খেয়েছো?
আমি: হ্যাঁ, খুব ভালো লাগছিল। তোমার হাতের সব রান্না খুব ভালো। আর মধু দেওয়া দুধ আরও ভালো।
তুমি: (সর্বনাশ!) ওতে তো—আমি—বি—ষ—দিয়ে রেখেছিলাম, আমি খাব ভেবে—
আমি: আমি জানতাম, তাই তো পান করেছি। তুমি যা চেয়েছিলে—তোমার আর আমার মাঝে কেউ থাকবে না। সত্যি, আজ থেকে কেউ থাকবে না। শুধু তুমি আর আমি।
তুমি: আমি তো তোমাকে চেয়েছি, আর তুমি তো চলে যাচ্ছ! আমার তো সর্বনাশ হয়ে গেল!
আমি: না না, আমি তো তোমায় সব দিয়ে গেলাম। তোমার শেষ ইচ্ছা পূর্ণ করলাম। তোমার আর আমার মাঝে কেউ রইবে না আর।
তুমি: না না, আমি তো এমন চাইনি। আমি চেয়েছি তোমাকে।
আমি: আমায় চাইতে গিয়ে তুমি নিজেকে হারাতে রাজি ছিলে, তাই তো আমি ভালোবাসার প্রতিদান দিতে নিজেকে হারিয়ে তোমাকে দিয়ে গেলাম ভালোবাসার উপহার। ভালোবাসার বিষ যে প্রতিদিন আমার দেহ-মনে প্রবেশ করছিল, আজ তার পূর্ণ প্রতিক্রিয়া হলো।

মন্তব্য করতে ক্লিক করুন