আগে একটা সাধারণ ডাকাত আসত,
মুখে গামছা বাঁধা, হাতে চকচকে রামদা;
ভয়ে বুক শুকিয়ে যেত ঠিকই,
কিন্তু অন্তত বোঝা যেত লোকটা ডাকাত।
তারপর আস্তে আস্তে কিছু মার্জিত লোক এল,
ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি, মিষ্টি হাসি,
খুব বিনয়ের সঙ্গে এক কাপ চা চেয়ে নিয়ে
বলল, “দাদা, চাঁদা তো নয়, এ হলো আমাদের জাতীয় সেবা।”
আমরা কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, “কত?”
ওরা হাসিমুখে বলল, “আপনার অভিরুচি,
তবে লাখের নিচে নামলে তো শিল্পের অপমান হয়।”

এখন আর কেউ রামদা তোলে না।
চাঁদাবাজি এখন চারুকলা ইনস্টিটিউটের সিলেবাসের মতো নিখুঁত,
দুর্নীতি এখন মার্জিত সুকুমার কলা।
রসিদ দেওয়া হয়, তাতে সূক্ষ্ম জলছাপ থাকে,
উপরে লেখা থাকে ‘শুভকামনা’।
পকেট সাফ করে নেওয়ার পর ওরা কাঁধে হাত রেখে বলে,
“শরীরটা ভালো যাচ্ছে তো কাকাবাবু? প্রেসারের ওষুধ খাচ্ছেন তো?”
আমরাও বাধ্য হয়ে মাথা নেড়ে বলি,
“হ্যাঁ বাবা, ভালো। তোমাদের কৃপায় বেঁচে আছি।”

বেঁচে তো ছিলামই কোনোমতে।
কিন্তু মুশকিল বাধাল পাড়ার চায়ের দোকানে সুধীরবাবু।
একদিন হঠাৎ আনমনে বলে ফেললেন,
“সূর্যটা তো সবার আকাশেই সমান আলো দেয়, তাই না?”
পরের দিন ভোরে গিয়ে দেখা গেল,
দোকানের কোণের বেঞ্চিতে সুধীরবাবু আর নেই।
দোকানদার নিচু গলায় কেটলিতে চা নাড়তে নাড়তে বলল,
“সুধীরদা একটু অন্যরকম ভাবতেন তো,
তাই ওনার হিসেবটা কাল রাতে নিয়মমাফিক চুকিয়ে দেওয়া হলো।”

কারা চুকিয়ে দিল, কেউ জানে না।
অথচ গলির কুকুরটাও জানে।
শহরের দেওয়ালে দেওয়ালে এখন পুণ্যবানেরা আলকাতরা লেপছে,
একটু ভিন্ন সুর শুনলেই
পকেট থেকে ছোরা নয়,
সোজা স্বর্গের সিলমোহর বের হয়ে আসে।
তারপর একটা লাশ ভেসে ওঠে নর্দমায়,
আর বিবৃতিতে লেখা হয়:
‘ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার্থে আবর্জনা পরিষ্কার করা হইল।’

আজকাল সকালবেলা ঘুম ভাঙলে
জানালা খুলে আগে দেখে নিই রোদটা বৈধ কি না,
বাতাসে শ্বাস টানাটা কোনো অনুভূতির বিরুদ্ধে গেল কি না।
কাল শুনলাম পাশের বাড়ির নিপাট ভদ্রলোক
বাড়ি ছেড়ে বাক্স-প্যাটরা গুটিয়ে পালাচ্ছেন।
জিজ্ঞেস করলাম, “দেশ ছাড়ছেন কেন ভাই? ঘরভাড়া বেশি?”
তিনি ফিসফিস করে বললেন, “না দাদা,
নিশ্বাস নেওয়ার ট্যাক্স আর বেঁচে থাকার ঝুঁকি—
দুটোই এখন সাধ্যের বাইরে চলে গেছে।”

যেখানে চুরি করা এখন ললিতকলা,
মানুষ খুন করা পবিত্র শুদ্ধিকরণ,
আর চোখ-কান বুজে থাকাই একমাত্র নাগরিক সদ্‌গুণ—
সেখানে আর মানুষ বাঁচে না।
শুধু আমরা কয়েকজন কাঠের পুতুলের মতো
প্রতিদিন সকালে হাত বুলিয়ে দেখে নিই,
মাথাটা এখনও ঘাড়ের ওপর আছে, না কি
কোনো দক্ষ শিল্পী এসে নিঃশব্দে কেটে নিয়ে চলে গেছে।