আমার মনের অন্তরের অন্তস্তলে এক বন্ধু আছে। সে আমার বন্ধু, আমার পরামর্শদাতা, আদেশকর্তা—যা-ই বলো না কেন; সে আমার পরম বন্ধু। তার সঙ্গে আমার এক অতি গভীর থেকে গভীরতর সম্পর্ক আছে।
সে আমায় বলেছে, আমার দুটি বাড়ি আছে। একটা এখানে—অর্থাৎ আমি এখন এই পৃথিবীতে আছি, হেসে-খেয়ে সুখে-দুখে জীবনযাপন করছি, সেটি একটি। আর একটা আছে, যা আপাতভাবে দেখা যায় না; কিন্তু ভাবনার স্তরে তার একটা নির্দিষ্ট অবস্থান আছে।
একসময় আমার খুব শারীরিক সমস্যা দেখা দিল। আমার ভয় হতে লাগল যে এবার হয়তো আর সেরে উঠব না। সেই বন্ধু আমায় অভয় দিতে লাগল যে সব ঠিক হয়ে যাবে। সে বলল, “মন শান্ত রাখো, শক্ত হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে কঠিন পরিস্থিতিকে সামাল দাও। ঝড়ের মাঝেও তরী ডুববে না। আর যদি কখনো ডুবে যায়, কষ্ট পেয়ো না; স্বাভাবিকভাবেই তাকে গ্রহণ করো। আমি তো তোমার দুটি বাড়িই চিনি, তাই আমার কাছে মনে হয় তুমি যে বাড়িতেই থাকো না কেন, তুমি তো সেই একই প্রিয় বন্ধু। তোমার মনে হচ্ছে এই বাড়িটা বেশি ভালো; অথবা আরেক বাড়ি যেটা তুমি এখনো ভেবে উঠতে পারোনি। কিন্তু যখন ঠিকভাবে বুঝে যাবে, তখন দেখবে দুটিই সমান। বরঞ্চ যেটি তুমি এখনো মনে করতে পারছ না, সেটি অনেক ভালো, অনেক বেশি শান্তির।”
আমি বললাম, “আমার বাড়িঘর, ছেলেমেয়ে, বউ, মা-বাবা, আত্মীয়-বন্ধুস্বজন, পাড়াপড়শি—এদের কত ভালোবাসি! এদের ছেড়ে, এদের ভুলে কী করে থাকব? এত সুন্দর বাগান, কত ফুল হয়, কত শাকসবজি! কত আম, জাম, লিচু, কাঁঠালের গাছ; প্রতিটি ঋতুতে কত ফুল-ফল হয়! সবাই কত আনন্দ করে সব উপভোগ করি। ঘরে আমার নিজের কত সুন্দর বিছানা, খাট-পালঙ্ক, আরামের কত কী! এসব তো আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এদের ছেড়ে তো আমি এক নিমেষও আলাদা থাকার কথা ভাবতেও পারি না।”
কিন্তু বন্ধু বলল, “শোনো, তোমার মনে হচ্ছে এসব ছেড়ে থাকতে পারবে না কারণ তুমি যে অবস্থাতে আছো, সেখানে এসব কিছু আছে। কিন্তু যদি এমন অবস্থা আসে যেখানে এসব কিছুই নেই, শুধু তুমি—শুধু তুমি আছো! আর সেটা একদিন হতে বাধ্য। তখন তুমি কী করবে? ধরো, দেশে এমন আইন হলো যে তোমাকে বা তোমার মতো সবাইকে একটা সময়ের পর নিয়ম অনুযায়ী সব ছেড়ে যেতে হবে; যা সবার জন্যই সমান! তখন তুমি কী করবে? মানবে না?”
“না মানলেও যেমন দোষী সাব্যস্ত হলে কয়েদিকে জেলে নিয়ে যায়, তোমাকে সেভাবেই ধরে নিয়ে যাবে। এসব ছেড়ে যেতে হবে—সেটাই নির্মম বাস্তব। আর শুধু তোমার বাড়িঘর বা আত্মীয় নয়, তোমার শরীরটাকেও এই বাড়িতেই ছেড়ে যেতে হবে। কারণ তোমার দ্বিতীয় বাড়িটি শুধু ভাবনা দিয়েই তৈরি। কিন্তু আমি দুটোই চিনি। তাই আমি বলছি, তুমি মনের থেকে প্রস্তুত হয়ে যাও; কোনো দুঃখ না রেখে দ্বিতীয় বাড়িতে যেতে রাজি হয়ে যাও। দেখবে, তাহলে তোমার কোনো কষ্ট হচ্ছে না। যেমন তুমি শহরের বাড়ি থেকে গ্রামের খামার বাড়িতে যাচ্ছ—তেমনটাই ভাবো। তাহলে কি তুমি কষ্ট পাবে? কী ভাবছো?”
