Amarendra sen

গল্প - একটি মোরগের কাহিনী

Amarendra sen
রবিবার, ০৩ মে ২০২৬ জীবনবাদী

সবুজ ঘাসের ওপর ভোরের প্রথম আলো পড়ার আগেই তার দিন শুরু হতো। গ্রামের সেই ছোট্ট বাড়িটার বাঁশবনের পাশে যখন কুয়াশা জমে থাকত, তখন সে ডানা ঝাপটে জানান দিত—নতুন দিন আসছে। তার লাল ঝুঁটিটা ছিল টকটকে সূর্যের মতো উজ্জ্বল। নিজের ছানাগুলো,সঙ্গী সঙ্গিনিদের নিয়ে উঠোনের ধুলোয় ঘুরে বেড়ানো, খড়কুটোর মধ্যে খাবার খোঁজা আর প্রকৃতির অফুরন্ত উষ্ণতা গায়ে মাখাই ছিল তার জীবনের আনন্দ। সে ভাবত, এই পৃথিবীটা যেমন মানুষের, তেমনি বোধ হয় তারও।

কিন্তু একদিন সব বদলে গেল।

বিকেলের পড়ন্ত রোদে যখন সে ডানা মেলে একটু উড়তে চাইল, তখনই মানুষের শক্ত হাত তাকে জাপটে ধরল। কোনো অপরাধ ছাড়াই তার দুই পা শক্ত দড়িতে বেঁধে ফেলা হলো। এখন সে পড়ে আছে উঠোনের এক কোণে। ওপরের নীল আকাশটা এখনো আগের মতোই আছে, কিন্তু তার ডানা ঝাপটানোর অধিকারটুকু কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

সে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে মানুষের ব্যস্ততা। যে মানুষগুলো তাকে প্রতিদিন খাবার দিত, আজ তারাই তার দিকে তাকাচ্ছে অন্য এক তৃষ্ণা নিয়ে। সে মনে মনে ভাবে, মানুষ কি সত্যিই এত ক্ষুধার্ত? প্রকৃতি তো কাউকে খালি হাতে ফেরায় না। নদীতে জল, গাছে ফল, দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ আছে। তবে কেন তার মতো এক ক্ষুদ্র প্রাণকে এক রাতের আহারের জন্য অকালে প্রাণ দিতে হবে?

সে তো কখনো কোনো নগর পোড়ায়নি, কোনো যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। সে শুধু চেয়েছিল বনের ধারে বা ঝোপের আড়ালে নিজের মতো করে বাঁচতে। নিঃশব্দ প্রকৃতির অংশ নিতে। কিন্তু মানুষের কাছে তাঁর জীবনের চেয়ে ‘প্রাতরাশ’ বড় হয়ে উঠল।

রাতের অন্ধকার যখন ঘনিয়ে আসে, সে দেখতে পায় ডাইনিং টেবিলে মানুষের হাসাহাসি আর আলোর ঝিলিক। একটু পরেই হয়তো তার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে সুগন্ধি মসলার ঘ্রাণে। অথচ সে মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে চায়, “তুমিও তো প্রকৃতির নিয়মে একদিন মরবে, তবে আমাকে কেন আমার সময় হওয়ার আগেই চলে যেতে হচ্ছে? আমার জীবন কি এতটাই মূল্যহীন?”
মানুষকে স্বাভাবিক মৃত্যুর আগে যদি কেউ মেরে ফেল তাকে হত্যা বলা হয়, আইন অনুযায়ী তার বিধান আছে। আমিও একই স্রষ্টার জীব মানুষ কি শুধু নিজের জীবনকে
সুরক্ষিত করতে পারে অন্য জীবের জীবনকে উপেক্ষা করে?মানুষ জীবন স্বাভাবিক মৃত্যু কে স্বীকার করে সেই রকম কেন ক্ষুদ্র প্রাণীর জন্যও ভাবে না?

অসহায় মোরগটি আকাশের শেষ তারাটার দিকে তাকিয়ে এক নীরব দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার চোখের কোণে জমে থাকে এক ফোঁটা জল, যা মানুষের পড়ার সাধ্য নেই। সে শুধু চেয়েছিল প্রকৃতির কোলে একটুখানি আশ্রয়, কিন্তু মানুষের ক্ষুধা আর শ্রেষ্ঠত্বের দাপটে তার সেই ছোট্ট ইচ্ছাটি এক টুকরো ধারালো ইস্পাতের নিচে স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনে।

পরে পড়বো
১২
মন্তব্য করতে ক্লিক করুন