গল্প — অপরাজিতা

মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৫ জীবনবাদী, বিরহ

“তুমি আমার কাছে আসবে না! আমাকে ছোঁবে না!”

মাঝরাতে অপরাজিতার কথায় তেমন অবাক হলাম না; কারণ আমার এমন অভিজ্ঞতা আগেও হয়েছে। মাঝে মাঝেই এমন হয়। কিন্তু আজ কেন এমন হলো, সেটা বোঝার চেষ্টা করছি।

আমি বললাম, “দেখো, আমি এমন কিছুই করিনি যে তুমি আমার সাথে এমন ব্যবহার করবে। আমি তো একজন মানুষ; আমি দশজনের সাথে কথা বলব, মিশব, তাদের সাথে সামাজিক ভাব বিনিময় করব—এটাই তো স্বাভাবিক! তুমিও তো তাই করছ। আমি কাকে কী বলছি, কার সাথে কী কথা বলছি এবং সেটা কোন প্রসঙ্গে বলছি—তুমি তা কী করে জানবে যদি সবটা না শুনে থাকো?”

অপরাজিতা বলল যে আমি কী করছি না করছি, কাকে কী বলছি—সে নাকি আমার চোখ দেখেই বুঝতে পারে। আবার বলল, “আমি সব জানি তুমি কাকে কী বলছ। আমার কাছ থেকে তুমি কোনো কিছু লুকাতে পারবে না। এটা মনে রাখবে। আমি একদম পছন্দ করি না যে আমার ঘরের খবর অন্য লোকেরা শুনে নিক।”

আমার মনে হলো, আমি হয়তো আমার বন্ধুকে কিছু একটা বলছিলাম। যেমন—মনটা ভালো নেই, মানসিকভাবে খুশি হতে পারছি না, কষ্টে আছি, জানি না জীবনে কেন এত অশান্তি আসছে ইত্যাদি। আমি তো অফিসে গিয়ে ফোনালাপ করেছিলাম, তাহলে অপরাজিতা এটা কী করে জানল? ও কি কোনো সফটওয়্যার দিয়ে আমার ফোনের তথ্য পেয়ে যাচ্ছে, নাকি কোনো এজেন্সি লাগিয়ে দিয়েছে? কিন্তু এত কেন কৌতূহল আমি কাকে কী বলি, কী করি? আমি যা কিছু করছি, তা তো বাস্তব জীবনে সবাই করে। এটাই তো আমাদের মতো নগণ্য মানুষের সামাজিক জীবন।

কিন্তু আমি তো এমন কিছু বলিনি যাতে অপরাজিতাকে দোষী বা দায়ী করা হয়েছে। হয়তো ও মনে মনে এক মনগড়া কাহিনী তৈরি করে আমার ওপর মানসিক প্রতিশোধ নিচ্ছে।

আমি পরিস্থিতি হালকা করার জন্য বললাম, “দেখো, এমন সন্দেহ করলে আর মনে মনে এমন ভাবলে জীবন চলে না। ভালো-মন্দ বলা বা ভাবার অধিকার প্রত্যেকের আছে। এটা একটা স্বাভাবিক মানসিক প্রবণতা। তুমি যেটাকে আমার দ্বারা খুব অন্যায় ভাবছ, সেটা আসলে মানুষের এক সহজাত প্রবৃত্তি। সবাই এটা করে থাকে। তবে কারো নামে বিনা কারণে অপবাদ দেওয়া অন্যায়; সেটা সমীচীন নয়। তুমিও তো প্রতিদিন রুটিন করে সবার সাথে কথা বলছ, তখন কিন্তু ভাবছ না যে তুমি অন্যায় করছ। তুমি স্বাভাবিকভাবেই তা করে যাচ্ছ। এটাই স্বাভাবিক।”

কাউকে কিছু বলা মানেই নিন্দা নয়। এটা একদিক থেকে ভালো যে এতে অন্যের মতামত জানা যায় আর নিজের মনের কষ্ট লাঘব হয়। কিন্তু অপরাজিতা আরও বেশি রেগে গিয়ে বলল, “তোমার নিজের ভুল কোনোদিন নিজের কাছে বিশ্বাস হয় না। তুমি যে কোনো ভুল করতে পারো বা অন্যায় করতে পারো, সেটাও তুমি মানো না। তুমি সেদিনই আমার কাছে আসবে, যেদিন তুমি তোমার ভুল বুঝবে এবং সবকিছু আমাকে দেখিয়ে করবে। যাকেই যা বলবে, আমার সামনে বলবে।”

আমি বললাম, “দেখো, আমি যদি ভুল করে থাকি, তবে তুমিও সেই একই ভুল প্রতিদিন করছ। কিন্তু তুমি নিজেই বুঝতে পারছ না যে যা বলছ তা অন্যায়; সেটাই তুমি প্রতিদিন অবহেলায় করে যাচ্ছ। তুমি কি ভাবছ আমি যদি তোমাকে না ছুঁই, তাতে আমার কিছু আসে যায়?

অপরাজিতা আরও রেগে বলল, “তোমার তো কিছুই আসে যায় না! তোমার সবই আছে বাইরে।”

আমি বললাম, “আমি কিন্তু এমন কথা পছন্দ করি না; আমাকে এভাবে কথা বলবে না। আমি অফিসের কাজ, সংসারের বিভিন্ন ঝামেলা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবে ভেবে খুব দুশ্চিন্তায় (Tense) আছি। আমাকে এখন ঘুমানো দরকার। কাল আমার অফিস আছে, অনেক কঠিন সমস্যা নিয়ে কাজ করতে হবে।”

অপরাজিতা টিপ্পনী কেটে বলল, “হ্যাঁ, তোমার তো ঘুম হলেই হলো। মার কোলে গিয়ে ঘুমিয়ে নাও। নাহলে আরও হয়তো কেউ আছে, তার কাছে যেতে পারো।”

আমি বললাম, “দেখো, তুমি কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ! একটু ভেবে কথা বললে অনেক কিছু সহজ হয়ে যাবে। আর এসব আমার প্রতিদিন ভালো লাগছে না। আমায় বাঁচতে দাও।”

অপরাজিতা বলল, “হ্যাঁ, আমি তো তোমাকে মেরে ফেলতে চাই! আমিই তো তোমার সবচাইতে বড় শত্রু!”

আমি শান্তভাবে বললাম, “দেখো, আবেগতাড়িত হয়ে কথা বললে সব সমস্যার সমাধান হয় না। সমাধানের জন্য সমস্যাটা কী, তা আগে বুঝতে হয়।”

অপরাজিতা বলল, “সমস্যা হচ্ছে তুমি লুকিয়ে চুরিয়ে কাজ করো আর আমার অসাক্ষাতে আমাকে নিচু করে সবাইকে বলো। সেটা তোমার বন্ধুকেই হোক আর বাড়ির লোককেই হোক।”

আমি বললাম, “তুমি এটা ভুল বললে। আমি অবশ্যই ভাবের আদান-প্রদান করি, কিন্তু সেটা তোমার সামনে হলে হয়তো অন্যভাবে হতো। যেমন—তুমি যদি আমার কাছে বসে তোমার আপনজনের সাথে কথা বলো, তখন তুমি পরিস্থিতি অনুযায়ী কথা গুছিয়ে নেবে। তুমি কি আমার ভালো-মন্দ তোমার আপনজনকে বলো না? তাদের মতামত শোনো না? আমি জানি তুমিও এটা করো। তাহলে কেন শুধু আমাকেই দায়ী করছ? এটা একটি স্বাভাবিক মানবিক প্রবণতা।”

অপরাজিতা গোঁ ধরে বলল, “দেখো, তুমি যাই বলো না কেন, আমি কিন্তু তোমার মতো করি না। তুমি এসব করে আমাদের সম্পর্ক নষ্ট করে দিচ্ছ।”

আমি উত্তর দিলাম, “সেটাই যদি হয়, তবে দোষ শুধু আমার নয়, তোমারও সমান দোষ আছে। তোমার ভাবনাতেই ভুল আছে; গোড়ায় গলদ রয়ে গেছে। আমরা কি পৃথিবীতে শুধু দুজন? আমাদের চারপাশে যারা আছে—গাছপালা, বাড়িঘর, মানুষ—সবাই আমাদের মনে ভালো-মন্দের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কিন্তু যতটা সম্ভব ভালো দিকটা নিয়ে চলার চেষ্টা করতে হয়।”

অপরাজিতা রেগে বলল, “রাখো তোমার বড় বড় কথা। এসব কথা আমার অসহ্য।”

আমি বললাম, “দেখো, তুমি যদি ভাবো সবাই তোমাকে শুধু ভালো বলবে, তবে কী করে বুঝবে তোমার ভুল কোথায়? তুমি শুধরাবে কী করে? শুধু তুমি বলবে আর সবাই শুনবে, তা তো হয় না। ভুল মানেই অন্যায় নয়। যাকে তুমি ভাবছ তোমাকে ছোট করেছে বা তোমার নামে খারাপ বলছে বলে সে তোমার শত্রু বা ঘৃণার পাত্র—আসলে তা নয়। যদি কেউ তোমাকে কিছু বলেও থাকে, তুমি তার সাথে মিশলে, তাকে ভালোবাসলে বা ভাবের আদান-প্রদান করলেই তো সে বুঝবে তুমি কত ভালো। আর তুমিও বুঝবে তাদের মনে তোমাকে নিয়ে কী আছে। তুমি তাদের খারাপ চাও না, তুমি তাদেরও শুভাকাঙ্ক্ষী।”

আমি আরও যোগ করলাম, “যদি তুমি এভাবে নিজেকে গুটিয়ে রাখো এই ভেবে যে সবাই তোমাকে খারাপ বলছে বা তোমার জীবন বিষিয়ে দিচ্ছে, তবে সেটা বড় ভুল। তুমিও তো তাদের সাথে তেমনই করছ, যেমনটা তুমি অভিযোগ করছ তাদের বিরুদ্ধে। ফলে এক দুস্তর দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, যেখানে কেউ কাউকে বুঝতে পারছে না; শুধু একে অপরকে দোষারোপ করছে। এটা অনেকটা মনের ‘সিস্টেম ডেডলক’-এর মতো। দয়া করে এর থেকে বেরিয়ে এসো। দেখবে জীবন কত সুন্দর।”

“যে আজকে তোমাকে অহংকারী বলছে, কাল সেই বলবে তুমি কত ভালো! শুধু রূপেই নয়, গুণেও তুমি তার প্রিয়। তোমার মতো মানুষ সে আর দেখেনি—এমনও বলতে পারে! তুমি সবাইকে তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছ এবং ভাবছ তোমার সুন্দর জীবন সবাই নষ্ট করে দিচ্ছে। তুমি নিজেকে এত একা ভাবছ যে ওদের অন্য গ্রহের লোক মনে করছ, কিন্তু ওরাও তোমার একান্তই আপন।”

সবশেষে বললাম, “তুমি ভাবছ ওরা তোমার কী করবে? তুমি তো ‘অপরাজিতা’, কারণ তোমার জগতে তুমি একাই রাজত্ব করছ। কিন্তু মনে রাখবে, তুমি শুধু নিজের কাছেই অপরাজিতা। আসলে তুমি ওদের কাছে হেরে গেছো। কারণ, ওরা সবার সাথে সম্মানজনক দূরত্ব রেখে সুখে দিন যাপন করছে। জীবনের যতটুকু সুখ সম্ভব, ওরা চারপাশ থেকে তা নিংড়ে নিয়ে বেঁচে আছে। আর তুমি শুধু নিজের গড়া প্রাসাদে একা। নিজের প্রাসাদ যতই বড় হোক, যদি সেখানে শুধু তুমি একাই থাকো, তবে তাতে সুখ কোথায়? আমি যদি এই পৃথিবীতে একা হয়ে যাই, তবে সেটা কি সুখের হবে, নাকি ভয়ের?”

২৮০ বার পঠিত রিপোর্ট

মন্তব্য করুন

লেখকের অন্যান্য প্রকাশনা